চিনের প্রাচীরে যতই মাথা ঠুকে গালমন্দ করুক না কেন, চিনা খাবারের প্রতি বাঙালির আগ্রহ কিন্তু বহুদিনের। এই শহরের বহু জায়গায় বিশেষ করে ট্যাংরা চিনা খাবারের স্বর্গরাজ্য। ট্যাংরার চায়না টাউন সহ সারা বিশ্ব জুড়ে ১০ই ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে শুরু হয়েছে চীনা নববর্ষ। এটিকে বসন্ত উৎসব বা চন্দ্র নববর্ষও বলা হয়। নববর্ষের দিন আমাদের মতোই চিনারাও পরিবারের সকলে একত্রিত হয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে নববর্ষ পালন করে। এবছর ১০ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পালন করা হবে এই বর্ষবরণ।

চীনারা চন্দ্র ক্যালেন্ডারের হিসেবে নববর্ষ পালন করে। পশ্চিমী গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হয় সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথের উপর ভিত্তি করে, আর চীনা নববর্ষের তারিখ পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের কক্ষপথ অনুসারে নির্ধারিত হয়। চীনা নববর্ষ পালন করা হয় শীতকালীন অয়নকালের পরে দ্বিতীয় নতুন চাঁদে পড়ে। অন্যান্য এশিয়ান দেশ যেমন কোরিয়া, জাপান এবং ভিয়েতনামও চন্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে নতুন বছর উদযাপন করে।
চিনা জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী রাশিচক্রের এক একটি প্রাণীর নামে নামাঙ্কিতে থাকে এক একটি বছর, এরা হলো ইঁদুর, ষাঁড়, বাঘ, খরগোশ, ড্রাগন, সাপ, ঘোড়া, ছাগল, বানর, মোরগ, কুকুর এবং শূকর। এ বছর চিনা শাস্ত্র অনুযায়ী ড্রাগন বছর হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই নির্দিষ্ট বারোটি প্রাণী ছাড়াও পাঁচটি উপাদানের উপরেও চীনা বছর পাঁচ বছর করে ঘুরে আসে পাঁচটি উপাদান হল কাঠ, আগুন, মাটি, ধাতু ও জল। বৌদ্ধধর্ম এবং দাওধর্মের নববর্ষের সময় স্বতন্ত্র রীতিনীতি থাকলেও চীনা নববর্ষ উভয় ধর্মের চেয়ে অনেক পুরনো।

যদিও নববর্ষ উদযাপনে ছুটির দিনটি আসলে এক সপ্তাহের, ঐতিহ্যগতভাবে এটি ১৫দিনের ছুটি হিসাবে পালিত হয়। এইকদিন আতশবাজি জ্বালানো হয়, রাস্তায় ড্রাম শোনা যায়, রাতে লাল লণ্ঠন জ্বলে এবং দরজায় লাল কাগজের কাটআউট এবং ক্যালিগ্রাফি ঝুলে থাকে। শিশুদের টাকা সম্বলিত লাল খামও দেওয়া হয়। বিশ্বের অনেক শহরে ড্রাগন এবং সিংহ নাচের সাথে সম্পূর্ণ নতুন বছরের প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। উদযাপন ১৫তম দিনে সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জলন বা লন্ঠন জ্বালানোর মধ্যে দিয়ে উৎসবে সমাপ্তি ঘটে।
খাদ্য নববর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। খাওয়ার জন্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে রয়েছে নিয়ান গাও (মিষ্টি স্টিকি রাইস কেক) এবং মুখরোচক ডাম্পলিং।
১৯১২ সাল থেকে সরকার চন্দ্র ক্যালেন্ডার বাতিল করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু মানুষ ঐতিহ্য পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক ছিল না তাই তারা উভয় ক্যালেন্ডার সিস্টেমে রেখেছিল। ১৯৪৯ সালের পর চাইনিজ নববর্ষ দেশব্যাপী সরকারি ছুটির দিন হিসেবে তালিকা ভুক্ত করা হয়।
চিনা নববর্ষের ইতিহাস ৩৫০০ বছরের বেশি পুরনো। মূলতঃ কৃষি উৎসব ও শীতের সমাপ্তি বসন্তের আগমন চিহ্নিত করার জন্য এই নববর্ষ পালন যদিও এর সঙ্গে রয়েছে নানান মিথ।

কিংবদন্তি অনুসারে উৎসবের উৎস শ্যাং রাজবংশের (১৬০০ থেকে ১০৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) থেকে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবছরের শেষের দিকে চীনারা পূর্বপুরুষ এবং দেবতাদের পূজা করত পশ্চিম ঝো রাজবংশের লোকেরা নববর্ষ উদযাপনে কৃষিকাজ করার রীতি তৈরি করেছিল। সেই উদ্দেশ্যেই তারা ঈশ্বরকে বা পূর্বপুরুষকে বলিদান করত ফসলের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য অর্থাৎ তাঁরা প্রকৃতির পূজা করতো। যদিও হান রাজ বংশ (২০২ বিসি ২২০ এডি) চন্দ্র ক্যালেন্ডার এর প্রথম মাসের প্রথম দিনটিকে কিছু আচার অনুষ্ঠান এর মধ্যে দিয়ে উৎসবের আকারে পালন করত যার মধ্যে ছিল আনুষ্ঠানিক জমায়েত হওয়া আতশবাজি ব্যবহার করে বাঁশ পোড়ানো ইত্যাদি।
চীনা পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এটি বিশ্বাস করা হয় যে চন্দ্র নববর্ষের প্রাক্কালে, নিয়ান নামে একটি দানব জীবিত প্রাণীদের খাওয়ার জন্য আবির্ভূত হবে। মধ্যরাতে আতশবাজি ব্যবহার করা হয় নিয়ানকে ভয় দেখানোর জন্য এবং সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
মূলতঃ চীনে যে ঋতুতে চাল উৎপন্ন হয় তার উপর নির্ভর করে নববর্ষ পালন করা হয়, যেমন ধান ঋতু প্রায় মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (উত্তর চীন), অক্টোবর থেকে অক্টোবর (ইয়াংজীজ নদী উপত্যকায়) অথবা নভেম্বর (দক্ষিণ-পূর্ব চীন) থেকে মার্চ পর্যন্ত।

এই কয়দিন চীনারা কয়েকটি প্রথা ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে যেমন লোকেরা পুরনো জিনিস নেতিবাচক শক্তিকে দূরে সরিয়ে দিতে বাড়ির দেওয়াল, মাটির কোন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, প্রবীণেরা পরিবারের সকল সদস্যের জন্য নতুন জামা কাপড় কিনে দেন, বাড়িতে যাওয়া বন্ধুবান্ধব পরিবার সকলে একসাথে মিলে পুনর্মিলন ডিনারে পরিকল্পনা করা হয়। পুনর্মিলনী ডিনারের পর পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা ‘লাল খাম’, যাকে ভাগ্যবান অর্থ বলা হয়, শিশুদের দেয়।
ময়দা দিয়ে তৈরি ডাম্পলিং এবং বিভিন্ন ফিলিংস দিয়ে স্টাফ খাওয়া চীনে নববর্ষের একটি রীতি যা আগামী বছর সম্পদ আনবে বলে বিশ্বাস করা হয়।
নববর্ষের সময়ে লোকেরা তাদের গেটে উল্টো ‘ফু’ পেস্ট করে যা সুখ ও সৌভাগ্যের আগমনের প্রতিক। চীনা সংস্কৃতিতে লাল রং সম্পদ ও সৌভাগ্যের সঙ্গে জড়িত তাই সিংহের মতো দানব নিওনকে তাড়ানোর জন্য উজ্জ্বল লাল শয্যা ঝুলানো হয়।

প্রতি বছরের মতো এবছরও কলকাতার এক টুকরো চিন চায়না টাউন ঐতিহ্যবাহী ড্রাগন নাচ, বর্ণিল মিছিল বাদ্যের তালে, নাচেগানে মুখরিত।
১৯৬২-র ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর কর্মসংস্থানের খোঁজে এ দেশে চলে আসেন বহু চিনা পরিবার। সেই সময় থেকে তাঁরা কলকাতায় রয়ে গিয়েছেন। বিশালাকৃতির ড্রাগনকে নিয়ে বহু মানুষ একসঙ্গে নাচেন, বিশেষ পোশাক পরে সিংহ সেজে দুজন শারীরিক কসরত দেখায়।ড্রাম আর বিশাল খঞ্জনির তালে তালে নেচে ওঠে কলকাতাবাসীও।
প্রসঙ্গত কলকাতারই এই অঞ্চলেই চিনা রেস্তরাঁগুলির পুরোনো ঠেক। অথেন্টিকেট চিনা খাবার সেদ্ধ চিকেন, স্যুপ, নুডলস, নিয়ান গাও (মিষ্টি স্টিকি রাইস কেক), মুখরোচক ডাম্পলিং এখানে মেলে। এছাড়াও ভারতীয় মশলা মেশানো ইন্দো-চাইনিজ খাবার বাও, মোমো, ওয়ান্টন, খোয়াই চই প্যান, নুডল স্যুপ, চিকেন ও পর্ক সসেজ ইত্যাদি পাবেন এই অঞ্চলে।

ড্রাগন হল চীনা জাতির টোটেম। অনুমান করা হয় যে, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বসন্ত উত্সবটি কোনো না কোনো আকারে উদযাপন করে। চীনারা বিশ্বাস করেন নতুন বছরে ড্রাগন সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। এই বিশ্বাসেই বিশ্বাস রেখে প্রার্থনা করি, ড্রাগন স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে তথা মানবজাতির সাথে প্রকৃতির সহাবস্থানের চেতনার প্রতীক রূপে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসুক।
Apurba anek kichu janlam apner lekhoni theke