এ রাজ্যের ৭.৩৪,০৭,৮৩২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৪৯ শতাংশ মহিলা। কেবল তাই নয়, ২০১১ ও ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে দেখা গিয়েছে পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের ভোটদানের হার ছিল বেশি। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে মোট মহিলা ভোটারদের ৮১.৭ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন৷ একুশের রাজ্য বিধানসভায় সব পক্ষের নজর তাই মহিলা ভোটারের দিকে বলেই মনে হচ্ছে৷
একসময় বিহারে মহিলাদের ভোট টানতে নীতীশকুমার সে রাজ্যে মদ নিষিদ্ধ করে মেয়েদের বিরাট সমর্থন পেয়েছিলেন৷ নির্বাচন কমিশন এ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের নির্ঘন্ট ঘোষণা করার পর থেকে ভোটে অংশগ্রহণকারী দলগুলির প্রচার দেখে মনে হচ্ছে আসন্ন বিধানসভা ভোটে তুরুপের তাস হতে পারে মহিলা ভোট৷
শতাংশের হিসাবে সামান্য হলেও দলীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ভোটের প্রার্থী এবং ভোটার হিসাবে মহিলারা বাম শিবিরে বরাবর গুরুত্ব পেয়ে এসেছে৷ এবার ক্ষমতায় ফিরে এলে মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বামেরা ‘নেবারহুড কমিটি’ তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন৷ ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেড মঞ্চে মাইক নিয়ে দেখা গিয়েছে জেএনইউ খ্যাত ঐশী ঘোষ, দীপ্সিতা ধরকে৷ সুযোগ পেয়ে ভাষণে তাক লাগিয়েছেন জনজাতী নেত্রী দেবলীনা হেমব্রম। ওঁদের তিনজনেই এবার বিধানসভা ভোটে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী। অন্যদিকে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বামদের হয়ে লড়ছেন মীনাক্ষি বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ঝাড়গ্রামে কেন্দ্র থেকেও বাম প্রার্থী হয়েছেন মধুজা সেনরায়। ওই কেন্দ্রে তাঁর বিরুদ্ধে লড়ছেন আরেক মহিলা তৃণমূল প্রার্থী বীরবাহা হাঁসদা।
‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’— রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের এই শ্লোগান লেখা হোর্ডিং ও ব্যানার দেখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তারা ২১-এর ভোটে মহিলাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা কেবল যে এই শ্লোগানকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন তাই নয়, ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী তালিকাতেও এবার আগের তুলনায় মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য হলেও বেড়েছে। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় ২০১৬ সালে মহিলা নাম ছিল ৪৫টি৷ এ বার সেখানে আরও পাঁচটি যোগ হয়ে মহিলা প্রার্থী বেড়ে হয়েছে ৫০৷
প্রশ্ন উঠতেই পারে একুশের লড়াই কঠিন হয়ে ওঠাতেই কি মহিলা ভোটার ও প্রাথীদের তুরুপের তাস করার চেষ্টা হচ্ছে৷ একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ইত্যাদি প্রকল্পগুলি মমতাকে মহিলা মহলে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলবে৷ পাশাপাশি শাসক দল তাদের ভোট প্রচারে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলা নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরেও বিরোধীদের বিপাকে ফেলতে কসুর করছে না৷ ইতিমধ্যে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কলকাতার রাজপথে মিছিল করেছে তৃণমূল মহিলা কংগ্রেস৷ সেখানে মমতার পাশে হেঁটে নারী সুরক্ষার বার্তা দিয়েছেন তৃণমূলে যোগ দেওয়া অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া, সাংসদ মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহানের মতো নেত্রীরা৷ মেয়েদের ভোটের কথা মাথায় রেখে তাঁরা সামিল হয়েছিলেন রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে৷
এখন পর্যন্ত ভোট নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূল দুই শিবিরের মিটিং, মিছিলে মহিলা প্রসঙ্গ যেভাবে ঘুরে ফিরে আসছে তাতে স্পষ্ট একুশের ভোটে মেয়েদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে। বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতা আগেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকার জন্য ছিলেন ‘অগ্নিকন্যা’। ‘দিদি’ থেকে হয়েছেন ‘ঘরের মেয়ে’, মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার পর বাংলার ‘বাংলার মা’, ‘বাংলার গর্ব’, এবার তিনি হতে চাইছেন ‘বাংলার ঘরের মেয়ে’। বাংলার মসনদে তৃতীয়বার ফিরে আসতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল কংগ্রেস যেমন ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগানকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চাইছে, অন্যদিকে গেরুয়া শিবির বাংলায় মমতার একচ্ছত্র জনপ্রিয়তার রাশ টেনে কুর্সি দখলের মরীয়া চেষ্টায় তাদের দলের মহিলা বাহিনীকে দাঁড় করাচ্ছে। জাতপাত, ধর্মীয় ইস্যুর পাশাপাশি মহিলা আবেগকেই পুঁজি করতে চাইছে ভোট বৈতরণী পেরোতে। মহিলা আবেগকে উস্কে দিতে তাদের হোর্ডিং-এও উঠেছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী, সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, ভারতী ঘোষ, মেহফুজা খাতুন, শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী, তনুজা চক্রবর্তী, ফাল্গুনি পাত্র, অগ্নিমিত্রা পাল প্রমুখ ন’জন বাঙালি মেয়ের ছবি।
তবে জাতীয় রাজনীতিতে এইমুহুর্তে যে কজন মহিলা রাজনীতিক রয়েছেন তাঁদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। জয়ললিতা প্রয়াত হয়েছেন। মায়াবতীর হাতে ক্ষমতা নেই। সনিয়া গান্ধী অসুস্থ। একমাত্র তৃণমূললনেত্রী এখনও রাজ্যপাটে সক্রিয়।
মহিলা ভোটার ও প্রাথীদের তুরুপের তাস করে ভোট বৈতরণী পেরতে শাসকদল কিংবা বিরোধীদের কৌশল যে খুব নতুন
তা নয়, কিন্তু লেখক বিষয়টাকে তার লেখায় খুব ভালভাবেই ধরেছেন, ব্যাখ্যাটাও সবদিক থেকে বেশ ভাল।
কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মহিলা মহলে জনপ্রিয় করে তুলছে একথা ঠিকই, কিন্তু
তাঁরই দলের বহু মন্ত্রী-নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ কি বাংলার মেয়েরা ভুলে গেছেন, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও কি ভুলে
গেছেন? দলত্যাগীরা সুযোগ সন্ধানী কিন্তু এতদিন দল তাদের সহ্য করল কিভাবে?
then what is the point, even if they are trump cards, will they get the respect and dignity they deserve in the society?
মেয়েদের ভোটটা না হয় ‘তুরুপের তাস’ হল কিন্তু মেয়েদের অধিকার-মর্যাদা-প্রাপ্য সম্মান সেটার কি হবে?
কবে কোন রাজনৈতিক দল ভোটের রাজনীতি বাদ দিয়ে সেটা ভাববে?
বেশ ভাল লেখা, যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা এবং বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ। লেখক ও পেজফোর উভয়কে ধন্যবাদ দিয়ে বলি; এ ধরণের
বিষয়গুলিতে যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ থাকা যায় ততই মঙ্গল।