ধূ ধূ ডাঙার মাঝে দহ, চাদ্দিক শুনশান। দাবদাহে জ্বলছে চরাচর। একটু স্বস্তির আশায় চিল শকুনও অস্থির। এই ডাঙার মাঝেই বিল বা দহ। টল টল জল। মরুভূমির বুক ভেদ করে উঠে আসা শান্তিবারি। এসব মানুষের হাতে গড়া নয়। এখানেও গল্প আছে, আছে লোক কাহিনী। এক ডাইনী তার মাথার জটায় বিঁধিয়ে নিয়ে চলেছে এক মস্ত দীঘি। এমন সময় ডেকে উঠল কাক। ডাইনীও অশুভ শব্দে সচকিত হয়, থমকায়, ডাঙার মাঝে নামিয়ে রাখে প্রকান্ড দীঘিটা। সকাল হলে গ্রামের মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখে মাঝডাঙায় দীঘি। তারা দীঘি দেবতার পুজো শুরু করে। দীঘি দেবতার আশীর্বাদেই তাদের জলের কষ্ট মিটেছে। এমন সময় গুনীন খবর দেয় এ এক ডাইনীর কীর্তি। যে কোন সময় ডাইনী উড়িয়ে নিয়ে যাবে এই দীঘি। গ্রামের মানুষ গুনীনকে ধরে— বিহিত কর, এর একটা বিহিত কর গো গুনীন। তাদের দু’দশটা গাঁয়ে কোথাও জল নেই। ঘরপোষা গরু, ছাগল হা জল হা জল করে অস্থির, মৃতপ্রায়।
এবার কেরামতি গুনীনের। গুনীন বলল রোসো, ব্যবস্থা করছি। রাতে ডাইনী যখন দীঘি উড়িয়ে নিতে এল; গুনীন অমনি ছাড়ল বান। সে কী কান্ড। এ মারে আগুন, ও মারে আগুন। শেষে ডাইনীর হার হল। গুনীনের কোপে নাকে খৎ দিয়ে ডাইনী দীঘি ফেলে উধাও হয়ে গেল। ধূ ধূ ডাঙার মাঝে দহ হয়ে গেল গুনীনের দহ বা ওঝার দহ।
এখন আর শিশু পাঠ্যে ডাইনীরা নেই, দৈত্য নেই, নেই এদের সঙ্গে সমানে পাল্লা দেওয়া রাজকুমার বা ওঝারা। হারিয়ে গেছে দীঘির গল্পও।
কয়েক দশক আগেও বাংলার গ্রামে টিউবওয়েল ছিলনা, ছিলনা ইঁদারা, পাইপ লাইনের স্বয়ংক্রিয় জল সরবরাহ। নদী আর দীঘিই ছিল মানুষের বেঁচে থাকার উপায়। গ্রামে গ্রামে দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে ঊঠেছিল অসংখ্য গল্প, যা এখন উপকথা বা লোককাহিনীর নিরাপদ আশ্রয়ে। রাক্ষসের প্রাণভোমরা থাকে দীঘির জলে, দীঘির জলে স্নান করেই কুৎসিত, কুদর্শনা মেয়ে হয়ে ওঠে রূপবতী রাজকন্যা। আমরা জানিনা কোন দীঘির জল স্পর্শ করলেই মানুষ পাথর কিংবা জন্তু হয়ে যায়।
দীঘিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনী, ইতিহাসের পাতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে অজস্র দীঘি কাহিনী। বাঁকুড়ার লালদীঘিতে এখনও নাকি শোনা যায় লাল বাঈয়ের নিঃশব্দ কান্না। বীরভূমের হেতমপুরে রয়েছে হাফেজ খাঁ’য়ের বাঁধ। শোনা যায় শাসক হাফেজ খাঁ’য়ের রক্ত স্রোত মিশে গিয়েছিল এই বাঁধে। বীরভূমের রাজনগরে রয়েছে কালীদহ। এর মধ্যে ছিল রাজা দেবীসিংহের বিশাল প্রাসাদ, কালী মন্দির। গুপ্ত ঘাতকের হাতে রাজা দেবী সিংহের প্রাণ গেলে তার আরাধ্য দেবী দীঘির পাড় ভেঙ্গে পুষ্করিণী নদী হয়ে ভেসে যান। চাকদহের পালপাড়ায় প্রদ্যুম্ন সরোবরে রাজা প্রদ্যুম্ন নাকি অদৃশ্য হয়ে যান।
মেদিনীপুরের দাঁতনে রয়েছে বিখ্যাত দীঘি শয়শঙ্ক। শশাঙ্কদেব পুরী যাওয়ার পথে বাংলা ও উড়িষ্যার সীমান্তে এই দীঘি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে বিদ্যাধর নামে অপর একটি দীঘি আছে। বিদ্যাধর নামে এক রাজমিস্ত্রী এই দীঘি খনন করেন। জনশ্রুতি আছে বিদ্যাধর ও শরশঙ্ক দীঘিকে সংযুক্ত করা হয়েছে এক সুরঙ্গের মাধ্যমে। কিংবদন্তি হল— কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দ্রৌপদী সহ পান্ডবরা মহাপ্রস্থানে যান। এদিকে গান্ধারীর শাপে যাদবকুল ধ্বংস হয়েছে। বিশীর্ণ যাদব কুলপতি শ্রীকৃষ্ণ ঘুরতে ঘুরতে শরশঙ্ক সরোবরের তীরে এক বৃক্ষে অবস্থান করছিলেন। এই অঞ্চল তখন ছিল শবর রাজা জরার অধীন। তাঁর নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতেই ভারত ইতিহাসের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়। এখানে পৌষ সংক্রান্তিতে পুণ্যস্নান করেন স্থানীয় মানুষরা।
হালিশহরের চৈতন্য ডোবাও এক ঐতিহাসিক স্থান। চৈতন্যদেবের দীক্ষাগুরু ঈশ্বরপুরী এখানেই বাস করতেন। গুরু ভিটে দর্শনে এসে গুরুর চরণ স্পর্শিত মাটি চৈতন্যদেব তাঁর সারা শরীরে লেপন করতে থাকেন। এই দৃশ্য দেখে শিষ্যরাও সেই পবিত্র মৃত্তিকা হাতে হাতে তুলে সর্বাঙ্গে লেপন করতে থাকে। এর ফলে যে জলাশয়ের সৃষ্টি হয় তাই আজকের চৈতন্য ডোবা।
দীঘিকে ঘিরে অলৌকিক কাহিনীও কম নয়। সুবোধ ঘোষের ‘কিংবদন্তির দেশে’ বর্ণনা আছে এমন এক কাহিনীর। রাণী মধুমঞ্জুরীর মনে সুখ নেই। রাজা গন্ধর্ব পাল ভেবে উঠতে পারছেন না কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবেন। এদিকে রাজ্যের আরাধ্য দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন তিনি বড়ই তৃষ্ণাতুর। রাজার আদেশে দীঘি খনন করা হলেও তা থেকে জল উঠছে না। দেবী আদেশ দিলেন— রাণীর অশ্রুবিন্দুই পারে দীঘির বুকে জলস্রোত সৃষ্টি করতে। রাণী মধুমঞ্জুরী ভাবেন দুঃখ না হলে তো চোখে অশ্রু আসবে না! তিনি তো সব দিক থেকেই তৃপ্ত, তাহলে? রাজপ্রাসাদের সুখ ছেড়ে রাণী বেরোলেন দুঃখ খুঁজতে। সাধারণ শাড়ী, অঙ্গে নেই অলঙ্কার, পাশে নেই সহচরীরা। দুধ-আলতার কোমল ত্বক ক্ষতবিক্ষত হল, গা ফেটে শোনিতস্রোত। তবুও চোখে জল নেই। এমন সময় তার চোখে পড়ল গ্রামের মেয়েরা কোমরে কলসি, মাথায় কলসি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। চোখ মুখ কপাল বেয়ে নেমে আসছে স্বেদবিন্দু। রাণী জানলেন অনেক দূর থেকে তাদের জল আনতে হয়। সে বড় কষ্ট। একথা শুনে রাণীর বুক ব্যথায় ভরে উঠল। টনটন করে উঠল গলা। আচম্বিতে তার চোখ ঠেলে বেড়িয়ে এল দু’ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। রাজার দীঘি জলে ভরে উঠল। দীঘির নাম হল রাণীর দিঘি। মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ে এখনও সেই দীঘি আছে।
বাংলার বিভিন্ন জেলায় দীঘি দেবতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক কাহিনী। কোন গৃহস্থ বাড়ীতে অনুষ্ঠান বা ক্রিয়াকর্ম থাকলে দীঘিদেবতা নাকি রান্নার সরঞ্জাম থেকে খাদ্যবস্তু পর্যন্ত সরবরাহ করতেন! দীঘির পাড়ে প্রদীপ জ্বেলে ১টি পয়সা, ১টি সুপারী ও ফর্দ রেখে এলেই হত। মগরার জয়মঙ্গলাপুকুর, আগাইয়ের গড় এবং চব্বিশ পরগণা ও বীরভূমের অনেক দীঘিকে কেন্দ্র করেই এই জনশ্রুতি আছে। কালোপুজোর সামগ্রী পাওয়া যেত হুগলীর আড়িয়াদহতে এমন গল্পও শোনা যায়।
দীঘি খনন করাকে একসময় মানুষ পবিত্র কর্তব্য, ধর্ম বলে মনে করতো। দীঘি খননের প্রয়োজনও ছিল। তখন জল উত্তোলনের কোন আধুনিক পন্থা পদ্ধতি ছিলনা। গ্রামের ধণাঢ্য মানুষরা ছিলেন ধর্মভীরু, কিছুটা নৈতিক গুণসম্পন্ন। তারাই মানুষের তৃষ্ণা নিবারণে দীঘি খনন করতেন। একদা মানুষের জীবনে দীঘির ভূমিকা ছিল অনেকটাই। তাই দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জানা অজানা অনেক কাহিনী। এখন আর ডাইনীরা দীঘি উড়িয়ে কোন ডাঙ্গায় নামেনা, এখন আর সেই সর্বশক্তিমান গুনীন কই যে ডাইনীকে বশ করে আমাদের তৃষ্ণা দূর করবে?
আজ জল দিবসে স্মরণে থাকুক সেই সকল কথা-কাহিনী, আশা থাকুক পৃথিবীর সকলের জন্য জলের অফুরান যোগান অব্যাহত থাকার।
খুবই সুন্দর হয়েছে ।