১৯৫১-৫২ সালের স্বাধীন দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে ২০২১-এর বাংলার বিধানসভার জনাদেশ, বামপন্থী ও কংগ্রেস দল জনগনের মতদানের ভিত্তিতে একটি আসনও নিজেদের পক্ষে আনতে সমর্থ হল না। দুটি দলের ভিতরে বাইরে বিচার বিশ্লেষণ চলছে তো বটেই তবে এটা ঠিক যে একে কেবল দলের ব্যর্থতা বা মানুষের মন থেকে সপাটে দূর হটে যাওয়া বললেও মনে হয় কম বলা হবে। তাহলে এই অবস্থাকে কি ভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায়। যেখানে বামফ্রন্ট ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েও ৭.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবার সেখানে তাদের প্রাপ্য ভোটের শতাংশ নেমে গিয়ে দাড়িয়েছে ৫.৬৭। অন্যদিকে গত লোকসভায় কংগ্রেসের জুটেছিল ৫.৫ শতাংশ ভোট ২১-এর ভোটে তা কমে হয়েছে ২.৯৩ শতাংশ। একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন থেকে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস একটা আসনও যেখানে দখল করতে পারেনি সেখানে তাদের সঙ্গে জোটে থাকা আব্বাস সিদ্দিকীর দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট কিন্তু একটি আসন জয় করেছে।
ভোটের সম্পূর্ণ ফলাফল হাতে আসার পর থেকেই নানা মহলে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। বাম ও কংগ্রেসের কঠোর সমালোচক থেকে শুরু করে ঘোর বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধীরাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন এই অবস্থার জন্য। অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষঙ্গরা দেখাচ্ছেন, এ রাজ্যে বিগত ৫০ বছরে এককভাবে কোনো দল এত শতাংশ ভোট নিজেদের ঝুলিতে ভরতে সমর্থ হয়নি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী; ১৯৭২ সালে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৯ শতাংশ ভোট। এবার তৃণমূল ভোট পেয়েছে ৪৭.৯৪% শতাংশ। এর আগে ১৯৭২ সালের পর গত ৫০ বছরে এককভাবে কোনো দল পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি ভোট পায়নি। আর পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ৭০ বছরের ইতিহাসে ভোটপ্রাপ্তির দিক থেকে তৃণমূল এখন দ্বিতীয় স্থানে।
নির্বাচনের ফলাফল তথা তৃণমূল কংগ্রেসের তৃতীয় বারের বাংলা জয়কে কেউ বলছেন, বাংলার মানুষ ভোট দিয়েছেন নিজের অস্তিত্বকে বাঁচাতে। কেউ বলছেন, শুধুমাত্র বিজেপিকে ঠেকাতে এ রাজ্যের মানুষ তৃণমূলকে তার অপশনাল মেজরিটি ডিভিডেন্ড হিসেবেই বেছে নিয়েছেন, কেউ কেউ বিষয়টাকে এভাবেও দেখছেন, তৃণমূল থেকে বেরিয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে ভোট প্রমাণ করে যে একটা প্রচ্ছন্ন পোলারাইজেশনও হয়েছে। এছাড়াও আরও অনেকের নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। লক্ষ্যনীয় ভোটের আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে বেশ কিছু কথা ভাইরাল হচ্ছিল, বামের ভোট রামে যাবে, নো ভোট টু বিজেপি’ইত্যাদি। বিজেপি’কে ভোট না দিতে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু মানুষকে একে ভোট দিন বা ওকে ভোট দিন অর্থাৎ কাকে দেওয়া উচিত হবে সেকথা কিন্তু বলা হয়নি। একথাও উল্লেখ করতে হবে, বামেরা করোনা-আমফান মোকাবিলায় নিজেদের লড়িয়ে দিয়েও বলেছে ‘আমরা ভোটের রাজনীতি করি না’। তারপরও স্যোশাল মিডিয়ার কিছু বাম বা রাম ভক্তের সৌজন্যে ট্রেন্ডিং হয়েছে ‘ভোট ফর লেফট্’। এরপরেই সেই প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উচ্চারিত হতে পারে কেন গতবারের বিধানসভায় প্রাপ্ত ভোট শতাংশ এইভাবে তলানি গিয়ে ঠেকল। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র ধরে ধরে বিচার করলে দেখা যাবে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা জয়ী প্রার্থীর ভোটের থেকে কোথাও কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার, এমনকি কোথাও ৫০ বা থেকেও অনেক বেশি ভোটের ব্যবধান। এই বিরাট ফারাক কখন আসতে পারে? প্রথমত যখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেন এবং একই সঙ্গে মানুষ একজন প্রার্থীকে জেতাতে বদ্ধমূল থাকেন এবং আরেকজনকে তাচ্ছিল্য করে হটিয়ে দিতে চান।
অন্যদিকে গত লোকসভায় ৪২টা আসনের মধ্যে ১৮টা জিতে বেলুনের মতো ফুলতে আরম্ভ করল গেরুয়া শিবির। যেন অর্ধেক বাংলা বগলদাবা তো হয়েই গিয়েছে বাকিটা একুশের বিধানসভায় তুড়ি মেরে হাতের মুঠোয় তুলে নেওয়ার অপেক্ষা। অথচ যে রাজ্য দখল করবে সে রাজ্যের নেতৃত্বের ওপরই নেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভরসা। এ রাজ্যের কিম্বা গোটা দেশের কোনও ইস্যুকেই গুরুত্ব না দিয়ে ভয়ংকর করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিদিন দিল্লি থেকে যাতায়াত করে ‘সুনার বাংলা’ আর ‘দি দি’ বলে কুৎসিত হাঁকডাক করতেই বিপুল আয়োজন আর বিপুল খরচ (প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা) ব্যায় হল। তারসঙ্গে পাল্লা দিয়ে নব্য আর আদি বিজেপির কোন্দল। কিন্তু বিধানসভায় বিরোধী আসনে বসবে সেই ভয়ংকর বিজেপি।
অন্যদিকে একটা অপ্রাপ্ত বয়স্ক জোট যা বড়জোর একটা পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যাল ভোটে কিছু আসনে জয় পেলেও পেতে পারে। তাছাড়া ছোট ছোট পদক্ষেপে কাজ করে তবে না বড় লক্ষ্যবস্তুতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সেটা না করেই বড় ময়দানে ক্যারিশমা দেখাতে মেতে উঠল দেশের প্রাচীন দুটি রাজনৈতিক দল। একে ছেলেখেলা না মুর্খামি কি বলা যায়! তার সঙ্গে আবার আইএসএফ’-এর জোট। বাংলার মানুষ কি মেনে নিতে পারে কখনও। এক তো দিনকেদিন দু’দলেরই ক্ষয় আর বিলুপ্ত দশা। তা থেকে উদ্ধারের জন্য না আছে যোগ্য নেতৃত্ব না সঠিক নীতি। বামেরা তো কোনওকালেই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। দলের কেউ বসে গেলে বরং বলে ও কবে দাঁড়িয়েছিল যে বসে গেছে। মুখেই শুধু গ্রাসরূট লেভেল। কিন্তু নেতৃত্বে বা ভোটে বেশিরভাগ জায়গাতেই ইউনিভার্সিটি লেভেলের নেতা। আর সেই জোটের ফলেই আইএসএফ-এর প্রতিনিধি বিধানসভায় থাকার সুযোগ পেল।
দুর্দান্ত বিশ্লেষণ
সাধারণ মানুষ যা বুঝলো তা দুটি অতি প্রাচীন রাজনৈতিক দল কেন বুঝল না সেটাই খুব আশ্চর্যজনক। আপনার বিশ্লেষণ খুব
সঠিক।
খুব সুন্দর করে ধরে ধরে লিখেছেন, ছোট লেখাটির মধ্যে এত বড় একটা বিষকে ধরেছেন। কেবল ভাল নয় খুব ভাল লেখা।
wrote very right, very important words.