রাজ্যে দু-দফা ভোট নেওয়া হয়ে গেল। রাজ্য সম্পর্কে হাজার বদনাম করার চেষ্টা নানা মহলে হওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ শান্তির আবহেই সম্পন্ন হলো। এ পর্যন্ত কোনো বুথে পুনর্নির্বাচনের আদেশ আসেনি, যদি এক-আধটা বুথে হয়ও, সেটা প্রায় সব ভোটেই হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েই ভোট করানো হবে, এমন একটা হাওয়া তোলা হলেও খোদ কেন্দ্রীয় বাহিনীর কর্তারাই জানিয়েছেন, রাজ্য পুলিশের সহযোগিতা ছাড়া ভোট করা সম্ভব নয়, রাজ্য পুলিশ সবরকম সহযোগিতা করছেনও। তাহলে এক কথায় দাঁড়ালো কী? যেমন হবার ছিল তেমনই হচ্ছে, মানুষ নিজের ভোট নিজে দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, একটু গোলমেলে ঠেকছে অন্য দু-একটা জায়গায়। প্রথম দফায় সিপিএমের সুশান্ত ঘোষের খবর-টবর একটু-আধটু পাওয়া যাচ্ছিল, দ্বিতীয় দফায় সেটা যেন আরও কমে গেল না-কি? পয়লা এপ্রিল ত্রিশ আসনে ভোট হলো, সব জায়গাতেই বামফ্রন্ট-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের প্রার্থী ছিল। কিন্তু কেমন যেন মিইয়ে যাওয়া ছবি একটা। দলটার বড় নেতাদের মধ্যে বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, রবীন দেব-সহ রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর বেশির ভাগই ভোটে দাঁড়াননি, তাঁদের সংগঠন ও প্রচার দেখার কথা। কিন্তু নন্দীগ্রামে বা সেদিনের আরও ২৯টি কেন্দ্রে জোটের নড়াচড়া সেভাবে ছিল কি?
এটা এবারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কি? হ্যাঁ, ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। গত লোকসভা ভোটে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট বিপুলভাবে বিজেপিতে যাওয়ার ফলেই রাজ্যে ৪০ শতাংশ সমর্থনের মালিক হয়েছিল নরেন্দ্র মোদির দল। সেই জোর দেখিয়েই বিধানসভা দখলের অভিযানে নেমেছে হিন্দুত্ববাদী দলটি। বাম-কংগ্রেস সমর্থন তলানিতে ঠেকলেও সেটা ১২ শতাংশের বেশিই ছিল। নীচের হিসেবটাতে বোঝা যাবে রাজ্যে ভোট সমীকরণের রসায়নটা।
রাজ্যে গত দশ বছরের ভোটফল (প্রাপ্ত ভোট শতাংশে, ব্র্যাকেটে প্রাপ্ত আসন। রাজ্যে লোকসভার মোট আসন ৪২, বিধানসভায় ২৯৪টি আসন)
| ভোট | তৃণমূল | বিজেপি | কংগ্রেস | বামফ্রন্ট |
| ২০০৯ লোকসভা | ৪৪.৬৫ (২৬) | ৬.১৫ (১) | ৪৩.২৯ (১৫) | |
| ২০১১ বিধানসভা | ৪৮.৪৩ (২২৮) | ৪.৬০ (০) | ৪১.০৫ (৬২) | |
| ২০১৪ লোকসভা | ৩৯.৭৯ (৩৪) | ১৭.০২ (২) | ৯.৬৯ (৪) | ২৯.৯৪ (২) |
| ২০১৬ বিধানসভা | ৪৫.০১ (২১১) | ১০.১৬ (৩) | ৩৯.৪২ (৭৭) | |
| ২০১৯ লোকসভা | ৪৩.৩০ (২২) | ৪০.২৮ (১৮) | ৫.৬২ (২) | ৭.৪৭ (০) |
২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূল ও জাতীয় কংগ্রেস জোট বেঁধে ভোটে নেমেছিল। সে জোট সাড়ে চুয়াল্লিশ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, রাজ্যে মোট বিয়াল্লিশটি আসনের ছাব্বিশটি জিতেছিল। দু-বছর পরে ২০১১ সালে ওই জোটের ভোট বেড়ে হয় প্রায় সাড়ে আটচল্লিশ শতাংশ, আসন মোট ২৯৪-এর মধ্যে ২২৮। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কারও সঙ্গে জোটে যায়নি। সেবার তৃণমূলের সমর্থন ছিল প্রায় চল্লিশ শতাংশ, ৪২-টির মধ্যে ৩৪ আসন জিতে নেয় মমতার দল। রাজ্য চালানোর পাঁচ বছরের মাথায় ২০১৬ সালে একা লড়ে তৃণমূলের ভোট দাঁড়িয়েছিল পঁয়তাল্লিশ শতাংশে, আসন ২১১। বছর দুই আগে ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছে প্রায় সাড়ে তেতাল্লিশ শতাংশ ভোট, আসনসংখ্যা নেমেছে ২২-এ।
পাশাপাশি বামফ্রন্টের প্রাপ্তিটা দেখলে বোঝা যায়, তাদের সমর্থনের রেখাচিত্র ক্রমশই নিম্নমুখী। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামেদের ৪৩ শতাংশ ভোট ও ১৫ আসন ছিল, যেটা ২০১১-তে বিধানসভা ভোটে নেমে হয় একচল্লিশ শতাংশ, প্রাপ্ত আসন ২৯৪-এর মধ্যে ৬২। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে বাম সমর্থন আরও নেমে হয় প্রায় ত্রিশ শতাংশ, দু’টি আসন জেতে তারা। ২০১৬-র বিধানসভা ভোটে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে বামফ্রন্টের সমঝোতা হয়েছিল, সে জোট প্রায় সাড়ে উনচল্লিশ শতাংশ ভোট পায়, জোটের ঝোলায় গিয়েছিল ৭৭ আসন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বামভোট তলানিতে ঠেকে, হয় সাড়ে সাত শতাংশ, কোনো আসন তারা পায়নি, প্রায় সব জায়গায় তাদের জামানত জব্দ হয়ে যায়। গত লোকসভা ভোটে একা লড়ে কংগ্রেস মাত্র সাড়ে পাঁচ শতাংশ সমর্থন পেলেও দু’টি আসন জিতে নেয় তারা। মনে রাখা দরকার, এই দুই আসনে সিপিআইএম কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল।
বিজেপির ২০০৯-এ ছয় শতাংশ ভোট ও একটি আসন মিলেছিল। ২০১১-তে ভারতীয় জনতা পার্টি সাড়ে চার শতাংশ সমর্থন পায় কিন্তু আসন জোটেনি। ২০১৪-তে সতেরো শতাংশ ভোট ও দু’টি আসন, ২০১৬-তে দশ শতাংশ ভোটে পেয়ে তিনটি আসন পেলেও হঠাৎই ২০১৯ লোকসভা ভোটে এই দল চল্লিশ শতাংশেরও বেশি ভোট পায়, ১৮ আসন জিতে নেয় ওই দল। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে মূল চলাচল ছিল, বাম-কংগ্রেস ভোটের বিজেপিতে যাওয়া। রাজ্যের রাজনীতিতে বাম-কংগ্রেসের ভূমিকায় আস্থা না পেয়েই তৃণমূল-বিরোধী জনতা নরেন্দ্র মোদির দলকে সমর্থন করেছিলেন। এ কারণেই অনেকে ভাবছেন, এবার তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপিই। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২১ সালের ধুন্ধুমার ভোট যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।
বাম-কংগ্রেস ভোট একেবারে তলানিতে ঠেকলেও তা মিলিত ভাবে ২০১৯ সালে ছিল ১৩ শতাংশ। এবারের ভোটের আগে কোমর কষে জোট গড়তে লেগে পড়ে সিপিআইএম। বামফ্রন্ট তো ছিলই, কংগ্রেসের সঙ্গেও দীর্ঘ কথাবার্তার পরে সমঝোতা প্রায় সম্পূর্ণ, নতুন আইএসএফ-ও পেয়েছে বেশ কয়েকটি আসন। চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনটিতে ব্রিগেডে ভরা জনসভায় অনেকের মনে ভরসা হয়েছিল, এবার হয়তো বাম-কংগ্রেস নিজেদের সমর্থন কিছুটা ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু দু-দফা ভোটের পরে এই জোটের তৎপরতা নিয়ে অনেকের সংশয় জাগছে। বাম-কংগ্রেসের ভোট যদি আরও কমে, তবে কার লাভ, উঠছে সে প্রশ্নও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কংগ্রেস যে সাড়ে পাঁচ শতাংশ ভোট ২০১৯-এ পেয়েছিল, তার প্রায় অনেকটাই রাজ্যের সংখ্যালঘু প্রধান তিন জেলা, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে। ওই এলাকার মানুষেরা এবার কংগ্রেসকে সমর্থন না দিলে কাকে দেবেন? অনেকে ভাবছেন, তারা কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই চলে আসবেন। রাজ্যের বাকি অংশেও নানা দিকে ভোট-চলাচল হলে রাজ্যের রঙিন রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে প্রায় মুছেই যাবে এক কালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআইএম ও কংগ্রেস। আবার বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের সমর্থন বাড়লে মূল ক্ষতি বিজেপিরই হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। আর তো ক’টা দিন, একটু জোর কদমে কমরেডস!