ওপার বাংলা থেকে আসা কিছু লোকশিল্পী তাদের গান-বাজনাকে বাঁচিয়ে রাখতেই ১৯৬২ সালে পূর্ব কলকাতায় গড়ে তুলেছিলেন লোকসংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ভ্রমরা। এ বছর তার হীরকজয়ন্তী বর্ষের সূচনা হল। ভালো উদ্যোগের ডালপালা এদেশে বড় তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়, সেখানে একটা ভিন্নধর্মী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ এতগুলি বছর পার করে দিল সেটা সত্যিই এক ভালো খবর। লোকগান ও লোকবাদ্য চর্চার সূত্রে ভ্রমরা ইতিমধ্যে কলকাতায় একটা পরিচিত নাম। গানবাজনার পাশাপাশি বাউল-ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া-ঝুমুর শিল্পীদের গ্রাম থেকে গান সংগ্রহের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই বহু হারিয়ে যাওয়া লোকগানকে আবার লোকের মুখে ফিরিয়ে এনেছে এই সংস্থা। বাঁশি থেকে শুরু করে নানা ধরণের তালবাদ্য সংরক্ষিত আছে ভ্রমরার সংরক্ষণ কেন্দ্রে। এমন একটি সংস্থার ৬০ বছরে পা দেওয়ায় কলকাতার লোকসংস্কৃতি অনুরাগী মহল স্বাভাবিক কারণেই খুশি।

হীরকজয়ন্তী উৎসব চলবে বছরভোর। মালদার ধরমপুরে সূচনা হবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। মালদা মানেই গম্ভীরা পালা। কুতুবপুর গম্ভীরা দলের একটি গম্ভীরা পালা দিয়ে উৎসব শুরু হবে। ভ্রমরা মানেই বাংলার লোকসাংস্কৃতিক বৈচিত্রের একটা প্রদর্শন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটার দিকে তাকালেই একথার সত্যতা প্রমাণিত হবে। পরিবেশিত হবে বাংলার একটা বিলুপ্তপ্রায় লোকবাদ্য চেরাপেটা। মুর্শিদাবাদের শিল্পী খোকন দাস বাজাবেন ঢাক ও ঢোল। পাহাড়ের গান শোনাবেন বীরভূমের সৃষ্টিধর বাদ্যকর ও সম্প্রদায়। থাকছে রাজমহল ও ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল শিল্পীদের নাচ ও গান। লোকনৃত্য নাটুয়া পরিবেশন করবেন মালদার গোয়ালপাড়া নাটুয়া সংস্কৃতি মঞ্চ। থাকছে বিষহরি পালা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি একইসঙ্গে বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ভ্রমরার কাজের বৈচিত্রের একটা ঝলক তুলে ধরবে। ভ্রমরার নিজস্ব গানের দলের লোকগান তো রয়েইছে। ২৫-২৭ মার্চ অবধি এই অনুষ্ঠান যেন বাংলার লোকসংস্কৃতির একটা ক্যালাইদোস্কোপ।
আমাদের প্রায় সব উদ্যোগ আর উৎসবের একটা শহরমুখী প্রবণতা রয়েছে। গ্রামের শিল্পীরা শহরের পন্ডিতদের প্রশংশা পেলে জাতে ওঠেন! অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বহু দক্ষ গ্রামীণ শিল্পীও এটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। এই অবস্থায় স্রোতের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে ভ্রমরার হীরকজয়ন্তী শুরু হচ্ছে গ্রাম থেকে। এতে কোন রাজনীতিবিদ, পন্ডিত, শহুরে সংস্কৃতিবিশেষজ্ঞ নেই। এটা শুধুমাত্রই শিল্পী ও লোকসংস্কৃতি ভালবাসা সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব অনুষ্ঠান। আশা রাখি বাংলার লোকসংস্কৃতিকে খোঁজা ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ভ্রমরার এই প্রচেষ্টার শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করবে। ভ্রমরা শুধু মধু আহরণ করেনা, তা অন্য জায়গায় ছড়িয়েও দেয়। শহরে লোকসংস্কৃতির একটা সংগ্রহশালা গড়ে তোলার জন্য ভ্রমরা অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সেই উদ্যোগের সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করছি।