১৯৬২ সালে আলাদা হয়ে যান নবারুণ ভট্টাচার্যের বাবা-মা তথা মহাশ্বেতা দেবী ও নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য। আসলে মহাশ্বেতা দেবী চাইতেন তিনি কেবলই লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন এবং সংসার করবেন না। বিখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য অসম্ভব ভালো মানুষ ছিলেন এবং তাঁদের এই বিচ্ছেদের জন্য বিজন ভট্টাচার্যের কোন দায় নেই। নবারুণ ভট্টাচার্যকে এক হাতে মানুষ করেছেন বিজন ভট্টাচার্য। মহাশ্বেতা দেবী কেবল তাঁর সামাজিক কাজ, আন্দোলন এবং লেখালেখি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।
মহাশ্বেতা দেবী সেই বিচ্ছেদ নিয়ে বলেছিলেন, “আমার ছেলের ১৪ বছর বয়সে স্বামীকে ছেড়ে এসেছিলাম৷ ঠিক করেছিলাম, একা থাকব৷ এমন নয় যে, বিজন আমাকে কোনো বাধা দিয়েছিলেন৷ উনি আমার সব কাজেই আমাকে অসম্ভব উত্সাহ দিয়েছেন৷ বলা যায়, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা৷ আমার অসম্ভব স্বাধীনতা ছিল৷ আমার সব কিছু, প্রতিটি কাজকর্মেই তিনি থাকতেন৷ মানুষ হিসাবে অসম্ভব খোলামেলা৷ আর একদম খাঁটি শিল্পী৷
কিশোর নবারুণ আর বিজনকে ছেড়ে আমি বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে জ্যোতির্ময় বসুর গেস্ট হাউসের একটা ছোটো ঘর ভাড়া নিয়ে চলে আসি৷ মনে করেছিলাম, আমার ‘একলা হওয়া’ খুব দরকার৷ একলা ছিলাম, এটাও সত্যি৷ সন্তান জন্মানোর পর নিজের সাধ্যমতো চেষ্টায় তাকে বড়ো করতে লাগলাম৷ এমন নয় যে, আমার সঙ্গে বিজনের কোনো বড়োসড়ো ঝগড়া হয়েছে৷ কোনো কথা-কাটাকাটিও হয়নি, যা হয়েছে সে যত্সামান্য মতবিরোধ৷ অত্যন্ত তুচ্ছ কারণে৷
বাট আই ওয়াজ ফোর্সড টু লিভ মাই সান৷ ১৪ বছর বয়সে সেই যে নবারুণকে ছেড়ে আসি, তারপর আর আমাদের একসাথে থাকা হয়নি বলতে গেলে৷ কিন্তু ওকে ছেড়ে আসলেও ওর লেখাপড়ার খরচ ও অন্যান্য সব কিছুর দেখাশুনো সাধ্যমতো পিছন থেকে আমিই করতাম৷ বিজনও চেয়েছিল, যতটা সময় একসঙ্গে থাকা যায়৷ বিজনের দিক থেকে কোনও বাধাও ছিল না৷ বাপ্পার বাবা যেভাবে স্নেহ আর যত্নে ওকে মানুষ করেছিল, তার কোনও তুলনা হয় না৷ তারপর একটা সময় পর ওর বিয়েও হয়ে যায়, নিজের একটা স্বতন্ত্র পরিবারও হয়৷ বাপ্পার সঙ্গে যোগাযোগটা আমার ছিলই৷ তারপর ক্রমে সেই যোগাযোগ ক্ষীণ হতে শুরু করে৷
আমি মাঝে মাঝে চিঠি লিখতাম, উত্তর পেতাম না৷ সে সব কথা আজ আর তুলতেও ইচ্ছা করে না৷ আমি দীর্ঘ দিন যে বিজনকে ছেড়ে ছিলাম, তার পিছনে আমাদের দু-জনের মধ্যেকার ভুল-বোঝাবুঝি সম্পূর্ণ দায়ী৷ পরে এ-জন্য আমি যথেষ্ট অনুশোচনা করেছি৷ আর বাপ্পার সঙ্গে তো মনের দিক থেকে আমি সব সময়ই জড়িয়ে ছিলাম৷ ওকে যে আমি ইচ্ছা করে ছেড়ে এসেছিলাম, তা নয়৷ সবটাই আমার হাতের বাইরে চলে গেছিল৷ আমাকে দুনিয়া হয়তো খুব নিষ্ঠুর মা হিসাবেই দেখবে৷”
ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা সম্পর্কে মা মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন, — বাপ্পা খুব পজিটিভ আর খুব পাওয়ারফুল৷ কবিতা-গল্প-উপন্যাস, সবকিছুতেই ও দক্ষতা দেখিয়ে গেছে! ওঁর লেখা বেরোলেই আমি সাধ্যমতো জোগাড় করে পড়তাম৷ কারণ সেই লেখার মধ্যেই আমার ছেলেকে আমি খুঁজে পেতাম৷ ও যা লিখেছে, নিজের হাতে কলম দিয়ে লিখেছে, সেটাই আমার কাছে বিরাট পাওয়া৷ লেখক হিসাবে ও যে দাঁড়িয়েছে, এটা আমার কাছে একটা মস্ত বড় প্রান্তি৷ বাপ্পা তো অনেক লেখেনি৷ ওর লেখা ওর সমসাময়িকদের চেয়ে অন্যরকম, ভিন্ন স্বাদের ছিল৷ ও লিখতেই এসেছিল৷ ওর লেখা যে মানুষের ভালো লেগেছে, স্বীকৃতি পেয়েছে, এটাই তো সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাপার৷ ভবিষ্যতে ওর লেখা থেকে যাবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা৷
ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্য ও স্বামী বিজন ভট্টাচার্যকে কতোখানি অনুভব করতেন তিনি সেই প্রসঙ্গে বলেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।
“বাপ্পা, আমার ছেলের কথাই খুব বেশি করে মনে পড়ে৷ হ্যাঁ, বিজনের থেকেও বেশি৷ বিজন খুব আনন্দময় মানুষ ছিলেন৷ অসম্ভব দারিদ্রের মধ্যে বড়ো হয়েছেন৷ আমাকে উনি ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন৷ আর নবারুণ? আমি তার মা৷ অথচ আমরা তো বেশি দিন একসঙ্গে থাকি নি৷ ও আসলে বাবার খুব কাছের ছিল৷ ওদের দু’জনের কাছেই আমি একটা রিয়েলিটি৷ ‘অ্যাজ আ পার্সন আই এক্সিস্ট৷’ এটা ওদের দু’জনের কেউই অস্বীকার করতে পারবে না৷ মনে হয়, আমার বিষয়ে আমার ছেলে শুধুই ক্রিটিকাল ছিল না, ওর মধ্যে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংও ছিল৷ অ্যাট দ্য এন্ড অফ মাই লাইফ, আজ সেই হাহাকার নেই যে, তাকে চোখে দেখিনি কত দিন৷ এক সময় খুব মনে হতো, আমার ছেলেকে আমি জানতে চাই, তার সঙ্গে কথা বলতে চাই, তাকে আমার বাড়িতে আনতে চাই, কাছে পেতে চাই৷ ইচ্ছা করত, তার হাত ধরে নিয়ে আসি৷ সে-ও নিশ্চয়ই আমাকে গ্রহণ করবে, ভালোবাসবে৷ ‘হি ইজ বর্ন অফ মি’, এই সম্পর্কটা তো কেউ কোনও দিন অস্বীকার করতে পারবে না!
অন্যরা দূর থেকেই আমার বিচার করে যাবে৷ কিন্তু আমার ভিতরটা কি কেউ দেখতে পাচ্ছে? কেউ জানে, আমার ভিতরে কী হয়? দূর থেকে কত বার যে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে গেছি, নিজের ছেলের কাছে, ‘কনটিনিউয়াস’, কেউ জানে তা? কত বার মনে হয়েছে, আমি মা, আমারই তো আগে যাওয়া উচিত৷ ও আমার কাছে একটা মস্ত বড় রিয়েলিটি হয়ে ছিল, ও যে আছে সেটাই, মনে হতো, চাইলেই তো যে কোনও সময় গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে পারবো! ও কেমন আছে, কী লিখছে, কী ভাবছে, এইসব চিন্তা আমাকে অস্থির করে তুলতো৷ আরও মনে হত, ও কি আমার কথা ভাবে? আমি কেমন আছি জিগ্যেস করে? আমার লেখা পড়ে? ওকে যে সে ভাবে আমি কাছে পাই নি, তার মধ্যে আমারও ভুল অনেকটাই আছে৷ কিন্তু বাপ্পা বা ওর বাবা আমাকে কখনও কোনও সমালোচনা করেনি৷ আজ মনে হয়, কেন করে নি? করলে ভালো হত৷
ছেলের অভ্যাস ও প্রথম জীবন নিয়ে মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন, — “বাপ্পা বই-পাগল ছিল৷ বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতো৷ ওর মতো ছেলের নিজস্ব একটা জগৎ থাকবেই৷ সেই জগতেই ও থাকত৷ ও একেবারে বইয়ের জঙ্গলের মধ্যে শিকারী হয়ে ঘুরে বেড়াতো৷ ওর চেনাজানা জঙ্গল! বিজন নাটক লিখত, আমি গল্প-উপন্যাস৷ বাপ্পা শুরুই করেছিল কবিতা দিয়ে৷ ওর একটা কবিতা খুব মনে পড়ে, — ‘একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে / সারা শহর উথাল-পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে / ফাটবে চিবুক, পোড় খাবে বুক, একটা নদী উতল হয়ে’, আর মনে পড়ছে না! কিছু দিন পর ও খুব মন দিয়ে গল্প লিখতে শুরু করল৷”
বই পড়ার পাশাপাশি ও খেতেও খুব ভালোবাসতো৷ মাংসের একটা রান্না আমি করতাম, পুরনো দিনের, রেজালা, সেটা ছিল ওর খুব পছন্দের৷ রেজালা ছিল কম ঝোলের, আর সেটাই বাপ্পা ভালোবাসতো৷ মাংসটাই বেশি মনে পড়ে৷ আমি তখন জীবনে খুবই ব্যস্ত৷ খুব যে গুছিয়ে রান্নাবান্না করে ওকে খাওয়াবো, সেটা আর হয়ে উঠতো না৷ রান্নাবান্না করতামও কালেভদ্রে৷ ও সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসত৷ কিন্তু ওকে নিয়ে সিনেমা যাওয়া-টাওয়াও আমার খুব একটা হয় নি৷
ছোটবেলায় খুব দুরন্ত হলেও, ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই ও যেন বদলে যেতে শুরু করলো৷ জীবনের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস হয়ে গেল৷ অ্যাজ আ সিরিয়াস পার্সন, ওর নিজের ইনটিগ্রিটি, ওর নিজের ডেপথ গড়ে উঠেছিল৷ ও কী করতে চায় বা না চায়, সে বিষয়ে ওর নিজের মনেই খুব স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েগেছিল৷ ওকে গভীর ভাবে চিন্তা করতে দেখতাম৷ বাপ্পা এই রকমই ছিল …গত দশ বছরে আপনাদের মধ্যে যোগাযোগ আর ছিলো না বললেই চলে …আসলে বাপ্পা ওর নিজের জীবন ও পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেছিল৷ আমার কাজ, আমার একাকিত্ব, আমার ব্যস্ততা নিয়ে আমিও সরে থেকেছি৷
স্মৃতিচারণা করেছেন নানা কিছুর, অতৃপ্তিও আছে অনেকটা মহাশ্বেতা দেবীর। তিনি লিখেছিলেন, — “মনে আছে, আমার নাতি তথাগতকে সমস্ত কলেজ স্ট্রিট তিন-চার দিন ঘুরে ঘুরে বিভূতিভূষণের যত বই পেরেছি জোগাড় করে জন্মদিনে দিয়েছিলাম৷ কী মধুর স্মৃতি সেটা আমার জীবনের! আমি তো ওদের সবাইকে নিয়েই থাকতে চেয়েছি৷ কিন্তু শুধু পরিবার তো কখনও আমার জীবন ছিল না! আমার অন্যান্য দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা বরাবরই ছিল৷ সে ব্যাপারে কখনও আমার পরিবার নিজেদের জড়াতে চায়নি৷ আমি যখন বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে যেতে আরম্ভ করেছি, তখনও বাপ্পা আমার কাছে থাকে নি৷ বয়স হলে মা-বাবারা ছেলেমেয়েদের কাছেই থাকতে চায়৷ কিন্তু আমার আর অতীতে ফিরে যেতে ইচ্ছা করেনি৷ দূর থেকেই আমার ছেলের খোঁজ নিতাম৷ ওর শুভকামনা করতাম৷ ওকে ভালোবাসতাম৷ ওর সাফল্য কামনা করতাম৷
কখনও মনে হতো, সব মিটিয়ে ফেলা যাক৷ আমিও আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করি৷ পরে বুঝতাম, সে আর হয় না৷ আর সে সব সম্ভব নয়! শেষ বছরগুলোয় আর কোনও ভাবেই আমাদের দেখাসাক্ষাৎ সম্ভব হয়ে ওঠেনি! অথচ ওকেই, আমার ছেলেকে, আজ সবচেয়ে বেশি দেখতে ইচ্ছা করছে৷
মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস “হাজার চুরাশির মা” ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্যকে কেন্দ্র করেই লেখা তা বহু জায়গায় বলেছেন মহাশ্বেতা দেবী। লেখাটি আমি সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে করেছিলাম মনে নেই। কেউ যদি সাহায্য করেন কৃতজ্ঞ থাকবো। কার্যকরী সম্পাদক।
এই ছবিটি অমূল্য একটি ছবি। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের মা বিখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। ছেলেকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। বলেছিলেন নানা সাক্ষাৎকারেও।