সোমবার সপ্তম পর্বে পাঁচ জেলার ৩৪ আসনে ভোট। এর মধ্যে কলকাতার ৪টি আসন; কলকাতা বন্দর, ভবানীপুর, রাসবিহারী, বালিগঞ্জ। দক্ষিণ দিনাজপুরের ৬টি-কুশমণ্ডি, কুমারগঞ্জ, বালুরঘাট, তপন, গঙ্গারামপুর, হরিরামপুর। হবিবপুর, গাজোল, চাঁচল, হরিশচন্দ্রপুর, মালতিপুর, রতুয়া-এই ৬টি আসন মালদার। মুর্শিদাবাদের ৯টি আসন হল ফরাক্কা, সুতি, রঘুনাথগঞ্জ, সাগরদিঘি, লালগোলা, ভগবানগোলা, রানিনগর, মুর্শিদাবাদ, নবগ্রাম এবং পশ্চিম বর্ধমানের ৯টি হল পাণ্ডবেশ্বর, দুর্গাপুর পূর্ব, দুর্গাপুর পশ্চিম, রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, আসানসোল দক্ষিণ, আসানসোল উত্তর, কুলটি, বারাবনি।
উল্লেখ্য; কলকাতার ভবানীপুর, রাসবিহারী, বালিগঞ্জ, পশ্চিম বর্ধমানের জামুড়িয়া, আসানসোল উত্তর, আসানসোল দক্ষিণ, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, কুশমন্ডির আসনগুলি এই দফায় নজরকাড়া কেন্দ্র। এই দফায় মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুর আসনেও ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা আক্রান্ত হয়ে দুই প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে এই দুই আসনের ভোট হবে ১৬ মে।
তবে সোমবার সপ্তম দফায় সবথেকে বেশি নজর ভবানীপুর কেন্দ্রে। ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালে এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম সরকারের পতনের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সাংসদ। সে বারও মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য ভবানীপুর আসনকেই বেছে নেন তিনি। সেবার ভবানীপুরে ৫৪ হাজার ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা। ২০১৬-তে জিতলেও কিন্তু ব্যবধান অনেকটাই কমে যায়।
এবার ভবানীপুর আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী নন। তাঁর জায়গায় তৃণমূল প্রার্থী রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। উলটোদিকে বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ। তিনি সম্প্রতি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এসেছেন তার আগে নাকি তিনি বামপন্থী ছিলেন। এই কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী সাদাব খান ভোট অঙ্কে বিশেষ ফারাক গড়তে পারবেন বলে মনে হয় না। ভবানীপুর কেন্দ্রটি অবাঙালি প্রধান হলেও একটা সময় পর্যন্ত তৃণমূলেরই প্রভাব ছিল বেশি। গত কয়েক বছর ধরে তারা বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন। সেই ট্রেন্ডই কি বজায় থাকবে না রদবদল হবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
কলকাতা পোর্ট আসনটি গত লোকসভা পর্যন্ত তৃণমূলের দখলে। দলের প্রার্থী ফিরহাদ হাকিম রাজ্যের মন্ত্রী। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে তিনি ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটেও এই আসনে তৃণমূল রেকর্ড ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। মনে হচ্ছে এবারও সেই ধারাই বজায় থাকবে।
পশ্চিম বর্ধমানের জামুড়িয়া কেন্দ্রটি সপ্তম দফায় বিশেষ নজরে। এখানে সংযুক্ত মোর্চার সিপিএম প্রার্থী হয়েছেন জেএনইউ-এর নেত্রী ঐশী ঘোষ। ২০১৬ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয় পেয়েছিলেন বামপ্রার্থী সিপিএমের জাহানারা খান। এবার সেখানে তুলনায় একেবারে তরুণ ঐশীকে সিপিএমের প্রার্থী করা হয়েছে। উলটো দিকে রয়েছেন তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের নেতা হরেরাম সিং এবং বিজেপির তাপস রায়। এই কেন্দ্রে বরাবরই সিপিএম শক্তিশালী। তবে এবার লাল হাওয়া কিছুটা বিজেপির দিকে গিয়েছে বলে দাবি ওয়াকিবহাল মহলের। গেরুয়া শিবিরের সংগঠনও ভাল। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বামেদের ভোটে থাবা বসিয়েছিল। এবার সেই ভোটাররা ফিরে এসেছেন বলে দাবি বামেদের। এই কেন্দ্রে জোরদার ত্রিমুখী লড়াই হবে।
পশ্চিম বর্ধমানের কুলটি কেন্দ্রটিতে গত পনেরো বছর ধরে বিধায়ক তৃণমূলের উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। এবারেও তিনিই প্রার্থী। তিনি গত কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে পুর চেয়ারম্যান। বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের বড় ব্যবধানে জয় হলেও লোকসভা ভোটে তৃণমূলের থেকে বিজেপি অনেক ভোটে এগিয়েছিল। এবার এখানে জোরদার লড়াই তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির। ধানবাদ সীমানা ঘেঁষা কুলটিতে বিজেপির এবারের তুরুপের তাস বিহারী ভোট।
মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলার সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায়, সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সব দল। মুর্শিদাবাদ ও প্রতিবেশী মালদার ভোট চিরকাল কংগ্রেসের দিকেই গিয়েছে। যেমন মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা আগাগোড়াই কংগ্রেসের শক্তঘাঁটি। ২০১৬ সালেও ব্যতিক্রম হয়নি। উনিশের ভোটেও এই বিধানসভা থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিল কংগ্রেস। তবে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে নিজেদের ভোট বাড়িয়েছে গেরুয়া শিবিরও। একুশে লড়াইটা মূলত তাঁদের মধ্যেই। এবার বামদের সঙ্গে জোট করে ওই দুই জেলায় ভাল ফলের আশা করছে কংগ্রেস। কিন্তু মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে গেলেই অঙ্ক যে পালটে যাবে সেটাও সকলের জানা।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বালুরঘাট বিধানসভা কেন্দ্রটি বরাবর আরএসপি-র ঘাঁটি বলে পরিচিত। ২০১১ সালে তৃণমূল এলেও ২০১৬ সালে ফের আরএসপি প্রার্থী নির্বাচিত হন এই কেন্দ্রে। অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েত-সহ পুরসভা দখলে রেখেছিল শাসকদল। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভায় প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে বিজেপি তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দেয়। এবারও এই কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
জেলার অপর সীমান্তঘেঁষা কুমারগঞ্জ, খরাপ্রবণ তপন বিধানসভা দুটিতে তফসিলি জাতি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাস। এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্র একসময় লাল দুর্গ হিসাবে পরিচিত ছিল। ২০১১ ও ১৬-র বিধানসভা ভোটে জিতে এই কেন্দ্র দুটি দখল করে তৃণমূল। তবে এই মূহূর্তে অনেকটাই সক্রিয় বিজেপি। যদিও উনিশের লোকসভা ভোটে তৃণমূলকে ছুঁতে পারেনি গেরুয়া ঝড়।
তবে উত্তরের এই তিন জেলাতেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটের অঙ্ক বদলে গিয়েছে চতুর্থ দফা ভোটের দিন। শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে যে চারজন ভোটারের মৃত্যু হয়েছে তারা সংখ্যালঘু মুসলমান। ফলত মনে হচ্ছে একটা বিরাট সংখ্যক মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষ করে মহিলাদের ভোট পুরোপুরি শাসকদলের পক্ষেই ঘুরে গিয়েছে। তার আগে পর্যন্ত মুর্শিদাবাদ, প্রতিবেশী মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুরের এই বিরাট সংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট কংগ্রেস বা সংযুক্ত মোর্চার পক্ষেই ছিল। এখন মনে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তার দল ওই ঘটনার পর সেই সমর্থন লাভ করতে চলেছেন। অবশ্য সবটাই বোঝা যাবে ফলাফলের দিন।
আপনার ব্যাখ্যায় সহমত পোষন করেও বলবো হাওয়া কিন্তু গেরুয়া। লোকেমুখে যতই বিরুদ্ধে কথা বলুক চুপচাপ ছাপ
মারছে ওদিকেই।
খুবই ভাল লেখা। সব কথাই যে অক্ষরে অক্ষরে মিলবে তা নয় তবে যেটা মনে হচ্ছে তার জন্য যুক্তিও রয়েছে।
বিজেপির পিছিয়ে থাকার মানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বন্দুক ‘শুধু ভয় দেখানোর জন্য নয়’ ‘মানুষ লক্ষ্য করে চালানোর জন্য’ আর
নির্বাচন কমিশন তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলবে ৮২% ভোট পড়েছে…
সপ্তম দফাতে বিজেপি ততটা পিছিয়ে না থাকলেও নির্বাচন কমিশন ও তাদের বাহিনী শান্তিপূর্ণ ভোট হতে দেবে না। আজও
ওরা বাংলার মাটিতে কিছু অঘটন ঘটাবেই।