দফায় দফায় জর্জরিত এবারের ভোটে প্রথমেই ভোট দেবেন যেসব জেলার মানুষ, পুরুলিয়া তাদের একটি। তবে কেবল সর্বোচ্চ দফা-সংখ্যাই নয়, এবার ভাগ করা হয়েছে জেলাকেও। অর্থাৎ কোনো জেলাকে দু’টি ভাগে বা তিন ভাগে ভাগ করে ভোট নেওয়া হবে। তবে পুরুলিয়ার সবক’টি আসনে ভোট হচ্ছে প্রথম দফাতেই।
পুরুলিয়ায় ৯টি আসনে ভোট ২৭ মার্চ। নানা কারণে এবার এই জেলার ভোট নজর কেড়েছে পর্যবেক্ষকদের। অবশ্যই আপাত ভাবে প্রধান কারণটি হলো, লোকসভা নির্বাচনে এ জেলাতে বেশ ভালো ফল করেছে বিজেপি। প্রায় দু’বছর আগের সেই ভোটে এতটাই চমক ছিল যে রাজনীতির সব পক্ষ নড়েচড়ে বসে। তৃণমূল কংগ্রেসে আসে নানা পরিবর্তন, বিজেপিও রাজ্য দখলের সঙ্কল্প করে তখন থেকেই। করোনা লকডাউনে রাজনীতির রথী-মহারথীরা কয়েক মাস অন্যদিকে মন দিলেও চলতে থাকে নিঃশব্দ প্রস্তুতি। প্রায় এক বছর হতে চলল লকডাউন উঠে গিয়েছে, আর তুঙ্গে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রথমেই দেখে নেওয়া যাক, কী হয়েছিল এই জেলার গত বিধানসভা ও লোকসভার ভোটে।
পুরুলিয়া জেলায় ৯টি বিধানসভা আসন। এর মধ্যে দু’টি আসন আদিবাসীদের জন্য ও দু’টি আসন তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত। মনে রাখতে হবে, গত বিধানসভার ভোটে বামফ্রন্ট ও জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯-এ সমঝোতার চেষ্টা হলেও তা ভেঙে যায়। ২০১৬ সালে ৭টি আসন গিয়েছিল তৃণমূলের ঝোলায়, দু’টি পেয়েছিল বাম-কংগ্রেস জোটের পক্ষে জাতীয় কংগ্রেস। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে ছবিটা বদলে যায়, ৮টি বিধানসভা ক্ষেত্রে ভালো ভোটে এগিয়ে যায় বিজেপি, ১টিতে প্রথম হয় তৃণমূল। বামফ্রন্ট তথা কংগ্রেসের অবস্থা হয়ে দাঁড়ায় করুণ। আসনগুলির সংক্ষিপ্ত ফল ছিল এরকম—
২৩৮ নং বান্দোয়ান (আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত) আসনে ২০১৬-তে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৭.৮৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বামফ্রন্টের ঝোলায় ছিল ৩৮.৫৩ শতাংশ সমর্থন। বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ। ২০১৯-এ তৃণমূল ৪১.৭০, বামফ্রন্ট ৯.০৮, বিজেপি ৪৩.০১ ও কংগ্রেস ১.৪১ শতাংশ ভোট পায়।
২৩৯ নং বলরামপুর আসনে ২০১৬-তে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল ৪৭.০২ শতাংশ ভোট পেয়ে। দ্বিতীয় হয় জাতীয় কংগ্রেস, তারা পায় ৪১.১৭ শতাংশ, আর বিজেপির মিলেছিল ৫.১২ শতাংশ ভোট। ২০১৯-এ তৃণমূল ৩৪.৬৪, বামফ্রন্ট ২.৭০, বিজেপি ৫৩.৫৬ ও কংগ্রেস ৩.৫৮ শতাংশ ভোট পায়।
২৪০ নং বাঘমুন্ডি আসনটি ২০১৬-তে জাতীয় কংগ্রেসের দখলে যায়, তারা পেয়েছিল ৪৭.১৬ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় তৃণমূল ৪২.৫৯ শতাংশ, বিজেপি পায় ৫.৯৬ শতাংশ। ২০১৯-এ তৃণমূল ২৪.১২, বামফ্রন্ট ৫.০৭, বিজেপি ৫০.৮৩ ও কংগ্রেস ১৪.৯৬ শতাংশ ভোট পায়।
২৪১ নং জয়পুর আসনে ২০১৬-তে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৭.৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে, বামফ্রন্ট ও জাতীয় কংগ্রেস জোট ৪২.৫২ শতাংশ পেয়ে দ্বিতীয় হয়। বিজেপি পেয়েছিল ৪.৫৮ শতাংশ। ২০১৯-এ তৃণমূল ২৮.৯৩, বামফ্রন্ট ৬.৮৬, বিজেপি ৪৫.২৩ ও কংগ্রেস ১৩.৮৬ শতাংশ ভোট পায়।
২৪২ নং পুরুলিয়া আসনে ২০১৬-তে জাতীয় কংগ্রেস ৪৪.৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে, তৃণমূল ৪১.৮৯ শতাংশ পেয়ে দ্বিতীয় হয় এবং বিজেপি ৬.৯৯ শতাংশ ভোট পায়। ২০১৯-এ তৃণমূল ৩৩.৭৫, বামফ্রন্ট ৫.০৯, বিজেপি ৫২.৩৪ ও কংগ্রেস ৪.৫৩ শতাংশ ভোট পায়।
২৪৩ নং মানবাজার (আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত) আসনে ২০১৬-তে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৮.৭২ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে, বামফ্রন্ট ৪৩.৬৯ শতাংশ পেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। বিজেপি মাত্র ৪.৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ২০১৯-এ তৃণমূল ৪৬.২০, বামফ্রন্ট ৬.৬১, বিজেপি ৪০.৯৯ ও কংগ্রেস ১.৪৪ শতাংশ ভোট পায়। ২০১৯ সালে সারা জেলার মধ্যে কেবল এই আসনেই তৃণমূল লিড পেয়েছিল।
২৪৪ নং কাশীপুর আসনে ২০১৬-তে তৃণমূল কংগ্রেস ৪৮.৭১ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে, দ্বিতীয় হয় বামফ্রন্ট, তাদের ঝোলায় পড়েছিল ৩৭.৮১ শতাংশ। বিজেপি ৬.৩৯ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়। ২০১৯-এ তৃণমূল ৪০.০৩, বামফ্রন্ট ৩.৯৪, বিজেপি ৪৮.৬৬ ও কংগ্রেস ২.০০ শতাংশ ভোট পায়।
২৪৫ নং পারা (তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত) আসনে ২০১৬-তে ৪৭.৫৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ৩৯.৭৬ শতাংশ ও বিজেপি ৬.২৬ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিল।২০১৯-এ তৃণমূল ৩১.৬৪, বামফ্রন্ট ৪.৮৭, বিজেপি ৫৩.৮৩ ও কংগ্রেস ৩.০০ শতাংশ ভোট পায়।
এ জেলার আরেকটি আসন ২৪৬ নং রঘুনাথপুর (তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত) আসনে ২০১৬-তে ৪৩.৩৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জেতে তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্টের ৩৫.০২ শতাংশ ও বিজেপির ১৩.৯২ শতাংশ ভোট মিলেছিল।২০১৯-এ তৃণমূল ৩৩.০৭, বামফ্রন্ট ৫.৬৯, বিজেপি ৫৪.০৫ শতাংশ ভোট পায়। লোকসভা ভোটে এই আসনে কংগ্রেস বামফ্রন্টকে সমর্থন জুগিয়েছিল।
সারা জেলার ভোট প্রাপ্তির তুলনা করলে দেখা যাবে, সমস্ত আসনগুলিতে তৃণমূল, বাম এবং কংগ্রেসের সমর্থন কমেছে, বেড়েছে একমাত্র বিজেপির। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে শাসক দলটি পুরুলিয়া জেলার ৫টি বিধানসভা ক্ষেত্রে পঞ্চাশ শাতংশের বেশি সমর্থন পায় ২০১৯ সালে। আবার ২০১৯-এ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল ৪০ শতাংশের কম ভোট পেয়েছে ৬টি আসনে।
গত দু’টি ভোটের হিসেব দেখলে আরও একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার দৃষ্টি কাড়ে। সেটি হলো, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট কমেছে দারুণ ভাবে। সামান্য কিছু ভোট বাদে প্রায় পুরো বাম-কংগ্রেস ভোটই গিয়েছে অন্য ঝোলায়। হয়তো বেশির ভাগটাই বিজেপি দখল নিয়েছে। কিছুটা তৃণমূলের কাছেও গিয়েছে থাকতে পারে বলেই মনে করেন অভিজ্ঞ মহল। অন্তত ২০১৯ সালে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসকে ভোট দেওয়াটা ভোট নষ্ট করা, এই চিন্তাই হয়তো বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সমর্থকদের অন্য প্রতীকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তৃণমূলের ভোটও যেহেতু প্রায় সব আসনেই কমে গেছে, তাই তাদের ভোটের একটা অংশও বিজেপির দিকে যাবার সম্ভাবনাটাই মনে আসে।
ভোটের এই হিসেব যা বলছে, তা কিন্তু ২০২১-এ প্রযোজ্য নয়। সেটা ছিল লোকসভার ভোট, এটা বিধানসভার নির্বাচন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবথেকে জনপ্রিয় নেতা। তিনি বলেছেন, সব আসনেই তিনি প্রার্থী। ফলে তৃণমূল ভোট বাড়াতে পারে মমতার জনপ্রিয়তাকে সামনে রেখে। আবার লোকসভা ভোটে পুলওয়ামা-বালাকোটকে কেন্দ্র করে যে তীব্র উগ্র জাতীয়তাবাদী ঝড় উঠেছিল, তা স্তিমিত হয়ে গিয়েছে। সেই ঝড়ে ২০১৯ সালে বিজেপি অনেকটাই লাভবান হয়েছিল, যেটা এবারে ততটা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া রাজ্য সরকারের নানা জনমুখী কাজও মানুষের বিবেচনায় থাকছে।
পুরুলিয়া জেলায় একটা বড় অংশের ভোটার আদিবাসীরা। লোকসভার ভোটে এদের একটা বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। বাম-কংগ্রেস ভোট তো বটেই, কিছু তৃণমূল ভোটও বিজেপির দিকে গিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। আদিবাসীরা কেন বিজেপির দিকে গিয়েছিলেন? সমাজের সবথেকে পিছিয়ে পড়া মানুষদের অনেকেই সাঁওতাল, মুন্ডা বা আরও নানা ধরনের আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত। আদিবাসীদের অধিকার, নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও ঐতিহ্য রক্ষায় যখন সারা দেশ জুড়ে বিজেপি-বিরোধী আন্দোলন মাথা তুলছে, তখনই বঙ্গে এহেন ঘটনায় কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ পড়ছে অনেকেরই। নানা কারণকে এসবের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। নানা রাজনৈতিক ও স্থানীয় কারণ ছাড়াও আরও গভীর কোনো কারণ কি রয়েছে? যে আদিবাসীরা এতকাল তাদের নিজস্ব ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা কি বিজেপির হাত ধরে হিন্দু ধর্মের স্যাটেলাইটে পরিণত হতে রাজি হচ্ছেন? বিশেষ করে এদের মধ্যে সম্পন্ন সম্প্রদায়? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।