| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অশোক, তুমি কি করেছো… তোমার ছবিতে আমি নিজেকে দুটো দেখছি… আলী আকবর খান

Reporter
অশোক মজুমদার / ৪৯৪ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২

“সহজ সাজে”….হাতে সরোদ থাকলে এক লহমায় তাকে চিনে নিতে পারে সারা বিশ্ব। কিন্তু রানীকুঠির পাড়ার সেলুনে চুল দাড়ি কাটতে বসা এই ব্যক্তি যে আলী আকবর খান তা কি চট করে বিশ্বাস করা যায়? অথচ ঘটনা সেটাই। নিজের পাড়ায় ওস্তাদজী একবারেই ঘরের মানুষ। মঙ্গলবার দুপুরে পাড়ার সেলুনে ঢুকে বললেন, “বারো বছর পর এখানে সেলুনে ঢুকলাম।”

ছবি : অশোক মজুমদার।

ছবিটি এই ক্যাপশনে আনন্দবাজার পত্রিকার কলকাতার পাতায় প্রকাশিত হবার পর পাঠকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলাম। শুধু মুখে নয় সম্পাদক সমীপেষুতে চিঠি লিখেও অনেকে ছবিটার প্রশংসা করেছিলেন। সেই সব চিঠিও কলকাতার পাতায় প্রকাশিত হয়।

আজ সেই প্রকাশিত ছবির গল্পই ছবিওয়ালার কলমে….

কয়েক বছর পর কলকাতায় এলেন প্রবাদ প্রতিম সরোদ শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খান। ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্সেলমো শহরের বাসিন্দা তখন খাঁ সাহেব। কিছু দূরে সান রাফায়েল শহরে ছিলো ওনার মিউজিক কলেজ। এহেন প্রবাসী পরিমণ্ডল ছেড়ে বেশ কিছু বছর অন্তর দেশে আসতেন উনি। সেবার দু বছর পর এ শহরে এসেছেন। অশীতিপর এই শিল্পী কলকাতা ছাড়াও বাজাবেন শান্তিনিকেতন ও মুম্বাইয়ে — একথা আমাকে নিজেই বলেছিলেন। এও বলেন, “কলকাতা হয়তো আর আসা হয়ে উঠবেনা। বয়স হচ্ছে তো।”

আমি তখন নিয়মিত আনন্দবাজার পত্রিকায় (সাদা বাড়ি কালো গ্রিল) কলকাতার পাতার জন্য ছবি তুলি। কলকাতায় যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক, সিনেমা আর্টিস্ট, বুদ্ধিজীবিরা থাকেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা পরিচয় না থাকলেও যোগাযোগ করা সহজ। কিন্তু ওস্তাদ খাঁ সাহেব তো বিদেশে থাকেন। কয়েকবছর পর পর কলকাতা আসেন। সুতরাং এরকম একজন মহান শিল্পীর সঙ্গে কি করে যোগাযোগ করবো?

এদিক ওদিক নানান খোঁজ খবর করতে করতে খান সাহেবের ছাত্র অনিন্দ্যকে ফোন করি। অনিন্দ্য নিজেও সরোদ শিল্পী। আমার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয়। আলী সাহেবের ছবি তোলার কথাটা বলতেই ও বললো, “অশোকদা তুমি যেভাবে ছবি তোলো এটা খুব ডিফিকাল্ট। খাঁ সাহেব কলকাতায় এলে আমি ওনার সাথে অনেক সময় থাকি। উনি কোথায় যাবেন কি করবেন আমাদের জানায়। একটু ভাবতে দাও। আমি বলে দেবো কি করলে বাবার ছবি তোলা যায়।”

বাবা কথাটা শুনে অনিন্দ্যর কাছে জানতে চাইলাম, “বাবা মানে?”

শুনলাম বহু শিল্পী, ছাত্র-ছাত্রী ওনাকে বাবা বলে সম্মোধন করেন।

আমি বললাম, “তাহলে আমিও বাবা বলে একদিন ওনার কাছে চলে যাবো। বলো কোথায় যেতে হবে?”

অনিন্দ্য হেসে বললো, “ঠিক আছে। সময় দাও।”

কলকাতায় এলে ওস্তাদ আলী আকবর খান রানিকুঠিতে নিজের বাড়িতে উঠতেন। এটাই ওনার কলকাতার বসতবাড়ি।

কিছুদিন পর অনিন্দ্যকে জিজ্ঞেস করি, “সারাদিন আলী সাব কি করেন? কোথায় কোথায় যান বলতে পারো? তাহলে আমি একদিন ছবি তুলতে চেষ্টা করবো।”

অনিন্দ্য বললো, “অশোকদা, সারাদিনের কথা বলতে পারবো না। কিন্তু উনি নিয়মিত সকালে রবীন্দ্র সরোবরে হাঁটতে যান।”

“ঠিক আছে। এবার আমার উপরে ছেড়ে দাও। আমি দেখে নিচ্ছি।”

অনিন্দ্য ভয়ে ভয়ে বললো, “আমার কাছ থেকে জেনেছো এটা যেন কেউ না জানে।”

আমি তার পরদিনই সাত সকালেই মেনকা সিনেমা হলের পাশে রবীন্দ্র সরোবর ঢোকার একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকি। সকাল নটা অবধি দাঁড়িয়েও ওস্তাদ আলী সাহেবের দেখা পাইনি।

অনিন্দ্যকে ফোন করতে ও বলে, “অশোকদা উনি হয়তো অন্য গেট দিয়ে ঢুকেছেন। কিন্তু সাধারণত মেনকার উল্টোদিক দিয়েই উনি লেকে ঢোকেন।”

আমি আবার তার পরদিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি। হঠাৎ দেখলাম একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি থেকে সাদা পাজামা ঢোলা পাঞ্জাবীর উপর কালো জহর কোট, হাতে লাঠি নিয়ে উনি গাড়ি থেকে নামছেন। চুপি চুপি পেছন নিলাম।

লেকে ঢুকতেই আমি সোজা ওস্তাদজীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললাম, “বাবা, আমি আনন্দবাজারের ফটোগ্রাফার। আপনার কিছু ছবি তুলতে পারি?”

মনে হল ‘বাবা’ কথাটা শুনে উনি একটু চমকেই উঠলেন কারণ সাধারণত বাবা কথাটি উনি যাদের চেনেন, যোগাযোগ আছে তাদের মুখেই শুনে এসেছেন। এখনও মনে আছে, ডান হাতটা লাঠির উপর ভর দিয়ে উনি বাঁ হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। তারপর বললেন, “তুমি ছবি তোলো, কিন্তু আনন্দবাজার পত্রিকা আমার ছবি ছাপবে তো?”

বিশ্ববিখ্যাত সরোদিয়ার একথা প্রসঙ্গে বলে রাখি, আনন্দবাজার পত্রিকায় এই মহান শিল্পীর ছবি ও লেখা খুব একটা পাবলিশড হতো না। কারণ পরে জেনেছিলাম আমার সময়ের আনন্দবাজার পত্রিকার এডিটরের ভাই পছন্দ করতেন আর এক বিখ্যাত সরোদিয়া শিল্পী আমজাদ আলী খান এবং তাঁর দুই পুত্র আমান ও আয়ানকে। এদের ছবি এবং রিভিউ একটু বেশি পাবলিশড হতো। আমি পরে অনেক কিছু জানলেও এখানে এটা আলোচ্য বিষয় না। কিন্তু বুঝতেই পেরেছিলাম ওস্তাদ আলী আকবর খানের মনে আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে একটা অভিমান, কষ্ট ছিলো।

ভারতীয় ক্লাসিক্যাল জগতের সব গাইয়ে এবং ইন্সট্রুমেন্টাল শিল্পীরা জানতেন যে আনন্দবাজার পত্রিকায় আলী আকবর খাঁ সাহেবের ছবি ও লেখা কেন কম প্রকাশিত হতো। যদিও আমার কাছে সব শিল্পীরাই সমান। ওনাদের বিচার করার জ্ঞান আমার নেই। তবে এটা বুঝছি দেখেছি শিল্পীদের ভিতরেই এক চোরাগোপ্তার মতো রাজনীতি থাকতো যা খোলা চোখে দেখা যায়না। আর সাদা বাড়ির কালো গ্রিল তো রাজনীতির পীঠস্থান। তবে যত দিন গেছে এই দুই মহান শিল্পীর (ওস্তাদ আলী আকবর খান ও ওস্তাদ আমজাদ আলি খান, আমান-আয়ান তো আছেই) সাথেই আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো।

যাইহোক সেদিন আলী আকবর খান সাহেবের বলা, “আনন্দবাজার আমার ছবি ছাপবে তো?” ….এর উত্তরে আমি বলেছিলাম — “বাবা আমি ছবি তুলি। আপনি একজন মহান শিল্পী। পাবলিশ না হলেও ছবিটা আমার কাছে থাকবে। সেটাও আমার কাছে গৌরবের। ছাপাটা আমার হাতে থাকে না। “….শুনে ওস্তাদ আলী সাব হাঁটতে লাগলেন অন্য কথা বলতে বলতে।

একটা বহু প্রাচীন বটগাছ, বহু ঝুরি নেমে গেছে…আমি বাবাকে বললাম, “আপনি একটু ওখানে দাঁড়াবেন আমি কয়েকটা ছবি তুলবো?”

উনি আস্তে আস্তে ঝুরি নেমে যাওয়া সেই প্রাচীন বটগাছের গোড়ায় কাছে দাঁড়ালেন। আমি বেশকিছু ছবি তুললাম। বিশেষ ভাবনা থেকে। আনন্দ পেলাম। তারপরও ওনার সাথে প্রায় একঘন্টার ওপর নানান ছবি তোলা ছাড়াও কলকাতার গল্প শুনলাম আমি নিজেও বললাম। উনি লেক থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে আমায় বললেন, “চলো আমার বাড়ি। চা খেয়ে চলে যাবে।”

মাত্র ঘন্টাখানেকের আলাপে মন্ত্রের মত এই কথাটা শোনালো। ভাবছি যেটা উনি বললেন সেটা সত্যি!! আমার কি ভাগ্য!! প্রথম কিছুক্ষনের আলাপেই আমায় বাড়ি যেতে বলছেন… এটা ভাবতে ভাবতেই গাড়িতে উঠে পরলাম। অফিস গাড়িকে বললাম, পিছু পিছু আসতে।

একটু পরই রানিকুঠীর সেই বাড়িতে পৌঁছে দেখি, আলী সাবের অনেক ছাত্র শিষ্যরা এক তলায় বসে আছেন তার মধ্যে অনিন্দ্যকেও এক ঝলক দেখলাম।

আমি বাবার পিছন পিছন দোতলায় উঠে এলাম। একটু পরেই চা এলো। বাবা আপন মনে খুট খুট করে নানান কাজ করছেন। আমরা দুজনেই চুপ। আমি শুধু চেয়ারে বসে খাঁ সাহেব কে দেখছি আর ভাবছি, “ইনি ওস্তাদ আলী আকবর খান — যাঁর সরোদের সুরে মূর্ছনা যায় গোটা বিশ্ব। আর আমি একজন না বোঝা শুধুই ফটোগ্রাফার সেই মানুষটির সামনে বসে আছি!” সরোদ বাজনা শিখলে অনেক কিছু জানতে চাইতাম। আমি তো শুধু ছবি তোলার ধান্দায়….

হটাৎ দেখলাম ঘরে থাকা একটা সরোদ হাতে নিয়ে মোছামুছি করছেন। তারপর আবার অন্যঘর থেকে আরেকটি সরোদ নিয়ে এলেন। ভাবছি ছবি তুলবো? ভয়ও লাগছে। আমি চা টা ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করলাম। ভাবছি একবার বলি ছবি তোলার কথা?

তখনই সেতার, সরোদ তৈরি করায় ভারতবর্ষ শুধু নয় সারা পৃথিবীতে যাঁর নাম সেই হেমেন সেন এলেন। দেশপ্রিয় পার্কের উল্টোদিকে দোকানের নাম “হেমেন এন্ড কোং” কত ওস্তাদ, পণ্ডিতদের পা পরেছে এই দোকানে। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, আলী আকবর খাঁ, আমজাদ আলী খাঁ এর মত বিখ্যাত শিল্পীরা এদের বাদ্যযন্ত্র কেনেন। ঠিক করান।

আমি আগে থেকেই হেমেনদাকে চিনতাম। ছবিও তুলেছি। হেমেনদা আমায় দেখে মুচকি হেসে কেমন আছি জানতে চাইলেন। তারপর সরোদগুলো ঠিকঠাক করতে লাগলেন, বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছু বলছেন। অদ্ভুত সে দৃশ্য! আমি সাহস করে ক্যামেরা বার করে কিছু ছবি তুললাম। দেখলাম ওস্তাদজী দেখেও কিছু বললেন না।

সেদিন সকালে আলাপ হওয়ার পর থেকে আমি যখনই আলী সাবের সঙ্গে কথা বলেছি, “বাবা” বলেই সম্মোধন করে যাচ্ছি। একফাঁকে অনিন্দ্য এসে আমার থেকে জেনে গেলো, “অশোকদা ছবি হয়েছে তো?”

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, “পরে সব বলছি।”

তখন বেলা হয়ে গেছে প্রায় এগারোটা ছুঁই ছুঁই। দেখি বাবাই আমাকে বললেন, কি এবার বাড়ি যাবে তো?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, আপনি কি করবেন বাবা?”

“কি আবার করবো? আজ ভাবছি একটু মাথার চুলগুলো ছোটো করবো। মাথায় ওপরে চুল না থাকলে পাশের চুল গুলো বড়ো হয়ে গেছে।”

আমি বললাম, “বাড়িতে না সেলুনে যাবেন?”

উনি বললেন, ‘না-না সেলুন। ওই রাস্তার ও পারেই।”

আমি বললাম, “বাবা আমি যেতে পারি?”

“তুমি কোথায় যাবে — সেলুনে? তুমিও কি চুল কাটবে?”

এতো সরল এতো সাদাসিধে কথাবার্তায় আমি অভিভূত। একজন বিশ্ববরেণ্য শিল্পী তার ধ্যান জ্ঞান ভালোবাসা আমি একদিনের আলাপেই বুঝতে পারছিলাম।

বাবা নিচে নেমে এলেন। একাই ঠিক রাস্তার ওপারেই সেলুনে ঢুকলেন। আমিও আস্তে আস্তে ঢুকলাম। বাইরে আসার সময় আমি ছাত্রদের বলে এসেছিলাম যে আমি চলে যাচ্ছি, বাবা বোধহয় চুল কাটতে যাবেন। অনিন্দ্যকে বললাম রাতে ফোন করবো।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। বাবা গিয়ে চেয়ারে বসলেন। একজন চেয়ার শুদ্ধ সাদা কাপড়ে ঢেকে দিলেন। বাবা মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে বসে থাকলেন।

এই মুহূর্তটা আমি একজন ফটোগ্রাফার কি করে ছাড়ি! ফটোগ্রাফাররা তো এই ক্যান্ডিড মুহূর্তের জন্যই বসে থাকে…. শাটার টেপে। ছাপা কাগজে পাঠক সেই ছবি দেখেই বিশ্ববরেণ্যদের জানার অদম্য কৌতূহল মেটায়। খুশি হয়। এটাই তো একজন ফটোগ্রাফারের জীবনের প্রাপ্তি।

আমি আস্তে করে ক্যামেরা বার করে আয়নায় রিফ্লেক্স-সহ বাবার অনেকগুলো ছবি তুলে আবার ক্যামেরা ঢুকিয়ে রাখলাম।

এবার অফিস ফিরতেই হয়। প্রথমদিনেই অনেক রকম ছবি হয়েছে। বাবার অনুমতি নিয়ে প্রণাম করে আমি বেরিয়ে এলাম। আসার সময় বললাম “বাবা আপনি যতদিন কলকাতায় থাকবেন আমি মাঝেমাঝে দেখা করতে আসবো।” ….উনি ঘাড় নাড়লেন।

গাড়িতে আসতে আসতে আন্দাজ করতে লাগলাম…. কোন ছবিটা দেবো অফিসে? বটগাছের ঝুরি নেমে গেছে ছবিটা ভালো। আবার লেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একা একা ওটাও ভালো। বাড়িতে হেমেনদার সরোদ ঠিক করছেন এটাও বেশ। শেষে সেলুনে চুল কাটছেন এটা আমার কাছে একবারে অন্যরকম লাগছে।

ভাবলাম সেলুনে চুল কাটার ছবিটাই দেবো। কারণ এইরকম ছবি আলী আকবর খাঁ-এর মতো শিল্পীর সাধারণত আর কোনোদিন তুলতেও পারবো না। সারা জীবন সাদা জামাকাপড়ের সাথে সুন্দর একটা জহর কোট আর সরোদ হাতেই দেখে এলাম।

এখানে বলি, আমি যে সেলুনে চুল কাটার ছবি তুলেছি সেটা কিন্তু আলী সাবকে বলেছিলাম।

উনি তার উত্তরে বলেছিলেন “বেশ করেছো।”

অফিসে ফিরে এক্সিকিউটিভ এডিটর সুমন চট্টোপাধ্যায়কে সব ঘটনা খুলে বলি।

সুমনদা জিজ্ঞেস করলো, “তুই কোনটা ভেবেছিস?”

আমি বললাম, “চুল কাটার ছবিটা।”

সুমনদা বললো, “একেবারে ঠিক। আমিও তাই ভাবছিলাম। যা ছবিটা সুজিতকে দিয়ে দে।”

সুজিত বোস — তৎকালীন অ্যসিস্ট্যান্ট এডিটর আনন্দবাজার পত্রিকা। সেইসময় কলকাতার পাতার দায়িত্বে ছিলেন। অস্বীকার করবো না, সুজিতদার হাত দিয়ে কলকাতার পাতায় আমার অসংখ্য ছবি বড়ো বড়ো করে ছাপা হয়েছে। তার একটাই কারণ সুজিতদা ছবি খুব ভালোবাসতেন।

আমার সাথে সুজিতদার আজকাল পত্রিকা থেকে আলাপ। শেষদিন অবধি বন্ধুত্ব ছিলো। যখন সুজিতদার পাশে কেউ ছিলোনা তখনও দিনের পর দিন সল্টলেকের লাবনীর বাড়িতে আড্ডা মারতে যেতাম। অনেককিছু শিখেছি সুজিতদার থেকে।

এক ঈদের দিন সুজিতদা আমাদের ছেড়ে চলে যান। আমি সেদিনও সকালে ওনার সঙ্গে দেখা করতে যাই। সন্ধায় বৌদির ফোন পেয়ে আজকাল পত্রিকা হয়ে আগুনের শিখায় ঢোকার আগে অবধি সুজিতদার মেয়ে জামাই, আমি ছিলাম। না বন্ধুরা কেউ না। এমন কি আজকাল কর্তৃপক্ষ-এর অনুরোধে সুজিতদার দেহ অফিসে নিয়ে গিয়ে ভিআইপি সাংবাদিকরা ভিতরে থাকলেও কেউ নামেন নি। শুনলাম অশোকদার শরীর খারাপ। চিত্র সাংবাদিক যারা ছিলেন নেমেছিলেন।

যাইহোক, হঠাৎ দেখি সুজিতদা কম্পিউটারে ছবিটা দেখতে দেখতে সুমনদার ঘরের দিকে দৌড়ে চলে গেল। ফিরে এলে জানতে চাইলাম, “কি গো কিছু হয়েছে?”

বললেন, “তুই যা তো। ডানদিকে একটা বিজ্ঞাপন আছে। সুমনকে বললাম ছবিটা সাত কলম নিতে চাই। কিন্তু বিজ্ঞাপন সরাতে হবে।”

আমি বললাম, “কি বললো?”

সুজিতদা….”তুই যা। কাজ করতে দে। কাল দেখিস।”

কিছুক্ষন পর ওস্তাদজীর বাড়ি থেকে একজন ফোন করে প্রায় ধমকের সুরে বললেন, “অশোকবাবু বাবা সেলুনে চুল কাটছেন আপনি এ ছবি তুলেছেন কেন? আমরা শুনেছি আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার সেলুনে চুল কাটার ছবি তুলেছেন? এটা আমাদের আপত্তি। বাবা আপনাকে কোনো ছবি তুলতে না করেন নি। তাই বলে আপনি বাবার চুল কাটার ছবি দেবেন আনন্দবাজারে? আমরা কেউ এটা ভালো ভাবে নিচ্ছি না।”

আমি একটু ঘাবড়েই গেলাম। সেই শিষ্য আরও বললেন, “ওই ছবি বেরোলে আমরা আপনার নামে এডিটর অভিকবাবু এমন কি অরূপ সরকারের কাছে চিঠি দেবো।”

এসব শুনে আমি একটু নার্ভাস হয়ে সুমনদার ঘরে ঢুকে বললাম, “ওনার কিছু শিষ্য আমায় এইসব বলছে। কি করি বলো তো? অরূপবাবু রেগে যাবেন না তো? কারণ একেই আলী আকবর খাঁ…. তার উপর চুল কাটার ছবি, ছেড়ে দাও আরো অনেক ছবি তোলা আছে সেখান থেকে একটা সিলেক্ট করো?”

সুমনদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই যা আমি দেখছি। আরও যা যা তুলেছিস সব সুজিত কে দিয়ে যা। পরে দেখে নেবো।”

বেরোবার আগে সব ছবি দিয়ে বললাম, “একটু দেখো সুজিতদা।”

মনে একটু কষ্ট হলো যে এইরকম একটা ছবি যদি না ছাপা হয়!

এসব ভাবতে ভাবতেই সল্টলেকের বৈশাখীর ভাড়ার বাড়িতে (আসলে গ্যারেজ) চলে আসি।

রাতে রান্নার সবচেয়ে সহজ উপায় খিচুড়ি, ডিমভাজা খেয়ে ছাপাবে কি ছাপাবে না…. না ছাপালে কেন ছাপাবে না…. আবার যদি ছাপে অরূপবাবু যদি কিছু বলেন…. এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পরি।

সকালে উঠে চোখ বন্ধ করে কলকাতার পাতা খুলি। তাকিয়ে দেখি সাত কলম জুড়ে ছবিটা বেরিয়েছে….ওপরে হেডিং — “আমি তোমাদেরই লোক” ….তারপর প্রথমেই লেখা ওই ক্যাপশন।

অফিসে এসে খুব ভয়ে ভয়ে বাবার ল্যান্ডফোনে ফোন করি…. কারণ খুব কৌতূহল হচ্ছে এই ছবিটা দেখে বাবার প্রতিক্রিয়া কি? বাবা কি ভেবেছেন?

ফোনটা নিচে ধরবি তো ধর অনিন্দ্যই ধরেছে। কে বলছেন নামটা বলতেই, অনিন্দ্য বলে, “অশোকদা ফোনটা ধরো। বাবা মর্নিং ওয়াক করে উঠতে উঠতেই তোমার কথা বলছিলেন। ধরো লাইনটা আমি উপরে দিচ্ছি।”

বাবা ধরতেই আমি বললাম, “বাবা প্রণাম, আমি অশোক।”

উনি হেসে বললেন, “অশোক, তুমি কি করেছো, …এতদিন ধরে তো আমি নিজেকে একটা দেখতাম। তোমার ছবিতে আমি নিজেকে দুটো দেখছি। কি সব ক্যামেরা বেরিয়েছে। আমি তো অবাক!!”

বললাম, “বাবা আমার ছবিটা ঠিক আছে তো? আপনি খুশি তো ?”

“খুব ভালো হয়েছে। আবার সময় করে এসো।”

ফোন রেখে ভাবলাম আগেরদিন যারা আমাকে এ ছবি ছাপাবেন না, অরূপবাবুকে বলে দেবো বলে ধমক দিচ্ছিলেন তারা ওস্তাদজীর ছাত্র বা শিষ্য। অথচ যাঁর ছবি তুলেছি সেই জগৎবিখ্যাত মানুষটি কি সহজ সরল ভাষায় আমাকে বলেছেন, “আমি কোনোদিন নিজেকে দুটো দেখিনি। তোমার ক্যামেরার কি কায়দা! খুব ভালো।” ইত্যাদি ইত্যাদি।

একেই বলে সাধক যে তাঁর বাজনার বাইরে দুনিয়ার আর কিছু জানেনা। জানতে চানও না।

আমি নিজেকে ধন্য মনে করি যে এই সাধকের সঙ্গে আমার ছবি তোলার সূত্রে একটা গভীর সম্পর্ক হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাবার অনেক ছবি তুলি। আমার ভাগ্য ভালো যে তার অনেক ছবি আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রথমবারের সেই একটি দিনের স্মৃতি আমার কাছে আজও অমলিন।

বাবা বহুবছর এই মায়ালোক ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর বাজনার সুর তাল ছন্দে আমরা এখনও বেঁধে আছি। পৃথিবীতে সরোদযন্ত্রটি যতদিন থাকবে সরোদসম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খান-এর নাম মানুষকে স্মরণ করতেই হবে।

বাবা আপনাকে শ্রদ্ধা-সহ প্রণাম।।

৫ নভেম্বর ২০২২

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev