একঘেয়ে কেজো জীবন থেকে মুক্তি পেতে কে না চায় বলুন! বয়স বাড়ার সঙ্গে টেনশন, স্ট্রেস যেভাবে বাড়ছে, তাতে কয়েক মাস একটানা কাজকর্ম করলেই শরীর, মনে ক্লান্তি নেমে আসে। ক্লান্ত শরীর, ভারাক্রান্ত মন কাজের গতি কমিয়ে দেয়। তাই মাঝে মধ্যে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়া দরকার। বেশ কয়েক বছর আগের কথা, এমনই একদিন শীত পড়ার মুখে, পুজোর গায়ে গন্ধ মেখে বেরিয়ে পড়েছিলাম অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। হাওড়া থেকে রাতের চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে চেপে বসলাম একরাশ সংশয় আর আশঙ্কা নিয়ে, কি জানি কি অভিজ্ঞতা হবে জঙ্গলমহল গিয়ে।
সে যাই হোক, ট্রেনে ছাতিম ফুলের গন্ধে আর বাতাসে ঠান্ডার ঝটকায় কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই, ঘুম ভাঙলো অতি পরিচিত চায়ের ডাকে। পূব আকাশ তৈরি হয়েছে তখন আলো বিলোবার জন্য, মাটির সোঁদা গন্ধ মেখে ট্রেন ছুটে চলেছে পুরুলিয়ার পানে।এবার নামার পালা।

বহু স্মৃতির স্মারক দলমা পাহাড়ের একটি অংশ ও পূর্বঘাট পর্বতমালার একটি সম্প্রসারিত অংশ পুরুলিয়ার এই অযোধ্যা পাহাড়। অযোধ্যা পাহাড়ের প্রাচীন নাম ছিল অঝোইদা। অঝোই শব্দের অর্থ অঝোর অর্থাৎ পাহাড়ের প্রচুর ঝরনা ও মাটির নিচে জলের অফুরন্ত উৎস দেখেই এই নামকরণ।
আগে পুরুলিয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর বাংলাভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমাটি পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়। পুরুলিয়া তিনদিন জুড়ে ঝাড়খন্ড রাজ্য আর পূর্বসীমান্তে পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া ঝাড়গ্রাম জেলার কিছু অংশ। অযোধ্যা পাহাড়ের উচ্চতম শৃঙ্গটি হল চেমটোবুরু।

অযোধ্যা পাহাড় ঘুরতে আমি সাহায্য নিয়েছিলাম লোকাল এক গাইডের। চাইলে আপনারাও নিতে পারেন কারণ এখানে জিপিএস, মোবাইল নেটওয়ার্ক বেশ দুর্বল। ভ্রমণের শুরুতে প্রথমেই গেলাম মার্বেল লেক। এরপর বামনী ফলস। ফলসের কাছে পৌঁছানোর জন্য আপনাকে পাহাড়ের নিচে প্রায় ৫০০ মিটার হেঁটে যেতে হবে। পুরোটাই সিঁড়ি আগে পাথরের ছিলো এখন কংক্রিটের তৈরি হয়ে গেছে। সবুজ ঝোপঝারের মধ্যে দিয়ে জঙ্গলের ট্রেকিং-এর এক অনন্য অভিজ্ঞতা আপনি লাভ করতে পারবেন।
এরপর এলাম তুর্গা ফলস। জায়গাটি এতটাই মনোরম যে, ট্রেকিংয়ের স্ট্রেস আপনাকে ভুলিয়ে দেবে। জলপ্রপাতের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর। পাথর গুলোর উপর দিয়ে জল যখন দ্রুত প্রবাহিত হয় তখন প্রকৃতিতে ক্যাসকেডিং এফেক্ট তৈরি হয়। এখানকার জল পাম্পিং করে বাগমুন্ডিতে পাঠানো হয়।

এরপর খয়রাবেরা ড্যাম। নিরিবিলি পরিবেশে দুধারে পাহাড় আর মধ্যিখানে দেড় কিলোমিটার লম্বা খয়রাবেরা ড্যাম। চাইলে আপনি এখানে একদিন রাত্রিযাপনও করতে পারেন। পাহাড়সারি চেংটাবুরুর কোলে প্রায় কয়েক একর জায়গা জুড়ে তিনটি কটেজ আর সাতটি স্থায়ী তাঁবুতে সমৃদ্ধ খয়রাবেড়া ইকো-অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প। অবসরযাপনের এই অপরূপ লোকেশনে পাবেন টাটকা সবজি, দেশী মুরগির ঝোল, পোস্তর বড়া … আরও অনেক কিছু।
এর কাছেই চড়িদা গ্রাম। পাহাড়ি পর্যটনে অন্যতম আকর্ষণ মুখোশশিল্প রয়েছে এখানে। তবে সেরকম প্রচার এখানে নেই। একমাত্র সরকারি পর্যটনের প্রচারে ছৌ নাচ এখানকার মূল আকর্ষণ। যদিওবা ছৌ নাচের মূল আকর্ষণই হলো মুখোশ।

এখান থেকে পাখি পাহাড়। সবুজ বনে আচ্ছাদিত পাহাড়টি ময়ূর-সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল, তাই এর নাম পাখি পাহাড়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীর গুপ্ত রাজবংশের দ্বারা নির্মিত বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির ও ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যেমন চারিদা মন্দির, অপূর্ব স্থাপত্য এবং জটিল খোদাইয়ের জন্য পরিচিত হনুমান মন্দির, পঞ্চকোট প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এবং আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে এখানে।
এছাড়া লহরিয়া ড্যাম, রয়েছে শিব মন্দির, পিকনিক স্পট; মুরশুমা ড্যাম যেখানে সুইসাইড পয়েন্ট বিখ্যাত দেখতে পারেন।

এখানে এলে অবশ্যই যাবেন সীতাকুণ্ডতে। স্থানীয় মানুষেরা বলে থাকেন, ত্রেতাযুগে বনবাসের সময় এখানে আড়াই দিনের জন্য রামচন্দ্র সীতাদেবী এখানে এসেছিলেন। সীতাদেবী তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে রামচন্দ্র তীর ছুড়ে মাটি ভেদ করে এই স্থান থেকে জল বের করে আনেন। আদি অনন্তকাল ধরে মাটির নিচ থেকে অনবরত স্বচ্ছ পরিষ্কার শীতল জল বেরিয়ে আসছে এখানে। বৈশাখী পূর্ণিমায় স্থানীয় অধিবাসীরা পশু শিকারের উৎসবে মেতে ওঠেন, তাদের কাছে সীতাকুন্ডের জল খুবই পবিত্র। প্রস্রবণের আরেকটি মুখ এখানে আছে তবে সেটি বিপর্যস্ত এখন আর সেখান থেকে জল বেরোয় না।
কুন্ডের সামনে শালবনে সীতার কেশ জড়ানো ডালপালা বিক্রি দেখে চললাম বামনী ঝর্ণার পথে। পাথুরে পথে নেমে ঝর্ণা দর্শন, তারপর নজর মিনারে উঠে ড্যাম দর্শন। শেষে টুরগা ঝর্ণায়। রোমান্টিক ঝর্ণা নুপুরের ছন্দে বয়ে চলেছে আপন মনে। এই ঝর্ণাকে বেঁধেই তৈরি হয়েছে টুরগা বাঁধ। পৌষ সংক্রান্তিতে টুসু পরবের মধ্যে মেতে ওঠে গ্রাম। আদিবাসী গ্রাম ঘুরে পাহাড়ের গায়ে বিশাল বাঁধে পৌঁছে গেলাম যেখানে জলবিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে হ্রদের জলে। হ্রদ ছাড়িয়ে চোখে পড়ল কাশবন হাওয়ায় দোল খাচ্ছে মেঘের মতো। সৌন্দর্যের এই রূপ বর্ণনার অতীত।

অযোধ্যার অরণ্যে এখনও চিতা, জংলি কুকুর, মুরগি, ময়ূর, হরিণ, খরগোশ, ময়ূরও দেখতে পাওয়া যায়। তবে একদিনে এতগুলো স্পট দেখতে পাওয়া যাবে না এখানে অন্তত দুই থেকে তিন দিন হাতে নিয়ে ঘুরতে আসুন। বনদপ্তরের ট্যুরিস্ট বাংলো রয়েছে অযোধ্যা পাহাড়ে। এছাড়াও ওয়েস্ট বেঙ্গল কমপ্রিহেনসিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের লজগুলি একেবারে পাহাড়ের মাথায়। পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে টুরগা বাঁধের কাছে টুসু মেলা বসে। এছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তিতে অযোধ্যার কাছেই বসে লহরিয়া বাবার গাজন মেলা।

এখানে এলে অবশ্যই ট্রাই করবেন ভাবরা ভাজা (Bhabra Fry) জিলিপির মতো দেখতে নোনতা তেলেভাজায় একবার কামর বসালেই মন ভরে যাবে। পুরুলিয়াতে যেমন জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়ে, সেই ঠান্ডায় চায়ের সঙ্গে মিষ্টি নোনতা তেলে ভাজা দুর্দান্ত খেতে লাগবে। দামও বেশি নয় পাঁচ থেকে ছয় টাকা।

অযোধ্যা নিজরূপে সমৃদ্ধ একটি পাহাড় যার ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ, তার গায়ে হেলান দেওয়া নীল আকাশ। শাল গাছের শাখায় শাখায় ফুলের বাহার। মন চাঙ্গা রাখার রসদ জোগার করতে সপ্তাহান্তের ছোট্ট ভ্রমণে পৌঁছে যেতে পারেন অযোধ্যা পাহাড়ে।
বাঃ ! চমৎকার বর্ণনা। পড়তে পড়তে মানসভ্রমণ হবে পাঠকের।
খুব খুশি হলাম আপনার মতামত পেয়ে।