সমুদ্রের তলদেশে পড়ে রয়েছে যুদ্ধবিমান, বুলডোজার, অজস্র জিপ, ফর্কলিফট, সেমিট্রেলার, কামান, ট্যাংকার সহ হরেক কিসিমের যন্ত্র। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতে গেলেই দেখা যাবে এহেন দৃশ্যের। যে অঞ্চলের পোশাকি নাম ‘মিলিয়ন ডলার পয়েন্ট’। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে এত যুদ্ধাস্ত্র বা যুদ্ধযান কিভাবে তলিয়ে গেল জলের তলায়? কোন মহাপ্রলয় ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল মানুষের বিরুদ্ধে?
না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। আসলে এসব যুদ্ধাস্ত্র ও সামগ্রী মানুষ স্বয়ং নিজের হাতে সমাধিস্থ করেছিল সমুদ্রবক্ষে। কিন্তু তার কারণ কি?

উত্তর জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরো ৮৪ বছর আগে। সালটা ১৯৪১। জার্মানের নাৎসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ভানুয়াতু দ্বীপের এস্পিরিতু সানটো হয়ে ওঠে আমেরিকার অন্যতম সামরিক ঘাঁটি। এখান থেকেই জাপানের মূল ভূখণ্ডের দিকে আক্রমণ চালাত মার্কিন সেনারা। জরুরী তৎপরতায় তৈরি করা হয়েছিল একাধিক রানওয়ে, বড় বড় ভবন, হাসপাতাল, পাকা রাস্তা। গোলা বারুদ অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধযানও যথেষ্ট পরিমাণ মজুত রাখা হয়েছিল ওই দ্বীপে। পরবর্তীকালে যা পণ্যবাহী জাহাজে করে পৌঁছে দেওয়া হতো যুদ্ধক্ষেত্রে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, প্রশান্ত মহাসাগরের এস্পিরিটু সান্টো দ্বীপটি নিউ হেব্রাইডস কনডোমিনিয়ামের অংশ হিসেবে ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের যৌথভাবে শাসিত হয়। যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বীপে একটি সামরিক ঘাঁটি ছিল কিন্তু সংঘাত শেষ হওয়ার পর তারা এই দ্বীপটি থেকে তাদের অধিকার প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় ও প্রশাসন দ্বৈত ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে ছেড়ে দেয়।

সমস্যা বাঁধে অন্য জায়গায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আমেরিকা যখন সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে চলে যায় তখন পাঁচ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা এই বিশাল সাম্রাজ্যের যুদ্ধের যানবাহন থেকে শুরু করে অবশিষ্ট পণ্য, অস্ত্রশস্ত্র, কোকা-কোলার বোতল পর্যন্ত, ফরাসি এবং ব্রিটিশদের কাছে খুব কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। উপনিবেশ স্থাপনকারীদের এই ধারণা ছিল যে যদি তারা জিনিসপত্র কিনতে অসম্মত হয়, তাহলে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সেগুলি বিনামূল্যে ছেড়ে দিতে বাধ্য করা যাবে।

আমেরিকানরা মোটেও এই ফাঁদে পা দেয়নি। মার্কিন সেনাবাহিনী তাড়াহুড়ো করে সমস্ত যানবাহন, খাবার, পোশাক, পানীয় এবং অন্যান্য সরঞ্জাম দ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে একটি ঘাটে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সেনাবাহিনী অবশিষ্ট সমস্ত জিনিসপত্র বুলডোজার ব্যবহার করে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেয়। যাতে ইউরোপীয় দেশগুলি বিনামূল্যে বা অন্য কোনওভাবে তাদের জিনিসপত্র ব্যবহার করতে না পারে।

এছাড়াও যুদ্ধের পর যেখানে অর্থনৈতিক মন্দা দেশজুড়ে, সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে সামরিক সামগ্রী দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া একপ্রকার বোকামিই বটে। ফলে সেসব সামগ্রী ভানুয়াতুতেই ছেড়ে রেখে আসতে বাধ্য হলেন মার্কিনীরা। এই সকল মার্কিন প্রযুক্তি ব্রিটিশ ও ফরাসি বৈজ্ঞানিক ও সেনাদের হাতে পৌঁছে যাক, এমনটি একেবারেই চায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কারণ সেই সময় ভানুয়াতু ছিল ফরাসি ও ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে ফলে সাগরের জলে সমাধিস্থ করা হয় এই বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম।
তবে মার্কিনিদের এই কূটনৈতিক জয় পরিবেশে প্রভাব ফেলেছিল ভয়াবহ। জ্বালানি তেল, রাবার ও অন্যান্য বিষাক্ত ধাতু সমুদ্রের জলে মিশে সে-সময় প্রাণ কেড়েছিল বহু সামুদ্রিক প্রাণীর। অবশ্য তা নিয়ে তৎকালীন সময় বড়ো কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি কোথাও-ই।

আট দশক পর আর প্রকৃতি নিজেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে এই পরিস্থিতির সঙ্গে। সমুদ্রবক্ষে জমে থাকা পরিত্যক্ত যুদ্ধসামগ্রীর ওপরেই গজিয়ে উঠেছে প্রাণ, আশ্রয় নিয়েছে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য প্রাণীরা। স্থানীয় মানুষদের লাভও কম হয় না। সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত এই ‘প্রত্নক্ষেত্র’ দেখতে প্রতিবছর ভিড় জমান লক্ষ লক্ষ মানুষ। পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্কুবা ডাইভের ব্যবসা। তাছাড়াও জলের নিচে ‘গুপ্তধন’-এর অনুসন্ধানও চালান স্থানীয়রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাচীন সামগ্রী তুলে এনে ‘প্রত্নপণ্য’ হিসাবে বিক্রি করে উপার্জন করেন লক্ষ লক্ষ টাকা। বলতে গেলে এই ‘ট্রেজার হান্টিং’-এর কারণেই ভানুয়াতুর এই অঞ্চল পরিচিত ‘মিলিয়ন ডলার পয়েন্ট’ নামে।

ভানুয়াতুর এস্পিরিটু সান্টোর লুগানভিলের কাছে সমুদ্র সৈকতের প্রায় ১৫-২৫ মিটার গভীর জলে ট্র্যাক করা এবং চাকাযুক্ত যানবাহন এবং বিভিন্ন অন্যান্য মেশিন (এবং নৌকা!) সহ একটি ডাইভিং সাইট।
গতকাল ৬ই নভেম্বর গোটা বিশ্বজুড়ে “আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশের শোষণ প্রতিরোধ দিবস” পালিত হলো। এই দিনটি বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের কারণে পরিবেশের উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, সে সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং পরিবেশ রক্ষা করতে সাহায্য করে।

এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হল মানুষকে যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হয়, তা সম্পর্কে অবগত করা। এই দিনটি পরিবেশগত সুরক্ষা, শান্তির জন্য পালন করা হয়।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) অনুসারে, গত ৬০ বছরে অন্তত ৪০% অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন — কাঠ, হীরা, সোনা, তেল বা জল এবং উর্বর জমির মতো সীমিত সম্পদের শোষণ হয়েছে।

জাতিসংঘ ২০০১ সালে এই দিবসটি ঘোষণা করে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হল পরিবেশের উপর যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে শিক্ষিত করা। যখন যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তখন জল সরবরাহ, বনভূমি এবং প্রাণীর মতো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিশ্বজুড়ে প্রচার করা হয় — যুদ্ধ নয় শান্তি চাই।
সূত্র : উইকিপিডিয়া বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড এবং অন্যান্য
চমৎকার বিষয়ক লেখা, বেশ ভাল লাগল।
থ্যাঙ্ক ইউ ????
অসাধারণ একটি তথ্য জানলাম আপনার লেখার মাধ্যমে,,,, ধন্যবাদ আপনাকে????