চৈত্র মাসের প্রথম ও তৃতীয় শনিবার পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির নিজকসবা গ্রামে হিজলীর ‘মসনদ-ই-আলা’ তাজ খাঁ’র সমাধি আর মসজিদ প্রাঙ্গণ ঘিরে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় বাবা মসন্দলী’র উরুষ উৎসব ‘ইসালে সওয়াব’ বা মসন্দলী বাবার ধর্মীয় সভা যার প্রচলিত নাম ‘জলসা’।
‘ইসালে সওয়াব’বা জলসা’য় খেজুরি ছাড়াও দুই মেদিনীপুর জেলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা, প্রতিবেশী রাজ্য এমনকী বাংলাদেশ থেকে আসা অগণিত ভক্ত ও মানুষজনের বাবা মসন্দলী’র উদ্দেশ্যে —
‘চারিদিকে লোনাপানি মধ্যেতে হিজলী
তাহাতে বাদশাহী করে বাবা মসন্দলী’।
‘মসন্দলী’ গীত আর ঘনঘন জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা ইতিহাস লব্ধ স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন হিজলীর প্রাঙ্গণ। ‘মসনদ-ই-আলা’-র এক রাতের উরুষ উৎসব তখন হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের অন্যতম সম্প্রীতির মিলন মেলা। ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে সুপ্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের গরিমা যখন একটু একটু করে লুপ্ত হতে বসেছে ঠিক সেই সময়ে বঙ্গোপসাগরের হুগলি নদীর মোহনার পশ্চিমদিকে পলি জমে প্রথমে ‘হিজলী’ ও কিছু পরে ‘খেজুরি’ নামে দুটি দ্বীপ জেগে ওঠে। দুটি দ্বীপের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কাউখালি নদীর জন্য দ্বীপ দুটি পৃথক ছিল। হিজলী ও খেজুরি দুটি দ্বীপই ছিল জনবসতিহীন জঙ্গলাকীর্ণ। ইতিহাসের চুপকথা জানান দেয়,কাঁথির কাছে সেই সময় চন্ডীভেটি মৌজায় মনসুর ভূঞ্যা নামে প্রবল প্রতিপত্তিশালী এক মুসলমান জমিদার ছিলেন। পারিবারিক বিবাদ ও বড় ভাই জামালের যড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পেতে জমিদার মনসুর ভূঞ্যার ছোটছেলে রহমত হিজলীতে পালিয়ে এসে জঙ্গল কেটে জনবসতি স্থাপন করেন। দ্বীপে হিজল গাছের প্রাধান্যের জন্য হিজলী নাম দিয়ে স্বতন্ত্র রাজ্য স্থাপন করে হিন্দু কর্মচারীদের নিয়ে রাজ্যপাট চালাতে শুরু করেন। কিছুকাল পরে ভীমসেন মহাপাত্র, দ্বারকা দাস ও দিবাকর পন্ডা প্রমুখ দক্ষ কর্মচারীদের পরামর্শে ও নিজ উদ্যোগে রহমত ভূঞ্যা দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে আপন জমিদারির সনন্দ গ্রহণ করে ইফতিকার খাঁ উপাধি প্রাপ্ত হন। ইফতিকারের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে দাউদ খাঁ হিজলীর অধিপতি হন ও মাত্র পাঁচ মাস রাজত্ব করার পর মারা গেলে দাউদ খাঁ জ্যেষ্ঠ পুত্র তাজ খাঁ ‘মসনদ্ -ই-আলা’ অর্থাৎ ‘যার আসন উচ্চে’ উপাধি গ্রহন করে ১৬২৮ সালে হিজলীর সিংহাসনে বসেন।

মসনদ-ই’-আলা’র মাজার বা সমাধিক্ষেত্র
তাজ খাঁ মসনদ্-ই-আলা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও সুশাসক। নিজের প্রানাধিক প্রিয় ছোট ভাই চিরকুমার সিকন্দরকে সহযোগী হিসেবে পেয়ে নিজের বুদ্ধি ও প্রতিভায় হিজলীকে সুশাসনের ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাজ খাঁ তার সাধনক্ষেত্র হিজলীতে তৈরি করেন মোঘল স্থাপত্য শৈলির প্রাচীন নিদর্শনের একটি মসজিদ। উত্তর দক্ষিণে লম্বা ও দৈর্ঘ্যে পঞ্চাশ ফুট ও প্রস্থে পঁচিশ ফুট ও গম্বুজ আকৃতি মসজিদটির পূর্ব দিকে তিনটি দ্বার ছাড়াও তিনটি সুগোল সুউচ্চ মিনার রয়েছে। হিজলী খেজুরির উপর দিয়ে বেশ কয়েকটি সামুদ্রিক প্লাবন, ঝড়-ঝঞ্জা বয়ে যাওয়ার পর আজও মসজিদটি অটুট ও অক্ষত। মসজিদ তৈরির পর তা দেখভাল ও সেবা কাজের জন্য খাদেম, শিরণি তৈরির জন্য ময়রা বা গুড়িয়া, প্রহর গোনার জন্য ঘড়িয়াল, দুন্দুভি বাজানোর জন্য বাদ্যকর প্রভৃতিকে জমি দান করেন। এদের অনেকেই এখনও বংশানুক্রমিকভাবে সেই জমি ভোগ করে মসজিদের সেবা করে আসছেন।
১৬২৮ থেকে ১৬৪৯ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করার পর পারিবারিক নানা চক্রান্ত ও প্রিয় ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে সুখ শান্তি হারিয়ে তাজ খাঁর মনে বৈরাগ্য জন্মায়। নিজ পুত্র বাহাদুর খাঁকে রাজত্বের ভার দিয়ে অমর্ষি পরগনার চিশ্তি সম্প্রদায়ের এক ফকিরের কাছে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাসীর মত জীবনযাপন করতে থাকেন। কিছুকাল পরে নিজের প্রতিষ্ঠিত মসজিদের সামনে তপস্যা মগ্ন অবস্থায় সমাধি প্রাপ্ত হন।
‘মসনদ-ই-আলা’-র সাধন ক্ষেত্র হিজলী শতকের পর শতক ধরে বিশেষ তীর্থস্থান হিসেবে বন্দিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রথম ও তৃতীয় শনিবার বাবা মসন্দলী’র উরুষ উৎসব জলসা উপলক্ষে মসনদ-ই-আলা’র হিজলীর সাধনক্ষেত্রে দুই মেদিনীপুর জেলা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে লক্ষাধিক ভক্ত উপস্থিত হন। মসন্দলী বাবার কাছে হিন্দু-মুসলমান ভক্তরা মানত করা ছাগল মোরগের মাংস,পায়েসের সিন্নি ভোগ দেন। চাল ভাজা গুড়ো গুড় দিয়ে পাক করা বিশেষ ধরনের তৈরি মিষ্টি ‘খুড়মা’ মসনদ-ই-আলার মাজারে লুঠ দিয়ে আর ‘মসন্দলী’ গীত গেয়ে মসনদ-ই-আলাকে স্মরণ করে তাঁর নামে জয়ধ্বনি করে তুলে আনা হয় তাঁর সমকালীন ইতিহাসকে।
তথ্য ঋণ — ১। মসনদ ই আলা-মহেন্দ্রনাথ করণ, ২। খেজুরির ইতিহাস-বৃহস্পতি মন্ডল, ৩। হিজলীর পীরবাবা মসনদ ই আলা -অশ্বিনী কুমার গিরি
????বাহ্! আজকের এই বিশেষ উৎসবের দিনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সারাবছর ধরে প্রতীক্ষিত খুশির উৎসবকে ঘিরে বিশেষ ভাবে সেজে ওঠা এই তীর্থষ্ঠান -র ইতিবৃত্ত বেশ সাবলীল কলেবরে তুলে ধরেছেন গুহসাহেব। বেশ ভালো লাগলো —–অনেক অজানাকে জানা গেল —????
লেখাটি আরো বিষদে আশা করেছিলাম।
ধন্যবাদ সমীমবাবু লেখাটি আপনার দৃষ্টিগোচর হওয়ার জন্য। ঠিকই বলেছেন, লেখাটি আরো বিস্তারিত লেখা হলে ভালো হতো।। লেখাটি চৈত্র মাসের প্রথম শনিবারের জন্য লিখতে গিয়ে দ্রুততার জন্য বিস্তারিত লেখা সম্ভবপর হয়নি। তবে অদূর ভবিষ্যতে তাজ খাঁ মসনদ ই আলা নিয়ে বিস্তারিত লেখার। ভালো থাকবেন আপনি। শুভময়তা। -সুব্রত গুহ
????বাহ্! আজকের এই বিশেষ উৎসবের দিনে মুসলিম সম্প্রদায়ের সারাবছর ধরে প্রতীক্ষিত খুশির উৎসবকে ঘিরে বিশেষ ভাবে সেজে ওঠা এই তীর্থষ্ঠান -র ইতিবৃত্ত বেশ সাবলীল কলেবরে প্রকাশিত
। বেশ ভালো লাগলো —–অনেক অজানাকে জানা গেল —????