ভোটের প্রচারে বাংলার দেওয়ালে আঁকা ব্যাঙ্গাত্মক ছবি আর ছড়ার পাশে দক্ষিণ ভারতের বিশালাকার কাট আউট অনেকটাই ম্রিয়মাণ। তারও আগে ল্যাম্পপোস্টে ঝুলতো দর্মার ওপর সাঁটা পোস্টার। দেওয়ালের ওপর স্টেনসিলে কাটা আলকাতরার ছাপে লেখা ভোট দিন। গত শতকের ছ’য়ের দশকে ভোটের প্রচারে দেওয়াল লিখনে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। উজ্জ্বল রঙের অক্ষরমালায় যেমন ক্যালিগ্রাফির নানা ধরন লক্ষ্য করা যেত তেমনি ব্যাঙ্গাত্মক ছবি আর ছড়া। তখন দেওয়ালগুলিই হয়ে উঠত রাজনৈতিক দলের আক্রমন পালটা আক্রমনের মল্লভূম।
ভোটপ্রার্থী তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন কিম্বা দেশের প্রধানমন্ত্রী; ভোট প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ছড়া ও ছবির আক্রমন থেকে রেহাই পেতেন না। শুধু কি ছড়া, ছন্দবদ্ধ বাক্যবন্ধে রাজ্যের তাবড় নেতাদের নিয়ে টিপ্পনিতে ভরে যেত দেওয়াল। সেসব লেখায় হাস্যরসের এমন সব মশলা থাকত যে ঘরে বাইরে উঠত হাসির ফোয়ারা। ভাবাই যায় না যদি সে জমানায় সোশাল মিডিয়ার এমন রমরমা থাকত তাহলে ভাইরাল কোন পর্যায়ে পৌঁছত।
এখন ভোটের সময় দেওয়ালে তেমন রসবোধের নজির মেলে না। খোদ কলকাতাতেও ভোটের ছড়া কিম্বা ব্যাঙ্গ ছবি আর তেমন করে নজর কাড়ে না। ভোট যুদ্ধে কোনও দলই বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র মেদিনী ছাড়ছে না। কিন্তু ভোটের বাজারে ব্যাঙ্গে ঠাসা পদ্যের অভাব বেজায় টের পাওয়া যাচ্ছে গত কয়েক বছর ধরেই।
ভোট চাইতে সেই ছ’য়ের দশকে বামপন্থীরা দেওয়ালে লিখেছিল— ভোট দেবেন কিসে/ কাস্তে ধানের শীষে। কংগ্রেস জবাবে লিখলো— জোড়া বলদের চারটে শিং/ কংগ্রেসকে ভোট দিন। পালটা বামেরা লিখল— জোড়া বলদ মারছে লাথ/ গরিবের নাই পেটে ভাত/ কোথায় যুদ্ধ কোথায় দই/ গাছে তুলে কাড়ছে মই। কংগ্রেস জবাব দিতে ছাড়ল না— চীনের চিহ্ণ কাস্তে হাতুড়ি/ পাকিস্তানের তারা/ এখনো কি বলতে হবে/ দেশের শত্রু কারা?
ষাটের দশকে এ রাজ্যে কায়েম হয়ছিল যুক্তফ্রন্ট সরকার। কিন্তু টিকেছিল মাত্র ন’মাস। ১৯৬৯-এ ফের নির্বাচন। বরানগর, ঢাকুরিয়া, যাদবপুরে দেওয়াল জুড়ে কংগ্রেস দেওয়াল ভরাল- যুক্তফ্রন্টে কী পেলাম/ গুলি-বুলি-লাল সেলাম। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ার প্যারডি করে যুক্তফ্রন্টের উত্তর- কিল মারেনি, ঢিল মেরেছে!/ তাতেই তোমরা রুষ্ট হলে?/ তোমরা যখন হুকুম দিয়ে/ চালাও গুলি দুষ্ট বলে!/ —তার বেলা? ওই সময়ে কংগ্রেস, বাম প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ভোটের দেওয়াল লিখনে জনপ্রিয় বাংলা গান বা ছড়ার আদলে অর্থাৎ প্যারডি তৈরি করত। তৎকালীন একটি বাংলা ছবির ছবির গানের প্যরডি করে কংগ্রেস দেওয়াল লেখেছিল- শোনো বন্ধু শোনো—/ ফ্রন্টের ন-মাসের ইতিকথা/ চোদ্দ জনের গোঁজামিলের/ সে এক বীভৎসতা।/ ওদের নীতি নেই/ ওদের স্থিতি নেই/ ভাঁওতা দিতেই— ভুল বোঝাতেই/ ওদের দক্ষতা। বামেদের প্যারডি করলো- এক যে আছে মজার দেশ/ সব রকমের ভালো/ চালের বদলে খুদ দেয়/ খুদের বদলে মাইলো। কিছু ছড়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল- আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ সেন প্রফুল্ল, ঘোষ প্রফুল্ল, আর অতুল্য নাচে।
সত্তরের দশকে নকশালবাড়ির আগুনে পোড়া আলকাতরায় জেদী শ্লোগান দেখা গেল রং-চটা, চুন ওঠা দেওয়ালে- ভোট বয়কট, জেল ভাঙা, চীনের চেয়ারম্যানকে নিজেদের চেয়ারম্যান বলে ডাক অথবা- তোমার বাড়ি-আমার বাড়ি/ নকশালবাড়ি-খড়িবাড়ি। ইন্দিরা কংগ্রেস দেওয়ালে ছড়া লিখল- হরে গেল, কেষ্ট গেল, গেল কে জি বসু/ রাবণ বংশে বাতি দিতে রইল জ্যোতি বসু। পালটা সিপিএম লিখলো- দিল্লি থেকে এল গাই!/ সঙ্গে বাছুর সিপিআই।
উল্লেখ্য; ষাটের দশকেই দেওয়াল লিখনে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন শুরু করেছিল বামেরা- দু আনা সের বেগুন কিনে/ মন হল প্রফুল্ল/ বাড়ি এনে কেটে দেখি/ সব কানা অতুল্য। সত্তরের দশকে কংগ্রেসও বামকে ব্যক্তিগত আক্রমন করল ছড়ায়- চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায় কে?/ প্রমোদ নাচে কেষ্ট নাচে / জ্যোতি বসুর বে। প্রত্যুত্তরে বামেরা লিখল- ঠিক বলেছিস ঠিক বলেছিস/ ঠিক বলেছিস ভাই/ ১১ মার্চ ইন্দিরাকে সাজিয়ে আনা চাই।
১৯৮০ সালে ফের ক্ষমতার মসনদে ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরার জয় এবং ছেলে সঞ্জয়কে কটাক্ষ করে বামফ্রন্ট দেওয়াল লিখল গানের প্যরোডি করে- বড়লোকের বেটি লো, সাদা কালো চুল/ বাপের কোটে গোঁজা ছিল লাল গোলাপ ফুল।/ সেই বেটির বেটা লো, পাতলা পাতলা চুল/ দেশ জুড়ে ফুটিয়ে দিল হলুদ সর্ষেফুল। রাজ্যের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস লিখলো- রায়বেরিলি ভুল করেছিল, চিক্মাগালুর করেনি/ সিপিআইএম মনে রেখো, ইন্দিরাজি মরেনি।
১৯৮৯-এর লোকসভা ভোটে জনপ্রিয় দেওয়াল লিখন- গলি গলি মে শোর হ্যায়/ রাজীব গান্ধী চোর হ্যায়। ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনে দেওয়ালে বামফ্রন্টের ছড়া- হাত উঠেছে ফুল ফুটেছে/ জোট করেছে কে/ দিদি নাচছে দাদু নাচছে/ দেশ ভোগে যাকগে। পালটা তৃণমূল লিখল—যেখানে বুদ্ধ সেখানে যুদ্ধ/ যেখানে বিমান সেখানে কামান/ যেখানে জ্যোতি সেখানে ক্ষতি/…বুদ্ধ-মোদী একই নাম/ দেখিয়ে দিল নন্দীগ্রাম। পাশাপাশি- টাটা আর ন্যানো গেল/ বাংলা হল শুদ্ধ/ আর কটা দিন সবুর করো/ এবার যাবে বুদ্ধ।
২০১১-র বিধানসভা ভোটে তৃণমূল লিখলো- মাসিক বেতন বিশ হাজার/ BPL পায় তারা/ রিক্সা চালায় যে বন্ধুরা/ ঘৃণার পাত্র তারা/ ঘর নেই, চাষ নেই, পায় না খেতে ভাত/ CPIM-কে ভোট না দিলে কেটে নেবে হাত। জনপ্রিয় হয়েছিল আরেকটি লেখা- ১৯৭৭ নং বামফ্রন্ট ডাউন লোকাল ৩৪ নং প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে, ২০১১ নং আপ মা-মাটি-মানুষ এক্সপ্রেস ওই প্ল্যাটফর্মে আসছে। এটি যদিও ছড়া নয় তবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ।
চমৎকার লেখা। ঠিকই আজ ভোটের প্রচারে কোনও আভিজাত্যই নেই, ছন্দ নেই, ছবিও নেই।
ভোটের প্রচারে দেওয়াল যে ব্যাঙ্গ ছড়া-ছবিতে ভরে উঠবে সেই সব ছড়া লিখবে কে, ছবিই বা আঁকবে কারা? ষাট-সত্তর
দশকের সময়-রাজনীতি আর আজ তো এক নয়। এখন কবি বা কবিতার জন্ম ফেসবুকে, রাজনীতির শুরু শেষও সেখানেই,
সত্তর-আশিতে কবি বা কবিতার জন্ম হত লিটিল ম্যাগাজিন ঘষে ঘষে। তারা কেউ স্বঘোষিত কবি বা রাজনীতিক হতে
পারতো না।
লেখটি সত্তর ও আশির দশকের ভোটের সময়কার চারপাশের ছবিটা সামনে এনে দিল।
তখনকার দেওয়াল লিখন-ব্যঙ্গ চিত্রে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ ছিল তবু তার মধ্যেও মজা ছিল, অশ্লীলতা বা নোংরামো তেমন
ছিলনা।
দেওয়ালে যারা গুলি-বুলি-লাল সেলাম কথগুলি লিখেছিলেন তাদের যে এক ধরণের বোধ-বুদ্ধি-শিক্ষা ছিল সেটা মানতেই
হয়, কিন্তু আজকে যদি দেওয়াল লেখা ফের শুরু হয় তাহলে? দেওয়ালজুড়ে ভেসে উঠবে নেতাদের মুখ দিয়ে যে নর্মার জল
প্রবাহিত হয় সেই অকথ্য ভাষা।