দেখা না দেখায় মেশা কতরকম বাস্তবতার গল্প নিয়ে বদলে যাচ্ছে আমাদের পৃথিবী। চোখের সামনে ফ্লপি বদলে গেলো সিডিতে, সেখান থেকে ডিভিডি হয়ে হার্ডডিক্স থেকে শুরু করে কড়ে আঙুলের চেয়েও ছোটো পেনড্রাইভে করেই ঘটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে তথ্য বিস্ফোরণ। এই যাবতীয় উত্থান-পতনের মধ্যেও তাঁর ভুবন ভোলানো হাসি নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছেন আমাদের বঙ্গ জীবনের অঙ্গ মহানায়ক উত্তমকুমার।
পঞ্চাশের দশকের একেবারে গোড়ায় সাফল্যের সিঁড়িটা দেখতে পান ভবানীপুরের চাটুজ্যে বাড়ির এই তরুণ। দেখতে দেখতে বাংলা ছবির আকাশে অভূতপূর্ব এই নক্ষত্রের উদয়। ইতিমধ্যে গণমাধ্যম বা বিনোদন মাধ্যম ক্রমশ নতুন চেহারা নিতে শুরু করেছে।
গণনাট্য আন্দোলনের মঞ্চে বিজন ভট্টাচার্যের লেখা ‘নবান্ন’ নাটক মঞ্চস্থ হলো বিজনবাবু ও শম্ভু মিত্রের যুগ্ম পরিচালনায়। এই নাটকে হাজার হাজার মানুষ দেখলো মানুষকে। মানুষের ভাষা স্বীকৃত হলো থিয়েটার, সিনেমা, বিষয় হিসেবে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক পি সি যোশী কর্মীদের বলেন, আগামী দিন কিন্তু অডিও-ভিসুয়াল মাধ্যমের দিন। উৎপল দত্ত লিখেছেন, নবান্ন প্রযোজনায় গোটা দেশের মানুষ চমকে উঠলো ক্রাউড সিন দেখে।
সে সময় মানুষ যেন যাত্রা, থিয়েটার, সিনেমায় বাস্তবকে দেখে নিতে চাইছেন। নিজেদের আশেপাশের ঘরবাড়ি, মাঠঘাট, নদীনালা ক্রমশ বিষয় হয়ে উঠল। আর এসবের মধ্যেই আমাদের বাড়ির মাসি-পিসিরা ম্যাটিনি শোয়ে উত্তমকুমারের ছবি দেখে এসে সন্ধে বেলা হেঁসেলে ভাতের হাঁড়ি চড়ালেন। আর নিজেদের মধ্যে গল্প করলেন, মা-গো অমন সোনার টুকরো ছেলে উত্তমকুমার কী সুন্দর মুগের ডাল আর আলুভাজা দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে নিলে। আর আমাদের সংসারে কত বায়নাক্কা। ইনি এটা খান না তো তিনি সেটা খাবেন না।
আমাদের বাস্তব-অবাস্তবের গল্প কেমন মিলেমিশে গেলো। সাড়ে চুয়াত্তর থেকে শুরু করে ত্রিযামা, শাপমোচন, পথে হলো দেরী, হারানো সুর, সদানন্দের মেলা—সব মিলে উত্তমকুমার কিন্তু বাঙালির গভীরতম আপনজন হয়ে উঠেছেন। তরুণীদের তিনি প্রেমিক, প্রৌঢ়া কিংবা বৃদ্ধাদের তিনি ভ্রাতৃপ্রতিম কি সন্তানতুল্য। রূপে তাঁর চেয়ে অনেকগুণ এগিয়ে ছিলেন বিশ্বজিৎ-এর মতো অনেকেই। কিন্তু উত্তম এক অজানা রহস্যে বাঙালির ঘরে ঘরে কড়া নাড়লেন।

১৯৬৬ এবং ৬৭ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত উত্তমকুমার অভিনীত নায়ক এবং চিড়িয়াখানা এই দুটো ছবি অভিনেতা উত্তমকুমারকেও বড়ো প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এ ছাড়াও এন্টনি-ফিরিঙ্গী, অগ্নীশ্বর, আমি সে ও সখা, মৌচাক, ব্রজবুলি, যদুবংশ, ধন্যি মেয়ে—এসব ছবিতেও উত্তমকুমার চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও দারুণ। তবে ততদিন কিন্তু ধুতি আর শার্ট পরা এই বাঙালিবাবু সারা দেশেই হইচই ফেলে দিয়েছেন। যে কথা আগে বলছিলাম, রূপোলি পর্দা আর আমাদের বাস্তব কতটা কাছাকাছি আসতে পারে তা নিয়ে তো বড়ো কাজ করছেন সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল সেন প্রমুখ। ষাটের দশকের শেষে ভারতীয় নবতরঙ্গ সিনেমাও শুরু হয়ে গিয়েছে। এসবের মধ্যে দিয়ে নানারকম বাঁক বদলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলেন উত্তমকুমার। নিজে বনপলাশির পদাবলীর মতো সুপারডুপার হিট ছবি পরিচালনা করেছেন। সেই সঙ্গে কাল তুমি আলেয়া-র মতো ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন। উত্তর ফাল্গুনী-সহ হারানো সুর, গৃহদাহ এরকম বহু ছবি প্রযোজনাও করেছেন।
উত্তমকুমারের আকস্মিক প্রয়াণ ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। তারপর দেখতে দেখতে প্রায় ৪০ বছর হতে চলল। দেখতে দেখতে কলকাতা শহরে কত কিছু অদলবদল হলো। শুধু কলকাতা বলি কেন, এখন তো সাইবার কাফে বদলে গিয়ে মুঠোফোনেই দুনিয়াদারির হালচাল বুঝে নেওয়া যাচ্ছে। ফেসবুক থেকে ট্যুইটার হরেকরকম উপায়েই মানুষে মানুষে বার্তা চালাচালি চলছে। সব আলোড়নের মধ্যেও আজও আমাদের মাসিমা, পিসিমা কিংবা মেসোমশাইরা সেই সাদা কালো যুগের উত্তমকুমারকে দেখলে তাঁদের পাশের বাড়ি ছেলে ভেবে উল্লসিত হন।