বিবেকানন্দ জন্মেছিলেন উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে। সিমলা তৎকালীন কলকাতার একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল। জোব চার্নক যে শহরের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই কলকাতা ব্রিটিশ পুঁজির বনিয়াদ পুষ্ট আধুনিক নগরায়নের ফসল। বিবেকানন্দের জন্মকালে এই শহর তার শৈশবদশা কাটিয়ে প্রায় এক সম্পূর্ণ গঠন ছাঁদ অর্জন করে ফেলেছে অথচ শুনতে আশ্চর্য হলেও সত্যি সিমলা প্রথম দিকে কলকাতার সীমার মধ্যে ছিলই না। ইতিহাসটি আলোচনার অপেক্ষা রাখে।
জোব চার্নক সাহেব ১৬৯০ এর ২৪ আগষ্ট মধ্যাহ্নকালে ‘হাটখোলা’ মতান্তরে বেনিয়াটোলা সমীপবর্তী রথতলা ঘাটে পদার্পণ করেন।১ তখন থেকেই তিনি এখানে পাকাপাকি ভাবে ঘাঁটি গাড়েন। ভারতবর্ষে রবার্ট ক্লাইভ যে ইংরেজ রাজত্বের স্থায়ী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা করেন তার পূর্বসূচনা ঘটেছিল জোবচার্নকের হাতেই।
জোবচার্নকের আগে কি কলকাতা ছিল না? কবি মুকুন্দের ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ ‘কলিকাতা’ শব্দটি পাওয়া যাচ্ছে। এই অংশটি প্রক্ষিপ্ত কিনা এবিষয়ে বিতর্কের অবকাশ থকলেও ‘কলিকাতা’ স্থান নামটি এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ধনপতি সদাগরকে যে পথে বাণিজ্য যাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে একালের বেশ কিছু পরিচিত স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়-
ত্বরায় বহিছে তরি তিলেক না রয়।
চিৎপুর শালিখা সে এড়াইয়া যায়।
কলিকাতা এড়াইল বেনিয়ার বালা।
বেতড়েতে উত্তরিল অবসান বেলা।
ভাহিনে ছড়িয়া যায় হিজলীর পথ।
রাজহংস কিনিয়া লইল পারাবত।।
বালুঘাট এড়াইল বেনের নন্দন।
কালীঘাটে গিয়া ডিঙ্গা দিল দরশন।।২
দীনবন্ধু মিত্রের ‘সুরধুনী কাব্যে’ গঙ্গার যাত্রাপথের বর্ণনায় ‘কলিকাতা’ নগরীর উল্লেখ আছে। উত্তর কলকাতার অনেক স্থান এখানে জীবন্ত :
বিবরণ বলি তবে শুন ভীষ্মমাতা,
ওই ঘুষুভীর ট্যাঁক পড়ে কলিকাতা,
অপূর্ব নগরী, মরি! কে বর্ণিতে পারে,
অলকা অমরাপুরী শোভা একাধারে।
… … …
ওই গঙ্গা দেখ বাগবাজারের ঘাট,
অপূর্ব আহিরী টোলা বনিকের হাট,
ওই দেখ নিমতলা সমাধি শ্মশান
সু-উচ্চ পাতুরেঘাটা জগন্নাথ স্থান,
ঐ চাঁদ পাল ঘাট সোপান সুন্দর
দেখ দেখ নগরীর শোভা মনোহর।৩
আমরা চলে যাই আরও পিছনে। যখন কলকাতা সহ প্রায় সমগ্র দক্ষিণবঙ্গ সমুদ্রগর্ভে প্রোথিত ছিল। বর্তমান সময়ের রাজমহল – মুর্শিদাবাদ-মালদহের সীমার মধ্যে কোন এক জায়গায় সমুদ্রতীর ছিল। হিমালয় থেকে নির্গত সমস্ত নদ – নদী সেখানে এসে মিলিত হত। এই নদী সমূহের স্রোত বাহিত পলল মৃত্তিকায় গাঙ্গেয় ‘ব-দ্বীপ’ (Delta) এর উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন কালে কলকাতা ছিল সুন্দর বনের অন্তর্গ। বর্তমান কলকাতায় বিভিন্ন খনন কার্যের ফলে সুন্দরবনের চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে।৪
সুন্দরবনের মতো কলকাতাও আগে ছিল হিংস্র জন্তুদের লীলাভূমি। বহু শতাব্দী পূর্বে কিরাত, শবর, ব্যাধ প্রভৃতি জাতি এখানে জঙ্গল কাটিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। তখন থেকে এই জঙ্গলপূর্ণ স্থান ক্রমশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামে পরিণত হয়। তারপর এক অন্ত্যজ জাতি এখানে এসে বসবাস শুরু করে।
কবিরাম নামক একজন বৌদ্ধ পরিবাজক পাটলিপুত্র নগরে বসবাস করতেন। তিনি পাটলীপুত্র থেকে অনাম দেশ পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর ভ্রমণ কাহিনির ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বিবরণ তিনি ‘দিগ্বিজয় প্রকাশ’ নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন। এই গ্রন্থে কিলকিলা (কিলকিল্লা) নামে একটি বিস্তৃত ভূভাগের বিবরণ পাওয়া যায়। এই ভূভাগের মধ্যে অনেক বড় বড় নগর ও গ্রাম ছিল। এই গ্রন্থে হরিপাল সিঙ্গুর, ত্রিবেণী, মাহেশ, চাকদহ, ভুমুরদহ, শিবপুর, বালুকা (বালি), বংশবাটী (বাঁশ বেড়িয়া), শিয়ালদা প্রভৃতি স্থাননাম পাওয়া গেছে। কবিরাম সম্ভবত যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের সমসাময়িক ছিলেন।
পঞ্চদশ শতকে রচিত কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গল কাব্যে ত্রিবেণী, নারিকেলডাঙ্গা প্রভৃতি স্থানের উল্লেখ রয়েছেঃ-
প্রত্যক্ষ উজান জল নারিকেল ডাঙ্গায়।
মৃন্ময়ী বিষহরী ঠাকুরানী তায়।
কলার মান্দাসে চাপি আইল তথায়।
বেহুলা দেবীরে পূজে নারিকেল ডাঙ্গায়।।৩৫।। ৫
ত্রিবেণী তখন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল-
তিনদিকে ত্রিবেণী ত্রিধারা যথা বহে।
তথায় বেহুলা আইল ক্ষমানন্দ কহে।। ৫৬।।৬
তবে কলকাতার সর্বপ্রাচীন স্থান কালীঘাট। ‘পীঠমালা’ গ্রন্থে একান্ন পীঠের বিবরণ রয়েছে। এই গ্রন্থ থেকে জানা যায় সতীর দক্ষিণপদের অঙ্গুলি কালীঘাটে পড়েছিল। কালীঘাট পবিত্র শাক্তপীঠ। কালীঘাটের দেবতা মহাশক্তিরূপিনী কালী এবং পীঠ রক্ষক ভৈরব নকুলেশ্বর। চূড়ামণি তন্ত্রে রয়েছে-
নকুলেশ কালী-পীঠ দক্ষ পাদাঙ্গুলিষু চ।
সর্বসিদ্ধিকর দেবী কালিকা তত্র দেবতাঃ।
‘পীঠমালা’ গ্রন্থের সাক্ষ্য অনুযায়ী পুরাকালে কালীঘাট ‘কালীক্ষেত্র’ নামে পরিচিত ছিল। এই কালীক্ষেত্র ছিল বহুদূর বিস্তৃত। দক্ষিণেশ্বর থেকে বহুলা (বেহালা) পর্যন্ত দুই যোজন ব্যাপ্ত ছিল ধনুকাকার কালীক্ষেত্র। থেকে কলকাতা নামটি এসেছে।
গৌড়েশ্বর বল্লাল সেনের সময়ে ‘কালীক্ষেত্র’ স্থানটি বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিল। বল্লালের এক দান পত্র হইতে জানা যায় যে, তিনি ‘কালীক্ষেত্র’ নামক এই বিস্তৃত ভূ-ভাগটি এক ব্রাহ্মণকে দান পত্র লিখিয়া দান করিয়াছিলেন। ইহার পর হইতে ১৪৯৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই ‘কালীক্ষেত্রের’ আর কোন সন্ধানই পাওয়া যায় না।৮
বর্তমান কলকাতা জব চার্নকের সময়ে তিনটি গণ্ডগ্রাম ছিল। সুতানুটি – গোবিন্দপুর – কলিকাতা। জোব চার্নক সুতানুটিতে পদার্পন করেছিলেন। কেমন ছিল এই অঞ্চলটির অবস্থা?
সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনখানি পাশাপাশি ছিল। ইহাদের চারিদিকেই ভীষণ জঙ্গল। গ্রাম গুলিকে দুই ভাগে বিভক্ত করিয়া মধ্যে একটি খাত ছিল। কার সাধ্য – সন্ধ্যার পর এই সমস্ত গ্রামের পথে একাকী বাহির হইতে পারে। চারিদিকে নরঘাতী দস্যু-তস্কর।
সুতালুটিতে গঙ্গার উপকূলে একটি ক্ষুদ্র হাট ছিল। শেঠ ও বসুকেরা (বসাকেরা) সেই সময়ে সুতালুটির প্রধান অধিবাসী ছিলেন। সুতরাং ব্যবসায়ই তাহাদের প্রধান উপজীবিকা। সুতালুটির হাটে বৎসরের মধ্যে কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে সুতাকাপড় প্রভৃতি বিক্রয় হইত।৯
এই তিনটি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের কলকাতা। কতদূর ছিল এই তিনটি গ্রামের সীমা? বাগবাজার পুল থেকে বর্তমান মিন্ট পর্যন্ত সুতানুটি, মিন্ট থেকে বর্তমান কাস্টম হাউস পর্যন্ত কলকাতা এবং সেখান থেকে গড়ের মাঠ পর্যন্ত স্থানের নাম গোবিন্দপুর ছিল। পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন :
বাগবাজারের খাল থেকে বাগবাজারের ট্যাঁকশাল পর্যন্ত সুতানুটি। কাস্টমস হাউস পর্যন্ত কলকাতা আর কলকাতার দক্ষিণে এখনকার ভবানীপুর পর্যন্ত গোবিন্দপুর।১০
অর্থাৎ কলকাতার চতুঃসীমা তখন ছিল এই রকম- পশ্চিমে ভাগীরথী, উত্তরে সুতানুটি, পূর্বে নোনা জলা ভূমি এবং খাল। দক্ষিণে গোবিন্দপুর।
কলকাতা গড়ে উঠলে যখন ব্রিটিশ বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, বাংলার নানান প্রান্ত থেকে লোক উঠে আসতে শুরু করল কলকাতায়। মূলত সুতানুটি অঞ্চল হয়ে উঠল বাঙালিদের আবাসভূমি। ইংরেজ – পর্তুগিজ ও আর্মেনিয়ান সাহেবদের বাসভূমি হয়ে উঠল গোবিন্দপুর অঞ্চল। কলকাতার শৈশবকালে সুতানুটি – গোবিন্দপুর ও কলিকাতা এই তিনটি গ্রামের জমি, রাস্তা, বাড়িঘর প্রথম জরিপ করা হয় ১৭০৬ সালে। তারপর ১৭২৬, ১৭৪২ ও ১৭৫৬ তে আরও তিনবার জরিপ হয়েছে। রাধারমণ মিত্র ১৯০১ সালের আদমশুমারির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্সাস অফিসার এ.কে রায় এর A short History of Calcutta, 1902 থেকে কলকাতার প্রথম শৈশবের জরিপের রিপোর্ট উল্লেখ করেছেন :১১
খ্রিস্টাব্দ বড়রাস্তা (স্ট্রিট) গলি (লেন) ছোটগলি (বাইলেন)
১৭০৬ ২ ২ ০
১৭২৬ ৪ ৮ ০
১৭৪২ ১৬ ৪৬ ৭৪
১৭৫৬ ২৭ ৫২ ৭৪
যদিও ১৬৯০ এ জোব চার্নকের সময় থেকে পরবর্তী ৬০-৬১ অর্থাৎ ১৭৫১ পর্যন্ত কলকাতায় দেশি লোকেরা যে যেমন খুশি বসবাস করত। ১৭৫১ থেকে কলকাতার জনসংখ্যা অপ্রত্যাশিত ভাবে বেড়ে গেল। প্রথম যুগে বাইরে থেকে লোক এনে কলকাতায় বসবাস করানোই ছিল সাহেবদের প্রধান লক্ষ্য। লোকসংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার পর কড়াকড়ি শুরু হল। ১৭৫২ সালে অন্ধকূপের বিখ্যাত হলওয়েল (Holwel) সাহেব কলকাতার জমিদার হয়ে হুকুম জারি করেন এরপর থেকে দেশি লোকেরা যে যেখানে খুশি বাস করতে পারবে না। বিভিন্ন পেশার লোকেদের নির্দিষ্ট স্থানে একত্রে বসবাস করতে হবে। তখন ১৭৫২ সাল থেকে কলকাতার বাঙালি আধ্যুষিত অঞ্চল গুলিতে গড়ে উঠতে থাকে ‘পাড়া’র ধারনা। কলকাতায় বিভিন্ন ‘পাড়া’ ‘টোলা’ ‘টুলি’ তখন থেকে গড়ে উঠতে থাকে। সাহেবরা ১৭৪২ সালে প্রথম কলকাতার নকশা তৈরি করেন। এই নকশায় শুধু ইংরেজ-পর্তুগিজ আর আর্মানি অধ্যুষিত কলকাতাটুকুই দেখনো হয়ে ছিল। যদিও এই নকশাটি আলাদাভাবে পাওয়া যায়না। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল তারিখে আপজন (A.Upjohn) সাহেব একটি বৃহত্তর নকশার অংশরূপে এই নকশাটি প্রকাশ করেন। আপজন সাহেব প্রকাশিত প্রথম নকশাটির পুরো নাম- plan of the territory of Calcutta as marked out in the year 1742, exhibiting likewise the military operations at Calcutta when attacked and taken by Seraj ud Dowlah on the 18th of June 1756. Printed and published according to the act of parliament by A.Upjhon. 2nd April 1794.১২ অর্থাৎ এই নকশাটিতে দুটি নকশা আছে – ১৭৪২ সালের আদি কলকাতার এবং ১৭৫৫ সালের বৃহত্তর কলকাতার। এই বৃহত্তর কলকাতা তখন উত্তরে বাগবাজারের খাল থেকে দক্ষিণে Governapore (গোবিন্দপুর) পর্যন্ত মারাঠা খাতের অন্তর্বতী কলকাতা। এই ১৭৫৬ সালের নকশায় মাত্র একটি রাস্তারই নাম পাওয়া যাচ্ছে – Avenue leading to the Eastward. এই রাস্তাটি বর্তমান চিৎপুর রোড থেকে আরম্ভ হয়ে পূর্বে মারাঠা খাত পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ বর্তমান বৌবাজার স্ট্রিট।
১৭৫৩ সালে ওয়েলস নামে একজন সৈনিক কলকাতার একটি নকশা এঁকেছিলেন। সেই নকশার নাম – plan of the Fort William and part of the City of Calcutta. Surveyed by W.Wells. Lieutenant of the Artillery company in Bengal, 1753. এই নকশার নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে পুরানো ফোর্ট উইলিয়াম ও ডালহৌসি স্কোয়ার অঞ্চলটুকু মাত্র এতে দেখানো হয়েছিল।১৩
সাহেবরা বিভিন্ন সময়েই কলকাতার নকশা তৈরি করেছেন বানিজ্যিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে। সবচেয়ে গুরুতবপূর্ণ নকশাটি তৈরি করেছিলেন মার্ক উড (Lt. Col. Mark Wood)। নকশাটি তৈরি হয়েছিল ১৭৮৪-৮৫ সালে। মার্ক উড সাহেব ছিলেন সার্ভেয়ার জেনারেল অব ইন্ডিয়া।১৪ এঁর নামে পরবর্তিকালে সার্ভেয়ার জেনারেলের অফিসের সামনের রাস্তার নাম হয়েছিল উড স্ট্রীট। এই নকশাটি কলকাতার পুলিশ কমিশনারদের জন্য তৈরি করা হয়ে ছিল। এই নকশাটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ন বলছি এই কারনেই যে নকশাতে সাহেব পাড়া ও বাঙালি পাড়াই দেখানো হয়েছিল, এবং এই নকশাতেই কলকাতার সর্বপ্রথম একটি রাস্তার নাম পাওয়া গেল। সেটি বহুবাজার স্ট্রিট বা বৈঠকখানা স্ট্রিট।
আপজন সাহেব যে দ্বিতীয় নকশাটি প্রকাশ করান সেটি অষ্টাদশ শতকের কলকাতার শেষ নকশা। এটি কেবলমাত্র কলকাতার নয় মারাঠা খাতের বাইরে গঙ্গার ওপারে হাওড়ার অনেকখানি অঞ্চল এতে দেখানো হয়েছে। এই দ্বিতীয় নকশাটির নাম — Calcutta and its environs from an accurate survey taken in the year 1792 and 1793 by A Upjohn – 2nd April 1794.১৫
এই নকশাগুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে ১৬৫২ সালেই কলকাতার একটা গঠন ছাঁদ তৈরি হয়ে গেছে, এবং এই সময় থেকেই কলকাতায় ‘দেশি’ পাড়া এবং ‘সাহেব পাড়া’ আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই সময় থেকেই কলকাতার ‘দেশি’ (Native) এলাকায় তৈ হচ্ছে ‘পাড়া’, ‘টোলা,’ টুলি’।
সুতরাং কলকাতা কলকাতা হয়ে উঠতে শুরু করেছিল অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই। পূর্বোক্ত নকশা গুলিও একথাই প্রমাণ করে। মোটামুটি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকেই সাহেবদের এলাকা ও বাঙালিদের এলাকা আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। তবে কলকাতা তার শৈশবকালে দু-দুবার বিধ্বস্ত হয়েছে। একবার ১৭৩৭ এর ভয়াবহ ঝড়ে। আরেকবার ১৭৫৬-এর নবাব সিরাজের আক্রমণে। ১৭৩৭-এর ঝড় কলকাতার নকশা রীতিমত পাল্টে দিয়েছিল-
সত্যিই শহরটা বেশ খোলতাই হয়ে উঠছিল দিনকে দিন। হঠাৎ ১৭৩৭ সালের এক ভীষণ ঝড় এসে লণ্ড ভণ্ড
করে দিয়ে গেল সাজানো শহরটাকে। নদীতে ডুবলো জাহাজ-পত্তর। মাটির বাড়ি লুটলো মাটিতে, ইংরেজদের
পাকা বাড়িও কাদায় কাত। চুড়ো ভাঙল সেন্ট অ্যান গির্জার। ভাঙল গোবিন্দরামের বিখ্যাত ‘ব্যাক-প্যাগোডা’ বা নবরত্ন মন্দিরের
ন’টা মাথার দু’ চারটে।১৬
এরপর বর্গী হাঙ্গামা শুরু হলে সাহেব অধ্যুষিত কলকাতা ও বাঙ্গালি এলাকা এক আশ্চর্য নিয়মে যেন মিলে গিয়েছিল। আড় বর্গীর ভয়ে দলে দলে লোক ছুটে আসছিল কলকাতায়। ১৭৩৭ এর ঝড়ো তাণ্ডব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বর্গী হানার আশঙ্কায় কেঁপে উঠছিল কলকাতা :
তবুও সেই দুর্যোগ কাটিয়ে আবার সবাই মন দিলে গঠন-গাঠনে। একটু সুখের মুখ দেখা যেতে না যেতেই – হা রে রে রে রে, ঐ যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে। ওরা কারা? ওরা নাকি বর্গী। হুগলি দখল করেছে। এবার করবে কলকাতা! সর্বনাশ। ইংরেজরা শহরের চারপাশে বসাল চারটে কামান-ঘাঁটি। শুরু করে দিল বাগবাজার থেকে হেস্টিংস পর্যন্ত একটা খাত কাটা। … ইতিহাসে ঐ খাতের নাম মারাঠা ডিচ। অনেক পড়ে যখন ঐ খাত ভরাট করা হয় তখন আজকের আপার আর লোয়ার সারকুলার রোডের জন্ম।
বর্গী হাঙ্গামা শেষে হুগলি পর্যন্ত এসে থেমে গেল। কলকাতার দিকে আর থাবা বাড়াল না। কলকাতায় যা বাড়ল তা শুধু ভীর। বর্গীর ভয়ে দলে দলে লোক ছুটে এল দেশের নানা জায়গা থেকে।
হাটখোলা, কুমোরটুলি, জোড়াবাগান, জোড়াসাঁকোয় গড়ে উঠতে লাগল নিত্যনতুন বসত, বন কেটে খানা খন্দ বুজিয়ে। লোক বাড়ছে। বাজার হাটও বাড়ছে। উত্তরে বাগবাজার, শোভাবাজার, হাটখোলা বাজার, চারলসবাজার, শ্যামবাজার। পূর্বে ঘাসতলাবাজার, জানবাজার। দক্ষিণে বেগমবাজার। মাঝে নতুনবাজার, ধোবাবাজার, বড়বাজার, লালবাজার।১৭
১৭৫৬ এর ২০ জুন সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা আক্রমণ করেছিলেন। ইংরেজরা ফলতায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সিরাজের আক্রমণে কলকাতা বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। সিরাজ কলকাতার নাম পাল্টে নতুন নাম রাখলেন আলীনগর। তারপর ইংরেজরা আবার কলকাতা দখল করে। আবার কলকাতাকে সাজিয়ে তোলা হয়।
সিরাজের আক্রমণে শহরের অর্ধেকটা ভাঙা। শহরের অর্ধেকের ও বেশী লোক বেপাত্তা। তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বিশেষ করে ফেরাতে হবে তাঁতিদের। ইংরেজদের যে মোটা লাভ তাদের বোনা মিহি কাপড় বেচে।..
… নূতন একটা জবরদস্ত কেল্লা চাই। পাঁচ জনের মত, লালদীঘির গায়েই কেল্লাটা হোক। ক্লাইভের একার মত গোবিন্দপুরে।
তাই হল।….
নতুন কেল্লা বানানোর সময়েই শুরু হল চৌরঙ্গীর জঙ্গল কাটা। জঙ্গল কাটতে কাটতে বেরুল রাস্তা। রাস্তা বেরুতেই একটা দুটো করে বাড়ি ঘর মাথা উঁচু করে দাঁড়াল।১৮
আগেই বলেছি আপজন সাহেবের নকশায় কলকাতার প্রথম একটি রাস্তার নাম পাওয়া যায়-বৈঠকখানা স্ট্রিট বা বহুবাজার (বৌবাজার) স্ট্রিট। বর্তমানে এই রাস্তার নাম বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট। কলকাতার প্রথম শৈশবে এটি ছিল একটি সরু কাঁচা পথ। লালদীঘি থেকে শুরু হয়ে বর্তমান শিয়ালদা স্টেশন ছাড়িয়ে একেবারে ধাপার জলাময় নিম্নভূমি পর্যন্ত গিয়েছিল। এই পথে ব্যাপারীরা জিনিসপত্র মাথায় করে চলাচল করত।
এককালে এক বিরাট বটগাছ ছিল বৌবাজার স্ট্রিট এবং শিয়ালদার সংযোগ স্থলে। অর্থাৎ সুবারবন পুলিশ কোর্টের কাছে বট গাছটি দেখা যেত। কথিত আছে সেই বটগাছের ছায়ায় বসে জোব চার্নক সাহেব গড় গড়ায় তামাক খেতেন আর ব্যাপারীদের সঙ্গে কথা বলতেন। বট গাছের ছায়ায় জোব চার্নকের বৈঠকখানা বসত। সেখান থেকেই নাকি বৈঠকখানা স্ট্রিট নামটি এসেছে। তবে এটি নিছকই গল্প কথা বলেই মনে হয়। কোম্পানির আমলের প্রথম দিকে লালদীঘির আশে পাশে ইংরেজদের বাস ছিল। শহরের এই অংশকে ‘হোয়াইট টাউন’ বলা হত। দেশীয় লোকেরা শহরের উত্তরাংশে বাস করতেন। এই অংশ বিদেশীদের কাছে ‘নেটিভ টাউন’ নামে পরিচিত ছিল।
বিবেকানন্দ জন্মেছিলেন উত্তর কলকাতার শিমলে পাড়ায় গৌড়মহন মুখার্জি স্ট্রিটের দত্ত বাড়িতে। এই দত্তরা ছিলেন বর্ধমানের মানুষ। পুরনো কলকাতার গোবিন্দপুর অঞ্চলে এঁরা বসতি স্থাপন করেছিলেন।
দত্তদের আদি নিবাস বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার দত্ত-দরিয়াটনা
বা দেরটনা গ্রামে। দক্ষিণরাঢ়ী কাশ্যপগোত্রীয় রামনিধি দত্ত তাঁর
পুত্র রামজীবন এবং পৌত্র রামসুন্দরকে নিয়ে গড়-গোবিন্দপুরে
(কলকাতা) চলে আসেন। দেওয়ান রামসুন্দরের পাঁচ ছেলে, জ্যেষ্ঠ
রামমোহন। ইনিই নরেন্দ্রনাথের প্রপিতামহ।১৯
বিবেকানন্দ যে বাড়িতে জন্মেছিলেন সেটি গৌরমহন মুখার্জি স্ট্রিটের ৩/৩ নম্বর বাড়ি। এই গোউরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের উৎপত্তি ১৮/১ নম্বর সিমলা স্ট্রিট থেকে। ২০০৪ সালে বাড়িটি রামকৃষ্ণ মিশন অধিগ্রহণ করেছে। এ সম্পর্কে কলকাতা স্ট্রিট ডাইরেক্টরী জানাচ্ছে-
বর্তমানে অধিগ্রহণ করে রামকৃষ্ণ মিশন-বিবেকানন্দ
অ্যানসেস্ট্রাল হাউস অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার এই
বাড়িটার আমূল সংস্কার করে, ২৬.৯.২০০৪ সালে
এই বাড়ির পাশে নির্মিত নবসংস্কৃতি কেন্দ্রের উদ্বোধন
করেন ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল
কালাম।২০
বিবেকানন্দ যে উঞ্চলে জন্মেছিলেন সেই অঞ্চলের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান গুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায় তৎকালীন বাংলার যাবতীয় নতুন নতুন ভাবতরঙ্গের উত্থান হয়েছিল এখান থেকেই। বর্তমান কলেজস্ট্রিট সে যুগের দুই বিপরীত ধর্মী পাতিষ্ঠান সংস্কৃত কলেজ এবং হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)। সংস্কৃত কলেজের প্রাচীন রক্ষণশীলতা – এই কলেজকে ঘিরে রাজা রাধাকান্ত দেবের মত নেতৃত্ব, আর হিন্দু কলেজকে ঘিরে ডিরোজিও পন্থী নব্য বঙ্গ গোষ্ঠীর উত্থান সমগ্র বঙ্গদেশে দ্বন্দ্বমুখর আবহাওয়া সৃষ্ঠি করেছিল। বর্তমান কলেজস্ট্রিট থেকে যদি বিবেকানন্দের জন্মস্থানের দিকে এগিয়ে যাই তাহলে যে পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে সেই রাস্তাটির নাম ‘বিধান সরণী’। এই রাস্তার বর্তমান নাম বিধান সরণি হলেও পূর্বনাম ছিল কর্ন ওয়ালিস স্ট্রিট। ‘কলিকাতা ‘ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী’ জানাচ্ছে :
লটারি কমিটির সংগৃহিত অর্থে এই রাস্তা ও কর্নওয়ালিস স্কোএর
(হেদুয়ায়) নির্মিত হয়। আরল লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৩৮-১৮০৫),
১৭৮৬ -১৭৯৩ খ্রি. ও ১৮০৫ খ্রি. ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন;
১৮০৫ খ্রি. ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (permanent settlement)
এঁর স্মরণীয় কীর্তি। ৩.৫.১৯৬৩ খ্রি. রাস্তার নাম ‘বিধান সরণি’
করা হয়।২১
এই অঞ্চলটি পরিক্রমণের পথে পর পর যে প্রতিষ্ঠানগুলি পরবে সেই প্রতিষ্ঠান গুলি সম্পর্কে একটি আলোচনা করা জরুরি। এই বিধান সরণি শুরু হচ্ছে ৭৬ কলেজস্ট্রিট থেকে। বিধান সরনি যখন ‘কর্নওয়ালিস স্ট্রিট’ নামে পরিচিত ছিল তখন ‘কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ৭ নম্বর বাড়িতে সরলা দেবী চৌধুরানীর (১৮৭২-১৯৪৫) বাসস্থান ছিল।
১৮৮৬ খ্রি. এন্ট্রান্স ও ১৮৯০ খ্রি. মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে বি.এ
পাশ করে পদ্মাবতী স্বর্নপদক পান; জাতীতাবাদী আন্দোলনের নেত্রীরূপে
বাঙালিদের মধ্যে তিনি এক অবিস্মরনীয় চরিত্র; কিছুদিন ভারতী পত্রিকার
সম্পাদনা করেন ও উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাদির রচয়িতা; এই বাড়িতে
লক্ষীভাণ্ডার ও রবীন্দ্রনাথের ভাণ্ডার পত্রিকার অফিস ছিল।২২
১০ নম্বর বাড়িটি ছিল নবগোপাল মিত্রের বাড়ি। ২০ নম্বর বাড়িটি থেকে বাংলার দুই যুগান্তকারি পত্রিকা প্রকাশিত হত :
বঙ্গদর্শন পত্রিকা ১৮৭২ খ্রি. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত।
এইখানে কান্তিক প্রেস থেকে প্রথম চৌধুরী ছদ্মনাম বীরবল (১৮৬৮-
১৯৪৬)সবুজ পত্র পত্রিকা (১৯১৪-২৭) প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন।২৩
আরেকটু এগিয়ে গেলে তৎকালীন ৬৯/১ ‘কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে কলকাতার অন্যতম শক্তিমন্দির ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি।২৪ বিধানসরনি (তৎকালীন‘কর্নওয়ালিস স্ট্রিট) থেকে বাম দিকে অর্থাৎ মন্দিরের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটি যাচ্ছে তার নেম শঙ্কর ঘোষের লেন। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির ইতিহাসটি এই :
আরপুলির ঘোষ পরিবারের দিকিনন্দনের পৌত্র রামশঙ্করের বা শঙ্কর
ঘোষের নামে রাস্তাটি নামাঙ্কিত। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি এঁরই নির্মিত
(১৮০৬); মন্দিরের ফলকে লেখা; ‘শঙ্করের হৃদয় মাঝে কালীবিরাজে’। অন্যমতে ব্রহ্মচারী উদয়নারায়ণ ঠনঠনিয়া সিদ্ধেশ্বরী কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন ও ১২১০ব. শঙ্কর ঘোষ মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।২৫
এই পথেই খানিকটা এগিয়ে গেলেই সাধারণ বাহ্মসমাজ। এই ব্রাহ্মসমাজ মন্দির স্থাপনের একটা ইতিহাস আছে। বাহ্মসমাজ মন্দির স্থাপিত হওয়ার আগে এখানে নবগোপাল মিত্র জিমন্যাস্টিকের আখড়া খুলেছিলেন। বিবাকানন্দ এখানে বার-এর খেলা শিখতেন।
এখন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দির নির্মাণের একটু ইতিহাস দেওয়া
যাক। ২৪-৩-১৮৭৮ তারিখে কেশবচন্দ্র সেনের ভারতবর্ষীয়
ব্রাহ্মমন্দির ত্যাগ করে চলে আসবার পর ‘সমদর্শী’ ও
‘সমালোচক’- এর দল (অর্থাৎ যাঁরা পরে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ
স্থাপন করেন) ঐ মন্দিরের পাশেই ব্রাহ্ম ডাক্তার উপেন্দ্রনাথ
বসুর বাড়িতে কিছুদিন উপাসনা করেন। কিছুদিন বাদে ৪৫ নম্বর
বেনেটোলা লেনের একটি ভাড়া-করা বড় ঘরে সাপ্তাহিক উপাসনা
চালাতে থাকে।
১৫-৫-১৮৭৮ তারিখে টাউন হলের এক সভায় ‘ভারতবর্ষীয়
ব্রাহ্মসমাজ’ থেকে আলাদা এক ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়, যার নাম
পরে দেওয়া হয় ‘সাধারন ব্রাহ্মসমাজ’।২৬
আগেই বলেছি কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়িটি ছিল নবগোপাল মিত্রের বাড়ি। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ স্থাপনের আগে এখানে নবগোপাল মিত্র জিমন্যাস্টিকের আখড়া খুলেছিলেন।
… কিন্তু মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে ওই জায়গায় কি ছিল?
স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, ১৮৬০-৭০
সনে ওখানে ঠনঠনের ঘোষেদের পুকুর ছিল। ঘোষদের বাড়ি
নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে অনেক বার তাঁরা এই পুকুরে মুখ
ধুয়েছেন। পুকুর ভরাট হয়ে মাঠ হয়ে ন্যাশনাল নবগোপাল মিত্র
জিমন্যাস্টিকের আখড়া খোলেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত (পড়ে স্বামী বিবাকানন্দ)
এই আখড়ায় বার-এর খেলা শিখতেন।২৭
আরেকটু এগিয়ে গেলে বেথুন কলেজ। এটি বঙ্গদেশে স্ত্রী শিক্ষার জন্য নির্মিত প্রথম কলেজ। জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন সাহেবের নামে নামাঙ্কিত।
… রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের জমিতে ৬.১১.১৮৫০ খ্রি. বেথুন
স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেথুন; তাঁর মৃত্যুর পর
প্রতিষ্ঠানটি নির্মিত হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠিত ৪.৩.১৮৭৯ খ্রি.।
৪.৩.১৯৭৯ খ্রি. মহিলাদের জন্য প্রথম কলেজ ‘বেথুন কলেজ’
স্থাপিত। তৎপূর্বে ৭.৫.১৮৪৬ খ্রি. বেথুনের উদ্যোগে দক্ষিণারঞ্জন
মুখোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর মদনমহোন তর্কালঙ্কার প্রমুখের সহায়তায়
কলিকাতা নেটিভ ফিমেল স্কুল (বর্তমান বেথুন স্কুল) প্রতিষ্ঠিত হয়।২৮
এই বেথুন কলেজের উল্টোদিকেই হেদুয়া পুষ্করিণী (বর্তমানে আজাদ হিন্দ বাগ)। এই হেদুয়া পুষ্করিণীর ধারেই ছিল রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ি । মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন তিনি রামমোহন রায়ের স্কুলে পড়তেন। স্কুলটির নাম ছি অ্যাংলো হিন্দু স্কুল, এবং এই স্কুলটি ছিল হেদুয়া পুষ্করিণীর ধারে। আরো জানিয়াছেন- “আমি প্রায় প্রতি শনিবার দুইটার সময় ছুটি হইলে রামপ্রসাদ রায়ের সহিত রামমোহন রায়ের মানিকতলা বাগানে যাইতাম।” কলকাতায় রামমোহন রায়ের মোট চারটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। দেবেন্দ্রনাথ যে স্কুলে পড়তেন সেই অ্যাংলো হিন্দু স্কুল ঠিক কোন বাড়িতে ছিল এ বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যে মানিকতলার বাগানবাড়ির কথা বলেছেন এটি রামমোহন রায়ের চতুর্থ বাড়ি।
বিভিন্ন সময়ে কলিকাতায় রামমোহনের নাকি চারিখনি বাড়ি ছিল,
যথা : সম্পত্তি বিভাগের সময় তিনি পিতার নিকট হইতে জোড়াসাঁকোয়
একখানা বাড়ি পাইয়াছিলেন; ১৮১৪ সনে রংপুর হইতে কলিকাতায়
আসিয়া রামমোহন দুইখানি বাড়ি খরিদ করেন। প্রথমটি চৌরঙ্গীতে
হাতাসুদ্ধ একটি দ্বিতল বাটী – এটি শ্রীমতী এলিজাবেথ ফেনউইক নাম্নী
এক মহিলার নিকট হইতে তিনি ২০৩১৭ টাকায় ক্রয় করেন। দ্বিতীয় বাড়িটি ক্রয় করেন সিমলায় ফ্রান্সিস মেন্ডস নামে এক সাহেবের নিকট হইতে ১৩০০০ টাকায়। চতুর্থ বাড়িটি ছিল তাঁহার বিখ্যাত মানিকতলার উদ্যানবাটী, যেটি তিনি নাকি তাঁহার জ্ঞ্যাতিভাই রামতনু রায়ের দ্বারা সাহেবি ধরনে তৈয়ারি ও সজ্জিত করাইয়া ছিলেন।২৯
তবে এংলো হিন্দু স্কুল কোন বাড়িতে বসত? রামমোহনের চারটি বাড়ির বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে হেদুয়া পুষ্করিণীর দক্ষিণে কোন বাড়িতে স্কুল বসত সেটি এখন রীতিমত গবেষণার বিষয়। বিবেকানন্দের জন্মস্থান সিমলায় রামমহোন রায়ের আদৌ কোন বাসস্থান ছিল কি? অথবা চারটি বাড়ির মধ্যে কোন বাড়িটিকে সিমালার বাড়ি বলে গণ্য করা যেতে পারে? একথা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জবানিতেই স্পষ্ট যে স্কুলটি সিমলার বাড়িতেই বসত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ হেদুয়া পুষ্করিণীর কথা লিখেছেন। কিন্তু এই অঞ্চলে ৮৫ নম্বর আমহার্স্টস্ট্রিটের একটি বাড়ির মর্মর ফলকে ইংরেজিতে রামমোহন রায়ের নামোল্লেখ থাকলেও এটিকে কখনোই রামমোহন রায়ের বাসগৃহ বলা চলে না। রাধারমণ মিত্র জানাচ্ছেন-
এই বাটির গাত্রে একটি মর্মর ফলকে ইংরেজিতে লিখিত
আছে ‘এই বাড়িতে রাজা রামমোহন রায়, ১৮১৪ হইতে ১৮৩০
খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাস করিয়াছিলেন’। পাথরের উপর লিখিত
হলেও এই লেখাটি এই ব্যাপারে ‘পাথুরেপ্রমাণ’ নয় যে
রামমোহন এই বাড়িতে বাস করিতেন অথবা এই বাড়ি খরিদ
করিয়াছিলেন। প্রথমত, রামমোহন এই বাড়িতে একদিনও যে
বাস করিয়াছিলেন তাহার আদৌ কোনো প্রমাণ নাই। তাঁহার
জীবনের কোনো ঘটনাই এই বাড়িতে ঘটে নাই।৩০
সম্ভবত মানিকতলার বাড়িটিই সিমলার বাগান বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। অথবা ৮৫ নম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িটির বিপরীত দিকে উর্থাৎ পূর্বদিকে রামমোহন একটি বাড়ি ক্রয় করেছিলেন। হয়তো এটিই ছিল সিমলার বাড়ি। অথবা সিমলায় রামমোহনের আরো একটি স্বতন্ত্র বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতেই স্কুলটি বসত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পরবর্তী বক্তব্য এ ব্যাপারে নিশ্চিত সাক্ষ্য দেয়।
প্রথমে কলিকাতাস্থ হেদুয়ার একটি বাড়িতে তত্ত্ববোধিনী
সভার যন্ত্রালয় হয়। যে হেদুয়াতে রামমোহন রায়ের স্কুলে
আমি পড়িতাম এ হেদুয়ার সেই বাড়ি।৩১
এই বিধান সরণী (তৎকালীন কর্ণ ওয়ালিস স্ট্রিট) উত্তর কলকাতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। তৎকালীন বুধমন্ডলীএবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বেশিরভাগ এখানেই বাস করতেন। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গুলিও এখানেই কেন্দ্রিভূত ছিল। এই অঞ্চলেই ছিল নটী বিনোদিনীর বাড়ি। বিনোদিনি তাঁর আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন তাঁর জন্ম ১৫৪ নম্বর কর্ণ ওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতে। তবে বিনোদিনীর বাড়ি প্রসঙ্গে ‘কলিকাতা স্ট্রিট ডাইরেক্টরি’ জানাচ্ছে এই বাড়িটি বর্তমান ৩/১ রাজাবাগান স্ট্রিট। এই রাজাবাগান স্ট্রিট আসলে ভাগ হচ্ছে ৭৮/১ কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট থেকে। ১৮৮৮-৮৯ খ্রিস্টাব্দে রাজাবাগান স্ট্রিট নির্মিত হ্য়। এখানে রাজা নবকৃষ্ণদেবের প্রকাণ্ড বাগানবাড়ি ছিল। এখান থেকে রাজাবাগান স্ট্রিট নামকরণ হয়েছে।
বিবেকানন্দের পৈতৃক বাড়ি থেকে আরও সোজা হাতিবাগানের দিকে এগিয়ে গেলে বিডন স্ট্রিটের স্টার থিয়েটার এবং হাতিবাগান স্টার থিয়েটার। বিডন স্ট্রিট স্টারে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২১ সেপ্টম্বর ‘চৈতন্য লীলার’ অভিনয় দেখতে এসেছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
বিবেকানন্দের পাড়া সিমলাতেই জন্মেছিলেন ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে’র কথাকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। পড়ে অবশ্য তাঁর পিতা স্রীমধুসূদন গুপ্ত ১২/২ গুরু প্রসাদ চৌধুরী লেনের বাড়িতে চলে আসেন। পরমহংস দেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে তিনি বিবেকানন্দের বাড়ির কাছেই ব্রাহ্মসমাজ মন্দির এবং ‘কমলকুটিরে’ যাতায়াত করতেন। তিনি কেশবচন্দ্র সেনের ভগ্নীসম্পর্কীয়া নিকুঞ্জ দেবীকে বিবাহ ও করেছিলেন। এই মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিবেকানন্দের বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। ইনি বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউটের শ্যাম পুকুর শাখার প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কথামৃতে রয়েছে।
পিপ্তৃবিয়োগের পর নরেন্দ্রের অন্নকষ্ট উপস্থিত হইলে
মাস্টারমহাশয় তাঁহাকে মাট্রোপলিটন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার
কার্য যোগার করিয়া দেন; একবার নরেন্দ্রর বাড়ির তিনমাসের
খরচ চালাইবার জন্য একশত টাকা দেন; এতদ্ব্যতীত গোপনে
নরেন্দ্র-জননীর হস্তে টাকা দিয়া বলিতেন, নরেন্দ্রকে যেন জানানো
না হয়,…৩৩
যদিও মেট্রোপলিটন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি বিবেকানন্দ বেশিদিন করতে পরেননি। কেন করতে পারেননি সে বিষয়ে নানাবিধ তর্কবিতর্ক রয়েছে। সে আলোচনা এখানে অনাবশ্যক।
পরমহংস দেবের সঙ্গে বিবেকানন্দের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল প্রতিবেশী সুরেন্দ্র বাবু (সুরেন্দ্রনাথ মিত্র) এর বাড়িতে। পরমহংস দেব অনেকবার সিমলে পাড়ায় সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে এসেছেন।
সুতরাং বিবেকানন্দ যে অঞ্চলে জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন সেই অঞ্চলটি তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাঙালির বুদ্ধি মেধা – সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গুলি এই অঞ্চলেই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। এবার দেখা যাক উত্তর কলকাতার এই সিমলা অঞ্চল সম্বন্ধে ‘কলিকাতা ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী’ কী বলছে।
সিমলা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্রাট ফারুখ শিয়ারের কাছ
থেকে যে ৩৮টি গ্রাম খাজনার ভিত্তিতে লাভ করে, সিমলা
গ্রাম তার অন্যতম। সে সময় সিমলার সিমানা ছিল
পরগনা কলকাতার উত্তরাংশ, সুতানুটির দক্ষিণ ও
দক্ষিপূর্বাংশ মির্জাপুর পর্যন্ত এবং মানিকতলা।
এলাকাটি শিমুল ও কাপাস তুলোর গাছে পরিপূর্ণ
থাকায় নাম হয় সিমুলিয়া বা সিমলা বা কাপাসডাঙ্গা।৩৪
সুতরাং এই সিমলা অঞ্চল কলকাতার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে প্রথমাবধি ছিল না। ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে জোব চার্নকের মৃত্যু ঘটে। ১৬৯৮ এর জুলাই মাসে ইংরেজরা নবাব আজিমুশ শানকে ১৬০০০ টাকা দিয়ে কলকাতা গোবিন্দপুর ও সুতানুটি এই তিনটি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব আদায় করেন। ইংরেজরা কেনবার আগে এই তিনটি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব ছিল সাবর্ণ চৌধুরীদের। কিনে নিলেও ইংরেজরা কি সত্যিই জমিদার হতে পেরেছিল?
না। আসলে তারা যা পেয়েছিল সেটা প্রজাস্বত্ব। বাদশার জমি
বিক্রি করে দেওয়ায় অধিকার ছিল না সাবর্ণ চৌধুরীদের।
তাই কলকাতার জমিদারি কিনলেও প্রজা হিসেবেই তাদের
খাজনা দিয়ে যেতে হত নিয়মিত।৩৫
ইংরেজরা সে সময় তিনটি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব কিনলেও বাদশাহের কাছ থেকে কোনো ফরমান পায়নি। ১৭১৭ সালে নবাব ফারুকশিয়ারের কাছ থেকে বহুমূল্য উপঢৌকনের বিনিময়ে ইংরেজরা জমিদারী ফরমান এবং আরও ৩৮টি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব কেনবার অধিকার আদায় করেন। তখন থেকে কলকাতা আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। ব্রিটিশ বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভাগীরথী–হুগলির দুই তীরে বিদেশী বনিকদের আনাগোনার সূত্রে ষোড়শ শতাব্দী থেকেই ক্রমিক নগরায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। কলকাতা হচ্ছে তার চরম পরিণতি। বিবেকানন্দের লেখায় এই ক্রমিক নগরায়নের বিবরণ পাওয়া যায়। এই ধারাবাহিক নগরায়ন সম্পর্কে বিবেকানন্দ ‘পরিব্রাজক’ গ্রন্থে একটি তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন।৩৬
আগেই বলেছি ১৭৫২ সালের মধ্যেই কলকাতার একটা প্রায় পূর্ণাঙ্গ গঠন ছাঁদ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিবেকানন্দের জন্মকালে তা শতবর্ষ অতিক্রম করেছে।
তৎকালীন বাঙালি মনীষা এবং বুধমণ্ডলীর সমাবেশে সিমলা অঞ্চল সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন ভাবতরঙ্গের সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চল। নরেন্দ্রনাথের ‘বিবেকানন্দ’ হয়ে ওঠার পিছনে তাই এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও সামাজিক – সাংস্কৃতিক ভূমিকাও কম নয়। আসলে এই ভৌগোলিক সংস্থান এখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে গড়ে তুলেছিল। যা বিবেকানন্দের হয়ে ওঠার ক্ষত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে।
লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক
উল্লেখপঞ্জি–
১। আজকাল যে স্থানকে লোকে ‘হাটখোলা’ বলে, সেই অঞ্চলেই জোব চার্নক কলিকাতার প্রান প্রতিষ্ঠা করেন। কেহ কেহ অনুমান করেন, বেনিইয়াটোলা ঘটের সমীপবর্তী রথতলা ঘাটেই জোব চার্নকের কলিকাতার প্রান প্রতিষ্ঠার প্রথমস্থান। কলিকাতা সেকালের ও একালের, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫, পি.এম বাকচি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯ গুলু ওস্তাগার লেন, কলকাতা-৭০০০০৬, পৃষ্ঠা -৩। (অতঃপর গ্রন্থটি ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ নামে উল্লিখিত হবে।)
২। কলিকাতা সেকালের ও একালের হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা-১৫।
৩। সুরধনীকাব্য, দীনবন্ধু মিত্র, দীনবন্ধু রচনাবলী, দ্বিতীয় প্রকাশ, আশ্বিন ১৪১১, কামিনী প্রকাশালয়,
৫ নবীনচন্দ্র পাল লেন, কলকাতা-৭০০০০৯, পৃষ্ঠা-৩৮৫।
৪। বর্তমান কালে কলিকাতার ভূতত্ত্ব সম্বন্ধে কয়েকটি পরীক্ষা হইয়া গিয়াছে। সে পরীক্ষার ফল হইতেও প্রমাণ হয়, যে বর্তমান কালের কলিকাতা ও তাহার সন্নিকটস্থ স্থানগুলি বহু শতাব্দী পূর্বে সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত ছিল। কেহ কেহ বলেন, হিমাচলের ত্রিশমাইল দক্ষিণে সমুদ্রতরঙ্গ উত্থিত হইত। …কলিকাতার গড়ের মাঠের মধ্যে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে একটি পুষ্করিণী খনন করান হয়। উক্ত বৎসরের মে মাসেই ‘কলিকাতা গেজেটে’ ইহার রিপোর্ট বাহির হইয়াছিল। উক্ত রিপোর্ট হইতে জানা যায় চৌরঙ্গীর কোণে দীঘির নিম্নে বালুকা জন্মায়, গ্রীষ্মকালে পুষ্করিণীটি শুকাইয়া যায়। সেই জন্য উহাকে একটু বেশি করিয়া খনন করান হয়। খনন কালে চারিফিট নিম্নে, সারি সারি পুরাতন বৃক্ষের মূল পাওয়া গিয়াছে। উদ্ভিদতত্তবিৎ- পণ্ডিত গন, সে মূলগুলি সুন্দ্রীবৃক্ষের বলিয়া সিদ্ধান্ত করিয়া ছিলেন। কলিকাতা সেকালের ও একালের, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা- ৭-৮
৫। মনসামঙ্গল, কেতকদাস ক্ষেমানন্দ সম্পাদনা : বিজন বিহারী ভট্টাচার্য, দশম মুদ্রণ ২০১৫, সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্রভবন, ৩৫ ফিরোজ শাহ রোড, নূতন দিল্লি ১১০০০২, পৃষ্ঠা-৭৩।
৬। তদেব, পৃষ্ঠা-৭৪।
৭। কলিকাতা সেকালের ও একালের, হরিসাধন মুখোপধ্যায়, পৃষ্ঠা-১০।
৮। তদেব, পৃষ্ঠা – ৬।
৯। তদেব, পৃষ্ঠা-২।
১০। পুরনো কলকাতার কথাচিত্র, পূর্ণেন্দু পত্রী, ষষ্ঠ সংস্করণ : ফাল্গুন ১৪২২, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০৭৩, পৃষ্ঠা-১১৪।
(অতঃপর গ্রন্থটি ‘পুরনো কলকাতার কথাচিত্র’ নামে উল্লেখিত হবে)।
১১। কলিকাতা-দর্পণ, (প্রথম পর্ব) রাধারমণ মিত্র, দ্বিতীয় সংস্করণ: এপ্রিল ১৯৮২, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৪, সুবর্ণরেখা, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা-৭০০০৯, পৃষ্ঠা-২৯। [অতঃপর গ্রন্থটি ‘কলিকাতা-দর্পণ’ (প্রথম পর্ব) নামে উল্লিখিত হবে]।
১২। তদেব, পৃষ্ঠা – ২৬।
১৩। তদেব, পৃষ্ঠা -২৬।
১৪। তদেব, পৃষ্ঠা – ২৭।
১৫। তদেব, পৃষ্ঠা – ২৮।
১৬। কী করে কলকাতা হল, পুর্ণেন্দু পত্রী, নবম সংস্করণ: জুন ২০১৭, আষাঢ় ১৪২৪, দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, পৃষ্ঠা – ৪৩। (অতঃপর গ্রন্থটি কী করে কলকাতা হল’ নমে উল্লিখিত হবে)।
১৭। তদেব, পৃষ্ঠা – ৪৩-৪৪
১৮। তদেব, পৃষ্ঠা – ৫২ – ৫৩।
১৯। অচেনা অজানা বিবেকানন্দ, শংকর, সপ্তদশ সংস্করণ মার্চ ২০০৯, সাহিত্যম, ১৮ বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৭৩, পৃষ্ঠা-১৮।
২০। কলিকাতা স্ট্রিট ডাইরেক্টরী, তথ্য সংকলন ও সংযোজন: জয়ন্ত বাকচি, নবকালের প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র ১৪২২ সন, পি এম বাকচি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ৩৮এ মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০৬, পৃষ্ঠা-১৯৭। (অতঃপর গ্রন্থটি ‘কলিকাতা ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী’ নামে উলিখিত হবে)।
২১। তদেব, পৃষ্ঠা -৯৫।
২২। তদেব, পৃষ্ঠা – ৯৫।
২৩। তদেব, পৃষ্ঠা – ৯৬।
২৪। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি – ঝমাপুকুরে বাসস্থান কালে গদাধর এই মন্দিরের মা সিদ্ধেশ্বরী কালী দর্শনে আসিতেন এবং দেবীকে গান শুনাইতেন। পরবর্তী কালেও এই মন্দিরে অনেকবার আসিয়া দেবীদর্শন ও পূজাদি দিয়াছিলেন। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত, (অখণ্ড) শ্রীম কথিত, দ্বিতীয় সংস্করন শ্রাবণ, ১৪২৩, July 2016, উদ্বোধন কার্যালয় ১ উদ্বোধন লেন, বাগবাজার, কলকাতা – ৭০০০০৩, পৃষ্ঠা -১১৯১ – ৯২। (অতঃপর গ্রন্থটি ‘ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত’ নামে উল্লেখিত হবে।)
২৫। কলিকাতা ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী, পৃষ্ঠা- ১০৫।
২৬। ক্লিকাতা-দর্পন, প্রথম পর্ব, রাধারমণ মিত্র, পৃষ্ঠা -১০৩।
২৭। তদেব, পৃষ্ঠা – ১০৪।
২৮। কলিকাতা স্ট্রিট ডাইরেক্টরী, পৃষ্ঠা -১০৩।
২৯। কলিকাতা – দর্পণ, (দ্বিতীয় পর্ব), রাধারমণ মিত্র, প্রথমপ্রকাশ: জানুয়ারি ২০০৩, পুনমুদ্রণ: জানুয়ারি ২০০৪, সুবর্ণরেখা, ৭৩ মহাত্মাগান্ধী রোড, কলিকাতা – ৭০০০০৯, পৃষ্ঠা-২৯।
৩০। তদেব, পৃষ্ঠা – ৩০।
৩১। আত্মজীবনী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম অলকানন্দা সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০২, ৩৫/৩ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৭০০০০৯, পৃষ্ঠা – ৩৫।
৩২। এই চৈতন্যলীলার অভিনয়ে – শুধু চৈতন্যলীলার অভিনয়ে নহে আমার জীবনের মধ্যে চৈতন্যলীলা অভিনয় আমার সকল অপেক্ষা শ্লাঘার বিষয় এই যে আমি পতিতপাবন ৺পরমহংসদেব রামকৃষ্ণ মহাশয়ের দয়া পাইয়াছিলাম। কেননা সেই পরম পূজনীয় দেবতা, চৈতন্যলীলা অভিনয় দর্শন করিয়া আমায় তাঁরা শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় দিয়াছিলেন। অভিনয় কার্য্য শেষ হইলে আমি শ্রীচরণ দর্শন জন্য যখন আপিস ঘরে তাঁহার চরণ সমীপে উপস্থিত হইতাম, তিনি প্রসন্ন বদনে উঠিয়া নাচিতে নাচিতে বলিতেন; “হরি গুরু গুরু হরি,” বল মা “হরি গুরু, গুরু হরি” তাহার পর উভয় হস্ত আমার মাথার উপর দিয়া আমার পাপ দেহকে পবিত্র করিয়া বলিতেন যে, “মা তোমার চৈতন্য হউক”। তাঁর সেই প্রসন্ন সুন্দর ক্ষমাময় মূর্ত্তি আমার ন্যায় অধম-জনের প্রতি কি করুণাময় দৃষ্টি। পাতকীতারণ পতীত পাবন যেন আমার সন্মুখে দাঁড়াইয়া আমার অভয় দিয়াছিলেন।
—-আমার কথা, নটী বিনোদিনী, আমার কথা ও অন্যান্য রচনা, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৩৯৪, সুবর্ণরেখা, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড কলকাতা – ৯, পৃষ্ঠা -৫০।
৩৩। শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত, অখণ্ড, শ্রীম-কথিত, পৃষ্ঠা-১১৭৮।
৩৪। কলিকাতা ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী, পৃষ্ঠা – ৬৫৮।
৩৫। পুরনো কলকাতার কথাচিত্র, পূর্ণেন্দু পত্রী, পৃষ্ঠা-১০৩।
৩৬। এতবড় পদ্মাছেড়ে গঙ্গার মহাত্মা হুগলি নামক ধারায় কেন বর্তমান, তার কারণ অনেকে বলেন যে, ভাগীরথী-মুখই গঙ্গার প্রধান এবং আদি জলধারা। পড়ে গঙ্গা পদ্মা-মুখ করে বেড়িয়ে গেছেন, ঐপ্রকার ‘টলিজ-নালা’ নামক খালও আদি গঙ্গা হয়ে গঙ্গার প্রাচীন স্রোত ছিল। কবিকঙ্কণ পোত-বনিক-নায়ককে ঐ পথেই সিংহল দ্বীপে নিয়ে গেছেন। পূর্বে ত্রিবেণী পর্যন্ত বড় বড় জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করত। সপ্তগ্রাম নামক প্রাচীন বন্দর এই ত্রিবেণী ঘটের কিঞ্চিৎ দূরেই সরস্বতীর উপর ছিল। অতিপ্রাচীন কাল হতেই এই সপ্তগ্রাম বঙ্গদেশের বহির্বাণিজ্যের প্রধান বন্দর। ক্রমে সরস্বতীর মুখ বন্ধ হতে লাগলো। ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এই মুখ এত বুজে এসেছে যে, পোর্তুগিজেরা আপনাদের জাহাজ আসবার জন্য কতকদূর নিচে গিয়ে গঙ্গার উপর স্থান নিল। উহাই পরে বিখ্যাত হুগলি-নগর। ১৬শ শতাব্দীর প্রারম্ভ হতেই স্বদেশী বিদেশী সদাগরেরা গঙ্গায় চড়া পড়বার ভয়ে ব্যাকুল;… ১৭শ শতাব্দীতে ওলন্দাজেরা হুগলির ১ মাইল নিচে চুঁচুড়ায় বাণিজ্য স্থান করলে; ফরাসীরা আরও পরে এসে তার আরও নিচে চন্দননগর স্থাপন করলে। জার্মান অস্টেন্ড কোম্পানি ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে চন্দননগরের পাঁচ মাইল নিচে অপর পারে বাঁকীপুর নামক জায়গায় আড়ত খুললেন। ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে দিনেমারেরা চন্দননগর হতে আট মাইল দূরে শ্রীরামপুরে আড়ত করলে। তারপর ইংরেজরা কলকাতা বসালেন আরও নিচে।
—পরিব্রাজক, স্বামী বিবেকানন্দ, একাদশ সংস্করণ ১৯৬৩, ৩৫ তম পুনমুদ্রণ চৈত্র ১৪২২, March 2016, উদ্বোধন কার্যালয়, ১ উদ্বোধন লেন, বাগবাজার, কলকাতা-৭০০০০৭৩, পৃষ্ঠা- ৯ -১০।
সহায়ক গ্রন্থ পঞ্জি
১। কলিকাতা সেকালের ও একালের, হরিসাধন মুখোপাধ্যায়, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫, পি এম বাকচি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯ গুলু ওস্তগার লেন, কলকাতা-৭০০০০৬।
২। দীনবন্ধু রচনাবলী, দীনবন্ধু মিত্র, দ্বিতীয় প্রকাশ আশ্বিন ১৪১১, কামিনি প্রকাশালয়, ৫ নবীন্দ্র পাল লেন, কলকাতা-৭০০০০৯।
৩। মনসামঙ্গল, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, সম্পাদনা: বিজন বিহারী ভট্টাচার্য্য দশম মুদ্রণ ২০১৫, সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্রভবন, ৩৫ ফিরোজ শাহ রোড। নতুন দিল্লি ১১০০০১।
৪। পরনো কলকাতার কথাচিত্র , পূর্ণেন্দু পত্রী, ষষ্ঠ সংস্করণ; ফাল্গুন ১৪২২, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০৩।
৫। কলিকাতা-দর্পণ (প্রথম পর্ব), রাধারমণ মিত্র, দ্বিতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ১৯৮২, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৪, সুবর্নরেখা, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড কলকাতা-৭০০০০৯।
৬। কলিকাতা-দর্পণ, (দ্বিতীয় পর্ব), রাধারমণ মিত্র, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০০৩, পুনমুদ্রনঃ জানুয়ারি ২০০৪, সুবর্ণরেখা, ৭৩ মহাত্মাগান্ধী রোড, কলকাতা – ৭০০০০৯।
৭। কী করে কলকাতা হল, পূর্ণেন্দু পত্রী, নবম সংস্করণ: জুন ২০১৭, আষাঢ় ১৪২৪, দে’জ পাবলিশিং, ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০৩।
৮। অচেনা অজানা বিবেকানন্দ, শংকর, সপ্তদশ সংস্করণ, মার্চ ২০০৯, সাহিত্যম, ১৮বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০৭৩।
৯। কলিকাতা ষ্ট্রীট ডাইরেক্টরী, তথ্যসংকলন ও সংযোজন: জয়ন্ত বাক্চি, নব কলেবরে প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র ১৪২২ সন, পি এম বাক্চি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ৩৮এ মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০৬।
১০। শ্রীশ্রী রমকৃষ্ণ কথামৃত, (অখণ্ড) শ্রীম কথিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, শ্রাবণ ১৪২৩, July 2016, উদ্বোধন কার্যালয়, ১ উদ্বোধন লেন, বাগবাজার, কলকাতা – ৭০০০০৩।
১১। আত্মজীবনী, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রথম অলকানন্দা সংস্করণ জানুয়ারি ২০০২, ৩৫/৩ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৭০০০০৯।
১২। আমার কথা ও অন্যান্য রচনা, নটী বিনোদিনী, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৩৯৪, সুবর্নরেখা, ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা – ৭০০০০৯।
১৩। পরিব্রাজক, স্বামী বিবেকানন্দ, একাদশ সংস্করণ ১৯৬৩, ৩৫ তম পুনর্মুদ্রণ চৈত্র ১৪২২, March 2016, উদ্বোধন কার্যালয়, ১ উদ্বোধন লেন কলকাতা-৭০০০০৩।
১৪। কলকাতা, অতুল সুর, সাহিত্য লোক সংস্করণ, ১৪ এপ্রিল ২০১৬, ৫৭এ কারবালা ট্যাঙ্ক লেন,
কলকাতা – ৭০০০০৬।