সেভাবে ঠান্ডা না পড়লেও শীতকাল শুরু হয়ে গিয়েছে। শীতকাল মানেই বাজারগুলিতে নানা শাক-সবজি উপচে পড়ে— ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম, গাজর, পেঁয়াজকলি, কড়াইশুঁটি, ওলকপি ইত্যাদি। এগুলিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এবং মিনারেল। যদিও এখন প্রায় সারা বছরই এগুলি বাজারে পাওয়া যায়। তবে এগুলি শীতেরই সবজি। শীতে এইসব সবজির বিশেষ আকর্ষণ। তবে কলকাতা শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পাশ্ববর্তী জেলাতেও এইসব সবজির দাম মধ্যবিত্তদের হাতে ছ্যাকা দিচ্ছে।
দুর্গাপুজোর আগে থেকে বাজারে আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন থেকে শুরু করে বেগুন, টোম্যাটোর দাম যে হারে বাড়া শুরু হয়েছিল তা কমা তো দূরের কথা ধাপে ধাপে বেড়েছে। বাজারের জিনিসপত্রের দাম কোথায় পৌঁছেছে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়া একটি ছড়ায় ধরা পড়ে— ফুলকপি হেসে কয়, ‘লাভ কার কাকা? আমি আজ পার পিস চল্লিশ টাকা’।/বেগুন ও সিমে চলে দড়ি টানাটানি।/সেঞ্চুরি টমেটোর, সবজির রানী।/লঙ্কা, করলা আর পে়ঁয়াজের কলি।/জনতার নাগালের বাইরে সকলই।
শীতেও শাক সবজির দাম এত বেশি কেন? বাজারের ছোট-মেজ-বড় ব্যবসায়ীদের কথায়, এ বছর বর্ষাকাল ছাড়াও বেশ কয়েকটি জেলায় অতিমাত্রায় বৃষ্টি হয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত সবজির ক্ষেত ছিল জলের তলায়। তার ওপর আবার গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানির দাম বেড়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পরিবহণ খরচ বেড়ে গিয়েছে। এই সাঁড়াশি আক্রমণেই বেড়েছে সবজির দাম। অনেকে জানাচ্ছেন, এমনও দেখা গিয়েছে দামের ফারাক রয়েছে পাইকারি বাজারের সঙ্গে খুচরো বাজারের।এর সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নেমে পড়েছেন মাঠে। অনেক ব্যবসায়ী আগেই জানিয়েছিলেন, দাম আরও বাড়তে পারে। বর্ষাকাল শেষ হলেও বৃষ্টি হয়েছে যে সময়ে, তখন জমিতে পটল, কাঁচালঙ্কা, ভেন্ডি, বেগুনের মতো নানান সবজি ছিল। সাধারণত এইসব সবজি নদীর কাছাকাছি এলাকায় চাষ হয়ে থাকে। বৃষ্টি চলতে থায় জমিতে জল ঢোকে, ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। যে কারণে সবজির চাহিদা থাকলেও উৎপাদন ব্যহত হয়েছে দাম বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে।

কলকাতার বাজারগুলিতে সবজি আসে দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, হাওড়া, হুগলি থেকে। এই জেলাগুলিতে সবজি চাষের ক্ষতি হওয়ায়, পাশাপাশি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য দাম আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি এটাও ঘটনা ডিজেলের দামের প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরো বাজার দরে। কালীপুজোর আগে থেকেই অনেকটা বেড়েছিল শাক-সবজির দাম। এখন বাজারে আলুর চেয়ে দামি লাউ, পালং শাক। ব্যাপারটা আজ এই পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে দুর্ভোগটাতো মধ্যবিত্তের, তাতে কার কী এসে গেল! কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধি রুখতে দেশের সরকার কি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে না৷ নাকি তারা ভোট ছাড়া আর কিছুই বোঝে না৷
জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ বেশ ভালভাবেই বোঝা যাচ্ছে। সেটা অযৌক্তিক নয়৷ বছরের শুরুতেও যে পেট্রল ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম কম-বেশি ১০৮ টাকা৷ ডিজেল ১০০ টাকা ছাড়ানোর পর সরকার ১০ টাকা দম কমিয়েছে৷ জ্বালানির দাম বাড়লে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। রান্নার তেল কিছুদিন আগেও লিটার প্রতি ১২০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা আড়াইশো টাকার কাছাকাছি৷ তাল মিলিয়ে অ্যাপ ক্যাবেরও দর হাঁকানো হচ্ছে। সেটা হওয়াই স্বাভাবিক৷ ফলে সংসার টানতে কালঘাম ছুটছে মধ্যবিত্তের৷
এর ওপর গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতির মতোই দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোমর ভেঙে গিয়েছে করোনা আর লকডাউনের জেরে৷ লক্ষ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন৷ আরও যে কত মানুষ কর্মহীন হওয়ার তালিকায় ঝুলে আছেন তার হিসাব নেই। যাদের কাজ আছে তাদের বেতন কমছে। এই পরিস্থিতিতেই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে শুরু করেছে লাফিয়ে লাফিয়ে৷ শুধু কী পেট্রল বা ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দামও বাড়তে বাড়তে প্রায় হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে৷ স্বাভাবিকভাবেই মানুষ দিশেহারা। কিন্তু দাম বৃদ্ধিতে দেশের সরকারের কোনও হেলদোল নেই। প্রতিদিন বেঁচে থাকার বদলে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে৷ কিন্তু একমাত্র প্রশাসনই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে৷ কালোবাজারি রুখতে পারে, মূল্যবৃদ্ধি রুখতে জরুরিভিত্তিতে কিছু ব্যবস্থা নিতে পারে৷ দেখেশুনে যা মনে হচ্ছে সে কাজে কেউ এগিয়ে আসবে না বা রাস্তায় নামবে না।