বিদ্যাসাগর যে কবিগানের ভক্ত ছিলেন তা বাংলাসাহিত্যে কোথাও আলোচনা করা হয় না। অথচ তিনি লিখেছেন, “বাংলাকে জাগাতে যেমন রামগোপাল ঘোষের মতো বাগ্মী, হুতোমপেঁচার মতো আমুদে লোক প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ভোলা ময়রার মতো লৌকিক গায়কদের।”
বিদ্যাসাগরের কবিয়ালপ্রীতি যে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনও শখ নয়, ছেলেবেলা থেকেই ছিল এই কবিগানের নেশা, তা আমরা জানতে পারি শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের (বিদ্যাসাগরের সেজ ভাই) ‘বিদ্যাসাগরচরিত ও ভ্রমনিরাশ’ বইটি থেকে। শম্ভুচন্দ্র লিখেছেন ‘এখনকার মত তৎকালে থিয়েটার বা হাপ্ আখড়াই প্রভৃতি ছিল না। তৎকালে কলিকাতায় কবি ও কৃষ্ণযাত্রা হইত। দাদার কবি শুনিবার অত্যন্ত শখ ছিল; কোথাও কবি হইলে তিনি শুনিতে যাইতেন। যখন দেশে যাইতেন, তখন সমবয়স্ক ভাই বন্ধু লইয়া কবিগান করিতেন।’ এখানে শম্ভুচন্দ্র কবি বলতে যে কবিগান বুঝিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।
তখন হরু ঠাকুর অন্তিম লগ্নে, ভোলা ময়রা, নীলু ঠাকুর, ভবানী বেনে, কেষ্টা মুচি, নিতাই বৈরাগী, ঠাকুরদাস সিংহ, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, মহিলা কবিয়াল যজ্ঞেশ্বরী — অনেকেই খ্যাতির শীর্ষে, বাংলায় কবিগানের জোয়ার চলছে। বিদ্যাসাগর কবিয়ালদের কোনওমতেই হীন চোখে দেখতেন না। তিনি তাদের লৌকিক ভাষার প্রয়োগের ক্ষমতার তারিফ করতেন। বাংলাভাষার খোলনলচে বদলানোর সময় কবিয়ালদের মুখের ভাষা থেকেও তিনি উপাদান সংগ্রহ করতেন।
পরবর্তীকালে কবিগানের দুর্নাম হয়েছিল মূলত খেউড় অংশের জন্যে। কবিগান তথা কবির লড়াই অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিরক্তির কথা জানিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের সময়ে খেউড় অংশের অতটা বাড়বাড়ন্ত হয়নি, তাই তাঁর পক্ষে কবিগান তথা কবির লড়াইয়ের অবিমিশ্র প্রশংসা করা সম্ভব হয়েছিল। হয়তো ঈশ্বরচন্দ্র সমস্ত ধরনের ভাষাকেই নবস্রোতের বাঙলাভাষায় স্থান দিতে চেয়েছিলেন, তাই কবিয়ালদের লৌকিক হাস্যপরিহাসের ভাষা তাঁর কাছে গ্রহণীয় মনে হয়েছিল, তিনি তাদের খিস্তি-খেউড়কেও ভাষার মধ্যে স্থান দিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খেউড় অংশের জন্যে কবিগানের বিরোধিতা করেছেন, আবার কবিয়াল গুমানী দেওয়ানকে শান্তিনিকেতনে ডেকে, তাঁর কাছ থেকে কবিগানও শুনেছেন কয়েকবার। কলকাতায় কবিয়াল রমেশ শীল ও গুমানী দেওয়ানের মধ্যে কবির লড়াইয়ে রমেশ শীল একচুলের হেরফেরে জয়ী হলে, তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে। তিনি কবিগানকে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়কার পাখিদের ক্ষণস্থায়ী কলকাকলি বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, আবার একথাও বলেছেন, তিনি যদি সম্পন্ন পরিবারে না জন্মে গ্রামের কোনও কৃষকপরিবারে জন্মাতেন, তাহলে হয়ত তিনি কবিয়াল হয়ে পথে পথে ঘুরতেন।
তাঁর বিভিন্ন রচনাতেও কবিগান প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।
জাপানযাত্রী বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ডেকের উপর বিছানা করে যখন শুলুম, তখন বাতাসে এবং জলে বেশ একটা কবির লড়াই চলছে, একদিকে সোঁ সোঁ শব্দে তান লাগিয়েছে, আর একদিকে ছল্ ছল্ শব্দে জবাব দিচ্ছে, কিন্তু ঝড়ের পালা বলে মনে হল না।’
চিত্রা দেব ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ বইয়ে লিখেছেন, একসময় পাঁচালি আর কবিগানের জীর্ণ বই পড়ে মেয়েদের দিন কাটত, কোনও নতুনত্ব ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কবিগানপ্রীতি তো একদিনের নয়, ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুরের বাবা রামলোচন ঠাকুরের আমলেই পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে (সিনিয়ার ব্র্যাঞ্চ) হাফ আখড়াই, কেলোয়াতি, কীর্তন, কবিগানের চল হয়েছিল।
পাথুরিয়াঘাটা ঠাকুরবাড়ির যোগেন্দ্রমোহন ঠাকুরের অর্থসাহায্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকা চালু করেন। তিনি কবিয়ালদের ইতিহাস লিখেছিলেন এই পত্রিকাতেই।
রবীন্দ্রনাথের জিনের মধ্যেই ছিল কবিগানের বীজ। তাঁর পূর্বপুরুষ পঞ্চানন কুশারী যে জাহাজের পণ্যসরবরাহকারী বা স্টিভডোর হয়েও কবিগান গাইতেন, তা প্রমাণিত সত্য। কবিয়াল হওয়ার জন্যেই তাঁদের পদবি বদলে কুশারী থেকে ঠাকুর হয়ে যায়।
এহেন রবীন্দ্রনাথ যে কবিগান নিয়ে তাঁর মতামত দেবেনই, তাতে আশ্চর্যের কী আছে?