সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’ কৌতুক নাটিকার কথা মনে পড়ে! পরিশ্রান্ত তৃষ্ণার্ত পথিক এক গ্লাস খাবার জলের জন্য কতগুলো দরজায় কড়া নাড়িয়েছিলেন! জল পাওয়া কি আদৌ জলের মতোই সোজা — বোধহয় না ।তাইতো হাস্যকৌতুকের পরতে পরতে ছিল এক প্রয়োজনীয় বার্তা। জলই জীবন—প্রবল তৃষ্ণার্ত না হলে এ কথাটার মর্মদ্ধার করাটা খুব একটা সহজ নয়।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির মূলে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম — এই পঞ্চ মহাভূতের সমাহারে সমস্ত জীবনে সৃষ্টি — বেঁচে থাকা রসদ — মৃত্যু বা ধ্বংসের কারণ। জল সবকিছুকেই রসসিক্ত করে রাখে। বায়ু, পিত্ত, কফের তারতম্য ঘটায়, সমস্ত প্রাণীকূলের, গাছপালার সুস্থ-অসুস্থ থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর চার ভাগের ৩ ভাগ জল হওয়া সত্বেও পানীয় জলের হাহাকার দেখা যায় সর্বত্র। পৃথিবীর বেশিরভাগ জল নোনা এবং খর জল। পানীয় জলের পরিমান কম। আমাদের সৌভাগ্য যে পৃথিবীর যেকোনো অংশের চেয়ে এই বাংলায় পানীয় জলের ভান্ডার সবচেয়ে বেশি অথচ আমরা তা অবলীক্রমে নষ্ট করে যাচ্ছি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তার এক নতুন দর্শন মানুষ দেখেছিল। ইউরোপীয় যৌথ বাহিনীর হাতে যথেষ্ট সৈনিক, খাদ্য, এমনকি সৈন্যসেবার থেকে চিকিৎসকও ছিল তবুও তারা শুধুমাত্র ১৮,০০,০০০ লিটার পানীয় জলের অভাবে মধ্যপ্রাচ্য দখলে আনতে অক্ষম হয়। এইজন্যেই জলের অপর নাম জীবন।

ল্যাটিন ভাষায় ইনিডিয়া নামে একটি শব্দ আছে যার অর্থ হল খাদ্যব্যাতিরেকে মানুষ শুধুমাত্র জল পান করে জীবন ধারণ করতে পারে। প্রাচীন হিন্দুশাস্ত্রতে এরকম বহু উদাহরণ উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত। পুরান কাহিনীতে বহু মুনি ঋষি ছাড়াও, দেবরাহা বাবা নামে এক সাধুসন্ধান পাওয়া গেছে যমুনা নদীর তীরে, যিনি বিনা খাদ্যে জল পান করেই দীর্ঘ জীবন কাটান। রাম বাহাদুর বোমজোন নামে এক নেপালী সাধুকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি হয় যিনি শুধুমাত্র জলপানের মাধ্যমে জীবিত ছিলেন খাদ্য ছাড়া। পরীক্ষামূলকভাবে দেখা গেছে ‘জলপান’ প্রাণায়াম করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আট মাস পর্যন্ত জীবনধারণ করতেই পারেন।
মানুষের শরীরে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জল অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য জল অত্যন্ত প্রয়োজন শরীরের প্রতিটি কোষে। জল শুধু অসুখ প্রতিরোধ করে না, জল দরকার জীবন ধরে রাখার জন্য। বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় যেমন কিডনিতে স্টোন থাকলে ওষুধের পাশাপাশি জলের পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলা হয়, কোন কারনে শরীরে (ডিহাইড্রেশন) জলের পরিমাণ কমে গেলে জল পান করা দরকার, জ্বর থেকে শরীরে তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জল খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
জল গ্রহণ করা উচিত তখনই যখন আপনি পিপাসা অনুভব করবেন, অযথা জলপান করা উচিত নয়। অন্যান্য বস্তুর সঙ্গে জল ও হজম হয়ে যায় এবং হজমের সাহায্য করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বলে, খাবারের ঠিক পূর্বে সামান্য জল খেতে পারেন শুধু গলা ভেজানোর মতো, বেশি জল খেলে হজম শক্তি কমে যায়। রাত্রে শোয়ার পূর্বে অতিরিক্ত জল পান করা উচিত নয়।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সারা দিনে তিন লিটার বা ১৪ গ্লাস জল এবং গরম পড়লে সর্বাধিক ৩.৫ লিটার জল গ্রহণ করতে পারেন মহিলার ক্ষেত্রে নূন্যতম ২.২ লিটার জল পান করলেও চলবে।
নিয়মিত জলপান এবং স্নান ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখে ত্বক উজ্জ্বল রাখে। মেটাবলিজমের কারণে উৎপন্ন ফ্রি রেডিকেল সমূহ দেহ থেকে নিষ্কাশন করতে অর্থাৎ ডি-টক্সিফাই করতেও জল একান্ত প্রয়োজন।
চিকিৎসকরা বলেন ত্বক শুকনো হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হয়। জানলে অবাক হবেন জলই হলো প্রকৃতির সবচাইতে শ্রেষ্ঠ ময়েশ্চারাইজার। খেয়াল করলেই দেখতে পারবেন সমস্ত নামী দামী ময়েশ্চারাইজার হলো জল প্রধান। ত্বকের আদ্রতা বজায় রাখতে হলে শ্রেষ্ঠ উপায় হল জলকে সঠিকভাবে ব্যবহার। আমাদের মত গ্রীষ্ম প্রধান দেশে ১০ মিনিট পর্যন্ত স্নান করা যেতে পারে তবে দীর্ঘক্ষণ স্নান করবেন না তাতে ত্বক শুকিয়ে যায়। আমাদের ত্বকের বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে এক ধরনের তেল বের হয়, বেশি স্নান করলে এই তেল বের হয়ে যায়। তাই জলের সঠিক ব্যবহার করুন।
সেই ষোড়শ শতাব্দীতে বেলজিয়ামে শুরু হয়েছিল এক বিশেষ জল চিকিৎসা। লাতিন শব্দমালায় ‘স্পা’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘জল থেকে স্বাস্থ্য’। বেলজিয়ামে যুদ্ধের ক্ষত আর পেশির ব্যথা সারাতে উষ্ণ জল কাজে লাগানো হতো। মেন কনসেপ্টটা হচ্ছে যে, জলে ধুয়ে দেবে শরীরের যাবতীয় ক্লান্তি সব টেনশনের হাত থেকে মুক্তি মিলবে মুহূর্তে। জীবন যতই ফাস্ট হচ্ছে, স্পা ট্রিটমেন্ট-এর গুরুত্ব ততটাই বাড়ছে।

গতকাল ছিলো বিশ্ব জল দিবস। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে রাষ্ট্রসংঘের অনুষ্ঠানে জলের গুরুত্ব এবং সংরক্ষনের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ১৯৯৩ সালের ২২ মার্চ থেকে সমস্ত বিশ্বে এই দিবস পালিত হয়। এ বছর জল দিবসের থিম হল ভূ-গর্ভস্থ জল। এর প্রাথমিক লক্ষ্য হল ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য পরিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা করা।
জল দিবসকে সার্থক করতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। মূল্যবান জলকে অযথা নষ্ট না করা হচ্ছে প্রধান লক্ষ। ভূ-গর্ভস্থ জলের ব্যবহার অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দিয়ে চাষবাসের জন্য বৃষ্টির জলের বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মাছ চাষ করা যাবে — লোকে কাজ পাবে, আর বাঙালির মাছ ভাতের অভাব ঘটবে না।
পুকুরের সংস্কার করতে হবে অর্থাৎ পুকুরের পাঁক তুলে পরিষ্কার করে, পাড়ে গাছের ডাল কেটে লাগিয়ে জল সঞ্চয় করতে হবে। তাতে রোদ যেন সারা দিনে সাত-আট ঘন্টা লাগতে পারে। এর দ্বারা নানাবিধ ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যের প্রাদুর্ভাব কমবে।
সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই এই দিবস পালন করা হয়। সচেতনতা না বাড়ালে আর হয়ত সেই দিন দূরে নয় যখন জলের জন্য আমাদের হাহাকার করতে হবে।
“যখন কূপ শুকিয়ে যায়, আমরা জলের মূল্য শিখি।” — (বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন) অতএব সময় থাকতেই জল সংরক্ষন করতে হবে।
Very important write up.
থ্যাঙ্ক ইউ।