এবার ভোটে যত ঘোরাঘুরি করেছি, তার বেশ কিছুটা পূর্ব মেদিনীপুরে। নানা কারণে এবার এই জেলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনিতে এই জেলা খুবই রাজনীতি সচেতন, শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ অন্য অনেক জায়গার তুলনায় পূর্ব মেদিনীপুরে বেশি। মনে পড়বে, এ রাজ্যে দীর্ঘ বাম জমানার অবসান কিন্তু সূচিত হয়েছিল পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকেই। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই দু’টি জেলাতেই জেলা পরিষদ দখল করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পরে ২০০৯ ও ২০১১ সালের লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটে বড় জয় পেয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। সেই ফলই এবারও হতে পারত। কিন্তু গত কয়েক মাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেছে যে পুরো ব্যাপারটাই নতুন করে ভেবে দেখতে হচ্ছে।
সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো এই জেলায় তৃণমূলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ অধিকারী পরিবারের দলত্যাগ ও বিজেপিতে যোগদান। প্রথমে তৃণমূল ছাড়েন রাজ্যের মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি মন্ত্রীসভা, বিধায়ক পদ সহ সব সরকারি পদ ছেড়ে দেন। এর কয়েকদিন পরেই শুভেন্দুর ভাই সৌম্যেন্দু ও তাঁর সাংসদ পিতা শিশির অধিকারীও দল ছাড়েন। শুভেন্দুর অপর ভ্রাতা সাংসদ দিব্যেন্দু এখনও দলত্যাগ না করলেও তাঁর সহানুভূতি কোন দিকে তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। কাঁথির এই পরিবারের দীর্ঘদিন রাজনীতি করার সূত্রে ভালোই পরিচিতি রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতটা সম্ভব এই পরিবারকে দিয়েছেন, শিশির ও তাঁর এক পুত্র সাংসদ, অপর পুত্র শুভেন্দু রাজ্যের মন্ত্রী এবং পুত্র সৌম্যেন্দুকে পুরসভার প্রধান পদে বসিয়েছিলেন মমতা। এহেন প্রভাবশালী পরিবারের কিছু সমর্থক ও নানা স্তরের কিছু নেতা সহ তৃণমূল ত্যাগ জেলার রাজনীতিতে একটা প্রভাব তো ফেলবেই। বাস্তব রাজনীতিতে যতটা প্রভাব ফেলেছে, তার থেকেও অনেক বেশি আলোড়ন উঠেছে নানা কিসিমের সংবাদমাধ্যমে। জেলার বর্তমান রাজনীতিটা বুঝতে তাই আমাদের একবার চোখ বোলাতে হবে গত দু’টি সাধারণ নির্বাচনের দিকে। একটি ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোট এবং অপরটি ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। প্রথম দফায় এই জেলাতে যে সাত কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়েছে, সেগুলিতে গত দু’টি নির্বাচনের ভোট-তথ্য দেখে নেওয়া যাক।
২১২.পটাশপুর (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫৪.৫১ | ৫০.২৫ |
| বিজেপি | ৫.৩৬ | ৪২.৯৬ |
| বামফ্রন্ট | ৩৮.৭৮ | ৪.৪৪ |
| কংগ্রেস | ১.১৪ |
২১৩.কাঁথি উত্তর (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫০.০৯ | ৪৮.৭৮ |
| বিজেপি | ৫.৭৭ | ৪২.৭১ |
| বামফ্রন্ট | ৪১.১৩ | ৫.৫২ |
| কংগ্রেস | ১.৪৫ |
২১৪.ভগবানপুর (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫৪.১৮ | ৫৪.৯৫ |
| বিজেপি | ৩.৮০ | ৩৭.৪২ |
| বামফ্রন্ট | ৫.৫১ | |
| কংগ্রেস | ৩৮.৬২ | ০.৯৪ |
২১৫.খেজুরি (তফশিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত) (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫৪.৩০ | ৪৮.৩৪ |
| বিজেপি | ৮.৯৪ | ৪৫.৫৬ |
| বামফ্রন্ট | ৩২.০৫* | ৩.৬১ |
| কংগ্রেস | ১.১১ |
*বাম-কংগ্রেসজোটসমর্থিতনির্দল
২১৬. কাঁথি দক্ষিণ (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫৩.৭২ | ৫১.৩৫ |
| বিজেপি | ৮.৭৬ | ৪০.৯৪ |
| বামফ্রন্ট | ৩৪.২২ | ৪.৭৭ |
| কংগ্রেস | ১.৪৯ |
২১৭. রামনগর (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫২.৯৯ | ৪৮.০১ |
| বিজেপি | ৬.০৩ | ৪৪.২৯ |
| বামফ্রন্ট | ৩৯.০১ | ৫.০৬ |
| কংগ্রেস | ১.২৫ |
২১৮. এগরা (বৈধ ভোটের শতাংশ)
| দল/ ভোট-বছর | ২০১৬ | ২০১৯ |
| তৃণমূল | ৫১.৩১ | ৪৪.৪২ |
| বিজেপি | ৫.৮৯ | ৪৮.২৫ |
| বামফ্রন্ট | ৩৯.৫৬* | ৩.৯৬ |
| কংগ্রেস | ১.০৩ |
*বাম-কংগ্রেস জোট সমর্থিত ডিএসপি প্রার্থী
পূর্ব মেদিনীপুরের এই সাত কেন্দ্রে সারা রাজ্যের রাজনীতির যেমন প্রভাব পড়েছে, তেমনই স্থানীয় বিষয়ও রয়েছে। এই সাত কেন্দ্রের প্রতিটিতেই ২০১৬ সালে তৃণমূলের ভোট ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। সেবার মমতার দলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বাম-কংগ্রেস জোট। তাদের ভোট ৩২ থেকে ৪১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির সমর্থন ছিল সামান্যই, ৫ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু সারা রাজ্যের মতোই এই জেলাতেও ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে হঠাৎ বিজেপির ভোট বেড়ে যায়। উপরে উল্লিখিত সাত কেন্দ্রের তথ্য দেখলে বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির ভোট ৩৭ থেকে ৪৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছিল। তবে এগরা কেন্দ্রটি ছাড়া অন্য সব কেন্দ্রে ২০১৯ সালেও প্রথম হয়েছিল তৃণমূলই। বাম-কংগ্রেস ভোট তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তৃণমূলের ভোট প্রাপ্তি খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সাতটির মধ্যে ছ’টিতে তৃণমূলের ভোট কমেছে, ব্যতিক্রম ভগবানপুর, যেখানে তৃণমূলের সমর্থন সামান্য হলেও বেড়েছে। এই সাত কেন্দ্রের মধ্যে তিন কেন্দ্র, পটাশপুর, ভগবানপুর ও কাঁথি দক্ষিণে ২০১৯ সালের খারাপ বাজারেও তৃণমূল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। সেটা রাখতে পারলে ওই তিন কেন্দ্র ধরে রাখতে পারে তৃণমূল। তবে মনে রাখতে হবে, পটাশপুর ও কাঁথি দক্ষিণে বিধানসভার তুলনায় ভোট কমেছে তৃণমূলের। কাঁথি-উত্তর, খেজুরি ও রামনগর আসনে তৃণমূলের সমর্থন ২০১৯-এ ছিল ৪৮ শতাংশের বেশি। এগুলোতেও গণিতের হিসেবে অ্যাডভান্টেজ তৃণমূল। কেবলমাত্র এগরা আসনটি তৃণমূলের পক্ষে কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
ভোট রাজনীতির একটা প্রচলিত ধারণা হলো, ভোট-তরঙ্গে একবার ঢেউ উঠলে, তা হঠাৎ থামে না। একটা পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূলের মধ্যে জমানা বদলের সঙ্গে কিন্তু বিজেপির একটা ফারাক আছে। অনেকেই বলছেন, বিজেপির হাতে রাজ্য গেলে বিপন্ন হয়ে পড়বে এ রাজ্যের সম্প্রীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। তাই আগের ভোট-চলাচলের অঙ্ক এবারও যে খাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না মোটেই। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল পুলওয়ামা-বালাকোটের তীব্র আবেগের পরিবেশে। এর পরে যতগুলি রাজ্য বিধানসভা ভোট হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে, প্রতিটিতেই বিজেপির সমর্থন কমেছে, গড়ে প্রায় ১২ শতাংশের মতো। এটা সব রাজ্যে হয়েছে, এ রাজ্যে হবে না, সেটা ভাবার কি কোনো কারণ আছে?
দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছি এই জেলার পথে প্রান্তরে। আবার যাবার প্ল্যান রয়েছে। মনে পড়ছে সপ্তাহ-খানেক আগের এক রাতের কথা। অনেক রাতে একটি চায়ের দোকানে চা পান করার ইচ্ছায় দাঁড়িয়েছি। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধানই ভানে, তেমনই তুললাম ভোটের কথা। বেচারি দোকানি দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাবে ভাবছিলেন, হঠাৎ এই উৎপাতে একটু যেন বিব্রত। সস্তায় পুষ্টিকর লাল চা হাতে ধরিয়ে খুব আস্তে বললেন, কে আবার জিতবে? হাওয়াই চটি থাকতে! আমার উত্তর যেন পেয়ে গেলাম, পূর্ব মেদিনীপুর কোন পথে চলেছে। তবে এটা দশ কোটি লোকের রাজ্য, এখানে জেলার সংখ্যা ২৩।
Not just good writing, The information will be useful