জাতীয় নির্বাচন কমিশন আগামী ১৬ এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি দু-দফায় ত্রিপুরায়, মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ডে ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঘোষণা করেছে। চলতি বছর বেশ কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন, তার মধ্যে উত্তর পূর্বাঞ্চলের তিনটি রাজ্য ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের ভোট ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলির জন্য সেমিফাইনাল রাউন্ড। অন্যদিকে এই তিন রাজ্যের নির্বাচনে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভোট পরিস্থিতি মেঘালয় ও ত্রিপুরায়। এই দুটি রাজ্যের ভোটের লড়াইয়ের ময়দানে রয়েছে বাংলার তিনবারের ক্ষমতাসীন দল তৃ়ণমূল কংগ্রেস। বাংলার ক্ষমাওতায় থাকার বাইরে তৃ়ণমূল একমাত্র মেঘালয়ে সর্বাধিক শক্তিশালী। কারণ তারা এই রাজ্যে বিরোধী আসনে থাকা দল। অন্যদিকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের এই তিন রাজ্যেই ভোট পরীক্ষায় রয়েছে বিজেপি।
উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাংলাভাষী প্রধান রাজ্য ত্রিপুরা বিধানসভার মোট ৬০। এখানে ২০১৮ থেকে শাসন ক্ষমতায় বিজেপি। টানা পঁচিশ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের পরিবর্তন ঘটিয়ে বিজেপি-আইপিএফটি জোট সরকার গড়লেও বিজেপি তীব্র গোষ্ঠিদ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক হিংসার কারণে অভিযুক্ত। পরিস্থিতি এমনই যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ রাজ্যে মু়খ্যমন্ত্রীর মুখ বদল করেতে বাধ্য হয়েছে। প্রথমবারের মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের পরিবর্তে বর্তমানে মু়খ্যমন্ত্রী মানিক সাহা। এবার ত্রিপুরার ভোটে সরাসরি লড়াইয়ে রয়েছে বিজেপি বনাম সিপিএম-কংগ্রেসের জোট। একই সঙ্গে প্রবল বিজেপি বিরোধী বার্তা দিয়েছে উপজাতি স্বশাসিত পরিষদের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল টিপ্রা মথা। পাশাপাশি ত্রিপুরার ভোট লড়াইয়ে রয়েছে তৃ়ণমূল কংগ্রেস।
দীর্ঘকাল এ রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইতে কেবলমাত্র কংগ্রেস বনাম বামেদেরই দেখা যেত। পরবর্তীকালে বিজেপি সেখানে ক্ষমতায় এসেছে। তবে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরায় বিধানসভা যে ভোট লড়াই হতে চলেছে তাতে ত্রিপুরার রাজবংশের সন্তান তথা রাজ্যের প্রাক্তন কংগ্রেস প্রধান প্রদ্যোৎ দেববর্মার পার্টি তিপরা মথা অন্যতম ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা। তিপরা মথা পার্টির প্রদ্যোৎ দেববর্মা স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে পার্টি লিখিতভাবে তাঁর দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে, তিনি এই ভোটে সেই পার্টির সঙ্গেই জোট গড়বেন। তাঁর দাবি-পৃথক ত্রিপুরা রাষ্ট্র। বর্তমানে পৃথক ‘তিপরা’ রাষ্ট্রের দাবিতে সেখানে বহু সংগঠন সরব। ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকায় ২০ আসনের এই সংগঠনের প্রভাবও যথেষ্ট। ফলে ৬০ আসনের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হতে পারে মনে করা হচ্ছে। যদিও ত্রিপুরার ভোট ময়দানে চিরদিনই কর্মসংস্থান একটি বড় ফ্যাক্টর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাটাও ত্রিপুরার জন্য একটি বড় ফ্যাক্টর। ২০২১ সালে সে রাজ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক হিংসা হয়েছে।
আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি মেঘালয়ের ৬০টি আসনে লড়াই। এখানে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি ২০টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের সমর্থনকারী ইউডিপির ৮টি আসন, পিডিএফ, বিজেপি ও নির্দলদের দুটি করে আসন। তৃণমূল ৯টি আসন নিয়ে বিরোধী। ১৪টি আসন খালি। বিজেপি সরকারের সমর্থক হলেও ক্ষমতাসীন এনপিপি একাই নির্বাচনে লড়াই করবে বলে ৫৮টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। নির্বাচনের মুখে প্রধান বিরোধী তৃণমূল থেকে একাধিক বিধায়ক ক্ষমতাসীন এনপিপিতে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে ২ এনপিপি এবং ১ কংগ্রেস এবং ১ নির্দল বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এনপিপির সঙ্গে জোট না হলেও বিজেপি মনে করছে উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যের তাদের ফল এবার আরও ভাল হবে। অন্যদিকে নির্বাচনের দিন ঘোষণার দিন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মেঘালয় সফর শুরু করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, মেঘালয়ে তৃণমূলই ক্ষমতায় আসবে। মেঘালয়ে কংগ্রেসের অবস্থা সব থেকে খারাপ। গত বিধানসভা নির্বাচনে তারা ১৭ টি আসন দখল করলেও ১২ জন তৃণমূলে চলে যান। তৃণমূল কংগ্রেস এবারের ভোটে মেঘালয়ে থাকা বাংলাভাষীদের বড় অংশকে টার্গেট করেছে।
নাগাল্যান্ডের ৬০ আসনে ভোটও আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে কার্যত বিধানসভা নাগাল্যান্ড বিরোধী শূন্য। মুখ্যমন্ত্রী নেফিউরিওর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক প্রোগ্রেসিভ পার্টি বিজেপি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। যে ছকে এনডিপিপি ২০১৮ সালের ভোটে জোট গড়ে নাগাল্যান্ডে ভোটে লড়েছিল ২০২৩ সালেও সেই ফর্মুলাই তাঁরা রিপিট করতে চলেছে বলে খবর। ফলে ৬০ আসনের নাগাল্যান্ড বিধানসভা নির্বাচনে ৪০ টি আসনে এনডিপিপি ও ২০ টি আসনে বিজেপি লড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, নাগাল্যান্ডের এই রাজনৈকি প্রোক্ষাপটে এনপিএফ নতুন করে নিজেদের ক্ষমতা কায়েম করতে চাইছে। নাগাল্যান্ডের ভোটে চিরকালই রাস্তার উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি বড়সড় ফ্যাক্টর। এছাড়া বহুবারই নাগাল্যান্ডের রাজনীতিতে উঠে এসেছে উত্তরপূর্বের ছটি রাজ্য মিলিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি। সেক্ষেত্রে ইস্টার্ন নাগা পিপলস অর্গানাইজেশনও একটি ফ্যাক্টর। এছাড়াও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে কেন্দ্র ও নাগা সংগঠনগুলির বৈঠক বরাবর অর্থাৎ শান্তি বৈঠক বরাবর নাগাল্যান্ডের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এবারের ভোটেও তা প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।