| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিবেকানন্দের আলোকে নিবেদিতা : ড. শিবরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

Reporter
ড. শিবরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় / ২১৬৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১

স্বামী বিবেকানন্দের অনবদ্য সৃষ্টি মার্গারেট এলিজাবেথ। যিনি পরবর্তীকালে ভগিনী নিবেদিতা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যাঁকে বলেছেন ‘লোকমাতা’। মার্গারেট এলিজাবেথের সঙ্গে স্বামীজির প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে। লেডি মার্গাসনের আবেদনে বিবেকানন্দ ওয়েস্ট এন্ড-এর এক বৈঠকখানায় উপস্থিত হয়েছিলেন। লেডি মার্গাসন মার্গারেট-সহ বেশ কয়েক জন বন্ধুকে আমন্ত্রণ করেছিলেন, ওই সভায় স্বামীজির কথা শোনার জন্য। সেইদিন লন্ডনে প্রচণ্ড শীত পড়েছে। গোটা শহর ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। মার্গারেট ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন। বাইরে বিষন্ন ও বিবর্ণ প্রকৃতি। অপর দিকে ঘরের মধ্যে গেরুয়া বেশে উপবিষ্ট এক অপরূপ সন্ন্যাসী। সৌম্যকান্তি। মুখমন্ডলে অনাবিল প্রশান্তি এবং ঊজ্বলতায় ভরপুর। মার্গারেট বাক্যহারা। ঘরে ও বাইরে একী অসীম বৈপরীত্য। লেডি মার্গাসন মার্গারেটকে স্বামীজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। দুজনেই একে অপরকে নমস্কার-প্রতি নমস্কার করলেন। তার কিছু দিন পরে স্বামীজির সঙ্গে আবার দেখা হলো ও কথাবার্তা হলো। তবে তার আগে মার্গারেট এলিজাবেথের পারিবারিক পটভূমি সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে। উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের সুপরিচিত নোবল পরিবারে মার্গারেটের জন্ম। পিতামহ রেভারেন্ড জন নোবল স্থানীয় প্রোটেস্টান্ট চার্চের ধর্মযাজক ছিলেন এবং আয়ার্ল্যান্ডের মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ১৮৬৭-এর ২৮ অক্টোবর এই মহীয়সীর জন্ম। পিতা স্যামুয়েল এবং মাতা মেরি। পিতাও ধর্মযাজক ছিলেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে স্যামুয়েল তাঁর স্ত্রীকে মার্গারেটের নাম করে বলেছিলেন, “শ্রীভগবান যেদিন উহাকে আহ্বান করিবেন সেদিন বাধা দিও না। ও আসিয়াছে একটা বড়ো কিছু করিবার জন্য।” ছোটোবেলা থেকেই মার্গারেটের শিক্ষকতা করার ইচ্ছা ছিল। ১৮ বছর বয়সে কেস্উইকের বোর্ডিং স্কুলে ১৪ থেকে ১৬ বছরের মেয়েদের সাহিত্য ও ইতিহাস পড়ানোর দায়িত্ব পেলেন। ১৮৮৭ সালে এই বোর্ডিং স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে রাগবির অনাথাশ্রমে চাকরি নিলেন। উদ্দেশ্য, মেয়েদের অন্তরে আত্মত্যাগ ও সেবার ভাব জাগ্রত করা। কিছুদিন পর উইম্বলডনে ‘রাস্কিন স্কুল’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে নিজে অধ্যক্ষা হলেন। তদানীন্তন প্রসিদ্ধ চিত্রশিল্পী এবেনজার কুক এই বিদ্যালয়ের অন্যতম শিক্ষক ছিলেন। মার্গারেট তাঁর নিকট থেকে চিত্রশিল্পবিদ্যা সর্বপ্রথম শিক্ষা লাভ করেন। শীঘ্রই শিক্ষিত ও বিদগ্ধ সমাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেলো। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিবেকানন্দের সঙ্গে মার্গারেটের আলাপ হয়। ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসের ১৬ এবং ২৩ তারিখে লন্ডনে স্বামীজি আরও দুটি বক্তৃতা দেন। দুটি বক্তৃতাতেই মার্গারেট উপস্থিত ছিলেন। স্বামীজির বক্তৃতার উল্লেখযোগ্য অংশগুলি নোট করলেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে চলল যুক্তি ও পাল্টা যুক্তি। অনেকে বিরক্ত হতেন। কিন্তু স্বামীজি বললেন, ইনি সত্যের খোঁজ করছেন। আরও প্রশ্ন করবার জন্য স্বামীজি মার্গারেটকে ক্রমাগত উৎসাহিত করতেন। মার্গারেটের আবাল্য লালিত সংস্কার ভেঙে গেল। ভেঙে গেল প্রচলিত ধর্মভাবনা। স্বামীজির উদার ধর্মমত, ধারালো যুক্তি, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং নির্মল চরিত্রের কাছে মার্গারেট আত্মসমর্পণ করলেন। তবুও কি সংশয়ের অবসান হয় ? ১৮৯৫-এর ২৭ নভেম্বর স্বামীজি লন্ডন থেকে আমেরিকা যাত্রা করলেন। ১৮৯৬-এর এপ্রিলে তিনি লন্ডনে ফিরে এলেন। এই নভেম্বর থেকে এপ্রিল চার মাসের বেশি সময় ধরে মার্গারেট বার বার ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করলেন, তিনি কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না তো ? যুক্তির থেকে আবেগ কি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে ? স্বামীজিকে তিনি ঠিক ঠিক চিনতে পেরেছেন কিনা? দীর্ঘ আত্মসংগ্রামের পর তাঁর সংকল্পের দৃঢ়তা আরও বেড়ে গেল। তিনি ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। এই প্রসঙ্গে মার্গারেটকে ১৮৯৬ সালের ৭ জানুয়াই তারিখে স্বামীজির একটি চিঠি উল্লেখযোগ্য। চিঠির মূল তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, (১) মানুষের কাছে তাঁর অন্তর্নিহিত দেবত্বের বাণী প্রচার করতে হবে (২) সমস্ত দুঃখের মূলে আছে অজ্ঞতা (৩) যাঁরা জগতে সর্বাধিক সাহসী ও বরেণ্য, তাঁদের চিরদিন “বহুজনহিতায়” ও “বহুজনসুখায়” আত্মবিসর্জন করতে হবে। স্বামীজি মার্গারেটকে বললেন, “ভারতবর্ষে হাজার হাজার নারী প্রতীক্ষা করে আছে। পশ্চিমের একটি নারী যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তাদের জন্য লড়াই করে, তাদের পথ দেখিয়ে দেয়, তারা মাথা তুলে সাড়া দেবে।” স্বামীজিও চিন্তিত ছিলেন। ভারতের গরম জলবায়ু, মার্গারেটের পাশ্চাত্য জীবনধারা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মধ্যে এসে তিনি মানিয়ে নিতে পারবেন কিনা। কিন্তু মার্গারেট অকুতোভয়। ১৮৯৭-এর ১৫ জানুয়ারি স্বামীজি ভারতে এসে পৌঁছোলেন। মিস মুলারের মাধ্যমে মার্গারেট জানিয়ে দিলেন, বাধা যতই আসুক, তিনি ভারতবর্ষে যাবেনই। মিস মুলার ইতিমধ্যে  স্বামীজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভারতে এসে কাজ আরম্ভ করেছেন।

মার্গারেট তাঁর আচার্যদেবের আহ্বানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু ডাক আসে কোথায়? ইতিমধ্যে স্বামীজির নির্দেশে স্বামী অভেদানন্দ লন্ডনে বেদান্ত প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। স্বামীজি মার্গারেটকে এই কাজে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে বললেন। কিছু দিনের মধ্যে মার্গারেট উইম্বলডনে বেদান্ত সমিতি স্থাপন করলেন। অবশেষে ডাক এল। ১৮৯৮ এর ২৮ জানুয়ারি মার্গারেট কলকাতায় পৌঁছলেন। স্বামীজি তাঁকে মন্ত্রদীক্ষা দিলেন এবং নতুন নামধারণ হল ‘নিবেদিতা’।

নিবেদিতার সেবাকার্যের প্রথম সুযোগ এল ১৮৯৮ এর এপ্রিল মাসে। তখন কলকাতায় ভীষণ প্লেগ রোগ দেখা দিল। গুরুভ্রাতা এবং নিবেদিতাকে সঙ্গে নিয়ে  স্বামীজি প্লেগ নিবারণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। এখানে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যর যদুনাথ সরকারের বক্তব্য উল্লেখযোগ্য : “প্লেগের সময় কলিকাতায় কি আতঙ্ক। কলিকাতার রাস্তাঘাটের আবর্জনা সাফ করিবার জন্য ঝাড়ুদার পাওয়া কঠিন হইয়া উঠিল। একদিন বাগবাজারের রাস্তায় দেখিলাম ঝাড়ু ও কোদালি হাতে এক শ্বেতাঙ্গিনী মহিলা স্বয়ং রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করিতে নামিয়াছেন। তাঁহার এই দৃষ্টান্তে লজ্জাবোধ করিয়া বাগবাজার পল্লীর যুবকেরাও অবশেষে ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নামিল। পরে শুনিলাম, এই বিদেশিনীই ভগিনী নিবেদিতা। স্বামী বিবেকানন্দ ইঁহাকে লন্ডন হইতে আনিয়াছেন। নাগরিক জীবনে স্বাবলম্বন শিক্ষার প্রথম পাঠ আমরা ভগিনী নিবেদিতার নিকট হইতেই পাইয়াছিলাম। এই প্লেগ উপলক্ষ করিয়াই তাঁহার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।” পরের বছর দ্বিতীয়বার কলকাতায় আবার প্লেগ হল। নিবেদিতা আগের মতো বাগবাজার অঞ্চলকে তাঁর সেবাকেন্দ্র করলেন।

বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন স্বামীজির অনেক দিনের পরিকল্পনা ছিল। নিবেদিতার মাধ্যমে সেই কাজ আরম্ভ হল। ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনে বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা হল। প্রতিষ্ঠা দিবসে শ্রী শ্রী মা সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ এবং তাঁর গুরুভ্রাতারা উপস্থিত ছিলেন। স্বামীজি বললেন, সেই শিক্ষাকেই আমি আদর্শ শিক্ষা মনে করি যে শিক্ষায় মানুষের মনের শক্তি বাড়ে, তার চরিত্র গঠন হয়, বুদ্ধির বিকাশ হয় এবং তাকে স্বাবলম্বী করে তোলে।

শ্রী শ্রী মা সারদা আশীর্বাদ করলেন। মায়ের আশীর্বাদে উল্লসিতা হয়ে নিবেদিতা লিখেছেন : “আগামীকালের শিক্ষিত নারীসমাজের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত শ্রী শ্রী মায়ের এই অমোঘ আশীর্বাণী হইতে অধিক মঙ্গলসূচক আর কি হইতে পারে ?” প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, স্বামীজি উদ্বিগ্ন ছিলেন, সারদাদেবী নিবেদিতাকে কি ভাবে গ্রহণ করবেন—কেউ কারুর ভাষা বোঝেন না, জীবনধারা ও সংস্কার আলাদা। মা নিবেদিতাকে অত্যন্ত সহজভাবে গ্রহণ করলেন, আদর করে ‘খুকি’ বলে ডাকলেন এবং বললেন, আমার নরেন বিদেশ থেকে শ্বেত জবা এনেছে মায়ের জন্য। সেই দিন এক নিঃশব্দ সামাজিক বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। নাম দিয়েছিলেন “শ্রী রামকৃষ্ণ বালিকা বিদ্যালয়”। স্থানিয় অধিবাসীরা বলতেন “নিবেদিতা স্কুল”। সামান্য কয়েকজন ছাত্রী নিয়ে বিদ্যালয়টি আরম্ভ হল। মূল দুটি সমস্যা দাঁড়াল—অর্থ সমস্যা এবং কলকাতার গোঁড়া হিন্দু সমাজের অসহযোগিতা। বিবেকানন্দের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে নিবেদিতাকে প্রচন্ড লড়াই করতে হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিবেকানন্দের পরামর্শে নিবেদিতা বলরাম বসুর বাড়ীতে একটা সভা ডেকেছিলেন। বিষয় ছিল, মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে নিবেদিতার নব প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে মেয়েদের পাঠানো হয়। শ্রী রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের অনুরাগী এবং কিছু পরিচিত মানুষকে ডাকা হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা বলরাম বসু শ্রী রামকৃষ্ণের অন্যতম প্রিয় গৃহশিষ্য ছিলেন। বলরামবাবুর বাড়িতেই রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। শ্রী শ্রী মা সারদা দেবীর চরণধূলিতে এই বাড়ী ধন্য হয়েছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ একাধিকবার এই বাড়িতে এসেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর সন্ন্যাসী গুরুভায়েরা মাঝে মাঝেই এই বাড়ীতে থাকতেন। পরবর্তীকালে এই বাড়িটি রামকৃষ্ণ মিশনকে দান করা হয় এবং বর্তমানে এটি ‘বলরাম মন্দির’ নামে রামকৃষ্ণ মঠের অন্যতম শাখাকেন্দ্র। যাই হোক, স্বামীজি আগেই নিবেদিতাকে বলেছিলেন, তিনি এই সভাতে থাকতে পারবেন না। নিবেদিতা বক্তব্য রাখবেন। নিবেদিতা তাঁর বক্তব্যে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝিয়ে বললেন। এর মধ্যে সবার অলক্ষ্যে চুপি চুপি বিবেকানন্দ এলেন এবং সকলের পিছনে এককোণে বসে রইলেন। বক্তব্য শেষ করে নিবেদিতা উপস্থিত ভদ্রমন্ডলীর কাছে জানতে চাইলেন, তাঁরা বাড়ীর মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাবেন কিনা। সবাই চুপ। পিছনের দিকে স্বামীজির জনৈক বাল্য বন্ধু বসেছিলেন। হঠাৎ তাঁর পিঠে এক কিল ও ধমক—এই শালা, উঠে দাঁড়া, বল তুই তোর মেয়েকে স্কুলে পাঠাবি। পিছনে ফিরে বন্ধুটি দেখলেন, স্বয়ং তাঁর বিদ্যালয়ের সহপাঠী বিবেকানন্দ। শেষ পর্যন্ত বন্ধুটিকে প্রতিশ্রুতি দিতে হল, তাঁর মেয়েকে নিবেদিতার বিদ্যালয়ে পাঠাবেন। তারপর আরো কয়েকজন একই প্রতিশ্রুতি দিলেন।

স্বামীজি তাঁর প্রিয় গৃহশিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীকে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন : “এই দেখ না এখনও মেয়ে বার-তের বৎসর পেরুতে না পেরুতে লোকভয়ে—সমাজ-ভয়ে বে (বিয়ে) দিয়ে ফেলে….বাল্যবিবাহে মেয়েরা অকালে সন্তান প্রসব করে অধিকাংশ মৃত্যুমুখে পতিত হয়; তাদের সন্তান-সন্ততিগণও ক্ষীণজীবী হয়ে দেশে ভিখারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে…তোদের যে ঘরে ঘরে এত বিধবা তার কারণ হচ্ছে—এই বাল্য-বিবাহ। বাল্য-বিবাহ কমে গেলে বিধবার সংখ্যাও কমে যাবে।” স্বামীজি আরও বলেছেন “আমাদের কাজ হচ্ছে স্ত্রী-পুরুষ—সমাজের সকলকে শিক্ষা দেওয়া সেই শিক্ষার ফলে তারা নিজেরাই কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ সব বুঝতে পারবে এবং নিজেরা মন্দটা করা ছেড়ে দেবে। তখন আর জোর করে সমাজের কোন বিষয় ভাঙ্গতে গড়তে হবে না।” (স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, নবম খন্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ২৩ তম পুণর্মুদ্রণ, ২০১২, পৃষ্ঠা ১৮-১৯)।

স্ত্রী শিক্ষা সম্পর্কে নিবেদিতার আদর্শ বিবেকানন্দের আদর্শের অনুরূপ। তিনি মনে প্রাণে অনুভব করেছিলেন যে, একটা জাতিকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ের সমবেত শিক্ষা ও শক্তির সাহায্যেই সেটা সম্ভব হবে। শ্রী শ্রী মা সারদাদেবীর চরিত্রের মধ্যে নিবেদিতা প্রাচীন ও নবীন ভারতের একটি সমন্বিত আদর্শ দেখতে পেয়েছিলেন (স্বামী তেজসানন্দ, ভগিনী নিবেদিতা, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬৪, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬)।

সব শেষে বলা যেতে পারে, পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতায় গঠিত জীবন নিয়ে কেমন করে ভারতীয় সংস্কৃতির ছাঁচে নিবেদিতা নিজেকে নতুন করে তৈরী করেছিলেন এবং ভারতের নারীদের শিক্ষার জন্য কি ভাবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, ভারতের ইতিহাসে সে কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

লেখক : প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলনা আজাদ কলেজ, কলকাতা

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev