অনেকেই শুনে চমকে উঠবেন, লন্ডনে কার্ল মার্ক্স যখন অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন ১৮৫০-এর দশকে, তখন তাঁর কাছে দেবদূতের মত সাহায্যকারী হয়ে ওঠেন যিনি, তিনি একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তাঁর নাম ডা. জন এপস্ (Dr. John Epps)। তিনি শুধু টাকাকড়ি দিয়েই সাহায্য করেননি মার্ক্সকে, থাকার ঘরও দিয়েছিলেন। Das Capital-লেখায় মগ্ন কার্ল মার্ক্স এই সহায়তাটুকু না পেলে তাঁর কাজ হয়তো অস্ম্পূর্ণ থেকে যেত। এই হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকের ঋণ তিনি জীবনে ভুলতে পারেননি। জন এপস একজন চিকিৎসক ও ফ্রেনোলজিস্ট (করোটিবিশেষজ্ঞ) ছিলেন। সম্পন্ন ঘরের এই চিকিৎসক রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও নাম করেন। ১৮০৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম, মৃত্যু ১৮৬৯-এর ১০ ফেব্রুয়ারি।
হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা স্যামুয়েল হ্যানিমানের দ্বারা আবিষ্কৃত হয়েও লোকের কাছে তখনও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ডা. জন এপস ও অন্য কয়েকজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রোগিরা সদ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছে এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে। কার্ল মার্ক্স নিজে হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করতেন কিনা তা অবশ্য জানা যায় না। তবে ডা. জন এপসের কাছে তিনি চিকিৎসার জন্যে কোনও দরিদ্র শ্রমজীবী রোগিকে পাঠিয়ে থাকলেও থাকতে পারেন।
বিদ্যাসাগর যে হোমিওপ্যাথির ভক্ত ছিলেন ও নিজেও এই চিকিৎসা করতেন, তা সকলেই জানেন। তাঁর কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না। তবু নিজের চেষ্টায় নামীদামি হোমিওপ্যাথি বই পড়ে ও অধ্যাবসায়ের জোরে সফল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হয়ে উঠেছিলেন।
বউবাজারের মলঙ্গানিবাসী বন্ধু রাজেন্দ্রলাল দত্তকে নিয়ে তিনি কলকাতায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রসারে আসা বেরিনি সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, ওই চিকিৎসাব্যবস্থা সাচ্চা না ভুয়ো তা যাচাই করে দেখার জন্যে।
বেরিনি সাহেবের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হন তাঁরা। বিদ্যাসাগর রাজেন্দ্রলালকে বলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শিখে হোমিওপ্যাথির প্রসারের জন্যে কাজ শুরু করতে। রাজেন্দ্রলাল অচিরেই নাম করেন ও কলকাতার একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হয়ে ওঠেন।
বিদ্যাসাগর তখন হাঁপানি ও মাইগ্রেন (মাথার তীব্র যন্ত্রণাবিশেষ) রোগে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। অ্যালোপাথি চিকিৎসায় সাড়া মিলছিল না তখন। রাজেন্দ্রলাল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় বিদ্যাসাগরকে সারিয়ে তুললেন।
তারপর বিদ্যাসাগর নিজেও হোমিওপ্যাথিচর্চা শুরু করেন। নিজের মধ্যমভ্রাতা দীনবন্ধুকে বীরসিংহ গ্রামে পাঠান হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বই ও ওষুধপত্র দিয়ে। সেখানে দীনবন্ধু গরীবের জন্যে দাতব্য চিকিৎসালয় খোলেন ও চিকিৎসক হিসেবে খুব নাম করেন।
লোকনাথ মৈত্র নামে এক ব্যক্তিকে (সম্পর্কে আত্মীয়) বিদ্যাসাগর হোমিওপ্যাথি পড়তে অর্থসাহায্য করেন। তিনিও কলকাতার প্রথিতযশা এক চিকিৎসক হন। লোকনাথবাবুকে বারাণসীতে গিয়ে দাতব্যচিকিৎসালয় খুলতে অর্থসাহায্য করেন তিনি। বারাণসীর গভর্নর আয়রনসাইড সাহেব তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসা করান লোকনাথ ডাক্তারকে দিয়ে। তাঁর স্ত্রী সুস্থ হয়ে যান। তখনকার প্রখ্যাত অ্যালোপাথি চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের সঙ্গেও বিদ্যাসাগরের বন্ধুত্ব ছিল। বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রলালবাবুকে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার কার্যকারিতা বোঝান ও তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেন যে মহেন্দ্রলাল সরকার অ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেন। তিনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের চিকিৎসাও করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর বিলেত থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বই আনাতেন। অনেককেই সেসব বই দান করতেন।
নিজের কার্মাটাঁড়ের বাড়িতেও সেসব বই ও ওষুধ নিয়ে যেতেন। সাঁওতালপল্লিতে দরিদ্রনারায়ণের সেবার সময় সেসব ওষুধ কাজে লাগত। তাঁর এই বিলেতযোগই হয়ত তাঁকে স্যামুয়েল হ্যানিমানের সুযোগ্য শিষ্য ডা. জন এপস-এর খবর জানতে সাহায্য করেছিল। তাঁর বাড়িতেই যে কার্ল মার্ক্স নামে এক সমাজতাত্ত্বিক ভাড়া থাকতেন, তাও তাঁর জানা হয়ে গিয়েছিল। দাস ক্যাপিটাল বেরোবার সময় বিদ্যাসাগর কার্মাটাঁড়ে প্রবাসী জীবন যাপন করছেন। যদিও বাদুড়বাগানের বাড়িতে মাঝেমাঝে তাঁকে আসতে হত বইছাপানো ও বইবিক্রির তদারকিতে। কার্মাটাঁড়ে ১৮৭৩-৯১ পর্বে হতদরিদ্র সাঁওতালদের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন বিদ্যাসাগর। কার্ল মার্ক্সের পরোক্ষ প্রভাব থাকতেই পারে তাঁর এই কার্মাটাঁড়যজ্ঞে।