২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে ১৮টি আসন পেয়ে বাংলার পদ্মশিবিরে আশার আলো জ্বলেছিল। সেই ফলাফলের ওপরে ভিত্তি করেই গেরুয়া শিবির বাংলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ভাবখানা হয় এমন যেন তারা অর্ধেক বাংলা দখল করেই নিয়েছেন, বাকিটুকু ২০১৬-র বিধানসভায়।
গত কয়েকমাস ধরে বাংলা দখলে বিজেপি নেতাদের দৌড়ঝাঁপ যেন বাংলাকে এই গিলে ফেলেন। কেন্দ্রীয়স্তরের বিজেপি নেতারা বাংলায় এমনভাবে আসা যাওয়া শুরু করলেন যেন বাংলাকে হাতের মুঠোতে না পাওয়া পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমতে পারছেন না। রাজ্য নেতারা বাংলার যত্রতত্র দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করলেন যেন বাংলা তাদের বাপের জমিদারি।
প্রচার, সভা, মিছিল, রোড শোতে লাগামছাড়া ভাষণ-একে মারছেন তো ওকে ধরছেন। তাকে কাটছেন তো বাকিদের রক্ষে নেই। শিক্ষক থেকে সমাজসেবী, বিজ্ঞানী থেকে শিল্পী সাহিত্যিক কেউ তাদের রোষানল থেকে বাদ পড়ছেন না। সবাইকে তারা জেলে ঢুকিয়ে দেওয়ার ধমক দিয়েছেন। থানা থেকে শুরু করে যে কোনও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান তারা বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়ার, আগুন জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়ার হুমকি দেয়েছেন। তাদের ভাষা, আচরণ, সবকিছুই ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বাংলা দখল করতে যে মাজার জোর লাগে তা বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানতো। তাঁরা বেশ কোমর বেঁধেই ময়দানে নেমেছিল। বাংলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীরই একা ২২টি সভা করার কথা ছিল। করোনার বাড়াবাড়িতে বাতিল হয়েও ১৮টি সভা করেন তিনি।
শুধু কি নরেন্দ্র মোদী, বাংলায় ভোট প্রচারে নেমেছিলেন অমিত শাহ থেকে শুরু করে স্মৃতি ইরানি, জেপি নাড্ডা, রাজনাথ সিং, কৈলাশ বিজয়বর্গীয়, যোগী আদিত্যনাথ। যদিও বিজেপির ভরসা-মুখ সেই মোদী, আর মোদী কি ম্যাজিক দেখান তার দিকেই তাকিয়ে থাকে বিজেপি। কিন্তু সেই ভরসা বা ম্যাজিক নন্দীগ্রাম ও হলদিয়ার মতো দু-তিন জায়গায় শিকে ছিঁড়লেও বাকি সুপার ফ্লপ।
গত ৭ই ফেব্রুয়ারি হলদিয়াতেই প্রথম নির্বাচনী সভা করেন মোদী। ওই কেন্দ্রে তাপসী মণ্ডল জিতেছেন। এরপর ২২শে ফেব্রুয়ারি হুগলীতে সভা করেছিলেন যার জন্য সেই লকেট চট্টোপাধ্যায় হেরে গিয়েছেন। ইতিমধ্যে ৭ই মার্চ ভরা ব্রিগেডে হাজির ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু কলকাতাতে বিজেপি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২৪শে মার্চ কাঁথির সভাও কাজে আসেনি।কাঁথি উত্তর বা দক্ষিণ, কোথাওই জয় আসেনি বিজেপির।
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি যেসব জায়গায় ভাল ফল করেছিল, সেই ফলাফলের ওপরে ভিত্তি করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গেরুয়া শিবির। বিরোধী শিবির থেকে নেতাদের যোগদান করিয়ে ভোটের সামনে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল তারা। কিন্তু ম্যাজিগ ফিগারের অর্ধেক রাস্তায় গিয়েই থামতে হল তাদের।
তবে ২০শে মার্চ খড়গপুর, এমনকি কৃষ্ণনগরের সভা কিছুটা হলেও কাজে এসেছে। খড়গপুরে জিতেছেন অভিনেতা হিরন চট্টোপাধ্যায়। কৃষ্ণনগর উত্তরে মুকুল রায় জিতলেও দক্ষিণে হার বিজেপির। আর মোদী ম্যাজিক কিছুটা কাজ করেছে উত্তরবঙ্গে। শিলিগুড়ি, কোচবিহারে সভা করেন মোদী। দেখা গিয়েছে, দার্জিলিং জেলার প্রায় সবকটি আসনেই জয়লাভ করেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবির জিতেছে কোচবিহার উত্তরেও।
তৃণমূল কংগ্রেস এ পর্যন্ত মোট ৬টি লোকসভা এবং ৫টি বিধানসভা ভোটে লড়েছে। তার মধ্যে বিধানসভা ভোটে তারা সেরা ফল করেছিল ২০১৬ সালে। ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়ে ২১১টি আসন জিতেছিল জোড়াফুল। এবার কেবল আসন সংখ্যাই নয় ভোট শতাংশও ছাপিয়ে গেল।
যেসব জায়গা বিজেপি শক্তিশালী বলে ধরা হয়েছিল। সেইসব এলাকাতে তৃণমূলই সাফল্য পেয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়া-র ১২টি আসনকে চিহ্নিত করা হয় জঙ্গলমহল নামে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দু’টি আসন বাদে বাকিগুলিতে এগিয়ে ছিল বিজেপি। বিধানসভা ভোটে এই ১২টি আসনের সবক’টিতেই জয় আসবে বলে ধরে নিয়েছিলেন বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। কিন্তু ফল বেরতেই দেখা গেল, জঙ্গলমহল চুরমার। ১২টি কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ২টিতে জিততে পেরেছে মোদী-শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপি একটিও আসন পায়নি। ৩১ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ৩০ টি আসনে জয়ী হয়েছে। একটি আসন জিতেছে আইএসএফ-এর আব্বাস সিদ্দিকি। উত্তর ২৪ পরগনায় একের পর এক আসনে হেরেছে। কলকাতায় উল্লেখযোগ্য প্রার্থীরা হেরেছেন। কলকাতায় বিজেপি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষদের কাছে পৌঁছনোর যে চেষ্টা করেছিল, তা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
গত লোকসভায় বিজেপি উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ভাল ফল করেছিল। কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল সেই জায়গা পুনরুদ্ধার করেছে। এছাড়াও তৃণমূল উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরেও ভাল আসন পেয়েছে। মালদহ-মুর্শিদাবাদ জেলার বেশিরভাগ আসন এবার তৃণমূলের ঝুলিতে এসেছে। এই দুই জেলার বেশিরভাগ আসন ছিল কংগ্রেস এবং বামেদের দখলে।তারা এবার কোনও আসন পায়নি।
অন্যদিকে যেসব দলবদলুরা অমিত শাহর বাংলা সফর বাতিল হয়ে যাওয়ায় ঘাসফুল ছেড়ে ‘চার্টার্ড বিমানে’ দিল্লি উড়ে গিয়ে গেরুয়া পতাকা হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অধিকাংশরাই কিন্তু পরাজিত হয়েছেন।
বাংলা কারও দাদা-দিদিগিরি মেনে নেবে না, দুদিন বাড়তে দেবে তারপর ছুড়ে ফেলে দেবে
মুখের ভাষায় কিম্বা আচরণে ঔদ্ধত্য সীমা ছাড়ালে কোমড় ভেঙ্গে দেওয়াই রীতি। তাছাড়া বাংলা ধর্ম কিম্বা রাজনীতির ব্যবসা
মেনে নেয় নি, নেবেও না।
Bengali maintains its tradition forever।