| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিবেকানন্দের মার্গারেট জননী নিবেদিতা : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

Reporter
জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় / ২০৫০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২২

উইম্বলডন স্টেশন থেকে বেরিয়ে নাক বরাবর খাড়াই রাস্তা ধরে উঠলেই পরবে অভিজাত এলাকা। বিশাল বাগানবাড়ি, সামনের নির্জন রাস্তায় বড় বড় গাছের নীচে শ্রান্ত পথিকদের জন্য বসার ব্যবস্থা। পাহাড়ী রাস্তার নীচে লাইমস বলে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন স্বামীজি, সঙ্গে তুরীয়ানন্দ, হরি মহারাজ। সেটা ১৮৯৯ সাল। একটু দূরেই থাকেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। আমন্ত্রণ জানিয়েছেন স্বামীজীকে তার বাড়িতে স্বামীজি যেন একটু পদধুলি দেন। শিষ্যার ডাকে গুরু সারা না দিয়ে পারেন? শরীর অসুস্থ, তবু তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছেন শিষ্যার বাড়ির দিকে। শ্রান্ত হয়ে মাঝে মাঝে বসে পড়ছেন রাস্তার ধারে। নোবেল পরিবারের বাড়ি ২১ নম্বর উইম্বলডন হাই স্ট্রিট। ১৯০১ সালের ব্রিটিশ জনগণনা অনুযায়ী এই বাড়িতে ছিলেন নিবেদিতা, ভাই রিচমন্ড মা, বোন। এই বাড়িতে পরবর্তী সময়ে যাওয়া আসা ছিল, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী জগদীশ বোস এবং তাঁর স্ত্রী অবলা বোস। ততদিনে মে (নিবেদিতার বোন) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। সেদিন পরিবারের সবাই উপস্থিত ছিলেন। নিবেদিতার সার্ধ শতবর্ষ গেছে ২৮ অক্টোবর ২০১৭। নভেম্বর ২০১৭ এই বাড়িতেই বসেছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী ‘নীল ফলক’। হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাড়িটি। 

ব্রিউ, উইম্বেলডনের ব্রেকফাস্ট কাফে এরই দোতলায় থাকতেন নিবেদিতা।

আয়ার্ল্যান্ডের নিম্নমধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা নিবেদিতা স্বপ্ন দেখতেন মেয়েদের উন্নতি।বাংলায় নিবেদিতা আজ প্রতিটি মানুযের ঘরে ঘরে। তার কর্মময় জীবন ছড়িয়ে রয়েছে সারা ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে। সেই বাংলারই আর এক নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ রাজ্যের কর্ণধার। যিনি নিবেদিতার মতো মেয়েদের উন্নতির স্বপ্ন দেখেন। তারা নিজের পায়ে দাঁড়াক। কেউ যেন তাদের অবলা না বলে। তিনি নিবেদিতার বাড়িগুলি উদ্ধার করে রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে তুলে দিয়েছেন। নিবেদিতার স্মৃতি বিজড়িত সমস্তকিছু যেন সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে যায় তার ব্যবস্থা করেছেন। নিবেদিতা যে আমাদের ঘরের মেয়ে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভূমিকা ইংলিশ হেরিটেজকে মুগ্ধ করেছে। তাঁরা জেনেছেন স্কুলের মেয়েদের শিক্ষার আলো মনের মধ্যে জ্বালাবার জন্য মমতার ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প আজ বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি পেয়েছে। অতএব নিবেদিতার বাড়িতে নীল ফলক লাগাবার জন্য এই মেয়েটিই ‘পারফেক্ট চয়েস’ তাঁদের কাছে। ব্রিটিশ সরকারি সংস্থা ‘ইংলিশ হেরিটেজ’-এর কিউরেটোরিয়াল ডিরেক্টর আনা অ্যাভিস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই আমন্ত্রণ স্বীকার করেছিলেন। উইম্বলডন লাইব্রেরিতে নভেম্বর ২০১৭ এই অনুষ্ঠান হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মহারাজ স্বামী সুহিতানন্দজি, লন্ডন বেদান্ত সেন্টারের স্বামী দয়াত্মানন্দজি, ভারতীয় দূতাবাসের অফিসিয়াল, উইম্বলডনের মেয়র, প্রবুদ্ধ ভারত পত্রিকার সম্পাদক স্বামী নরসিংহানন্দজি, নিবেদিতা এবং জোসেফিন ম্যাকলয়েডের পরিবারের সদস্যরা এবং আরও অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব। লিড স্পনসর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার রিজিওনাল হেড সঞ্জীব চাড্ডা।

১৮৯৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক পিকনিকে সিস্টার নিবেদিতা, মিসেস সেভিয়ার, সিস্টার ক্রিস্টিনা।

জিন ম্যাকগুইনেস (Jean McGuinness) একজন অধ্যাপিকা। বিষয় আইরিশ ল্যাঙ্গুয়েজ, ইতিহাস ও সাহিত্য। তিনি বেলফাস্টের (Belfast) কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে (Queen’s University) পড়ান। মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল-এর মতো জিন-এর জন্মও টাইরনের (Tyrone) ডানগাননে (Dungannon)। একদিন উইকএন্ডে বাড়ি ফেরার সময় দেখলেন রাস্তার ধারে ব্রিটিশ হেরিটেজের ঐতিহ্যবাহী ‘নীল ফলক’ (Blue Plaque) লাগান। তাতে লেখা, মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল (সিস্টার নিবেদিতা) ‘একজন শিক্ষাবিদ এবং ক্যাম্পেনার অফ ইন্ডিয়ান ফ্রিডম মুভমেন্ট’। একটু অবাক হলেন! এই নামটিতো আগে কখনো শুনি নি। বিট্রেনে বিখ্যাত মানুষেরা যে সব রাস্তায় বা বাড়িতে জন্মেছেন ‘অলস্টার হিস্ট্রি সার্কল’ (ব্রিটিশ সরকারি সংস্থা ১৮৬৬ সালে তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটেনের বিশিষ্টজনেদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান চিহ্নিত করার কাজ করে এই সংস্থা।) সেই সব রাস্তায় এবং বাড়িতে এই ঐতিহ্যবাহী ‘নীল ফলক’ লাগায়। অতি উৎসাহ বসে তিনি এলাকারই একজন সেনেটর মরিস হেইসের (Maurice Hayes) কাছে এলেন। যিনি শুধুমাত্র একজন সেনেটর নন তাঁরই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন সিনিয়ার অধ্যাপক। তাঁর কাছে তিনি নিবেদিতা সম্পর্কে কিছুটা জানলেন। তারপর ইন্টারনেটে বসে সার্চ শুরু করলেন। ইন্টারনেটে একের পর এক বিষ্ময় তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছিল। তিনি বিষ্ফারিত চোখে সব দেখে অবাক হলেন। শুরু করলেন তাঁর নতুন জীবন। ভগিনী নিবেদিতাই হবে এবার তার পড়াশুনার বিষয়। অধ্যাপনার টার্ম শেষ হবার আগেই জিন অধ্যাপক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। আইরিশ লিটেরেচার এবং নিবেদিতা নিয়ে শুরু করলেন নতুন করে পড়াশুনো। ছুটে গেলেন সিস্টার গায়েত্রীপ্রাণার কেছে। তারপর একের পর এক নিবেদিতার আবাসস্থল, তাঁর তৈরি স্কুল, বিবেকানন্দের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ যে বাড়িতে সেই বাড়ি, সব সব সব খুঁজে বার করলেন এবং প্রত্যেকটা তথ্য জমা রাখলেন মরিস হেইসের কাছে। তারপর একদিন লিখে ফেললেন নিবেদিতাকে নিয়ে একটা নাটক ‘Awakening a Nation’। মঞ্চস্থ হলো বার্মিংহামের বেখট থিয়াটারে। পরে দিওয়ালি সামিয়ান উৎসবেও এই নাটক মঞ্চস্থ হয়। এখন ডানগাননে প্রায়ই এই নটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। নিবেদিতার ভূমিকায় অভিনয় করেন জিন।

মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম, সিস্টার নিবেদিতা, মিসেস সেভিয়ার, সিস্টার ক্রিস্টিনা, মিসেস অবলা বসু।

২১ হাই স্ট্রিটের যে বাড়িটা নিয়ে ব্রিটেন তোলপার। সেই বাড়িটার একটা সুন্দর গল্প বলি। এই বাড়ির যে ঘর দুটিতে নিবেদিতা এবং তাঁর পরিবার থাকতেন। সেই ঘর দুটিতে আগস্ট ২০১৭-র আগে পর্যন্ত থাকতেন ইনেস সাও পেড্রো এবং ফিলিপ (Ines Sao Pedro and Filipe) নামে পর্তুগীজ দম্পত্তি। তাঁরা ভাড়াই থাকতেন। তাঁরা ঘুনাক্ষরেও জানতেন না এই ঘরেই সেই মহিয়সী মহিলা থাকতেন যিনি বিবেকানন্দের শিষ্যা। এমন কি এই বাড়িটি যে হেরিটেজ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে তাও তাঁরা জানতেন না। ইনেস জানায় আমার স্বামী পেড্রো একজন আইটি প্রফেসন্যাল আমি এখানে একটা চাকরী খুঁজছি। এই কথা জানার পর আমি নেটে সার্চ শুরু করি। আমি অভিভূত হয়ে যাই মহিয়সী নিবেদিতার বায়োগ্রাফি পরে। আরও দু’ঘর ভাড়াটে আছে এই বাড়িতে। একজন স্প্যানিশ দম্পত্তি আর একজন মহিলা। তাঁরাও সব শোনার পর আকাশ থেকে পড়েছেন। বর্তমানে এই সম্পত্তির মালিক প্রীতিন প্যাটেল। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, তিনি এই বাড়িটা বছর কুড়ি আগে কেনেন। তিনি এই বিষয়টা সম্বন্ধে কিছুটা জানেন। কি করে? বছর খানেক আগে এক আইরিশ ভদ্রমহিলা (জিন ম্যাকগুইনেস) আমার কাছে আসেন। পরে তাঁর পরিচয় পাই। প্রথমে আমিও তাঁর মুখ থেকে শোনার পর অবাক হয়েগেছিলাম। তাঁদের সংস্থা যে হেরিটেজ হিসাবে এই বাড়ির দুটি জানলার মাঝে হেরিটেজ ফলক লাগাবেন তাও জানান। আমি তাঁকে অনুমতি দিই। তিনি চলে যাবার পর আমি আমার আত্মীয়দের ব্যাপারটি জানাই। তাঁরা পরে আমাকে সবিস্তারে জনান। তবে কি, এই বাড়ির বাইরে অংশ ঠিক থাকলেও ভেতরের অংশ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতার ছায়া ভেতরের প্রত্যেকটি ঘরে। প্রীতিন বলেছিল আমি যখন এই বাড়ি কিনি তখন এই বাড়ির তলায় ‘জিরাফি কাফে’ (Giraffe Cafe) নামে একটা রেস্তোরাঁ ছিল এখন তার জায়গায় স্থান নিয়েছে ব্রু কাফে (Brew Cafee)।

২ জুলাই ১৯০২ বুধবার। বিবেকানন্দ বাগবাজারে নিবেদিতার কাছে খবর পাঠালেন আজ বেলুড়ে এসো। তোমার নিমন্ত্রণ। আজ আমরা সকলে একসঙ্গে দুপুরের খাওয়া খাব। স্বমীজির কথা মতো নিবেদিতা বেলুড়ে এলেন। গুরুভ্রাতারা সকলেই খুশি। একসঙ্গে খেতে বসা হলো। ‘সেদিনের মেনুছিল—কাঁঠালের বিচিসিদ্ধ‚ আলুসিদ্ধ‚ সাদা ভাত‚ ঠান্ডা দুধ’। খেতে খেতে গুরুভাইদের সঙ্গে নানা কৌতুক করলেন বিবেকানন্দ। মুখরিত হয়ে উঠলো খাওয়ার আসর। খাওয়ার শেষে বিবেকানন্দ নিবেদিতার হাত ধুইয়ে দিলেন। নিবেদিতা প্রতিবাদ করলেন, এ কি করছেন আপনি! স্বামীজি বললেন, কেন, যীশুও তাঁর শিষ্যদের পা ধুঁইয়ে দিয়েছিলেন। নিবেদিতা বললেন, সে তো তাঁর শেষ সময়ে। বিবেকানন্দ হেসে বলেছিলেন, ‘ইউ সিলি গার্ল’।

৫ জুলাই ১৯০২ শনিবার। সকাল ৯টা নাগাদ বোস পাড়া লেনে নিবেদিতার কাছে বেলুড় মঠ থেকে একটা ছোট্ট চিঠি আসে। মঠেরই একজন সন্ন্যাসী সেই চিঠি নিয়ে আসে। চিঠিটি পাঠান স্বামী সারদানন্দজি। চিঠিটির বয়ান এইরকম—‘‘মাই ডিয়ার নিবেদিতা, দ্য এন্ড হ্যাজ কাম, স্বামীজি হ্যাজ স্লেপ্ট লাস্ট নাইট অ্যাট নাইন ও’ক্লক। নেভার টু রাইজ এগেন। সারদানন্দ’’। চিঠিটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিবেদিতার সারাটা শরীর কেঁপে উঠলো। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরলো। নিবেদিতার ওই অবস্থা দেখে, নিবেদিতার সেবিকাও কেঁদে উঠলো, ‘কি হয়েছে মা তুমি কাঁদছো কেন!’ নিবেদিতা বাকরুদ্ধ। কিছুক্ষণ পর নিজের সম্বিত ফিরে পেলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠলো অমরনাথ যাত্রা। গুহা মুখ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিবেদিতাকে বলেছিলেন, আমি ইচ্ছা মৃত্যুর বর পেয়েছি। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত না হলে আমার দেহত্যাগ হবে না। আর ‘নিবেদিতাকে উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর আরাধ্য দেবতা শিবেরই চরণে’। কালবিলম্ব না করে নিবেদিতা ছুটলেন বেলুড়ের দিকে। পত্রবাহক ছুটলেন তার পিছন পিছন। বেলুড়ে পৌঁছেই তিনি সোজা চলে এলেন স্বামীজির ঘরে। স্বামীজির মাথাটি ছিল পশ্চিম দিকে পা গঙ্গার দিকে। ধীরে স্বামীজির মাথাটি তিনি তুলে নিলেন নিজের কোলে। চোখের জল কিছুতেই থামে না। ‘এখন আর তিনি কন্যা নন, তিনি মাতা! স্বামীজির তাঁর প্রতি আশীর্বচনের সার্থক রূপ একাধারে তিনি সেবিকা ও মাতা। যেন মায়ের মতোই প্রিয়বিচ্ছেদ-বেদনায় কাতর হয়ে সেই অনিন্দ্যসুন্দর শিবরূপী গুরুর সেবা করতে থাকেন ছোট একটি পাখা হাতে। এর পর সেই মহাযাত্রার পালা।’

সারা ওলে বুল

একে একে গুরুভাইরা স্বামীজির স্থবির দেহটি দোতলার ঘর থেকে নীচে নামিয়ে আনলো। আরতি ও প্রণাম শেষে আলক্তরাগে রঞ্জিত করা হলো তাঁর পদযুগল। একে একে গুরুভাইরা শ্রীপাদপদ্মের ছাপ নিলেন। নিবেদিতাও চোখের জলে গুরুর পা দুটি ধুয়ে একটি পরিষ্কার রেশমি রুমালে তাঁর গুরুর পদচিহ্ন গ্রহন করলেন। শেষকৃত্যর জায়গা বিবেকানন্দ নিজেই ঠিক করে রেখেছিলেন। তাঁর প্রিয় বেলগাছের কাছে অপেক্ষাকৃত ঢালু জায়গায়। বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায়। সেই মুহূর্তে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন জননী ভুবনেশ্বরী। চিৎকার করে কেঁদে উঠে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। হঠাৎ চলে গেল কেন ? ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয়। মঠের সন্ন্যাসীরা তাঁকে কী যেন বোঝালেন। তারপর তাঁকে তুলে দিলেন নৌকায়। ভুবনেশ্বরীর নৌকো ধীরে ধীরে গঙ্গাবক্ষে মিলিয়ে গেল। চিতায় প্রথম আগুনের স্পর্শ করলেন তাঁর মানসকন্যা নিবেদিতা পরে একে একে গুরুভাই ও অন্যান্য সন্ন্যাসী-ভাইয়েরা। চিতার আগুন প্রথমে ধিকিধিকি, পরে লেলিহান শিখা গ্রাস করল স্বামীজির দেহ। নিবেদিতা ছলছল চোখে একটু দূরে গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। ‘প্রজ্বলিত চিতাগ্নির সামনে বিবেকানন্দের প্রিয় ‘জি.সি’ অর্থাৎ নাট্যকার ও মহাকবি গিরিশচন্দ্র কান্নায় ভেঙে পড়লেন, “নরেন, তুমি তো ঠাকুরের ছেলে, ঠাকুরের কোলে গিয়ে উঠলে। আর আমি বুড়ো মানুষ, কোথায় তোমার আগে যাব, তা না হয়ে আজ আমাকে দেখতে হচ্ছে তোমার এই দৃশ্য!” কথাটা শুনেই নিবেদিতা ধীরে ধীরে উঠে এলেন চিতার সামনে। চিতার লেলিহান শিখা গঙ্গার পাগল হাওয়ায় দুলে দুলে উঠছে। নিবেদিতা সেদিকে তাকিয়ে চিতার চারপাশে ঘুরতে লাগলেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দজির চোখে প্রথম পড়ে ব্যাপারটা তিনি নিশ্চলানন্দকে নিবেদিতাকে চিতার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইশারা করেন। নিশ্চলানন্দ নিবেদিতার কাছে এসে দাঁড়ান। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে নিবেদিতা। নিবেদাতার হাত ধরে তিনি চিতার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন সেই গাছের তলায়। হঠাৎ গঙ্গার উতাল হাওয়ায় চিতার অগ্নিকুন্ড থেকে একটুকরো বসন উড়ে এসে পরল নিবেদিতার কোলে।পরম মমতায় ও যত্নে নিবেদিতা তা গুরুর আশীর্বাদ ভেবে মাথায় ঠেকান। সেই পবিত্র স্পর্শ যেন শোকস্তব্ধ  নিবেদিতার হৃদয়ে সান্ত্বনা ও শক্তি জোগাল। তবু অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠলেন “পরের জন্য নিজেকে যিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকেও কেন ছেড়ে দিতে হয় আমাদের? হে ভগবান, কেন?” বাগবাজারে ফিরে এসে ক্রিস্টিনকে নিবেদিতা লিখলেন—Tomorrow you will receive this news that will desolate your life. I can only tell Dear, that if my presence could keep you there, you were never absent from his side on Saturday … Death came to him so beautifully on Friday night! A half hour’s sleep after meditation, and he was gone!

সারা ফার্মার

১৮৯৫ সালের ১০ নভেম্বর, রবিবার অপরাহ্নে লেডি মার্গেসনের বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোটা পনেরো সম্ভ্রান্ত ও বিশিষ্ট জন। প্রধানবক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। লেডি মার্গেসনের বাড়ির এই ছোট্ট সমাবেশটিতে অন্যদের সঙ্গে উপস্থিত হয়েছিলেন উইম্বলডনের বাসিন্দা, তরুণী শিক্ষাব্রতী মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। এইরকম একটা গুরু গম্ভীর অনুষ্ঠানে মার্গারেট নোবল কেন? লেডি ইসাবেল মার্গেসনের সঙ্গে তরুণী মার্গারেটের পরিচয় সিসেঁম ক্লাবে। সিসেঁম ক্লাব সেই সময়ে সম্ভ্রান্ত এবং বিশিষ্ট ব্রিটিশ সমাজের একটি মিলন স্থল। মার্গারেটের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল অ্যাভেনজার কুক। কুক সেই সময়ে লণ্ডনের বেশ নামজাদা ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ। মার্গারেটও একটা স্কুল (রাসকিন স্কুল) চালাচ্ছেন। কুক এ-ও জানতেন মার্গারেট সেই সময়ে ব্যক্তিগত জীবনে একটি মর্মান্তিক আঘাত পেয়ে আশ্রয়স্থল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মার্গারেট তখন প্রচন্ড অস্থিরতায় ভুগছেন। গীর্জা কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার একধরনের একঘেয়েমীর সঙ্গে তাঁর যুক্তিবাদী মনের দ্বন্দ্ব তাঁকে বিচলিত করে তোলে। এসময় বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থ ‘লাইট অফ এশিয়া’ তাঁর হাতে আসে। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী হন। কিন্তু আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত মীমাংসা তাঁর কাছে অধরা থেকে যায়।  কুকের মনে হয়েছিল মার্গারেট যে আশ্রয় খুঁজে বাড়াচ্ছেন হয়তোবা এই সন্ন্যাসী সেই আশ্রয়ের সন্ধান দিতে পারবে।

মার্গারেট সেদিনের সেই সভাঘরে একটু দেরিতে এসেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর মধ্যে একটা অস্বস্তি কাজ করছিল। তবু একবারে সামনে যে খালি চেয়ারটা ছিল সেখানে বসলেন। কি আশ্চর্য বিবেকানন্দ এসে বসলেন একেবারে মার্গারেটের মুখোমুখি। বিস্ময়ে মার্গারেট সেদিন শুনেছিল বিবেকানন্দের বেদান্ত ব্যাখ্যা। ওই প্রথম সাক্ষাৎ সম্পর্কে ‘দ্য মাস্টার অ্যাজ আই সি হিম’ গ্রন্থে নিবেদিতা লিখেছেন, ‘অর্ধবৃত্তাকারে উপবিষ্ট শোতৃমণ্ডলীর দিকে মুখ করিয়া তিনি বসিয়াছিলেন।তাঁহার পশ্চাতে ছিল কক্ষের অগ্নি রাখিবার স্থানে প্রজ্বলিত অগ্নি। আর যখন তিনি প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দিতেছিলেন, এর মধ্যে মধ্যে উত্তরটি উদাহরণ দ্বারা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কোন সংস্কৃত গ্রন্থ হইতে সুর করিয়া আবৃত্তি করিতেছিলেন, তখন গোধূলি ও অন্ধকারের মিলন-সম্ভূত সেই দৃশ্যটি নিশ্চয়ই ভারতের কোন উদ্যানে, অথবা সূর্যাস্তকালের কূপের নিকটে, কিংবা গ্রামের উপকণ্ঠে বৃক্ষতলে উপবিষ্ট সাধু এবং তাহার চারিদিকে সমবেত শোতৃবৃন্দ-এইরূপ এক দৃশ্যেরই কৌতুককর রূপান্তর বলিয়া তাঁহার বোধ হইয়া থাকিবে। ইংলণ্ডে আচার্য হিসাবে স্বামীজিকে আমি আর কখনও এমন সাদাসিধাভাবে দেখি নাই।….সে অপরাহ্নের পর আজ দশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, এবং সেদিনকার কথাবার্তার একটু আধটু মাত্র এখন মনে পড়িতেছে। কিন্তু সেই বিস্ময়কর প্রাচ্য সুর সংযোগ যে সকল সংস্কৃত শ্লোক তিনি আবৃত্তি করিয়া শুনাইয়াছিলেন, তাহা কখনও ভুলিবার নহে; ঐ সুরের ঝঙ্কার আমাদের গীর্জায় প্রচলিত গ্রেগরী-প্রবর্তিত সুরের কথা এত মন করাইয়া দেয়, অথচ উহা হইতে কত ভিন্ন।’

সিস্টার নিবেদিতা

নিবেদিতার জন্ম ১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডের টাইরন প্রদেশের ছোট্ট শহর ড্যানগ্যাননে। আসল নাম মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। তাঁর ঠাকুরদাদা রেভারেন্ড জন নোবল ছিলেন এক প্রটেষ্ট্যান গীর্জার যাজক। তাঁর চতুর্থ সন্তান স্যামুয়েল রিচমন্ড হচ্ছেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল তথা ভগিনী নিবেদিতার বাবা। ভগিনী নিবেদিতার মায়ের নাম মেরী ইসাবেল হ্যামিল্টন। ঠাকুরদাদা আর বাবা উভয়ে ছিলেন যাজক। ফলে এক শুদ্ধ ধর্মীয় পারিবারিক পরিবেশে মার্গারেট বেড়ে উঠেন। মার্গারেটের বয়স যখন মাত্র দশ বছর তখন স্যামুয়েলের মৃত্যু হয়। মার্গারেট ও তার বোনকে (মে) নিয়ে মা ইসাবেল চলে আসেন বাপের বাড়িতে। ইসাবেলের বাবা হ্যামিল্টন ছিলেন আইরিশ স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। বাপ-মরা নাতনিদের কোলে পিঠে করে নিজের আদর্শে মানুষ করেছেন হ্যামিল্টন সাহেব। ছোটবেলা থেকেই মার্গারেট জেনে এসেছে—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। লন্ডনে চার্চের বোর্ডিং স্কুলে থেকে লেখাপড়া শিখেছে মার্গারেট ও তার বোন। হ্যালিফ্যাক্স কলেজ থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করেছেন আর্টস, ফিজিক্স, মিউজিক, লিটারেচার ইত্যাদি সাবজেক্ট নিয়ে। ১৭ বছর বয়স থেকে স্কুলের শিক্ষকতা ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা শুরু করেন মার্গারেট।

বুদ্ধের যেমন সুজাতা, যীশুর যেমন মেরি ম্যাগডলেন, তেমন এভাবেই ধীরে ধীরে মার্গারেট নোবল হয়ে উঠেছিলেন বিবেকানন্দের নিবেদিতা। ১৮৯৭ সালের ২৯ জুলাই, লন্ডন থেকে স্বামীজি ফিরলেন ভারতে। এসময় মার্গারেটও আসার জন্য স্বামীজির কাছে অনুমতি চান। জানান যে, প্রাণ দিয়ে ভারতবর্ষের সেবা করতে চান তিনি। প্রতি উত্তরে স্বামীজি জানালেন, ‘ঝাঁপ দেওয়ার আগে ভাল করে ভেবে দেখ। যদি কাজে নামার পর ব্যর্থ হও, বা যদি বিরক্তি আসে, তবে আমার দিক থেকে অবশ্যই জেনো আমি আমরণ তোমার পাশে থাকব। তুমি ভারতবর্ষের জন্য কাজ করো বা নাই করো।’ মনস্থির করে ফেললেন মার্গারেট, যাবেন তিনি ভারতে। প্রতীক্ষায় রইলেন, কবে ডাকেন স্বামীজি। অবশেষে এল স্বামীজির পত্র। স্বামীজি মার্গারেটকে লিখছেন, ‘তোমাকে খোলাখুলি বলছি, এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতের জন্য, বিশেষতঃ ভারতের নারী সমাজের জন্য, পুরুষদের চেয়ে নারীর-একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন। ভারতবর্ষ একনও মহিয়সী মহিলার জন্ম দান করতে পারছে না, তা অন্য জাতি থেকে তাকে ধার করতে হবে। তোমার শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালবাসা, দৃঢ়তা-সর্বপোরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেলটিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেইরূপ নারী যাকে আজ প্রয়োজন।’

আর্তের সেবায় নিবেদিতা ও গোপালের মা

জানুয়ারী ১৮৯৮। মোম্বাসা জাহাজ তখনও জেটিতে লাগেনি। মার্গারেট জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছেন তাঁর স্বপ্নের ভারতবর্ষকে। আগের বছর  জুলাই মাসে বিবেকানন্দ তাঁকে একটি অকপট চিঠি লিখেছিলেন। ভারতবর্ষে মিস নোবল-এর মতো মহিয়সীর দরকার। ‘মোম্বাসা’ জেটিতে লাগলে বিবেকানন্দের সঙ্গে আবার দেখা হবে মার্গারেটের। জাহাজ যত তীরবর্তী হচ্ছে ততই চোখে পড়ছে সবুজ গাছপালা। দেখা যাচ্ছে লোকালয়ের খড়ের চালের মাটির বাড়ি। জাহাজ জেটিতে লাগল। মার্গারেট দেখতে পেলেন বিবেকানন্দকে। গৈরিক বস্ত্র, মাথায় পাগড়ি, পায়ে  চটি। জেটি থেকে এগোতেই ঘর্মাক্ত মানুষের ভিড়, গরু আর ঘোড়ার গাড়ির হট্টগোল। খালি গায়ে কুলিরা মাথায় পিরামিডের মতো বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে এ-দিক ও-দিক ছোটাছুটি করছে। ভিড় ঠেলে খানিকটা এগিয়ে যাওয়ার পর বিবেকানন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার লন্ডনের বন্ধুরা কেমন আছেন? তোমার মা কেমন আছেন মার্গারেট? কেমন চলছে তোমার স্কুল?’ মার্গারেট মুচকি হাসলেন।

কলকাতায় আসার পর বেশ কিছুদিন মার্গারেট পার্ক স্ট্রীট অঞ্চলে ছিলেন। তারপর চলে আসেন উত্তর কলকাতায়। ১৮৯৮ সালের প্রথম কয়েকটা মাস তাঁর জীবন বড়ই আনন্দে কেটেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা বিবেকানন্দের সান্নিধ্য সবচেয়ে বেশি করে পাচ্ছেন। ১৮৯৮ সালের ৩১ জানুয়ারি এরিক হ্যামন্ডকে এক চিঠিতে লিখলেন তাঁর শোওয়ার ঘর আর বাথরুমের কথা। ক্যামেরা থাকলে নাকি ছবি তুলে পাঠাতেন। ক্যামেরা নেই তাই চিঠির সঙ্গে ছবি এঁকে পাঠিয়ে দিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে রামকৃষ্ণদেবের সাধারণ জন্মোৎসব। দক্ষিণেশ্বরে এলেন মার্গারেট। তার পর বেলুড়ে পূর্ণচন্দ্র দাঁর বাড়িতে ঠাকুরের জন্মোৎসবে যোগ দিলেন। এই সময় বেলুড়ে মঠ নির্মাণের কাজও চলছে পুরোদমে। সারা বুল আর মিস ম্যাকলাউড বিবেকানন্দের দুই আমেরিকান শিষ্যা ফেব্রুয়ারি মাসে এলেন ভারতে। তাঁরা সেখানে ছোট্ট গেস্ট হাউসে উঠলেন, মঠ নির্মাণের কাজ দেখবেন, দু-জনেই মঠের জন্য ডোনেসন নিয়ে এসেছেন। বিবেকানন্দের সঙ্গে কথায়-বার্তায় সময় কাটছে গঙ্গার শ্রোতের মতো। শিষ্যরা জানতে পারলেন আয়ার্ল্যান্ডের মার্গারেটও এসেছেন ভারতে। সমস্বরে বলে উঠলেন, ‘স্বামীজি, মার্গারেট আমাদের সঙ্গে এখানে থাকতে পারেন না !’ পরের দিন এলেন মার্গারেট। মার্চ মাসের গোড়ায় কলকাতার বিশিষ্ট জনেদের সঙ্গে মার্গারেটের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য স্টার থিয়েটারে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। মার্গারেট সাদা মানুষ, কিন্তু ভাল মানুষ। ভারতে এসেছেন ভারতবাসীকে ভালবাসবেন, সেবা করবেন বলে।

১৮৯৮ সালের ১৭ মার্চ তারিখটি মার্গারেটের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ওই দিনই তিনি প্রথম মা সারদা দেবীকে দেখেছিলেন। সেই সময় মা সারদা দেবী কলকাতায় ছিলেন না। ছিলেন জয়রামবাটিতে। ১৭ মার্চের দিন কয়েক আগে তিনি ফিরে এলেন। মা সারদা কলকাতায় আসার পর বিবেকানন্দ ঠিক করলেন মা-র কাছে তিনি তাঁর তিন বিদেশিনী শিষ্যাকে নিয়ে যাবেন। সেই মতো মায়ের অনুমতিও নেওয়া হলো। মা সম্মতি দিলেন। বাগবাজারে মায়ের বাড়ির সামনে সেদিন হৈ হৈ ব্যাপার। তিন বিদেশিনী এসেছেন জুরিগাড়ি করে। তাদের দেখার জন্য মায়ের বাড়ির গেটে পাড়ার লোকেদের ভিড়। মার্গারেট চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছেন উৎসাহ ভরে। এ কোথায় এলেন তাঁরা! মা থাকতেন দোতলায়। একে একে তাঁরা তিনজনে উঠে এলেন দোতলার ঘরে। মেঝেতে অতিথিদের বসার জন্য মাদুর পেতে দেওয়া হলো। তারপর ফল আর চা দেওয়া হলো অতিথিদের। মা-কেও দেওয়া হলো। মা একই সঙ্গে তিন বিদেশিনীর সঙ্গে ফল খেলেন। মার্গারেটের চোখে মুখে খুশির ছোঁয়া। একজন ইংরাজী জানা মেয়ের সাহায্যে মায়ের সঙ্গে আলাপ জমে উঠলো। মা প্রত্যেকের পরিবারের খোঁজ খবর নিলেন। আর্শীবাদ করলেন। তিনজনে যখন মায়ের কাছ থেকে উঠে আসছেন, মা মার্গারেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি আসায় ভারী খুশি হয়েছি মা।’

এরপর সব কিছু ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিবিসি রেডিও ৪ একটি অনুষ্ঠান করে। অনুষ্ঠানটার নামকরন ছিল ‘Sisters of Kali’। এই অনুষ্ঠানে নিবেদিতা এবং নেতাজিকে উগ্রপন্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, তখন প্রতিবাদ করেছিলেন ইটন কলেজের হিন্দুধর্মের শিক্ষক জয় লখানি। কিন্তু অনুষ্ঠানের প্রযোজক মাইক থম্পসন বারংবার সিস্টার নিবেদিতাকে ‘Irish Terrorist’ বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে তিনি কোনও দুঃখপ্রকাশ করেননি। বিবিসি-ও পরবর্তীতে কমিটি গঠন করে একটা রিপোর্ট তৈরি করে। ব্যাস ওই পর্যন্ত। তারপর গঙ্গা আর টেমস দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। এখন এখানে ব্রিটিশ হেরিটেজের ঐতিহ্যবাহী ‘নীল ফলক’ (Blue Plaque) বসতে চলেছে উইম্বলডনে নিবেদিতার বাড়িতে। ইংলিশ হেরিটেজের ওই ফলকে লেখা থাকবে নিবেদিতার পরিচয় ‘একজন শিক্ষাবিদ এবং ক্যাম্পেনার অফ ইন্ডিয়ান ফ্রিডম মুভমেন্ট’ হিসেবে।

নিবেদিতার ভাইয়ের নাতনি সেলেন্ডা মার্গট জিয়ার্ডিন

রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার ‘The Web of Indian Life’ গ্রন্থের (লংম্যান প্রকাশিত জুলাই ১৯১৮ সংস্করণ) ভূমিকা লেখেন। তিনি নিবেদিতার সঠিক মূল্যয়ণ করেছেন—‘তিনি আমাদের ন্যায় জীবন অতিবাহিত করিয়াছেন এবং আমাদের অন্যতম হইয়াই আমাদের সহিত পরিচিত হইয়াছেন। আমাদের মানুষদের সহিত তিনি এতটাই ঘনিষ্ঠ হইয়া যান যে অসতর্ক অবস্থায় আমাদের পর্যবেক্ষণ করিবার বিরল সুযোগও তাঁহার ঘটে। জাতিগতভাবে আমাদের বিশেষ কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটি রহিয়াছে, এবং তাহা উদ্ঘাটন করিতে একজন বিদেশির বিরাট কোনও অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন নাই। আমরা নিশ্চিত, এই সকল ত্রুটি নিবেদিতার নজর এড়াইয়া যায় নাই। কিন্তু তিনি অধিকাংশ ভিনদেশির ন্যায় এর থেকে কোনও সর্বজনীন ধারণা করেন নাই। তাঁহার বহুমুখী বোধসম্পন্ন মন এবং প্রীতিপূর্ণ অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি থাকায় আমাদের সামাজিক রূপের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল সৃজনশীল আদর্শটিকে তিনি দেখিতে পান, অতীতের প্রতি সতত সংযোগরক্ষাকারী ও চরিতার্থতার প্রতি অগ্রসরমান আমাদের আত্মাকে তিনি আবিষ্কার করিতে পারেন।’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev