কার্ল মার্ক্সের সমাজচিন্তা আর বিদ্যাসাগরের সমাজমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোথায় যেন সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। দুই মনীষীর সামাজিক ক্রিয়াকলাপ আমাদের একটি ইংরেজি প্রবাদবাক্য মনে পড়ায়, ‘Great men think alike’।
বিদ্যাসাগর ও কার্ল মার্ক্স সমসাময়িক মনীষী। বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০-র ২৬ সেপ্টেম্বর, মৃত্যু ১৮৯১-এর ২৯ জুলাই। কার্ল মার্ক্সের জন্ম ১৮১৮-র ৫ মে, মৃত্যু ১৮৮৩-র ১৪ মার্চ।
এই দু’জন মনীষীর কাজের ক্ষেত্রে আর্তের সেবা ও সম্পদের সমবন্টন বিরাট ভূমিকা নিয়েছে। বিদ্যাসাগরের বিশাল উইলে যেমন ভৃত্যের জন্যে মাসোহারার ব্যবস্থা আছে, তেমনই নিজের স্ত্রী দীনময়ী ও ভাইদের জন্যেও ব্যবস্থা আছে। আবার অতি দূরসম্পর্কের কোনও ব্যক্তির জন্যেও তিনি উইলে বন্দোবস্ত রেখেছিলেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্গে কার্ল মার্ক্সের যোগাযোগের কোনও পাথুরে প্রমাণ পাওযা যায়নি। তবে পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আছে। তাঁদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের সেতু ছিলেন কয়েকজন। এর মধ্যে একজন ডক্টর রোয়ার।
ডক্টর রোয়ারের সম্বন্ধে বাংলা বা ইংরেজিতে বিদ্যাসাগরবিদরা কেউ এক লাইনও লিখে যাননি। একমাত্র সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর ইংরেজিতে লেখা বিদ্যাসাগর-জীবনী ‘Iswar Chandra Vidyasagar, a story of his life and work’-এ এঁর উল্লেখ করে গেছেন।
ইনি ছিলেন বিশিষ্ট জার্মান সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের সহকর্মী ছিলেন ১৮৪৬-১৮৪৯-এ। জুনিয়ার ও সিনিয়র, দুই বিভাগেই প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব ছিল বিদ্যাসাগর ও রোয়ারের। একে অপরের পরামর্শ নিতেন তাঁরা, প্রশ্নপত্র যাতে নিখুঁত হয়।
এই রোয়ার সাহেবের কাছেই জার্মানি ও জার্মান সাহিত্যের খবর পেতেন বিদ্যাসাগর। কার্ল মার্ক্স তখন জার্মানিতে কমিউনিজম নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছেন। পরে এঙ্গেলসের সাহায্যে তা পৌঁছে যাবে বিশ্বের দরবারে। কার্ল মার্ক্স ‘দাস ক্যাপিটাল’ লিখে সাড়া ফেলে দেবেন বিশ্বে। তিন খণ্ডে Das Kapital-এর প্রথম খণ্ড বেরোয় ১৮৬৭-তে। তার প্রথম বিদেশি সংস্করণ বেরোয় ১৮৭২-এ রাশিয়ান ভাষায়, ফ্রেঞ্চ এডিশনও ১৮৭২এ। ১৮৮৭-তে বেরোয় ইংরেজি সংস্করণ।অবশ্য জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে চলে আসতে হবে দুজনকেই। কার্ল মার্ক্স ইংল্যান্ডে যান ফ্রান্স ও বেলজিয়াম হয়ে ১৮৫০ নাগাদ। মনে হয় বিদ্যাসাগর ডক্টর রোয়ার-এর মাধ্যমে কাল মার্ক্সের কাজের খবর পেয়েছিলেন কিছুকিছু। নিজের জীবনেও তার ফলিত প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। মহামারীর সময় মুসলিমপল্লিতে সেবাশুশ্রুষা, বিশেষত শেষ বয়সে কার্মাটাঁড়ে তাঁর সাঁওতালদের মধ্যে সেবাকার্য, তারই ইঙ্গিত দেয়।
ড. রোয়ার (Dr. Rowar) সংস্কৃতে লেখা সাহিত্যদর্পণ নামক লব্জমূলক বইটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। ভাষাপরিচ্ছেদ নামক ন্যায়শাস্ত্রের বইটিরও ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তাই পণ্ডিত হিসেবে তিনিও উপেক্ষার পাত্র ছিলেন না। তাঁর বিষয়ে বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত ঢাউস ঢাউস বিদ্যাসাগর-সংখ্যাগুলিতে একটি অক্ষরও লেখা হয়নি।
বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাহেবদের বনিবনা যেমন হয়নি কখনও কখনও, তেমনি অনেক সাহেব তাঁকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রিন্সিপ্যাল মার্শাল সাহেবের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন সাহেবের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল।
১৮৬৬-তে মিস মেরি কার্পেন্টারকে নিয়ে তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে উত্তরপাড়ার বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে জখম হন। তখন মিস কার্পেন্টার তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করেন ও তুলে কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন অন্যান্য সাহেবদের সাহায্যে।
তিনি ১৮৬৪ সালেই জার্মান ওরিয়েন্টাল সোসাইটির সদস্য মনোনীত হন। সঙ্গে রাজেন্দ্রলাল মিত্রও ছিলেন। ১৮৬৩-র ৩১ অক্টোবর বিশিষ্ট জার্মান ওরিয়েন্টালিস্ট ও ভারতবিদ অ্যালবার্ট ওয়েবার তাঁদের দুজনের নাম মনোনয়ন করার জন্যে চিঠি লেখেন সোসাইটিকে। তাঁদের আগে অবশ্য শব্দকল্পদ্রুম-স্রষ্টা রাধাকান্ত দেব সেখানকার সদস্য হয়েছিলেন।
হেরমান ব্রোখাস ছিলেন ফ্রেডরিকস ম্যাক্সমুলারের শিক্ষক। তিনিও জার্মান ওরিয়েন্টাল সোসাইটির পত্রিকায় বিদ্যাসাগরের অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন ।
১৮৫৩ সালে এই জার্মান ওরিয়েন্টাল সোসাইটির সদস্য হয়েছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের বন্ধু ফার্দিনান্দ লাজালে। তাই সাংস্কৃতিক ও তাত্ত্বিক আদানপ্রদানের একটি সম্ভাবনা ছিলই।
১৮৮৪ সালে বিলেতের To-day মাসিকপত্রে ‘Das Kapital’-এর জার্মান সংস্করণের রিভিউ বেরোয়। বইটির সেই প্রথম রিভিউ কোনও ইংরেজি পত্রিকায় বেরোল। কলকাতার ইংরেজমহলে সেসব কাগজের ছিল বিরাট চাহিদা। ইংরেজিজানা বাঙালিদের মধ্যেও আলোড়ন তুলত সেসব কাগজ। কার্ল মার্ক্সের কাজের খবর Das Kapital মারফত না পেলেও বিলেতি কাগজের রিভিউ মারফত পাওয়ার খুবই সম্ভাবনা ছিল বিদ্যাসাগরের। তৎকালীন কলকাতার সারস্বতমহলে সান্ধ্য আলোচনার বিষয়বস্তু হত সেই লেখাগুলি। এখানে সমালোচক ফিলিপ এইচ উইকস্টিড-কৃত রিভিউ বেরিয়েছিল। বিলেতে প্রকাশিত To-day মাসিকপত্র জাহাজে করে তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী কলকাতায় যে আসতই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রলিফিক রিডার। গোগ্রাসে যে কোনও ইউরোপীয় সাহিত্য আত্মীকরণ করতে পারতেন। তাই কার্ল মার্ক্সের রচনার খবর অন্তত সংবাদপত্র মারফত তাঁর কাছে পৌঁছানোর ছিল সমূহ সম্ভাবনা। দুধের স্বাদ ঘোলে অন্তত মেটাতেন তিনি।
সম্ভবত বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি-প্রীতি তাঁকে জার্মান চিকিৎসক হ্যানিম্যানের প্রতি ও তাঁর স্বদেশী জাতভাই কার্ল মার্ক্সের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। তিনি সাঁওতাল পরগনার জামতাড়ায় কার্মাটাঁড়ে নিরন্ন দরিদ্র সাঁওতাল অধিবাসীদের মধ্যে সেবামূলক কাজ করতেন জীবনের শেষ কুড়ি বছর ধরে। যদিও একটানা এই কাজ তিনি করতেন না। মাঝে মাঝেই বইলেখা ও বিক্রির কাজে তাঁকে কলকাতার বাদুড়বাগানের বাড়িতে ফিরতে হত।
কার্মাটাঁড়ে যে দাতব্য চিকিৎসালয় তিনি গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে তিনি একটা ডায়েরি রাখতেন। রোগীর নাম, ওষুধের নাম, সব তাতে লেখা থাকত। সাধারণত ডায়েরিয়ায় তিনি আর্সেনিক ও সালফার ব্যবহার করতেন। তাঁর এই হোমিওপ্যাথি প্রীতির শুরু ১৮৫০-এ। তীব্র মাথার যন্ত্রণার (মাইগ্রেন) জন্যে তিনি বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, কিন্তু অ্যালোপাথির নামীদামি চিকিৎসকরাও তাঁর মাথার যন্ত্রণা সারাতে পারেননি।
তখন তাঁর বন্ধু ডা. রাজেন্দ্রলাল দত্তের শরণাপন্ন হন তিনি। তিনি ছিলেন নামকরা হোমিওপ্যাথ। তাঁর চিকিৎসায় বিদ্যাসাগর আরোগ্যলাভ করেন। এই রোগমুক্তির কথা তিনি তখনকার বিখ্যাত চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারকে জানান। মহেন্দ্রলাল সরকার তখন খ্যাতির শীর্ষে। কিন্তু অনেক কেসে তাঁর সাফল্য আসছে না প্রচলিত অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায়। তাই তিনি অ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিশ শুরু করলেন। তাঁর দেখাদেখি ‘প্যাথি’ পরিবর্তনের হিড়িক পড়ে গেল অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকদের মধ্যে।
বিদ্যাসাগর ছোটভাই ঈশানচন্দ্রকে নিজের গ্রাম বীরসিংহে একটি দাতব্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয়ে বসান দুঃস্থ গ্রামবাসীদের চিকিৎসার জন্যে। দীর্ঘ ৩৮ বছর সেই চিকিৎসাব্রত চালিয়েছিলেন ঈশানচন্দ্র। কার্মাটাঁড়ে পাওয়া বিদ্যাসাগরের চিকিৎসার ডায়েরি হাত ঘুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে এসেছিল। সেটি এখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত আছে।
হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা ও অন্যান্য চিকিৎসাসংক্রান্ত বই পড়ে বিদ্যাসাগর স্যামুয়েল ফ্রেডরিক হ্যানিম্যানের কম খরচের mass-medicine এর ভক্ত হয়ে পড়েন। খাঁটি হোমিওপ্যাথি ওষুধ তখন জার্মানি থেকে আসত। জার্মানি-কানেকশনটাই হয়তো বিদ্যাসাগরকে মার্ক্সের ব্যাপারে খোঁজখবর দিয়ে থাকতে পারে।
কার্লমার্ক্সের বন্ধু ছিলেন বিশিষ্ট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক জন এপস। তিনি দুঃসময়ে লন্ডনে কার্ল মার্ক্সকে থাকার ঘর দিয়েছিলেন, অর্থসাহায্যও করেছিলেন ১৮৫০-৫১য়। তাঁর লেখা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বই ‘Domestic Homeopathy’ বিলেত তো বটেই, ভারতেও চলত। বিদ্যাসাগর এই বই পড়েই বইয়ের লেখক ডা. জন এপসের কার্ল মার্ক্স-কানেকশন জানতে পারেন। তাঁর রচনার ব্যাপারে উৎসাহী হন।যদিও মার্ক্সের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের চিঠিপত্র আদানপ্রদানের কোনও খবর নেই। বিদ্যাসাগর যখন কার্মাটাঁড়ে (১৮৭৩-৯১) প্রায়ই থাকছেন, তখনই বেরোচ্ছে মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটালের ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি সংস্করণ। কোনওভাবে তাঁর কাছে বইটির খবর পৌঁছেছিল কি?
বিদ্যাসাগর যে সত্যিকারের একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তা তাঁর মৃত্যুতে ইউরোপ ও আমেরিকার কাগজগুলিতে খবর প্রকাশের মধ্যেই প্রতীয়মান হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাগজে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পরিবেশিত হয়। আমেরিকার একটি কাগজে তো তাঁকে ব্রিটিশ মনীষী গ্ল্যাডস্টোনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
সুতরাং বিদ্যাসাগরের সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকার সাংস্কৃতিক মহলের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য নাকি অস্ত যেত না। একদেশের কোনও বুদ্ধিজীবী বা তাত্ত্বিক লেখকের কাজের খবর অন্যদেশে দ্রুত পৌঁছে যেত। তা নাহলে বিদ্যাসাগরের মৃত্যুসংবাদ এত দ্রুত ইংল্যান্ড-আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিতে পারতো না।
মার্ক্সের কাজের খবর বিদ্যাসাগরের কাছে হয়তো পৌঁছেছিল ‘To-day’-র মতো বিলেতি মাসিকপত্র মারফত।