শনিবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গের ভোট যুদ্ধ। বহুদিন পর রাজ্যের ভোটে দেখা যাচ্ছে প্রকৃত অর্থেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এবার এ লড়াই মূলত দুটি দক্ষিণপন্থী দলের মধ্যে। এটা আর কংগ্রেস বনাম বামের লড়াই নয় কিংবা তৃণমূল বনাম সিপিএমের। এ লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপির। এ লড়াই মূলত তৃণমূলের গত এক দশকের কাজের অগ্নিপরীক্ষা। অন্যদিকে বিজেপিকেও বাড়তে হলে এখন পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতেই বাড়তে হবে। এই বৃদ্ধিই তাদের অন্য জায়গার ঘাটতি সামাল দেবে। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, নব হিন্দুত্ববাদ এবং শ্যামাপ্রসাদ সব মিলিয়ে বিজেপি মনে করে বাংলা তাদের বিকাশের এক উর্বর জায়গা। তাছাড়া ওপার বাংলা থেকে রাতারাতি সর্বহারা হয়ে এপারে পালিয়ে আসা মানুষেরা তাদের স্বাভাবিক মিত্র। বাংলা দখল করাটা বিজেপির কাছে এবার একটা মানসন্মানের প্রশ্ন।
এই প্রথম ভোটে পেশাদার এক ভোট বিশেষজ্ঞকে রীতিমত অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ব্যবহার করছে শাসকদল। রাজনীতির কর্পোরেটাইজেশন এর ফলে একটা নতুন মাত্রা পেল। শ্লোগান থেকে প্রচার নানা ক্ষেত্রে পেশাদার প্রচারকর্মীদের ব্যবহার করছে অন্য দলগুলিও। প্রচারের ধারাও এবার বদলে গেছে। টেক্সটের বদলে এবার গুরুত্ব পাচ্ছে ছবি। বিজেপির কয়েক কোটি টাকার দামি গাড়ি যার নাম দেওয়া হয়েছে প্রচার রথ এবার চলতে শুরু করেছে ভোটের প্রায় সুচনা থেকেই। ভিড় করছেন নামী প্রচারকরা। এমনটা এর আগে দেখা যায়নি। ‘খেলা হবে’ কিংবা ‘টুম্পা’র মত কোরিওগ্রাফি সহযোগে গান এর আগে কি আপনি অন্য কোন ভোটে দেখেছেন? বলি-টালি-টেলি সহযোগে এত তারকার চাষ বিশেষ করে তাদের শাসক ও বিরোধী দলে বিপুল সংখ্যায় প্রার্থী হয়ে দাঁড়ানো কী আগে কখনও ঘটেছে এই বাংলায়? আর কোন ভোটে মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এভাবে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে প্রচার করেছেন কিংবা প্রচারে এসেছেন এত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা!
আবার দেখুন, ভোট পূর্ব হিংসা ও সন্ত্রাস মৃত্যু এবং লাগাতার আকথা-কুকথার চাষে এই ভোট আগের সব ভোটকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রচারে অনেক দল এমন সব বিশেষণ ব্যবহার করছে যে তা শুনলে কানে আঙুল দিতে হয়। ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে এই তরজা, শেষবেলাতে এসেও তার বিরতি ঘটেনি বরং আরও জোরদার হয়েছে।
ভোট এলেই আমরা শুনি নির্বাচন কমিশনের কথা এবং তা কিছু রুটিন কাজকর্মেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের শুধুই বিরোধী দলের অভিযোগ হজম করতে হয়। এবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই বেশ তৎপর, যাকে বলে হাত খুলে খেলা। তারা যা সক্রিয়তা দেখাচ্ছে তা রাজ্যের আগের কোন নির্বাচনে দেখা যায়নি। ভোটের শুরু থেকেই সব মহলে কেমন যেন সাজো সাজো রব। আরও আশ্চর্য হল, এত তৎপরতাতে মানুষ আশ্বস্ত হচ্ছেন না। তাদের মনে বইছে একটা চাপা আতঙ্ক ও আশঙ্কার স্রোত। সবাই ভাবছেন, ভোটটা ঠিকঠাক দিতে পারবো তো?
বাহুবল, অর্থবল, লোকবল, বিশেষজ্ঞবল, প্রচারবল সবকিছুতেই পশ্চিমবঙ্গের এবারের ভোট আগের ভোটগুলিকে টেক্কা দিয়েছে। কিন্তু এসব বাদ দিয়েও এই ভোটের একটা অনন্যতা আছে। সেটা কী বলুন তো? আমাদের দেশে আর কোন ভোট অতিমারির এত কান ঘেঁষে হয়নি। এখন ভোট করা ঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক উঠছে, উঠবেও। এক বছরেরও বেশি সময় আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকা একটি রাজ্যের মানুষের গণতন্ত্রের উৎসবে এতটা উজ্জীবিত হয়ে ওঠা সত্যি প্রমাণ করছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সচেতনতা। কোভিডের আশঙ্কাকে গোল্লায় পাঠিয়ে দিয়ে চলছে প্রচার। তাও আবার এমন একটা সময়ে, যখন দেশের দোরগোড়ায় আবার ধাক্কা মারছে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। জীবন এরকমই।