আধুনিক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা নিয়ে তার আগমনই আবির্ভাব হয়ে ওঠে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রাধান্যে মুদ্রণশিল্পের অগ্রগতিতে পত্রপত্রিকা প্রকাশের আলোয় শিল্পবিপ্লবের নগরসভ্যতার বিস্তারে উপন্যাসের আবেদন মুখর হয়ে ওঠে। রূপকথা বা অলৌকিক, ভোতিক গল্প নয়, ধর্মীয় বা পৌরাণিক কাহিনিও নয়, যুক্তিবাদী অনুভূতিপ্রবণ আধুনিক মানুষ মানুষেরই মধ্যেই অচেনা-অজানা খনির পরশমণিকে পরশ পেতে চাইল। তারই শিল্পরূপ সাহিত্যে এল। জন্ম হল উপন্যাসের। ১৭১৯-এ ইংল্যাণ্ডের ড্যানিয়েল ডিফো’র ‘রবিনসন ক্রুশো’ প্রকাশের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু হল। সেই উপন্যাসই তার অভিজাত প্রকৃতি ও ব্যাপ্তির উৎকর্ষে হয়ে উঠল মহাকাব্যের আধুনিক সংস্করণ। তার অনন্য শিল্পরূপ, আলোআঁধারি ঘরবাড়ি। সেই ঘরবাড়ির দৃশ্য প্রকৃতির আড়ালে অদৃশ্য সত্তার পরিচয় নানাভাবে তার বনেদিয়ানাকে চিনিয়ে দেয়। ছয়টি উপাদানের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে তোলা চেনা অথচ অচেনা মহলের রূপমাধুরীও নানাভাবে উপন্যাসের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
১। Plot বা কাহিনিবৃত্ত
উপন্যাসে কাহিনি বা Story থাকে না, থাকে কাহিনিবৃত্ত বা Plot। স্টোরি-র মধ্যে থাকে ঘটনাপরম্পরার বিবরণ। তার চলন ১, ২, ৩, ৪ এরকম। আমরা গল্প শুনতে গিয়ে বলি ‘তারপর’, ‘তারপর–’। অর্থাৎ পর পর ঘটনার বিবরণ। অন্যদিকে প্লট হল কার্যকারণ সম্পর্কের বিবরণ ক্রম। তার চলন ৩, ১, ৪, ২-এর মতো। অর্থাৎ আগেরটা পরে, পরেরটা আগে আসতে পারে। সেখানে কার্যকারণ সম্পর্কের নিরিখে তার বিবরণ উঠে আসে। স্টোরিতে যেখানে ‘তারপর’-এর প্রতীক্ষা, Plot-এ ‘কেন হল’র জিজ্ঞাসা বা ‘এবং সেজন্য’র উত্তরের দৃষ্টিতে বিবরণ। আবার প্লট নানা শ্রেণির। যেমন, সরল ও যৌগিক প্লট। প্রথমটির একটি প্লট, যৌগিকে মূল প্লটের সঙ্গে একাধিক সাবপ্লট বর্তমান। আবার প্লটকে দৃঢ় পিনদ্ধ (organic) ও শিথিল (Loose) দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমটিতে কালগত ঐক্য, অন্যটিতে স্থানগত বিস্তৃতি।
এছাড়া Panoramic ও Scenic এই দুইভাবেও প্লট বিভক্ত হয়। প্রথমটির গঠনকৌশল অস্পষ্ট। শিথিল বিন্যস্ত, উপসংহার। অন্যটি অনিবার্য, যুক্তিগ্রাহ্য ও নাটকীয়। শুধু তাই নয়, বৃত্তাকার, পন্থাকার ও হর্ম্যাকারেও প্লট বিভাজিত। প্রথমটি সুশৃঙ্খলিত। যেমন, ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের প্লট। পন্থাকার প্লট শিথিল, টুকরো ছবি, একটি ভাবদৃষ্টি ও কয়েকটি চরিত্রের পরিক্রমা। যেমন, ‘পথের পাঁচালী’র প্লট। আর হর্ম্যাকার প্লট জটিল। যেমন, ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের প্লট।
আবার Plotকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এছাড়া প্রাচীন কাহিনির ছকে বা দাবার ছকেও উপন্যাসের প্লট রচিত হতে পারে। দাবার ছকে মেরিডিথের ‘Egoist’ রচিত। অন্যদিকে Plot device বা প্লটের উপায় তথা কায়দাও বিচিত্র প্রকৃতির। যেমন,
১। Deus ex machine : এই কায়দায় ‘God from machine’ নীতি প্রতিফলিত। অর্থাৎ অলৌকিক চরিত্র আবির্ভাবে আকস্মিকভাবে কোনো বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া।
২। MacGuffin : থ্রিলারস ফিল্মের(রহস্যরোমাঞ্চকর সিনেমা) কায়দায় রচিত প্লট। এতে প্রথমেই শেষ দেখানো। রহস্য উন্মোচনের লক্ষ্যে তার চলন।
৩। Red herring : ভুল পথে চালিত করে বা বিপথে নিয়ে যাওয়ার ছকে লেখা প্লট। এজন্য Rhetoric strategies বা বাগাড়ম্ভর করে ছলাকলায় ভোলানোর প্রয়াস তাতে বিদ্যমান। রামকে মারীচের হরিণ রূপে প্রতারণার ছকের মতো তার কৌশল। অবশ্য শেষে happy ending বা মধুরেণ সমাপয়েৎ। ইংল্যান্ডের তর্কশাস্ত্রবিদ William Cobbett ১৮০৭-এ প্লটের উপায়টি জনপ্রিয় করে তোলেন। Mystery fiction বা রহস্যময় কথাসাহিত্য এই প্লটে লেখা হয়।
৪। Chekhov’ gun : এই ধরনের প্লট জাল ফেলে মাছধরার মতো। প্রথমে ছড়িয়ে দিয়ে পরে গুটিয়ে আনা। কাহিনি বিস্তৃত আকারে বিস্তার করে ধীরে ধীরে তা গুটিয়ে ফেলা। আন্তন চেকভের গল্পের মতো এই প্লট।
২। Character বা চরিত্র
আধুনিক পরিসরে সাহিত্যে চরিত্র প্রাধান্য লাভ করে। এর পূর্বে প্রাচীন সাহিত্যে ঘটনামুখ্য নাটকে প্লট বা কাহিনিবৃত্তের আধারে ছকবন্দি চেতনায় চরিত্রের গুরুত্ব প্রাধান্য না পেলেও মহাকাব্যে পেয়েছিল। সেদিক থেকে মহাকাব্যের আধুনিক সংস্করণ উপন্যাসের মধ্যে চরিত্রের প্রাধান্য স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অবশ্য মহাকাব্যের চরিত্রের সঙ্গে উপন্যাসের চরিত্রের পার্থক্য বর্তমান। মহাকাব্যে লৌকিক চরিত্রের সঙ্গে অলৌকিক চরিত্রের সহাবস্থান ঘটে। অন্যদিকে সেই চরিত্রগুলি ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় সেগুলির বিস্তার সম্ভব হয়ে ওঠে না। চরিত্রগুলি কোনো মহত্তর বা বৃহত্তর মানুষের প্রতিনিধি, মানবিক আদর্শ বা অমানবিক পশুত্বের প্রতিভূ। ব্যক্তিমানসের পরিচয় সেখানে দুর্লভ। সেক্ষেত্রে আধুনিক চেতনায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের আলোয় উপন্যাসের জন্ম। স্বাভাবিক ভাবেই তার বাস্তবজনোচিত চরিত্রের বিকাশই উপন্যাসে প্রাধান্য লাভ করে। সেখানে একেঅপরকে জানতে চায়। তবে এই প্রাধান্য একবারে আসেনি। প্রথমদিকে রোমান্সের পরে এল রোমান্সধর্মী উপন্যাস এবং তার পরে উপন্যাস। প্রথমদিকের ঘটনাবহুল কাহিনিবৃত্তই উপন্যাসে আখ্যানে পরিণতি লাভ করে যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে অন্বিত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁর ‘দুর্গেশনন্দিনী’(১৮৬৫) রোমান্স, ‘কপালকুণ্ডলা’(১৮৬৬) রোমান্সধর্মী উপন্যাস এবং ‘বিষবৃক্ষ’(১৮৭৩) উপন্যাস। অন্যদিকে আধুনিকতার অভিমুখে চরিত্রের মাধ্যমেই উপন্যাসের আবেদন মুখর হয়ে উঠেছে। সেখানে যেমন ‘আঁতের কথা’(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’) উঠে এল, তেমনই জটিল মনস্তত্ব বহুমাত্রিক রূপে অপরূপতা(জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’(Ulysses), ১৯২২-এ প্রকাশিত, বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস মনে করা হয়) লাভ করল। উপন্যাসের মধ্যে এল চেতনা প্রবাহমূলক রীতি। অবশ্য ঘটনাপ্রধান উপন্যাসের গঠনে দৃঢ়সংবদ্ধ প্লট(Organic Plot) থাকায় তাতে চরিত্রের বিস্তারের অবকাশ থাকে না। পূর্ব পরিকল্পিত কাহিনির মধ্যে চরিত্রের বিকাশ হতে পারে না। সেদিক থেকে শিথিলসংবদ্ধ প্লটে (Loose Plot) চরিত্রের বিস্তার স্বাভাবিক ভাবেই ঘটে থাকে। প্রথমটির ক্ষেত্রে ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘চরিত্রহীন’-এর কিরণময়ী এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ‘শ্রীকান্ত’-এর শ্রীকান্ত, ‘পথের পাঁচালী’র অপু, ‘ধাত্রীদেবতা’র শিবনাথ প্রভৃতি চরিত্র লক্ষণীয়।
চরিত্রের শ্রেণিবিভাগ
চরিত্রকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি টাইপ (Type) বা নির্বিশেষ-চরিত্র, অন্যটি ইণ্ডিভিজুয়াল (Individual) বা ব্যক্তি-চরিত্র। প্রথম প্রকারের চরিত্রের সাদা-কালো বিভাজন স্পষ্ট, ভালো-মন্দে পৃথক হয়ে পড়ে, একটি মাত্র বৃত্তি গড়ে তোলে। চরিত্রগুলি একরৈখিক হওয়ায় তা সরল হয়ে থাকে। কমন ম্যান (common man) বা অতি সাধারণ মানুষের সাধারণ বিশেষত্বে মোড়া মানুষের চরিত্র। মহাকাব্যে বা রোমান্সে এরকম টাইপ চরিত্র বর্তমান। আধুনিক উপন্যাসে এই টাইপ চরিত্র সমতলসদৃশ চরিত্র(Flat, Thin বা Disc Character নামেও) পরিচিত। এই চরিত্রগুলি একরঙা। বিশেষত্বহীন হলেও চরিত্রগুলির স্মরণীয় হয়ে ওঠে। যেমন, হাস্যরস সৃষ্টিকারী কমিক চরিত্র হিসাবে তার ভূমিকা বর্তমান। তাছাড়া ঘটনাপ্রধান উপন্যাসে এসব অপ্রধান চরিত্রের উপস্থিতি বর্তমান। আসলে সাধারণ পাঠক এধরনের টাইপ বা ফ্ল্যাট চরিত্রকে সহজেই আপন করে নিতে পারে। সেদিক থেকে ব্যক্তি-চরিত্র জটিল বৃত্তির, নানারৈখিক চলন তার। এই ব্যক্তি-চরিত্রই উপন্যাসে প্রাধান্য লাভ করে। সময়ের আধুনিকতায় ব্যক্তি-চরিত্রের পরিচয় উপন্যাসে ক্রমশ নিবিড়তা লাভ করে। সেক্ষেত্রে অতি আধুনিক উপন্যাসে আরেক ধরনের চরিত্র হল বৃত্তাকার চরিত্র বা Round Character বা Thick Character। বৃত্তকে যেমন কোনো দিক থেকেই দেখা যায়, এই ধরনের চরিত্রগুলিকেও একদিক থেকে বোঝা যায়। তাকে চারিদিক থেকে বা উপর-নীচ সব দিকেই দেখতে হয়। অনেক তার রঙ, অনেক সাজ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘বৃত্তিনিচয়ের অসামাঞ্জস্য’। বৃত্তাকার চরিত্রের কেন্দ্রবিন্দু থেকে অসংখ্য চারিত্রিক রশ্মি বেরিয়ে পড়ে বলে যেমন তা জটিল হয়ে ওঠে, তেমনই অসংখ্য রশ্মির কেন্দ্রবিন্দুতে মিলিত হয়ে তার স্বরূপকে চিনিয়ে দেয়। সেদিক থেকে ঔপন্যাসিকের লক্ষ্যে থাকে চরিত্রের অন্তর্জগৎকে উন্মোচন করা। এভাবেই মনস্তত্বমূলক উপন্যাস থেকে আধুনিক উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহমূলক (Stream of consciousness) রীতির প্রবর্তনায় বৃত্তাকার চরিত্র বিশেষভাবে স্মরণীয়। ‘চতুরঙ্গ’-এর শচীশ, ‘অন্তঃশীলা’-‘আবর্ত’-‘মোহনা’র খগেনবাবু, ‘সত্যাসত্য’-র বাদল এরূপ চরিত্র।
এছাড়া গুরুত্ব অনুসারে প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্র (Major বা Central Character) বা অপ্রধান বা গৌণ চরিত্র (Minor Character) হিসাবেও শ্রেণিবিভাগ করা হয়। প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্র কাহিনিবৃত্ত বা প্লটকে আবর্তিত করে সম্প্রসারিত হয় এবং উপন্যাসের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বকে নিবিড় করে এগিয়ে নেয়। অন্যদিকে প্রধান বা কেন্দ্রীয় চরিত্রকে প্রস্ফুটিত করাই শুধু নয়, কাহিনিকে সম্প্রসারণে সাহায্য করে।
এছাড়া উপন্যাসে সক্রিয় চরিত্র বা Dynamic Character, অরূপান্তরিত চরিত্র বা Static Character, একরঙা চরিত্র বা Stock Character, মুখ্য চরিত্র বা Protagonist Character বা তার বিপরীত Antagonist Character, তুল্য চরিত্র বা Foil Character এবং প্রতীক বা Symbolic Characterও বর্তমান। সক্রিয় চরিত্রগুলি সর্বদা সচল থাকে। সাধারণত উপন্যাসে দ্বন্দ্বমুখর প্রকৃতিকে সক্রিয় করার পাশাপাশি সংকটমুখর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় এসব চরিত্র। অন্যদিকে যে চরিত্র কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তিত হয় না, তা অরূপান্তরিত চরিত্র। একরঙা চরিত্রে একক বিশেষত্বে অমলিন চরিত্র। নিন্দুক, নীতিবাদী, পাগলা বিজ্ঞানী, নির্মম ব্যবসায়ী, বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান প্রভৃতি। উপন্যাসে মুখ্য চরিত্র হলেও তা সব সময় প্রশংসিত নয়। কোনো অসৎ লোকও উপন্যাসে মুখ্য চরিত্র হতে পারে। তুল্য চরিত্রের মাধ্যমে অন্য চরিত্রের তুল্যমূল্যে বিশেষ করে মুখ্য চরিত্রের গুণাগুণ সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া প্রতীক চরিত্র সাংকেতিক ভাবে কোনো বিষয়ে বার্তাবহ হয়ে ওঠে। উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের মাধ্যমে আসলে তার শিল্পরূপের বহুমাত্রিক চেতনাকেই আলোকিত করা হয়।
৩। Conversation বা সংলাপ তথা কথোপথন
সংলাপ বা কথোপকথন উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার মাধ্যমে যেমন তার ঘটনাক্রম সম্প্রসারিত হয়, তেমনই তার চরিত্রগুলির বাস্তবতা আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সেখানে রক্তমাংসের সজীবতা থেকে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব নানাভাবে প্রকাশমুখর। উপন্যাসের পরিসর বিস্তৃত হওয়ায় তার ভাষিক বৈচিত্র স্বাভাবিকতা লাভ করে। সেক্ষেত্রে উপন্যাসের ভাষা জীবনের বাস্তবতা ও কাব্য দুইই ধারণ করে। প্রখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক ওয়াল্টার স্কটের ভাষায় উপন্যাসের মধ্যে Prose of Life এবং Poetry of life দুই প্রতীয়মান। বাস্তবের স্বরূপ উদ্ঘাটনে উভয়ের প্রয়োজন। এজন্য উপন্যাসের লেখক জীবনের কাব্যকেও অধিগত করে। দ্বিতীয়ত, কাব্যিক মানুষ বা নাটকীয় মানুষ নয়, বাস্তব মানুষই ঔপন্যাসিকের লক্ষ্য। মানুষের কর্মিষ্ট অস্তিত্বকে রূপদানের জন্যই উপন্যাস শিল্পরূপের জন্ম। সেদিক থেকে তার ভাষা সর্বত্রগ্রামী। ছড়া-ধাঁধা, কবিতা-গান, সংলাপ থেকে সংকেতের ভাষায় তার প্রকাশ আকাশ হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, উপন্যাসে গদ্যের স্থল কাব্যের জল উভয়ই সাবলীল হয়ে থাকে। সেখানে মুড্ (Mood) বা প্রকাশভঙ্গি ভাষার অনুগামী নয়, তার সহগামী। এজন্য ভাষায় মিশ্র ও কৃত্রিম প্রকৃতি উঠে আসে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ (১৮৬৬) উপন্যাসে পথ হারিয়ে চলা নবকুমারকে যখন কপালকুণ্ডলা ‘পথিক, তুমি পথ হারাইছ !’ বলে চেতাবনি দিয়েছে, তার মধ্যে সেই মুডের প্রকাশ কৃত্রিম হলেও অস্বাভাবিক মনে হয় না। আবার কপালকুণ্ডলার সৌন্দর্য বর্ণনায় ঔপন্যাসিকের লেখনী তুলি হয়ে উঠলেও অদ্ভুত রোমাঞ্চ জাগিয়ে তোলে, ‘সাগরবসনা পৃথিবী সুন্দরী ; রমণী সুন্দরী ; ধ্বনিও সুন্দর ; হৃদয়তন্ত্রীতে সৌন্দর্যের লয় মিলিতে লাগিল।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ (১৯১০) বা ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯) উপন্যাসে তা লক্ষণীয়। ভাবকে বহন করায় ভাষার সক্রিয়তায় সময়বিশেষে ভাবই ভাষা হয়ে ওঠে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে তা প্রতীয়মান। চতুর্থত, প্রয়োজনে উপন্যাসের জন্য ঔপন্যাসিককে ভাষা তৈরি করতে হয়। প্রকাশের আভিজাত্যে উপন্যাসের ভাষিক আবেদন দাবি করে। ফরাসি ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়ারের কথায়, ‘If you know exactly what you want to say you will say it well’। সেদিক থেকে ভাব ও ভাষার হরগৌরীয় সম্পর্ককে গড়ে তুলতে হয়। পঞ্চমত, উপন্যাসের ভাষার মধ্যে বহুমাত্রিক রূপের বাস্তবায়নে রূপের মধ্যে রহস্যময় অপরূপতা বর্তমান। তা অদ্ভুত, বিচিত্র, দুর্বোধ্য ও অস্পষ্টতার সমন্বয় যা চাষার মেয়ের মতো বাস্তবতার অতিরেক মনে হয়। ষষ্ঠত, উপন্যাসের ভাষার লক্ষ্যে থাকে Actuality থেকে Reality-তে পৌঁছানো। সর্বোপরি ঔপন্যাসিক স্বকীয় ভাষিক আভিজাত্যে স্বতন্ত্রতা লাভ করেন। সেখানে Style is the man সমান সক্রিয়।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
Khub sundor laglo pore ar khubei help ful