রাত আটটা পর্যন্ত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত মেনে সেই সময়সীমার ঠিক পরেই আবার প্রচারে সক্রিয় হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচার সারলেন একাধিক জায়গায়। বললেন বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। এ রাজ্যের সম্প্রীতির কথা তাঁর কথায়, ভঙ্গিতে বারবার উঠে এল। তিনি ফাইটার। দেশ বাঁচাবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কখনোই পালিয়ে যাননি মমতা। সেটাই প্রমাণ হলো আবার। তৃণমূল সমর্থকরা স্বভাবতই উল্লসিত। তাঁরা যেন বলছেন, ফাইট, মমতা ফাইট।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অবশ্য রাজনৈতিক মহলে চর্চা অব্যাহত। অনেকেই মনে করছেন, হিংসা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের লক্ষ্যে নানা ধরনের বহু উক্তি বিজেপির শীর্ষ স্তর থেকে করা হলেও কেন সবার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে শাস্তি দেওয়া হলো? ঠিকই যে, বিজেপির রাহুল সিংহকে দু’দিনের জন্য প্রচার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকেও। কিন্তু বহুদিন ধরেই এই দু’জন সহ অনেক বিজেপি নেতা কুকথা বলছিলেন। মমতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে তড়িঘড়ি রাহুল সিংহের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় নির্বাচন কমিশন। দিলীপ ঘোষকেও শো-কজ করা হয়েছে। সর্বশেষ খবরে জানা যাচ্ছে, আজই রাতে তৃণমূলের নেতা অনুব্রত মণ্ডলকে করা শো-কজ-এর জবাব দিতে বলা হয়েছে। রাজ্য জুড়ে বিজেপি নেতারা সাম্প্রদায়িক মনোভাব উস্কে দিচ্ছেন। সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কি প্রথম থেকে যথেষ্ট সক্রিয় থেকেছে? উঠছে প্রশ্ন। ইতিমধ্যেই অন্য নানা রাজ্য থেকে বিরোধী নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত দীর্ঘ চিঠিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, তাঁর বক্তৃতায় ‘প্ররোচনামূলক বিষয়’ রয়েছে, যাতে আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হতে পারে। বিজেপি নেতাদের ‘প্ররোচনামূলক’ কথাবার্তা কি নির্বাচন কমিশন আগে খেয়াল করেনি?
লক্ষ্যণীয় যে রাজ্যে নির্বাচনি ময়দানে তৃতীয় শক্তি, অর্থাৎ বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও আইএসএফ নেতারাও কিন্তু বিজেপি নেতাদের কুৎসিত এবং প্ররোচনামূলক কথাবার্তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। কংগ্রেসের অধীর চৌধুরি তো খোলাখুলিই বলেছেন, এসব কথার জন্য বিজেপির একাধিক নেতাকে ধরে জেলে পোরা উচিত। তবে এসব মতামতে বিজেপি নেতারা তেমন চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। তাঁদের লক্ষ্য, যে করেই হোক সাম্প্রদায়িক বিভাজন বাড়িয়ে তোলা। এই দারুণ ফাঁদে বাংলার মানুষ পা দিচ্ছেন কি-না, সেটা বোঝা যাবে ভোট গণনার দিনে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরেই এক ট্যুইট বার্তায় বলেছিলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ হিসেবে আমি আগামীকাল গান্ধি মূর্তির সামনে দুপুর বারোটায় ধরনায় বসব।’ আজ, ১৩ তারিখ মঙ্গলবার মমতা কয়েক ঘণ্টা ধরনা দেন। তবে এই ধরনাস্থলে তৃণমূলের নেতারা বা কর্মীরা বড় সংখ্যায় হাজির ছিলেন না। এটা ছিল একক প্রতিবাদ।
এদিকে ১০ এপ্রিল কোচবিহার জেলার শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিচালনায় কয়েকজনের মৃত্যুর পরেই ভারতের নির্বাচন কমিশন এক অভূতপূর্ব নির্দেশিকা জারি করে। তাতে বলা হয়, পঞ্চম দফার ভোট-প্রচার ৭২ ঘণ্টা আগেই শেষ করে দিতে হবে। যার ফলে ১৪ এপ্রিল বিকেল পাঁচটার পরে আর ওই দফার কেন্দ্রগুলিতে প্রচার করা যাবে না। যেহেতু মমতাই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রচারক, তাই বলা যেতে পারে, তৃণমূলের ক্ষতি হলো। অন্য দিকে বিজেপির প্রধান প্রচারকারীরা এই দিনটিকে কাজে লাগিয়ে প্রচার করতে পারলেন।
নানা পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন দল উঠে এসেছে রাজ্যের ভোট মানচিত্রে। একসময় ছিল জাতীয় কংগ্রেসের একাধিপত্য। ১৯৬২ সালের ১ জুলাই আশি বছর বয়সে বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর বাংলায় কংগ্রেসের একচেটিয়া প্রভাবে ভাটার টান আসে। সেটা ছিল এক ঝোড়ো সময়। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন সীমানা সংঘর্ষে ভারতের প্রায় পরাজয় প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর জনপ্রিয়তায় আঘাত করেছিল। আর্থিক পরিস্থিতিও মোটেই ভালো ছিল না। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস খারাপ ফল করে। এ রাজ্যে সেই প্রথম অ-কংগ্রেসি জোট সরকার, প্রথম যুক্তফ্রন্ট গড়ে ওঠে। সে সরকার পড়ে গেলে ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার হয়েছিল। কিন্তু সে সরকারও বেশিদিন না টেকায় ১৯৭১ সালে ভোট হয়, সিপিএম সর্ববৃহত দল হলেও সরকার গড়তে পারেনি। অল্প কয়েক মাসের জন্য একটি সরকার গড়ে উঠে ভেঙে যায়। রিগিংয়ের নানা অভিযোগ থাকলেও ১৯৭২ সালে রাজ্য পেয়েছিল সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে স্থায়ী সরকার। এরপরে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা (১৯৭৫-৭৭) শেষে ১৯৭৭-এর ভোটে কংগ্রেস সারা দেশে পরাজিত হয়, পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার। ৩৪ বছর রাজত্ব করবার পর বামফ্রন্টকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই যে সাত দশকের পথ চলা, দীর্ঘ সে সময়ে কখনও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা হয়নি এ রাজ্যে। এইটাই এবারের সঙ্গে অন্য সব ভোটের তফাৎ। এ রাজ্য তার সম্প্রীতির সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারবে, না-কি নাগিনীরা ফেলিবে বিষাক্ত নিশ্বাস, সেদিকেই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে বঙ্গবাসী।