এবারের আট দফা ভোটের দীর্ঘ পথ চলা চলছে। পেজ ফোর নিউজের পাতায় ভোট বোঝার নানা লেখালিখিও প্রকাশিত হচ্ছে, যা নিয়ে চিন্তার অবকাশ থাকছে। চলতি ভোটে বেশ কয়েকটি জেলায় একদফায় ভোটগ্রহণের বদলে একাধিক পর্বে ভোট নেওয়া চলছে। তেমনই এক জেলা পূর্ব মেদিনীপুর। প্রথম দফায় ওই জেলার ৭ কেন্দ্রে ভোট হয়েছিল। বাকি ৯টি আসনের জন্য মানুষ মতামত দিলেন দ্বিতীয় দফায়, ১ এপ্রিল। কী হতে পারে এই আসনগুলিতে? আকাশকুসুম কল্পনা না করে দেখে নেওয়া যাক, গত দু’টি সাধারণ নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০১৬-র বিধানসভা এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে নানা দলের প্রাপ্তির ছবিটি।
পয়লা এপ্রিল যে ৯টি আসনে ভোট হয়, সেগুলি হলো নন্দীগ্রাম, তমলুক, হলদিয়া, মহিষাদল, পাঁশকুড়া-পূর্ব, পাঁশকুড়া-পশ্চিম, ময়না, নন্দকুমার ও চণ্ডীপুর। দেখা যাক অদূর অতীতে এই আসনগুলিতে কোন দল কেমন সমর্থন পেয়েছিল।
২০৩. তমলুক (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৪.৪৭ | ৪২.৮৫ |
| বিজেপি | ৬.৬৩ | ৩৯.৮৬ |
| বামফ্রন্ট | ৪৪.৭২ | ১২.৭৯ |
| কংগ্রেস | ০.৯৭ |
২০৪. পাঁশকুড়া-পূর্ব (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৪.১৩ | ৪৩.৯৩ |
| বিজেপি | ৫.৫০ | ৩৯.৮৫ |
| বামফ্রন্ট | ৪৬.৭৪ | ১১.৬৪ |
| কংগ্রেস | ১.৪৮ |
২০৫. পাঁশকুড়া-পশ্চিম (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৪.১৯ | ৪৪.০৯ |
| বিজেপি | ৯.২৮ | ৪৫.৪২ |
| বামফ্রন্ট | ৪২.৬৮ | ৬.০৯ |
| কংগ্রেস | ২.৪২ |
২০৬. ময়না (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫০.২৫ | ৪৮.৩৩ |
| বিজেপি | ৩.২৪ | ৪২.৪০ |
| বামফ্রন্ট | ৫.৯৪ | |
| কংগ্রেস | ৪৪.২২ | ১.১৯ |
২০৭. নন্দকুমার (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৮.১১ | ৪৬.১৯ |
| বিজেপি | ৫.২১ | ৩৮.৯১ |
| বামফ্রন্ট | ৪২.৮০ | ১১.৮১ |
| কংগ্রেস | ০.৯৮ |
২০৮. মহিষাদল (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৮.১০ | ৪৬.৯৯ |
| বিজেপি | ৭.১৮ | ৩৮.৭৩ |
| বামফ্রন্ট | ৩৯.৬২ | ১০.৬৬ |
| কংগ্রেস | ১.১৯ |
২০৯. হলদিয়া (তফশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত) (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৩৯.৫৩ | ৫৯.১৫ |
| বিজেপি | ৬.৬৭ | ২৯.০২ |
| বামফ্রন্ট | ৫০.১৭ | ৮.৬৬ |
| কংগ্রেস | ১.১২ |
২১০. নন্দীগ্রাম (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৬৬.৭৯ | ৬২.৭৭ |
| বিজেপি | ৫.৩২ | ২৯.৯২ |
| বামফ্রন্ট | ২৬.৪৯ | ৪.৪৯ |
| কংগ্রেস | ০.৮৬ |
২১১. চণ্ডীপুর (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৪৮.৫২ | ৪৮.৫১ |
| বিজেপি | ৫.১৪ | ৪০.৯৮ |
| বামফ্রন্ট | ৪৩.৬৪ | ৮.৩৪ |
| কংগ্রেস | ০.৯২ |
ভোট প্রাপ্তির এই ছবিটায় প্রথমে তৃণমূলের ওঠাপড়া দেখে নেওয়া যেতে পারে। ৯টি ক্ষেত্রের ৮টিতেই তৃণমূলের ভোট সামান্য হলেও কমেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে কমাটা খুবই সামান্য, বলা যেতে পারে, প্রায় সমানই রয়েছে। কেবল হলদিয়া ক্ষেত্রে তৃণমূলের ভোটে একটা বড়সড় উত্থান লক্ষ করা যায়। বিধানসভা ভোটে এই জায়গায় তৃণমূলের মিলেছিল সাড়ে উনচল্লিশ শতাংশ, সে নির্বাচনে বামফ্রন্ট অর্ধেকের বেশি ভোট পেয়ে আসনটি জিতেছিল। লোকসভা ভোটে তৃণমূলের ভোট বেড়ে হয় উনষাট শতাংশের বেশি। বিধানসভা ভোটে তৃণমূল এই ৯টি কেন্দ্রের ৬টি জেতে, বামফ্রন্টের ভাগ্যে গিয়েছিল ৩ আসন। এবারে নন্দীগ্রাম আসনের দিকে তাকানো যেতে পারে। বিধানসভাতে এখানে তৃণমূল প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোট পায়। লোকসভাতে তা কিছুটা কমলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল প্রায় ৬৩ শতাংশ সমর্থন ধরে রাখে।
২০১৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের আসন সমঝোতা হয়েছিল। তাই বাম অথবা কংগ্রেসের ভোটের মধ্যে এই দুই শক্তির মিলিত সমর্থন ছিল, যদিও এসব এলাকায় কংগ্রেস খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিধানসভায় বামফ্রন্ট ৩টি আসন পায়, সেগুলি হলো তমলুক, পাঁশকুড়া-পূর্ব ও হলদিয়া। লোকসভা নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস সমঝোতা ভেঙে পড়ে, ফলে ওই দুই শক্তি আলাদা আলাদা হয়ে লড়ে। দেখা যায়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস উভয়ের সমর্থনই তলানিতে ঠেকেছে। বামফ্রন্ট সর্বোচ্চ ১২, সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ ভোট ধরে রাখতে পারে। কংগ্রেসের অবস্থা আরও করুণ হয়, কোথাও কোথাও তারা ১ শতাংশেরও নীচে নেমে যায়।
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট মূলত চলে যায় বিজেপিতে, যদিও একটা ছোটো অংশ তৃণমূলেও গিয়েছে বলে মনে হয়। ২০১৬ সালেও বিজেপি প্রান্তিক শক্তি ছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তারা ৯টি ক্ষেত্রের সবকটিতেই দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গড়ে তারা প্রায় ৪০ শতাংশ সমর্থন আদায় করে, যদিও নন্দীগ্রাম ও হলদিয়াতে তাদের ভোট ৩০ শতাংশের কম ছিল। মোটের উপর বলা যায়, ভোটের ভগ্যাকাশে বিজেপি দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। সেই আশাতেই এবারেও বিজেপি ভালো ফল করার দাবি করেছে। তবে পাঁশকুড়া পশ্চিম কেন্দ্রটি ছাড়া অন্য ৮ আসনেই বিজেপির ভোট তৃণমূলের থেকে কম ছিল।
২০১৯ ও ২০২১ সালের মধ্যে অবশ্য অনেক তফাত। মাঝখানে হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন, যেগুলিতে বিজেপি ও তার সহযোগীরা লোকসভার সমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। তারপরে এসেছে করোনা সংক্রমণ, লকডাউন, পরিযায়ী শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুর্দশা ইত্যাদি ইত্যাদি। করোনা পরিবেশেই বিহার রাজ্য বিধানসভা ও বেশ কয়েকটি উপনির্বাচনেও দেখা গেছে, এনডিএ-র বোট কমেছে। অন্যদিকে রাজ্যে স্বাস্থ্য সাথি, দুয়ারে সরকার, ছাত্রদের ট্যাব কেনার টাকা সহ নানা জনমুখী কাজ সদ্য সদ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি মেরুকরণের দিকেই নজর দিয়েছে বেশি। এক অদ্ভুত উত্তেজনাময় পরিবেশে ভোট হচ্ছে। মানুষের মন বুঝতে ঘুরে বেড়িয়েছি রাজ্যের নানা প্রান্ত। কথা বলেছি নানা লোকের সঙ্গে। মনে পড়ছে পাঁশকুড়ার এক মাঝবয়সি মানুষের কথা। নানা কথা বলে শেষমেশ ওঠবার সময় বললেন, দেখুন, আমরা অকৃতজ্ঞ নই। কারও নুন খেলে গুণ তার গাইবই। এটাই কি পূর্ব মেদিনীপুরের ভাষা? ২ মে বোঝা যাবে।