হিন্দুত্ববাদীরা বন্দেমাতরমের পাল্টা স্লোগান হিসেবে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠছেন জয়শ্রীরাম বলে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামমন্দিরের শিলান্যাস করে সেই দিনটিকে স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। যদিও স্বাধীনতা দিবস যেমন সকলের, সবার, বাবরি মসজিদ ভাঙার স্লোগান দিয়ে, এবং ভেঙে, সেই স্থলে নির্মিত রাম মন্দির সকলের, সবার হয়ে ওঠার কথাও নয়, হয়ওনি। মসজিদ ভাঙা যে বেআইনি কাজ হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট সে মন্তব্যও করেছে তার রায়ে। আর সুপ্রিম কোর্টে মসজিদ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা না-করা যে অনৈতিক কাজ হয়ে্যছিল, সেটা আগাম মেনে নিয়ে ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বিজেপি নেতা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং পদত্যাগ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রিত্বের পদ থেকে।
বন্দেমাতরম না জনগণমনঅধিনায়ক, কোন সঙ্গীতটি দেশর জাতীয় সঙ্গীত হবে তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে বিধান রায়ের একটি পত্র-তর্ক হয়েছিল। তার আংশিক উদ্ধৃতি এখা খুবই প্রাসঙ্গিক। সেটা ছিল এই রকম— ‘…১৯৪৮ সালের ১৪ জুন, বিধান রায় জওহরলালকে চিঠিতে লেখেন, ‘… বুঝতে পারছি না, জাতীয়-সঙ্গীত হিসেবে ‘জনগণমন’ ব্যবহার করা আপনার নির্দেশ, না কি, এ বিষয়ে আপনি আমাদের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। যদি মতামতের প্রশ্ন হয়, তাহলে বলতে পারি, জাতীয়-সঙ্গীত হবার ব্যাপারে ‘বন্দেমাতরম’-এর দাবি যে অনেক বেশি, সেটা বিবেচনা করে দেখা উচিত। ১৯০৫ সাল থেকে আত্মদান ও নিপীড়নের এক মহান ঐতিহাসিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এর (বন্দেমাতরম সঙ্গীতের) পিছনে। ব্রিটিশ আমলে সরকারি আদেশ ভাঙার জন্য মানুষ এই গান গেয়ে উঠত আর তার জন্য অবলীলায় শাস্তি ভোগ করত। মানুষ জেলে গেছে, বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে, ফাঁসীর মঞ্চে উঠে গেছে এই গান কণ্ঠে নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের উপর আমাদের বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা একযোগে বলেছেন, বন্দেমাতরমই জাতীয়-সঙ্গীত হওয়া উচিত’।
বিধান রায়ের এই চিঠির জবাবে জওহরলাল লিখলেন,— ‘…জাতীয়সঙ্গীত কী হবে সেটা যে আইনসভাই স্থির করবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।…এখনকার পরিস্থিতিতে জাতীয়-সঙ্গীত হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’ একেবারেই খাপ খাচ্ছে না। বন্দেমাতরম আমাদের জাতীয়-ভাবোদ্দীপক গান হিসেবে এখন কেন, চিরকালই মর্যাদা পাবে, কারণ এর সঙ্গে আমাদের জাতীয় সংগ্রাম ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু যে গান জাতীয় সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন বন্দেমাতরম করেছে,- তার সঙ্গে জাতীয়-সঙ্গীতের কিছুটা তফাৎ আছে। জাতীয়সঙ্গীত এমনই হবে, যাতে জয়ের কথা থাকবে, আশা পূরণের কথা থাকবে,— অতীতে কী সংগ্রাম করা হয়েছে, তার কথা নয়। জাতীয়-সঙ্গীত হচ্ছে প্রধানত সঙ্গীত…এর এমন একটি সুর থাকা দরকার যার লালিত্য থাকবে, যা তালে তালে গাওয়া যায়’।
১৯৯৪-র ৮ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু। আনন্দমঠ প্রকাশের ১৪ বছর পর ১৮৯৬ সালে কলকাতার বিডন স্কোয়ারে, এখন যেটা রবীন্দ্র কানন, সেখানে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল। সেখানেই রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন বন্দেমাতরম গান। ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, কেউ কেউ নাকি সে গান শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় শোনা গেল বন্দমাতরম স্লোগান। যাকে বলা হল দেশাত্মবোধের বীজমন্ত্র।
তবে বন্দেমাতরম না জনগণমন, এই বিতর্ক অনেক দিন চলেছিল। অবশেষে, স্বাধীনতার প্রায় দু’বছর পর, ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান রচনার কাজ শেষ হওয়ার দু’মাস পরে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘The composition of the words and music known as Janaganamana is the National Anthem of India subject to such alteration in the words as the government may authorise as occasion arises; and the song Vande Mataram which has played a historic part in the struggle for Indian freedom shall be honoured equally with Janaganamana and shall have equal status with it. I hope this will satisfy the members’. এইভাবে ‘বন্দেমাতরম’ রাষ্ট্রীয় সংগীতের সমমর্যাদা পেল। সংবিধানে এর কোনও উল্লেখ নেই, তবে গণপরিষদে সর্বসম্মত স্বীকৃতির রেকর্ড অবশ্যই আছে।
এই ‘বন্দেমারতম’ দেখা যাচ্ছে পিছু হটছে হিন্দুত্ববাদীদের আমলে। পিছু হটছে কারণ, হিন্দুত্বাদীদের অতীত ইতিহাসে এমন একজন নেতা-কর্মীও নেই যিনি দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বন্দেমাতরম বলতে বলতে ফাঁসীর মঞ্চে প্র্রাণ দিয়েছিলেন। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই ইতিহাস তাঁরা ভুলে যেতে চান। ভুলে থাকতে চান। সে কারণেই বন্দেমাতরমের পাল্টা স্লোগান হিসেবে জয়শ্রীরাম স্লোগানে তারা মুখরিত করে তুলতে চাইছেন রাজনৈতিক পরিবেশ। বন্দেমাতরমের ঐতিহ্য যাতে নতুন প্রজন্ম ভুলে যায়।
ধম্মে শুধু বিভেদ বাড়ে ।