বড়ো বড়ো মানুষের সঙ্গ উপভোগ করা আমার চিরকালের নেশা। মোদ্দা কথা তাদের কাছ ঘেঁষে কিছু সংগ্রহ করা কিছু পাওয়ার নেশা। এই নেশাটা একটা সময় আমার কাছে এ্যাডিকশনের মতো ছিল। আমার এক বন্ধু আছে ফটোগ্রাফার। নাম গোপাল। গোপাল স্টুডিও পাড়ার ফটোগ্রাফার।
আর একটা আমার বদ অভ্যাস ছিল, যখন আমি কাজে যেতাম তখন আমার বইয়ের তাকে আমার মান, সম্মান, সব তুলে রেখে যেতাম।
তখন তরুণ মজুমদারের ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ ছবিটার শুটিং চলছে। সেই ছবিতে একটা চরিত্রে কাজ করছেন বিশিষ্ট নাট্যকার অভিনেতা উৎপল দত্ত। ছবি কভার করতে করতে গোপালকে বললাম তরুণদাকে বল না একটু উৎপল-দার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে।
চল আমি করিয়ে দিচ্ছি।
না।
কেন।
তুই বুঝবি না।
ও তরুণদাকে কি গিয়ে বললো। ব্রেক টাইমে তরুণদা আমাকে ডাকলেন।
কেন অনি, গোপাল আলাপ করিয়ে দিলে হয়না?
না দাদা, আপনি আলাপ করিয়ে দিলে তার ওয়েট অনেকটা ক্যারি করবে।
কেন বলবি তো?
আমি উৎপল-দার কাছে সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দিতে পারবো না।
ওরে ব্যাস। তারমানে তোর অন্য কোনও ফন্দি আছে?
আছে।
সেটা কি বল?
আমি নাটকে অভিনয় করতে চাই।
তুই অভিনয় করবি! এটা কি করে সম্ভব?
ওটা পরের কথা।
তারমানে!
আপনি আলাপ করিয়ে দিন বাকিটা আমি বুঝবো।
সেই দিন তরুণদা আমার সঙ্গে উৎপল-দার আলাপ করিয়ে দিলেন। আমি যে ভাবে চাইলাম সেই ভাবে। তারপর অনেক লাথি ঝাঁটা খেলাম। যেদিন যেদিন উৎপল-দার কাছে গেছি, গালাগাল খাই নি এমন দিন মনে পরে না। তবে নাটক করতে যে আমি আসি নি। সেটা উৎপলদা অচিরেই ধরতে পেরেছিলেন। এবং সর্বোপরি আমার পরিচয়টাও কয়েকদিন পর পেয়েগেছিলেন। কিন্তু আমি উৎপল-দার ন্যাওটা হয়ে গেলাম। প্রায় নাটকের মহড়ায় যাই সবাই নাটকের মহড়া দেয়। আমি চা জল এনে দিই। একমাত্র উৎপলদা আর ওনার স্ত্রী শোভাদি ছাড়া কেউ জানতেন না আমার আসল পরিচয়।
একদিন একজন কুশলী আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। আমি হাসি মুখে তা মেনে নিয়েছিলাম। পরে উৎপলদা তাকে ঝাড়ের চোটে বৃন্দাবন দেখিয়ে দিয়েছিলেন। সেইদিন সমস্ত কলাকুশলী আমার আসল পরিচয় পেয়েছিলো।
তাও প্রায় দেড় বছর পর। তখন সবাই থ। উৎপলদা বলে কি!
আমার কিন্তু তাতে কোনও হেলদোল নেই আমি আমার জায়গাতেই রইলাম। বরং আনন্দ সহকারে।
সেবার টিনের তলোয়ার মঞ্চস্থ হবে। মহড়া চলছে। ইউনিভার্সিটি ইনিস্টিটিউট হলে। হলটা কলেজস্ট্রীটে। উৎপলদা আমাকে তার আগের দিন অফিসে ফোন করে বললেন। তিনদিন ছুটি নে। কাল সকাল থেকে হলে চলে আসবি তোর ডিউটি তুই করবি। আর গেটের দায়িত্ব তোর ওপর থাকবে।
দাদাকে বলতেই দাদা গম্ভীর হয়ে বললো, যাচ্ছ যাও, আমার ভালো একটা এক্সক্লুসিভ ফিচার চাই এটা যেন মনে থাকে। কি ভাবে দেবে তোমার ব্যাপার।
উৎপলদা এটা মানবেন না।
মানানোর ব্যাপারটা তোমার। আমার কিছু এক্সক্লুসিভ চাই।
ঠিক আছে।
পরদিন ঠিক সময়ে হলে পৌঁছে গেলাম।
হলের যিনি কেয়ারটেকার চন্দনদার সঙ্গে আমার আগেই আলাপ ছিল। সব কথা জানাতে বললো। দাদা তো আমাকে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেছে। আর কিছু বলে নি। দিলাম চন্দনদাকে রাম গালাগাল। তখন বললো ঠিক আছে, দাদাকে আস্তে দে। চলবে তো সারাদিন ধরে।
হলের সামনের দিকে গেট বন্ধ। যা কিছু সব পেছনের গেট দিয়ে ঢোকা বেরোনো চলছে। উৎপলদার আসার কথা দশটার সময়। আমি চা রেডি করলাম। র’ চা। উৎপলদা এলেন ঠিক দশটা বাজতে পাঁচমিনিট আগে।
আমি গাড়ির সামনে গিয়ে এটাচিটা হাতে নিলাম।
সবাই এসে গেছে অনি?
হ্যাঁ।
মিথ্যে কথা বললি। উৎপলদার সেই নিজস্ব স্টাইল।
চমকে উঠলাম।
আমার দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হাসি দিয়ে বললেন, তোর শোভাদি আসেনি।
বাচন ভঙ্গি সেই আগের স্টাইলেই।
দিদি তো আপনার সঙ্গে আসার কথা।
সময়ের জ্ঞান নেই তাই আগে চলে এলাম।
ভেতরে এলেন। সত্যদা (টাক মাথা সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় যিনি মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে, পরশুরামারে কুঠার প্রভৃতি ছবিতে ছিলেন।) উৎপলদার কাছের মানুষ। কাছে ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক সাড়ে দশটায় গেট বন্ধ করে দিবি।
আচ্ছা।
আমি এ্যাটাচিটা পাশে রেখে, জিজ্ঞাসা করলাম চা আনি।
আন। দেখতো দুটো চুরুট পাওয়া যায় কিনা।
এসি চলছে।
ও, তাহলে বাইরে গিয়ে খেতে হবে।
হ্যাঁ।
থাক তাহলে।
আমি চা আনতে ছুটলাম। ফিরে এসে দেখলাম উৎপলদা বসে বসে সেকসপিয়ার পড়ছেন।
সাড়েদশটা বাজলো গেট বন্ধ হলো। মহড়া শুরু হয়ে গেলো। শোভাদি আসে নি। উৎপলদা বসে বসে মহড়া দেখছেন কুশীলবদের সব বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আমি সবাইকে সাহায্য করছি। একজন এসে বললো অনি শোভাদি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ছুটে গেলাম। দিদি ঘর্মাক্ত কলেবর। আমাকে দেখেই বললেন, তাড়াতাড়ি খোল।
আমার মাথা নিচু। পার্মিশন ছাড়া গেট খোলা নিষেধ। যতোবার যাই, দেখি দাদা আমাকে হাত দেখিয়ে বলছেন একটু পরে। মিনিট পনেরো এরকম হওয়ার পর। আমি গেট খুলে দিলাম। ততক্ষণে শোভাদির দুটো সিন প্রক্সিদিয়ে হয়ে গেছে। মহড়া চলছে। আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি। সকলের দেখভাল করছি।
লাঞ্চ ব্রেক হলো। আমার ডাক পরলো। আমি গিয়ে উৎপলদার সামনে দাঁড়ালাম।
আমার খাবারটা নিয়ে আয়।
আমি ছুটে চলে গেলাম। খাবার নিয়ে এলাম।
গ্রীণ রুমে যা।
আড় চোখে দেখলাম শোভাদি পাশে বসে আমাকে কিছু ইশারা করলেন। কিছু বুঝতে পারলাম না।
আমি মাথা নিচু করে গ্রীণরুমে চলে এলাম।
কিছুক্ষণ পর উৎপলদা এলেন। পেছন পেছন শোভাদি।
বুঝলাম আজ কিছু একটা অঘটন ঘটবে। উৎপলদার মুখ চোখ সেই কথাই বলছে।
হাত ধুয়ে খেতে বসলেন। দুজনে নিস্তব্ধে খাচ্ছেন আমি সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
অনি।
আমি মাথা তুলে তাকালাম।
কাল থেকে তুই আর আসবি না।
মাথায় যেনো বাজ ভেঙে পরলো। একি বলছেন উৎপলদা!
কেনো? এই প্রশ্ন করার অধিকার আমার নেই।
যা এখান থেকে বেরিয়ে যা।
কিছুক্ষণ স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম তারপর বেরিয়ে এলাম। ভীষণ কান্না পাচ্ছিলো। কাকে আমার মনের কথা বলবো। সবাইকে লুকিয়ে চলে এলাম।
এরপর মহড়ায় যাওয়া বন্ধ।
একদিন টিনের তলোয়ার মঞ্চস্থ হলো অফিসে কার্ড এলো। দাদা আমাকে বললেন তুই যা কভার করে আয়। আমি এড়িয়ে গেলাম। বললাম অন্য কাউকে পাঠিয়ে দাও।
দাদা বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে।
যারা যারা নাটকের দলে ছিলেন তাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয় তারাও জিজ্ঞাসা করে কিরে অনি তোর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না কেনো।
কাজের চাপ আছে বলে এড়িয়ে যাই।
প্রায় মাস দুয়েক পর অফিসে বসে কাজ করছি। হঠাৎ একটা ফোন এলো।
হ্যালো।
গম্ভীর কণ্ঠস্বর। বুঝতে পারলাম কার গলা।
আজ বিকেলে একবার বাড়িতে আসবি।
কট করে ফোনটা কেটে গেলো।
বুঝলাম কথা শেষ, ফোনটা কেটে দেওয়া হলো।
গলা শুনে যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে।
প্রথমে ভাবলাম যাবো না। একবার যখন তাল কেটে গেছে তখন গিয়ে লাভ কি। তারপর ভাবলাম যাই একবার, এতো বড়ো একজন ব্যক্তিত্ব যখন ডেকে পাঠালেন।
বিকেলে নিজের হাতের কাজ শেষ করে বেরিয়ে এলাম।
বাসে উঠে সোজা চলে এলাম উৎপলদার বাড়ি।
বেল বাজাতেই দরজা খুললো। দেখলাম উৎপলদা নিজে দরজা খুলেছেন। বুকটা হঠাৎ দুর দুর করে উঠলো।
ভেতরে আয়।
ভেতরে গেলাম। নিজেই দরজা বন্ধ করলেন। উৎপলদার ঘরে গেলাম। উৎপলদা সোফার একদিকে বসলেন আমি অন্যদিকে।
মাথা নিচু করে আছি। কোনও কথা নেই। উৎপলদা একটা বই পড়ছেন। সমালোচনা সাহিত্য।
এতদিন কোথায় থাকা হয়েছিল?
কলকাতায় ছিলাম। আস্তে করে বললাম।
আসা হয়নি কেনো?
চুপ করে রইলাম।
জীবনে বড়ো হতে গেলে ডিসিপ্লিন মাস্ট। সেখানে আত্মীয়তার কোনও বন্ধন নেই।
চুপ করে আছি।
হঠাৎ কি মনে হলো আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম।
এ কিরে! বাচ্চাদের মতো কাঁদছিস কেনো?
কোনও কথা বলতে পারলাম না।
সোফা ছেড়ে উঠে এলাম। দরজা খুলে সোজা সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে নেমে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। তারপর সোজা নিজের ফ্ল্যাটে।
আজ উৎপলদা ইহজগতে নেই। এখনও একা থাকলে মাঝে মাঝে উৎপলদার সেই কন্ঠস্বর গম গম করে ওঠে কানের কাছে, “জীবনে বড়ো হতে গেলে ডিসিপ্লিন মাস্ট”।
পরে আমার এক পরিচিতের কাছে শুনেছি। সেদিন শোভাদি আমার জন্য উৎপলদার কাছে অনেক ছোটোবড়ো কথা শুনেছিলেন।
অবাক করা অভিজ্ঞতা, সত্যিই অ বাক হয়ে গেলাম।