পৃথিবীর প্রথম কমিউনিস্ট দেশ সোবিয়েত রাশিয়া। সে দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিনবাবু। প্রায় দু-দশক একই পদে আছেন তিনি। যেমন আর এক কমিউনিস্ট দেশ চিনের রাষ্ট্রপ্রধান শি চিনফিং আছেন একই পদে। সেই ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে পুতিনবাবুর মতি-গতি লক্ষ্য করছিলাম। তাঁর পূর্বসূরীরা এস্তোনিয়া-লাটভিয়ায় যে কাণ্ড করেছিলেন, সেই একই কাণ্ড। এস্তোনিয়ার মানুষ তাঁদের ঠেকিয়েছিল গান দিয়ে। গান বন্দুক নয়, সংগীত। সে গল্প অন্যদিন বলা যাবে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবাদ উঠেছিল পুতিনবাবুর দেশের ভেতর থেকেই। পুতিনবাবু কোন বিরোধিতা সহ্য করার লোক নন। আজ একটি ইংরেজি কাগজে তাঁর দমননীতি প্রকাশিত হয়েছে। সেই দমননীতির কথা পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের ‘গান্ধারীর আবেদনে’র কথা। কি আশ্চর্য দূরদর্শিতা ছিল রবীন্দ্রনাথের।
আসুন আগে আমরা রবীন্দ্রের সেই কাব্যনাট্যের ধৃতরাষ্ট্র্র ও দুর্যোধনের কথাবার্তা শুনি। তারপরে পুতিনবাবুর কথা বলা যাবে, দেখা যাবে বিশ্বে পুতিনবাবুর মতো আরও অনেকবাবু দুর্যোধনের লাইনে চলেছেন।
ধৃতরাষ্ট্র স্নেহান্ধ মানুষ। স্ত্রী গান্ধারীর মতো দৃঢ়চেতা নন। বাবা-বাছা করে তিনি পুত্র দুর্যোধনের ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করে চলেছেন। প্রথমেই তিনি ‘সুখের প্রশ্ন তুললেন। জানতে চাইলেন পাণ্ডবদের অন্যায়ভাবে তাড়িয়ে দিয়ে দুর্যোধন সুখী হয়েছেন কি না! দুর্যোধন জানালেন সুখ তিনি চান না, তিনি চান জয়। যখন তিনি পাণ্ডবদের সঙ্গে ছিলেন তখন ছিল কর্মহীন, গর্বহীন, দীপ্তিহীন সুখ। সর্ব তেজ নির্বাপিত করে এ রকম সুখ তিনি চান না। তিনি চান দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা জয়রস। দুর্যোধনের এই ক্ষুদ্র ঈর্ষাকে ধৃতরাষ্ট্র বিষময়ী ভুজঙ্গিনীর সঙ্গে তুলনা করতে দুর্যোধন জানালেন যে ঈর্ষা ক্ষুদ্র নয়, ঈর্ষা বৃহতের ধর্ম। ধৃতরাষ্ট্র আবার বোঝাতে চেষ্টা করেন। বলেন এই ঈর্ষার জন্য পরাজিত হয়েছে ধর্ম। দুর্যোধন তখন বললেন যে লোকধর্ম আর রাজধর্ম এক নয়। রাজার কোন বন্ধু নেই, ভাই নেই, আত্মীয়-বান্ধব নেই। রাজা একেশ্বর। রাজদণ্ড যত খণ্ড হবে তত তার ক্ষয়। ধৃতরাষ্ট্র তখন কপট দ্যূতক্রীড়ার কথা তুললেন। তারও চমৎকার সাফাই দিলেন দুর্যোধন। বললেন যার যা বল তার তাই অস্ত্র। আসলে ছল-বল-কৌশলের চাণক্যনীতির কথা বললেন দুর্যোধন। হতাশ ধৃতরাষ্ট্র। কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না পুত্রকে। নিজের কীর্তিকলাপের পক্ষে সে চোখা চোখা যুক্তি হাজির করছে একেবারে আধুনিক যুগের স্বৈরাচারী রাজার মতো। ধৃতরাষ্ট্র বললেন দুর্যোধনের অন্যায়-অধর্মে চারদিকে নিন্দাধ্বনি উঠছে। এ কথা শুনে রাগে লাল হয়ে উঠল দুর্যোধনের চোখ। তিনি বললেন, এতদিন অনেক সমালোচনা সহ্য করেছেন তিনি, এবার ‘নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠ রুদ্ধ করি’। নিন্দারই গলা টিপে হত্যা করবেন তাকে। ক্ষত্রতেজে উদ্দীপ্ত দুর্যোধন বললেন —
রাজদণ্ড স্পর্শ করে কহি মহারাজ,
আপামর জনে আমি কহাইব আজ—
দুর্যোধন রাজা, দুর্যোধন নাহি সহে
রাজনিন্দা আলোচনা, দুর্যোধন বহে
নিজ হস্তে নিজ নাম।
পুত্রের কথা শুনে অস্থির হয়ে ওঠেন ধৃতরাষ্ট্র। গন্ধ পান আসন্ন সর্বনাশের। বুঝিয়ে বলেন মানুষের কণ্ঠরোধ করলে বিপদ বাড়ে। মানুষের মনের গভীরে জমা হতে থাকে ক্রোধ আর ক্ষোভ। জ্বলতে থাকে তুষের আগুনের মতো। তাই দুর্যোধন যেন প্রীতিমন্ত্রবলে নিন্দারূপ সর্পদের বশীভূত করেন। স্বৈরাচারী রাজাদের মতো দুর্যোধন থোড়াই কেয়ার করেন মানুষের ‘অব্যক্ত নিন্দায়’। প্রীতি নয়, তিনি চান ভয়। সেটাই তাঁর রাজপ্রাপ্য :
অব্যক্ত নিন্দায়
কোন ক্ষতি নাহি করে রাজমর্যাদায় ;
ভ্রূক্ষেপ না করি তাহে। প্রীতি নাহি পাই
তাহে খেদ নাহি, কিন্তু স্পর্ধা নাহি চাই
মহারাজ ! প্রীতিদান স্বেচ্ছার অধীন,
প্রীতিভিক্ষা দিয়ে থাকে দীনতম দীন—
সে প্রীতি বিলাক তারা পালিত মার্জারে,
দ্বারের কুক্কুরে আর পাণ্ডবভ্রাতারে—
তাহে মোর নাহি কাজ। আমি চাই ভয়,
সেই মোর রাজপ্রাপ্য—আমি চাহি জয়
দর্পিতের দর্প নাশি।
পৃথিবীর ইতিহাসের পাতা ওল্টালে স্বৈরাচারী শাসকদের মুখে আমরা এই কথাগুলিই শুনতে পাই। যুগে যুগে। কত বছর আগে রাশিয়ায় রাজতন্ত্র (জারতন্ত্র) উচ্ছেদ করেছিল কমিউনিস্টরা। আজ দেখছি সেই রাশিয়ার নতুন রাজাকে। যাঁর নাম ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি লোকধর্মকে পাত্তা দেন না, রাজনিন্দা আলোচনা সহ্য করেন না, দর্পিতের দর্প নাশ করে তিনি চান জয়।
সংবাদপত্রে পড়লাম মিখাইল খোডোরকভস্কির কথা। পুতিনবিরোধী দলগুলিকে অর্থসাহায্য করেছিলেন তিনি। তাঁকে দশ বছরের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হল কারাগারে। কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি আর রাশিয়ায় থাকতে ভরসা পেলেন না, চলে গেলেন অন্য দেশে। বরিস বেরেজভস্কি এক সময়ে পুতিনের বন্ধু ছিলেন, তাঁকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু যেই তিনি মুখ খুললেন, সমালোচনা করলেন পুতিনের, অমনি তাঁকে ছাড়তে হল দেশে, তারপরে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। মনে আছে ইলিয়া ইয়াশিনের কথা? গত বছর তিনি ইউটিউবে এক লাইভ স্ট্রিমে ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলেন, পুতিনকে ‘কশাই’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাঁকে ঢুকিয়ে দেওয়া হল কারার লৌহকপাটের মধ্যে। পশ্চিমী গণমাধ্যমে পুতিনের সমালোচনা করেছিলেন সাংবাদিক ভ্লাদিমির কারা-মুর্জা রুশ। তিনি বিষক্রিয়ার শিকার হলেন। সাংবাদিক লিওনিড ভলকভকে এমন ভয় দেখানো হল যে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন। অ্যালেক্সি নাভালনি একটি গোঁয়ার মানুষ। পুতিনের আকাশপ্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে তিনি লড়ে চলেছেন কবে থেকে। একবার তাঁকে বিষ খাওয়ানো হয়েছিল। কোমায় চলে গিয়েছিলেন। বেঁচে যান কোনক্রমে। তবু রেহাই পান নি। জালিয়াতি আর আদালত অবমাননার জন্য তাঁকে পুরে দেওয়া হল জেলে।
বিশ্বময় এ রকম পুতিনবাবু অনেক আছেন। এখন আবার নতুন এক কায়দা হয়েছে। রাম নাম করতে করতে সর্বনেশে কামের মতো গণতন্ত্রের মালা জপতে জপতে স্বৈরাচারের নতুন নতুন কীর্তি স্থাপন করছেন শাসক-রাজারা।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক।