শনিবার আট দফা বিধানসভা ভোটের চতুর্থ পর্যায়ের ভোট। এদিন ৪৪টি আসনে ভোট হবে। এর মধ্যে হাওড়াতে ৯ আসনে, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১১, হুগলিতে ১০, আলিপুরদুয়ারে ৫ ও কোচবিহারের ৯ আসনে ভোট হবে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাগ ৩-এর কেন্দ্র বেহালা পশ্চিমের ২৩০ নং ওয়ার্ডে এবারও ভোট দেবেন এই এলাকার প্রবীনতম ভোটার ৯৭ বছরের শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষাল।
১৯২৪ সালের ১৫ অগাস্ট তাঁর জন্ম। তখন তাঁরা থাকতেন ভবানীপুর এলাকায়। প্রথম স্কুল ভবানীপুর ইন্সটিটিউশন। তবে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন অভয়চরণ বিদ্যামন্দির থেকে। এরপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে ভর্তি হন। তখন অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় নয়, যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। পারিবারিক কারণে অবশ্য শৈলেন্দ্রনাথের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ হয়নি। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে সাউথ সিটি কলেজে কমার্সে ভর্তি হন এবং স্নাতক হন।
তখন এ শহরে সাহেবি কোম্পানির বেশ কিছু দফতর ছিল। সে রকম কয়েকটি কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করার পর অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের টেলিকমিউনিকেশন দফতরের চাকরিতে শৈলেনবাবু স্থায়ী হন। পরাধীন দেশে বিদেশি সরকারের চাকরিজীবি শৈলেনবাবু স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝড়ের পর্ব প্রতক্ষ্য করেছেন। সুভাষচন্দ্রের আজাদ-হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ, নাবিকদের বিদ্রোহ, মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি থেকে শুরু করে ছেচল্লিশের রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অবশেষে সাতচল্লিশ সালের ১৫ অগাস্ট। ইতিমধ্যে শৈলেনবাবু ব্রিটিশ সরকারের কর্মী থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীতে পরিণত হন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর আয়জিত হল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর শুরু হয়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত; অর্থাৎ প্রায় চারমাস ধরে চলেছিল সেই ভোট পর্ব। সাত দশক আগে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষাল হয়েছিলেন পোলিং অফিসার। তখন তাঁর বয়স ২৮ বছর। শৈলেন্দ্রবাবুর কথা অনুযায়ী, ভোট শুরু হয়েছিল সকাল সাতটা থেকে। তার এক ঘণ্টা আগে তাকে পৌঁছতে হয়েছিল ভোট কেন্দ্রে। শ্যামবাজার অঞ্চলের একটি স্কুলে ছিল সেই ভোট কেন্দ্র। ভবানীপুরের বাসিন্দা শৈলেনবাবু ভোট কেন্দ্রে সঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্য আরও এক ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।
শৈলেন্দ্রবাবুর কথাতে এও জানা গেল সেবারের ভোটে কেন্দ্রে যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা সবই নিজেদের করতে হয়েছিল। এখনকার মতো সরকারের তরফে প্রায় কোনও ব্যবস্থাই করা হয়নি। এমনকি ভোটপর্ব মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ১১টা বেজে গিয়েছিল। সেদিনও কি ভোটে ছাপ্পা-রিগিং এসব ছিল? শৈলেন্দ্রবাবু জানান, তিনি সে ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হননি বটে কিন্তু এসব ঘটনা সামান্য হলেও ঘটেছিল, কারণ কথাগুলি প্রথমবারের ভোটেও শোনা গিয়েছিল, এমনকি আল্পবিস্তর অশান্তিও হয়েছিল। তবে তা আজকাল ভোটে যে ধরনের মারামারি, লাঠালাঠি হয় তার তুলনায় যতসামান্য। এর পরবর্তী ভোটে ছাপ্পা ভোট, রিগিং শুরু হয় এবং ক্রমশই বাড়তে থাকে।
১৯৫২ সালের পর বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে এরপর আরও ১৭টি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষাল প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছেন। ভবানীপুর ছেড়ে বেশ কিছু কাল হল শৈলেন্দ্রবাবু সরশুনা উপনগরীর বাসিন্দা। প্রথম সেই নির্বাচনের পর দশক কেটে গিয়েছে সত্তর বছর। ইতিমধ্যে দেশ ও রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির রদবদল যেমন ঘটেছে, চারপাশের সব কিছুই অনেকখানি বদলে গিয়েছে। সেই পালটে যাওয়া সময়ের সাক্ষী শৈলেন্দ্রবাবু আজকের ভোটকে কিভাবে দেখছেন? তাঁর স্পষ্ট জবাব, এখন যেভাবে নির্বাচন হয়, তা শৈলেন্দ্রবাবুর মতে গণতন্ত্রের জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। তাঁর প্রশ্ন, ভোটের সময় শান্তি বজায় রাখতে দলে দলে সশস্ত্র বাহিনীকে চারপাশে ঘুরতে হচ্ছে, ভোট কেন্দ্র থেকে সর্বত্র তাদের পাহারা। এছাড়াও আরওকত ব্যবস্থা। এসব কিছুর দরকার হবে কেন? শৈলেন্দ্রবাবু বলেন, সশস্ত্র বাহিনী তো বাইরের শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে। আর নির্বাচন তো নিজেদের মতপ্রকাশের মাধ্যম। নাগরিকরা বা ভোটাররা ও নেতানেত্রীরা কেন এইটুকু পরিণতিবোধ দেখাতে পারি না, যাতে পারস্পরিক সৌহার্দের ভিত্তিতেই শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হয়!
তবে এত কিছুর পরও শৈলেন্দ্রবাবু ভোট দিতে যাবেন। এখন চড়া রোদ তাই খুব সকালে যদি না পৌঁছাতে পারেন তাহলে বিকেলে তাঁর ভোট কেন্দ্র শকুন্তলা কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে পৌঁছে তিনি তার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন।
অশান্তির ভোট তবু সত্যি একটা ভাল খবর। ধন্যবাদ তপন ও পেজফোর-কে।
এক কথায় অপূর্ব…
ভোট দিতে যাওয়ার আগে নিজের এলাকায় এমন একজন ভোটারের কথা পড়ে খুব অবাক হলাম, ভালোও লাগল, যদিও
শৈলেন্দ্রবাবুর আর আমার ভোট কেন্দ্র আলাদা তবে ইচ্ছে আছে মানুষটির সঙ্গে একদিন সাক্ষাৎ করার।
পড়ে ভাল লাগলো। ভোটে এত হিংসা, কাটাকাটি, রক্ত, প্রাণহানি তার মধ্যে একটু অক্সিজেন এই প্রতিবেদনটি। ধন্যবাদ।
এক কথায় অনবদ্য।
বেহালার ১৩০ নং ওয়ার্ডে যে এমন একজন ভোটার রয়েছেন শুনেছিলাম। তার সম্পর্কে এত বিস্তারিত জানা ছিল না। জেনে
খুবই ভাল লাগল। লেখক ও পেজফোরকে অশেষ ধন্যবাদ।