করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে শুরু থেকেই। উল্লেখ্য; পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং থেকেই প্রথম খবর ছড়িয়ে পড়েছিল- ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য সবং গ্রামীণ হাসপাতালে রাত থেকে লম্বা লাইন দেখা যায়। কেউ মশারি টাঙিয়ে হাসপাতালেই শুয়ে পড়েছিলেন, কেউ আবার রাত কাটিয়েছেন গাছের নিচে। টিকা পাওয়ার জন্য শিকেয় ওঠে দূরত্ব বিধি। কেবল সবং নয়, এই অভিযোগ প্রায়সই শোনা যাচ্ছিল, পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও মানুষকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র কেউই এই অভিযোগ মানতে নারাজ। আধিকারিকদের দাবি, চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় সমস্যা হচ্ছে। জোগান যে কম সে বিষয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই।
প্রসঙ্গত বলতে হয় সুন্দরবনের কথা। নদী-নালায় ভরা সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলই নয় দক্ষিণ ২৪ পরগণার এই অঞ্চলে এমন কয়েকটি জায়গা রয়েছে যেখানে সড়কপথের দেখা মেলে না। সেই সব জায়গাগুলি থেকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসতে হলে দু-তিন বার নদী পেরতে হয়। তার ওপর ইয়াস ও ভরা কোটালের দাপটে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। ভাঙা ঘরবাড়ি মেরামত, নোনা জল ঢুকে পড়া জমিকে আবার চাষযোগ্য করে তোলা, লকডাউনে রুজি-রুটির সংস্থান করাটাই যখন সুন্দরবনবাসীর কাছে সব থেকে জরুরী তখন তারা কি আর করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে অতটা চিন্তা করার অবকাশ পাবেন।

গোসাবা, পাথরপ্রতিমা-সহ নদীবেষ্টিত ব্লকগুলির বিভিন্ন দ্বীপের বহু মানুষ কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভ্যাকসিন নিতে পারেননি। ইয়াস ও ভরা কোটাল পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার লড়াইতেই এখনও তাদের দিন কাটছে। তার ওপর হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে গেলে যে হ্যাপা এখন তাঁদের পক্ষে ভ্যাকসিন নিতে যাওয়া তাই সম্ভব নয়। তাঁদের কথা ভেবেই এই অঞ্চলে চালু হয়েছে ‘ভ্যাকসিনেশন অন বোট’। মূলত দ্বীপবেষ্টিত সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার জন্য এই কর্মসূচি চালু করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন। গত ৫ জুলাই গোসাবা ব্লকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক পি উল্গানাথন। ভ্যাকসিনেশন অনুষ্ঠানে জেলাশাসক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল সহ জেলার অন্যান্য আধিকারিক ও স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা। ওই দিন দুপুরে গোসাবার কুমিরমারী দ্বীপ থেকেই বোটে চড়ে ভ্যাকসিন নিয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রওনা দেন।
ওইভাবেই প্রতিদিন গোসাবা ব্লকের বিভিন্ন দ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁরা। তারপর একটি ঘাটে ক্যাম্প করে ওই দ্বীপের সমস্ত বয়সের মানুষদের ভ্যাকসিন দেওয়ার কাজ চলছে। এক একদিন, এক একটি দ্বীপে ওই জলযান ঘুরে বেড়াচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তরফে সরকারি নির্দেশিকা মেনেই বোটের মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত সোমবার ও মঙ্গলবার যেমন ওই কর্মসূচির মাধ্যমে গোসাবা অঞ্চলের শম্ভুনগরে ও সজনে খালিতে প্রায় দুশো জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হল। কেবল বোটের মধ্যে নয়, বোট থেকে নেমে ওই দুই এলাকার ঘাটে ক্যাম্প করেও বিভিন্ন গ্রামবাসীকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কোথাও গ্রামবাসীরা একে একে এসে বোটে উঠছেন। ভ্যাকসিন নিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। তারপর ফিরে গেলেন। কেউ যাতে টিকাকরণ কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত না হন, সেই লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা করেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন।
গোসাবার বিডিও সৌরভ মিত্র জানালেন, ২০৮৫ স্কোয়্যার কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে গোসাবার ৯টি দ্বীপে রয়েছে ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েত। এখানে সমগ্র এলাকায় ৩ লক্ষেরও কিছু বেশি মানুষের বসবাস। এই দ্বীপগুলি ছাড়াও পাথরপ্রতিমা, সাগর-সহ অন্যান্য ব্লকের দ্বীপেও ভ্যাকসিনেশন অন বোট কর্মসূচি রয়েছে। এই কর্মসূচির জন্য আপাতত ২টি বোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মধ্যে একটি গোসাবা ব্লকের জন্য এবং আরেকটি পাথরপ্রতিমা, সাগর ও নামখানার জন্য ধার্য করা হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, সবাইকে ভ্যাকসিন দিতে প্রয়োজনে নৌকার সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। মাসখানেক আগেই তাণ্ডব চালিয়েছে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস! ত্রাণশিবিরে একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হয়েছে দীর্ঘদিন। এমনকি, এখনও অনেকেই ফিরতে পারেননি বাড়িতে! তবে এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের এই ব্যবস্থায় মানুষ খুশি। কারণ তাদের কষ্ট করে নদী পেরিয়ে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে না।

জেলা তথা রাজ্যে বোটের মাধ্যমে করোনার টিকাকরণ এই প্রথম। এর আগে বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা বাস বা অন্য গাড়ির মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সেই গাড়ি ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন শহর কেন্দ্রিক এলাকায় ঘুরে ঘুরে বয়স্ক মানুষদের ভ্যাকসিন দিয়েছিল। প্রায় একইরকমভাবে এই বোট দুটি বিভিন্ন দ্বীপে দ্বীপে নদী পথে ঘুরে স্থানীয় মানুষদের করোনার ভ্যাকসিন দিচ্ছে। গোসাবা ব্লকের কুমিরমারি, বালি, রাধানগর, ছোট মোল্লাখালি ছাড়াও আরও এলাকায় যেমন যাবে, তেমনি পৌঁছানোর কথা পাথরপ্রতিমার মত বিভিন্ন দ্বীপে।
গোসাবার বিডিও জানালেন, যশ সাইক্লোনের পর সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের বিভিন্ন দ্বীপে কিছুটা হলেও করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। একদিকে যেমন মানুষের করোনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে তেমনি ভ্যাকসিনের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। আর এই ভ্যাকসিন-এর জন্য স্থানীয় দ্বীপবাসিকে আর ব্লক হাসপাতাল বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে লাইন দিতে হচ্ছে না। তবে প্রতিদিন ১০০-১৫০-র বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া যাচ্ছেনা, ফলে সমস্ত মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে বহুদিন লেগে যাবে।