টিনের তলোয়ার নাটকে উৎপল দত্ত লিখেছিলেন, মহাকবি মাইকেল দুটি জিনিস বিদেশ থেকে এনে এদেশে প্রচলন করে গেলেন, অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সিগারেট। উৎপল দত্তও আরও অনেক কিছুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকে প্রচুর অপ্রচলিত শব্দ উপহার দিয়ে গেছেন। এখানে আমরা আলোচনা করব টিনের তলোয়ার নাটকে ব্যবহৃত একগুচ্ছ প্রায় অচেনা-আজানা বাংলা শব্দ নিয়ে।
একটু মন দিয়ে ‘টিনের তলোয়ার’ নাটক পড়লে এই সব শব্দে আমাদের চোখ আটকে যাবেই। এই নাটকের ব্যবহৃত বহু শব্দই আমাদের অচেনা। এমন ভাষা অবশ্য তীতুমীর সহ অন্য আরও নাটকে উৎপল দত্ত ব্যবহার করেছেন। কিন্তু আমি এখানে শুধু টিনের তলোয়ার নিয়েই কথা বলব। প্রথমে কিছু দৃষ্টান্ত।
১) ‘বেটি আজ গ্রেট নেশনেলে চলে গেল ডাঙস করে’।
২) ‘সে শালা যে ছ্যাং চ্যাংড়ার কেত্তন শুরু করে দেবে এ সব জানতে পারলে’
৩) ‘ব্যাটার ক অক্ষর গোমাংস, যেখানে যাবে পেছনে মোদাগাড়ি ভরা মালের বোতল চলে, সে শালা হল স্বত্বাধিকারী’।
৪) ‘ও সব দালালির তলাখাঁক্তি কথা রেখে দে, পুনকে বেটি’।
৫) ‘গ্রেট নেশনালের ঘাঘিঘোচরা আমাদের সর্বনাশ করলে’।
৬) ‘ওই কাপ্তেনবাবু তো দেখছি ভুড়ুঙ্গে বজ্জাত’।
৭) ‘একের পর এক এমন পালা ধরছেন, যা দেখলে আমার থুতকুড়ি জাগে’।
৮) ‘আমি দল তুলে দেব তবু ভালো, অমন ঢোস্কা পালা করতে দেব না’।
৯) ‘থাক হয়েছে। আপনার সান্ত্বনা দেবার ঘ্যাঁতঘোঁতে মেয়েটা মুর্ছো যাবে’।
১০) ‘আপনার এই মেয়েছেলেটা তো বড় নড়েভোলা!’
শুধু কি ঢোস্কা আর নড়েভোলা? মোটেই না। বরং এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক, আরও এক গুচ্ছ শব্দ। যেমন, ‘গস্তানি, নুনচুপড়ি, বেদেবুড়ি, খুরকানাই, হেড়াহেড়ি, চিতেন, তজবিজ, ফররার, আচাভুয়া, বালতিপোঁতা, গররা, পাতাচাপা কপাল, মাড়গে, বৌকাঁটকি, চৈতন ফক্কা ইত্যাদি ইত্যাদি।

মজার কথা হল, এই ‘আচাভুয়া’ শব্দ কিন্তু বিদ্যাসাগর যে অপ্রচলিত শব্দ সংগ্রহ করেছিলেন, সেই তালিকাতেও আছে। বিদ্যাসাগর সংগৃহীত প্রায় তিনশো শব্দের তালিকা সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় ছাপাও হয়েছিল বাংলা ১৩০৮ সালে। সেই তালিকায় ছিল, আখাম্বা, আদামাদা, আলবায়ে, খেঙড়া, তাংরানো, আড়ে হাতে, পিংলা, ঢলানি, বোচামি, আজমাইস, ফইজস ইত্যাদি শব্দ। আচাভুয়া পাওয়া যায় ভারতচন্দ্রেও। যেমন, ‘মোর বিভার দায় নাই আচাভুয়া বরে’।
এমন অসংখ্য কম জানা, অপ্রচলিত মুখের ভাষা (শব্দ), ‘ইতর’ জনের ভাষা উৎপল দত্তের গোটা নাটক জুড়েই রয়েছে। আগাগোড়া নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে কলেজে লেখাপড়া করা উৎপল দত্ত এই ভাষা কী ভাবে সংগ্রহ করতেন, হয়তো তাঁর কাছের মানুষরা বলতে পারবেন। উৎপল দত্ত কোন প্রক্রিয়ায় এ সব শব্দ সংগ্রহ করতেন তা না বলতে পারলেও, উৎপল দত্ত নিয়ে দীর্ঘ কাল গবেষণারত অরূপ মুখোপাধ্যায় জানান, ‘এ সব শব্দের অনেকটাই সম্ভবত ফুটপাথ, রক, মেলা, সার্কাস, গ্রাম্য কথোপকথন থেকে সংগ্রহ’। আমার নিজের অনুমান, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর ইত্যাদিতে এমন শব্দ ছড়িয়ে রয়েছে, যার ব্যবহার পরে কমে যায়। উৎপল দত্তের এই ধরনের শব্দভাণ্ডারের সেটাও একটা সূত্র। অরূপ বললেন, ‘উৎপল দত্তের জার্মান নাটক ও সাহিত্যের উপর প্রচুর দখল থাকলেও তিনি ব্রেশটের নাটক করতেন না। এই প্রসঙ্গে আলোচনায়, উৎপল দত্ত অরূপকে বলেছিলেন, ব্রেশটের নাটকে এত ‘নিচুতলার’ মানুষের অপ্রচলিত শব্দ আছে যা বাংলায় আনুবাদ করা যায় না। যা ব্রেশট সংগ্রহ করতেন নিচুতলার মানুষের মুখ থেকেই। উৎপল দত্তের নাটকে এই ধরনের শব্দের ব্যবহার কী ব্রেশটের প্রভাবে? অরূপবাবুর মত, সম্ভবত তাই। এই সব নিচুতলার মুখের ভাষা বাংলা সাহিত্য নিল না। কার্যত তাকে দরজার বাইরে বসিয়ে রাখল। এর অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে আমার মনে হয় এর অন্যতম কারণ, বাংলা সাহিত্যের উপর ব্রাহ্ম ধর্ম এবং বামপন্থী প্রভাব। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্য মূলত বিকশিত হয়েছে উচ্চ বর্ণের লেখার টেবিলে। সেটাও একটা কারণ।
নিচুতলার ভাষা নয়, কিন্তু প্রচুর নতুন এবং বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষাকে উপহার দিয়েছিলেন কাজি নজরুলও। কারণ নিশ্চয় ভিন্ন, কিন্তু মিল একটাই, সেই সব শব্দও বেশিরভাগই জায়গা পায়নি বাংলা ভাষার মূল স্রোতে। এও এক ধরনের ক্ষতি। ভাষার ক্ষতি। শব্দভাণ্ডারের ক্ষতি।