৩১শে ডিসেম্বর। রাত এগারোটা পঞ্চাশ। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাজি-পটকার ধামাকা। রাত বারোটার পরে সে ধামাকা আমাদের বারোটা বাজিয়ে দেবে। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে হবে না? তাই বাজি-পটকার ধূম। এখন অবশ্য যে কোন অনুষ্ঠানেই এসে যায় বাজি-পটকা। অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, বিয়ে, রং-বেরঙের পুজো–আচ্চা, ভোটের ফল। বাকি আছে মৃত্যু। এরপরে হয়তো মৃতদেহ নিয়ে যাবার সময়, অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার সময় বাজি ফাটতে থাকবে। শব্দদূষণ নিয়ে প্রতিবাদ থাকবে, বাজি-পটকাও থাকবে। এই রকম সহাবস্থান একটা প্রাপ্তি।
বাজির শব্দে চমকে চমকে উঠছে আমাদের ঘরের দিশি কুকুর, যার নাম নিমকি। আমিও চমকে উঠছি, আর ভাবতে শুরু করেছি একুশ শতকের পঁচিশটা বছর কেমন ফুস করে কেটে গেল। নিমকিকে ছেড়ে বিছানায় যেতে পারছি না। তাই সময় কাটাবার জন্য মনে মনে হিসেবের খাতা খুলে বসলাম। কি পেলাম, কি হারালাম, তারই হিসেব। এসবের কোন দরকার নেই, এসবের কোন উপযোগিতা নেই। আর এসবের মূলে আছে আবেগ। আমি গত শতকের মানুষ, তাই আবেগটা মরে যায় নি। কারোর কষ্টের কথা শুনলে চোখে জল আসে, সুখবরে হাসি আসে। নব শতকের তরুণ বন্ধু বলল, অবশ্যই ইংরেজিতে ‘ইমোশনাল ফুল’।

একুশ শতকের প্রথম পঁচিশের প্রাপ্তি হল আবেগের বিনষ্টি। ন্যাতানো কলাপাতার মতো আবেগ পড়ে আছে মানব সংসারের আস্তাকুঁড়ে। আবেগের কথাটা বেশি করে আসে প্রেমের ক্ষেত্রে। প্রেমাবেগ কি আছে? না, নেই। একটুকু ছোঁয়া লাগলে এখন আর শিহরণ জাগে না, চোখের আলোয় চোখের বাইরে কিছু দেখা যায় না। যে কৌতূহল, যে রোমাঞ্চ প্রেমকে প্রাণ দেয়, তার প্রাণবায়ু নিঃশেষিত। নিছক জৈবিক সত্তার বাইরে যে কিছু আছে, থাকতে পারে, সেই অনুভূতিও ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। এখন সব কিছু প্রত্যক্ষ, উপযোগিতার তত্ত্বে বিচার্য। ভালো না লাগলে টা টা, প্রেমের জন্য আত্মদান আবার কি? একই কথা দেশপ্রেমের ব্যাপারেও। যদি গত শতকের ক্ষুদিরামদের কথা কেউ বলে, তাহলে এক ঝটকায় বলা যাবে, ও তো বাড় খাওয়া ক্ষুদিরাম। দেশপ্রেম আমাকে কতটা দেবে, তার বিচার আগে করতে হবে। আবেগপ্রবণ বোকাদের মতো কাজ-কারবার চলবে না।
বেগ আর আবেগের পার্থক্যটা জানা চাই। এই পঁচিশটা বছর গতির বেগ দিয়েছে না? দূরকে করেছ নিকট বন্ধু। গত শতকেই সেই দূরকে নিকট করেছিল দ্রুতগামী যানবাহন। এখন আবার অতি অতি দ্রুতগামী যানবাহন তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। ভোরবেলায় কলকাতায় চা খেয়ে বিকেলে লণ্ডনে চা খাওয়া যায়। ভোর থেকে বিকেল? এতটা সময়? আরে মশাই, টাইম ইজ মানি। ফোন আছে, টুইটার আছে, ফেসবুক আছে, আরও কত কি আছে। সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্কে ছেলের সঙ্গে কথা বলা যায়, কোম্পানির কাছে মেসেজ চলে যায়, ভার্চুয়াল বৈঠক সেরে ফেলা যায়। করোনাসুরের আবির্ভাবের পরে তো অন লাইন ব্যবসা থেকে পড়াশুনো সবই চলছে। কত অল্প সময়ের মধ্যে কত কি করা যায়, কত যোগাযোগ, কত কানেকশন, কত এসপার ওসপার।
গত শতকের মানুষ আমি, একটু কবিতা করে বলি : পৃথিবীতো হাতের মুঠোয়, ভালো কথা, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের এত দূরত্ব কেন? এ আবার কি কথা! কাছে আছে, অথচ যোজন যোজন দূরত্ব। হ্যাঁ, তাইতো। মানুষের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক, সেই যে বেঁধে বেঁধে থাকার কথা, সে আর নেই। এখন আমরা একক, নিঃসঙ্গ। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে কোন আবেগ নেই, সে সম্পর্ক বিশুদ্ধ নৈর্ব্যক্তিক। একুশ শতকের ছেলে-মেয়ে তুড়ি মেরে উঠিয়ে দেয় বটে, কিন্তু মনে মনে স্বীকার করে যে তাদের হৃদয় অরণ্যের অন্ধকার বাড়ছে তো বাড়ছেই। একেই তো মনোবিজ্ঞানে আ্যালিইনেশন বলে, না কি! এর জন্যই মনের অসুখ বাড়ছে তো বাড়ছেই। কোথায় সেদিন পড়লাম, আগামী কয়েক বছরে ক্যানসারকে হার মানিয়ে দেবে এই অসুখ।

মানব সম্পর্ককে ক্রমাগত ঘা মারছে ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। যাদের উদ্ভাবনের শেষ নেই। উদ্ভাবকরাই মানুষের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রলোভিত করছে। জড় যান্ত্রিকতা পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, বৃহত্তর মানব সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে মানুষকে। আর আছে তথ্য, তথ্যের স্তূপ, তথ্যের ভয়ংকর বিপ্লব। তার সঙ্গে আছে এ আই। সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা মুছে একাকার। ছাগলকে কুকুর বলে চালিয়ে দেওয়া, কিংবা কুকুরকে ছাগল। নিপাট ভালো মানুষের পাগল হবার জোগাড়। আর ওই সোশ্যাল মিডিয়া। খুরে খুরে দণ্ডবৎ তোমাকে। তোমার কৃপায় ভাই পঙ্গু গিরি লঙ্ঘন করে, মূক বাচাল হয়।
লিখতে লিখতে রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেল। বাজি-পটকার শব্দ থেমে গেছে। আমাদের নিমকি এখন শান্ত। তাকে তার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আমি আমার বিছানার দিকে এগোলাম। তখনই পঁচিশ বছরের আরও এক প্রাপ্তির কথা মনে পড়ল। সে হল কৃত্রিম আলোর বন্যা। রাতকে দিন করার আশ্চর্য কৌশল। রাতকে দিন করার ফলে মানুষের নিদ নাহি আঁখিপাতে। নিদ্রাহীনতার অভিশাপে ভুগছে মানুষ। শাস্ত্রে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাবার কথা বলা হয়েছিল। এখন আমার মতো গত শতকের মানুষ বলছে আলো থেকে নিয়ে যাও অন্ধকারে। যে অন্ধকার ভূমিগর্ভে অঙ্কুরিত হয় বীজ, যে অন্ধকার মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেয় নবজাতক।
একেবারেই যথাযথ লেখা।এখনকার অবস্থানকে এর চেয়ে ভাল করে বোঝানোর যায় না।ধন্যবাদ লেখককে।
লেখকের আমি একজন গুণগ্রাহী ভক্ত।তবে একটু সংযোজন করি, উত্তর কলকাতার বিধুশ্রী সিনেমা হলের পাশের গলি কে ধাঙ্গর পট্টি বলা হতো, সেখানে কেউ মারা গেলে জয় ঢাক (ব্যান্ড/তাশা) বাজিয়ে মৃত দেহ সরকারের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো। পটকা ও ফাট তো।
সব কি নেতিবাচক? এই সময়ে অনেক পেয়েছি আমরা। বিশেষত এই পঁচিশ বছরে। গ্রামে না গেলে পাওয়া বোঝা যাবে না।