বয়স তাঁকে এখনও সেভাবে কাবু করতে না পারলেও বুকে পেশমেকার, তাছাড়া ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আসা, লাইনে দাঁড়ানো সবমিলিয়ে যে শারীরিক ধকল তাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়ির লোকের পক্ষে ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আর এবার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট নয়। কিন্তু নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার কোনওভাবেই ছেড়ে দিতে নারাজ। তাই একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে চিত্তরঞ্জনবাবু ভোট দিলেন বাড়িতে বসেই। সাহায্য করলেন চিত্তরঞ্জনবাবুর কৃতী সন্তান মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়।
মানবীর কথায়—আটানব্বই বছর ছুঁই ছুঁই বয়সে বাবা আজ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ভোট দিলেন বাড়িতে বসে। বাড়ির আশ পাশ ঘিরে ফেলেছিল সেন্ট্রাল ফোর্স। বাবাকে মনে হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন! স্যানিটাইজার স্প্রের শ্রাদ্ধ হোলো! ভোট অফিসার এই বয়সে বাবার কর্মদক্ষতা দেখে হতবাক। বললেন আমরা তো এই বয়সে থাকব না। আমাকে সরিয়ে দেওয়া হল নকল বুঁদিগড় থেকে। বাবা যাতে প্রভাবিত না হন। এই বয়সে কি প্রভাবিত হওয়া যায়! আর দূরে গেলেই কি প্রভাবের রেডিয়েশন কমে যায়! বড় একা লাগছিল বাবাকে সাময়িক তৈরি করা বুথের আড়ালে!
উত্তর ২৪ পরগণার নৈহাটির ৯৩/২ সঞ্জীবচন্দ্র চ্যাটার্জি রোডের বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম ভোট দিয়েছিলেন স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ১৯৫২ সালে। তিনি জন্মেছিলেন ১৩৩০ সালের ১ কার্তিক। হিসাব অনুযায়ী চিত্তরঞ্জন বাবুর বয়স এখন ৯৭। রবিবার তিনি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিলেন শারীরিক কারণে। কারণ প্রায় দশ বছর আগেই তাঁর পেশমেকার বসেছে।
জন্মসূত্রে চিত্তরঞ্জন অধুনা বাংলাদেশের যশোহরের মাগুরা সাবডিভিশনের মানুষ। তাঁর বাবা মহেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন রেলের কর্মী। সেই সূত্রে নৈহাটিতে এসে বসবাস। চিত্তরঞ্জনবাবুর জন্মও নৈহাটির রেল কোয়ার্টারে। পড়াশোনা বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত নৈহাটির দেড়শতাধিক বর্ষ উদযাপিত মহেন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে।

চিত্তরঞ্জনবাবুর খুব ইচ্ছে ছিল বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার। তার কথা অনুযায়ী, খেলার মাঠে গিয়ে খেলা দেখার আনন্দই আলাদা। এবারও তাই বলছিলেন, টিভিতে খেলা দেখে কি সেই উত্তাপ পাওয়া যায়। কিন্তু পেশমেকার ছাড়াও তাঁর কোমরেও সমস্যা রয়েছে। যার জন্য বেশীক্ষণ দাঁড়ানো বা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা করতে পারেন না। অগত্যা পোস্টাল ব্যালট বেছে নিতে হয়েছে।
চিত্তরঞ্জনবাবুর শ্রবণশক্তি ক্ষীণ কিন্তু মস্তিষ্ক সজাগ। এখনো নিয়মিত খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়েন। চাকরি থেকে অবসরের পরও বন্ধু মহলে রাজনীতির আলোচনাই তাঁর কাছে বেশি প্রিয়, সেই সঙ্গে ছিল গঙ্গার ধারে আড্ডা দেওয়ার প্রবল আকর্ষণ। প্রবীণ মানুষ হলেও আধ্যাত্মিক আলাপের থেকে রাজনৈতিক আলোচনাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। দমদমের জেশপস-এ বগি ওয়ার্কসে চাকরিতে ঢুকেছিলেন ১৯৬১-তে। সেখান থেকেই অবসর। এখন ভরসা এমআইএস-এর টাকা। তবে ভয় পান সুদ কমে যাওয়ার।
মানবীর কথায়—একসময় নিজেও ভোট নিতে গেছেন দূর গ্রামে, তখনকার গ্রামের লোকের আতিথ্য আজও তাঁর মনে পড়ে। আমি তাঁর মেয়ে, বেশ মনে আছে ভোট নিতে গেলেন বাবা দুদিন পর ফিরলেন হ্যারিকেন নিয়ে। বাবাদের এক অদ্ভুত আন্তরিক পৃথিবী ছিল। মানুষ তখন চারপাশের মানুষকে নিয়ে ভাবত। মোবাইল বা সেল ফোন তখনো মানুষকে সেল করে দিতে পারে নি। কানে হেড ফোন গুঁজে কৈশোর যৌবন তখনো একলা থাকাটাই সুখ এমন বিবেচনা করে নি। হ্যারিকেন ঘিরে আমরা একান্নবর্তী পরিবারের একপাল ভাইবোন তারস্বরে পড়ছি, বাবা-কাকারা একটু দূরে আলোচনা করছেন, তাস খেলছেন, গোটা সমাজটাই তখন একান্নবর্তী। ভোট তখনও প্রাণসংশয়ী হয়ে ওঠে নি। বাবা ভোট নিতে গেলে আমরা কাকী, জেঠিদের সঙ্গে বাড়ির ভেতরেই পিকনিক করতাম। ডিজিটাল বা ডিজিট হয়ে যায় নি মানুষ। তখন মানুষ তার আইডেনটিটির জন্য আধার নামক কার্ড-এ পর্যবসিত হয়নি। এটিএম মেশিন হাট্টিমাটিমটিমের মতো মাঠে ঘাটে ডিম পাড়া শুরু করে নি।
এখন চিত্তরঞ্জনবাবু খবরের কাগজের ভিতর দিয়েই ভুবন দেখেন। করোনা আর ভোট দুটোই তাঁর কাছে সমান প্রতিপক্ষ। এখনও সুস্থ মস্তিষ্কে আছেন বলেই, আগামী প্রজন্মকে শিক্ষা দেবেন বলেই, পোস্টাল ব্যালটে হলেও ভোট দেবেন। ব্যালটের দৌলতে কিছু নূতন লোকের মুখ দেখতে পাবেন, যারা ভোট নিতে আসবেন। চিত্তরঞ্জনবাবুর পুত্র সন্তান নেই বলে কোনো আক্ষেপ নেই। বৈবাহিক ও কর্ম সূত্রে মানবীরা তিন বোনই দূরে থাকে। চিত্তরঞ্জনবাবু থাকেন নার্স আয়াদের ভরসায়। এবারও চিত্তরঞ্জনবাবু মানবীকে জোর দিয়ে বলেছেন ভোট তিনি দেবেনই দেবেন।
চিত্তরঞ্জন বাবুদের দেখে আমাদের তথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রচূর কিছু শেখার আছে।যত আমরা শিখবো তত পরম্পরায় বোধ জীবিত থাকবে,সুস্থ চেতনা বহমান থাকবে।
শ্রদ্ধেয় শতক ছুঁই ছুঁই তরুণ আপনি যতটা সম্ভব ভালো থাকুন…
আপনার আশীর্বাদ আমাদের ওপর বর্ষিত হোক অক্লান্ত..
প্রণাম নতজানু…