বাংলায় দুর্গাপুজো যদিও আকবরের বাঙলা আক্রমণ অর্থাৎ ১৫৭৫-১৬০০র মধ্যে কোনও একটা সময় আয়োজন করেন বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে জমিদার কংস নারায়ণ, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্মৃতিতে আজও জাগরূক মারাঠা বর্গি গোষ্ঠীপতি ভাস্কর পণ্ডিতের দাঁইহাটের দুর্গাপুজোর আয়োজন। ইতিহাস বলে, মুঘল আমলের শেষ দিকে (দিল্লির সিংহাসনে তখন সম্রাট মহম্মদ শাহ) মারাঠা-মুঘল চুক্তি বাবদ দিল্লির সম্রাটের কাছে ‘চৌথ কর’ চাইলেন মারাঠারাজ। সম্রাট লুঠেরা মারাঠাদের লেলিয়ে দিলেন সুবে বাংলায়। বাংলা থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায়ের মারাঠাদের নির্দেশ দিলেন তিনি। মারাঠারাজ নাগপুরের রঘুজি ভোঁসলেকে চৌথ রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন। রঘুজি সেই দায়িত্ব অর্পণ দেন বিশ্বস্ত সেনানায়ক ভাস্কর কোহলতকারকে, যিনি বাংলায় ভাস্কর পণ্ডিত নামে পরিচিত। চৌথ আদায়ের উদ্দেশে ১৭৪২ এর এপ্রিলে বাছাই করা ২২ জন মারাঠা সর্দার আর কুড়ি হাজার বর্গী লুঠেরা সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেয়।
১১৪৯ বঙ্গাব্দে মরাঠা বর্গী বাঙলা লুঠ শুরু হয়। সেটা নবাব আলিবর্দি খানের আমল। ১১৫০ বঙ্গাব্দে (১৭৪৩) বর্গীদের সর্দার সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে যুদ্ধে বীরভূমের জমিদার রাজা রুদ্রচরণ নিহত হন। বৈষ্ণব বিশেষজ্ঞ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখছেন যুদ্ধের স্থানকে পরবর্তিকালে লোকে “সংগ্রামপুর” বলে উল্লেখ করে। বর্গীর আক্রমণে রাজা রুদ্রচরণের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি ছড়া প্রচলিত ছিল … যাদবিন্দ সর্ব্বানন্দ। মল্লশরণ রামভদ্র॥ আর কচ্চিকাচরণ। পাঁচে রুদ্রচরণ॥ বর্গীরে হলেন সদয়া, রুদ্রে হলেন বৈমুখী। ভাস্কর কল্লে ব্রহ্মহত্যা, কাঁদলো গাছপালা পশুপক্ষী॥ যাদবিন্দ বা যাদব্রেন্দ্র ছিলেন বৈষ্ণব পদকর্তা যাঁর ৩টে পদ পদকল্পতরুতে সংকলিত হয়। মাথায় রক্ষতে হবে হিন্দুপাদপাদশাহী তৈরি করতে চাওয়া বর্গী লুঠেরারা বাংলার হিন্দু মুসলমান কাউকে রেয়াত করেনি।

বর্গি আক্রমণের সঙ্গে ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গাপুজোর বিস্তারিত বিবরণ পাই কবি গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এ। গঙ্গারাম লিখছেন, ‘একা ভাস্কর লইয়া কিছু শুন বিবরণ / জেরূপে ডাঞিহাটে কৈলা পূজা আরম্ভন।। / ভাস্কর করিবে পূজা বলি দিবার তরে। / ছাগ মহিষ আইসে কত হাজারে হাজারে।’ গঙ্গারাম ‘ডাঞিহাট’ বা দাঁইহাট লিখেছিলেন বটে, তবে সম্ভবত সরকারি কাগজে তখনও জায়গাটির নাম ছিল দৈনহাট বা দিনহাট। শোনা যায় গঙ্গাতীরের এই প্রাচীন শহরে প্রতিদিনই হাট বসত। আর সেখান থেকেই এমন নামকরণ। এই দৈনহাটই আজকের দাঁইহাট। বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া শহরের কাছে গঙ্গাতীরের শহর। এখন দুর্গাপুজোর সময়। সেখানে রীতিমতো সাজো সাজো রব। দুর্গাপুজোকে ঘিরে গোটা রাজ্যে তাই। তবে এই পুজো তো যেমন তেমন পুজো নয়। এর গোড়াপত্তন মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে।
১৭৫১-য় গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’ থেকে জানা যায়, সুবে বাংলার নবাব আলিবর্দি উড়িষ্যার বিদ্রোহ দমন করে বর্ধমানের রানিসায়রের কাছে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, সেই সময়েই গোপনে ভাস্কর পণ্ডিত হামলা চালায়। তিন দিন অবরুদ্ধ থাকার পরে কাটোয়া হয়ে মুর্শিদাবাদ চলে যান নবাব। সেই সময় দাঁইহাটে ঘাঁটি গড়ে রাঢ়বঙ্গ জুড়ে লুঠপাট শুরু করে ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গী সেনারা। বর্ধমানের মহারাজারা গঙ্গাস্নানের জন্য দাঁইহাটে গঙ্গাতীরে সমাজবাড়ি বানিয়েছিলেন। ১৭৪০-এ মারা যান বর্ধমানের মহারাজ কীর্তিচন্দ্র রায়। মৃত্যুর পর চিতাভস্ম সমাধিস্থ করে সমাজবাড়ি নির্মাণ করা হয় দাঁইহাট শহরে। সেই বাড়ি দখল করেন ভাস্কর পণ্ডিত।

এর ঠিক পরের বছরই বাংলায় হানা দিল বর্গির দল। ১৭৪১ থেকে ১৭৪৪ পর্যন্ত একটানা বর্গি আক্রমণ হয়েছিল বর্ধমানে। তার মধ্যেই ভাস্কর পণ্ডিত দুর্গাপুজোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। খুব সম্ভবত ১৭৪২-এ হয়েছিল পুজোর আয়োজন। মহারাষ্ট্র পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরই বর্গিদের নেতৃত্বে ছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। ১৭৪২-এ আক্রমণের সময় নবাব আলিবর্দি খাঁ গিয়েছিলেন ওড়িশার কর আদায় করতে। তাঁর অনুপস্থিতিতে বর্গিরা একেবারে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত লুঠ করে। ফেরার সময় দাঁইহাটে খালি পড়ে থাকা সমাজবাড়ি দেখে সেখানেই ঘাঁটি গাড়লেন ভাস্কর। মারাঠা বর্গি দল তখন বিজয়ের আনন্দে ভরপুর। মারাঠা লুঠেরা ঠিক করলেন দাঁইহাটেই হবে নব্য দুর্গাপুজোর আয়োজন।

ভাস্কর পণ্ডিত শক্তি উপাসক ছিলেন। মারাঠা রীতি মেনে অষ্টভূজা দেবীর আরাধনা করতেন। বাঙলা লুঠতে সঙ্গে এনেছিলেন সোনার দুর্গা প্রতিমা। এই সোনার প্রতিমার কথাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায় দাঁইহাট বাসীর কাছে। অবশ্য অনেকেই মনে করেন, বাংলা আক্রমণে বেরিয়ে পড়ার কারণে মহারাষ্ট্রের গণেশ পুজোর অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি ভাস্কর পণ্ডিত। আর তাই বাংলার রীতি মেনেইবাংলায় দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন। কাটোয়ার দাঁইহাটের গঙ্গাপাড়ের দেওয়ানগঞ্জ এলাকার ভাস্কর পণ্ডিত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সোনার দুর্গা। ভাস্কর পণ্ডিত নিজে হাতে প্রতিমায় মাটি দিয়েছিলেন। এলাকায় অবাধ লুটপাট চালিয়ে ভাস্কর দুর্গাপুজো আয়োজন করেন সাড়ম্বরে। সন্ধে থেকে পুজো–আরতির পর মারাঠা দস্যু ভাস্কররাম পণ্ডিতের সাঙ্গোপাঙ্গোরা তখন ক্লান্ত। অনেকে সিদ্ধির নেশায় ঢুলু ঢুলু। দাঁইহাট–কাটোয়া আর লাগোয়া মারাঠা লুঠেরা নেতার পুজোর খবর পৌঁছাল নবাবের দরবারে। এই সুযোগটাই নিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খান। বাছাই করা সৈন্য নিয়ে রাতের অন্ধকারে দাঁইহাট লাগোয়া গঙ্গার ওপরের অস্থায়ী সেতু পার হয়ে অতর্কিত আক্রমণ চালালেন। মারাঠারা খুব একটা সম্মুখ যুদ্ধে পারদর্শী ছিল না। অষ্টমীর সন্ধিপুজো অসমাপ্ত রেখেই পালালেন ভাস্কর পণ্ডিত। ১৭৪২-এর ২৭ সেপ্টেম্বর ভোররাতের এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণে দিশেহারা বর্গিবাহিনী কোনও রকমে দাঁইহাট থেকে পালিয়ে মেদিনীপুরের রাস্তা ধরে ওডিশার দিকে চলে যায়। আলিবর্দির সেনারাও পিছু পিছু ধাওয়া করে বর্গিদের একেবারে চিল্কা পার করে দিয়ে আসে। তবে দাঁইহাট ছাড়ার সময় ভাস্কররাম সোনার দুর্গা মূর্তি গঙ্গায় ফেলে দিয়ে যান। স্থানীয় প্রবাদ কোশিগ্রামের কাছে সন্দীপে নবাবের সেনাদলের হাতে ধরা পড়েন ভাস্কর পণ্ডিত। সেখানেই হত্যা করা হয় তাঁকে। অবশ্য গঙ্গারাম লিখেছিলেন মেদিনীপুর পর্যন্ত ভাস্কর পণ্ডিতের বাহিনীর পিছু ধাওয়া করেছিলেন নবাব। তারপর ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে এসেছিলেন।

ষষ্ঠীর বোধন দিয়ে পুজো শুরু হলেও অষ্টমীর সন্ধিপুজো অসমাপ্ত রেখে পালালেন ভাস্কর পণ্ডিত। যাওয়ার আগে দাঁইহাটের সমাজবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে গেলেন। লুঠরা খুনি মারাঠাদের বাঙলা দলনের স্মৃতি নিয়ে ৩০০ বছর আগের সমাজবাড়ি একটিমাত্র পাঁচিল দাঁড়িয়ে আছে আজও। বাংলায় বর্গি আক্রমণের আজকের একমাত্র প্রত্যক্ষ নিদর্শন। বর্তমানে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন থেকে স্বীকৃতিও পেয়েছে দেয়ালটি। এই দেয়াল ঘেঁষেই প্যান্ডেল টাঙিয়ে আজও পুজোর আয়োজন করেন দাঁইহাটবাসী। দাঁইহাটে এই পুঁজই মারাঠা লুঠেরা ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো নামেই বিখ্যাত। মারাঠারা নিজের দেশে কীভাবে দুর্গাপুজো করত জানা না থাকলেও, ভাস্কর পুজোর নিয়মকানুন ঢেলে সাজিয়েছিলেন বাঙালি মতে। আজ এখানে একচালা দশভুজা মূর্তির পুজো হয়। পুজোতে পশুবলির নিয়ম নেই। অথচ গঙ্গারাম লিখেছিলেন, পশুবলির উদ্দেশ্যেই পুজোর আয়োজন করেছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। কথিত আছে, বর্গী হামলার ওই নায়ক ভেবেছিলেন দুর্গাপুজো ও দশেরা উৎসব একসঙ্গে হবে। সে জন্যই বর্ধমানের মহারাজাদের ওই বাড়িতে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি।
বিশ শতকে নতুন করে দুর্গাপুজোর পুজোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন দাঁইহাটবাসী। ১৯৬৭-তে কমিটিও তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে কয়েক বছর পুজো আয়োজন হওয়ার পর আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৭ থেকে ধারাবাহিকভাবে পুজো হয়ে আসছে। এলাকার পুরুষরা পুজোর কাজে সাহায্য করলেও মূল দায়িত্বে থাকেন এলাকার মহিলারা। তাঁদের উদ্যোগেই নবমীতে কুমারীপুজোর আয়োজন হয় প্রতিবছর। এটাই উৎসবের সবচেয়ে বড়ো দিন বলে মনে করেন দাঁইহাটবাসীরা। ভাস্কর পণ্ডিত লুটেরা দস্যু হতে পারেন, কিন্তু এই পুজো ক্রমশ বাঙালির নিজস্ব অনুষ্ঠানেই পরিণত হয়েছে। এই পুজোর সঙ্গে দাঁইহাটবাসী বয়ে নিয়ে চলেছে একটুকরো ইতিহাস। আমরা যেন মাথায় রাখি গোটা বাংলায় বর্গী হামলার আর কোনও নিদর্শন নেই। একমাত্র দাঁইহাটের পাঁচিল একমাত্র সাক্ষী।