শুক্রবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন ঘোষণা করে। ৫ মার্চ ২০২১ বাংলার পুরো ২৯১টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীদের নাম জানিয়ে দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। দার্জিলিংয়ের ৩টি আসন ছেরে রাখা হয়। কম পয়সায় নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার হলো বাড়ির দেওয়াল এমনকী কুঁড়ে ঘরের মাটির দেওয়ালও। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা বলতে গেলে অধিকাংশ দেওয়াল আগেই চুনকাম করে ‘টিএমসি ২০২১’ লিখে রেখেছিল। শুক্রবার প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পরেই বিকেলেই শুরু হয়ে যায় দেওয়াল লিখন এবং এলাকায় এলাকায় প্রচারপর্ব। চলতে থাকে কর্মিসভা। বেশ কিছুদিন বিজেপি রাজ্যের একজন প্রার্থীর নামও ঠিক করতে পারেনি অনেক কষ্টে প্রথম দু-দফার প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলো ৬ মার্চ। ৭ মার্চ মোদীর সভা ছিল ব্রিগেডে। মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নিলেন। বলে বসলেন তিনি কোবরা। মহাগুরুর বড্ড বর্ণময়। সে যাক, মোদীর সভা হলেও মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে সেদিন থেকে চলে এলেন মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী।
তবে মোদী দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পরই প্রার্থী নিয়ে গন্ডগোল দেখা যায় বেশ কিছু জেলায়। পরের ৪ দফা প্রার্থীপদ ঘোষণার পর বিজেপি কর্মীদের মধ্যেই গৃহযুদ্ধ লেগে যায় জেলায় জেলায়। বিজেপির সেকেন্ড ম্যান অমিত শাহকে অসমের সফর কাটছাঁট করে ফের আসতে হয় কলকাতায়। সারারাত শীর্ষনেতাদের সঙ্গে কথা বলে দিল্লি ফিরে গিয়েই ফের বিকেলে ডেকে পাঠান হয় বাংলার বিজেপির নেতাদের। ততক্ষণে যা হবার হয়ে গিয়েছে। বিজেপির নীচু তলার কর্মীরা ঘেঁটে ঘ। প্রার্থী পদ নিয়ে বিজেপির অন্দরমহলে যে একটা ঝড় বইছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার বৃথা চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে উত্তর কলকাতা, হাওড়া এবং চৌরঙ্গীতে এমন সব প্রার্থীর নাম ঘোষণা করলো বিজেপি যে প্রার্থী ঘোষণার আধঘন্টার মধ্যে তারা বলে বসলেন ‘আমি জানিই না আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলো, কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নি’। আর দু-জন বলে বসলেন, ‘আমরা তো বিজেপিতে নামই লেখাই নি তাহলে আমাদের নাম ঘোষণা করা হলো কেন’? একটা জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এইধরণের ভুল ত্রুটি স্বাভাবিক কি? না প্রার্থী জোগাড় করার দৈন্যতায় তাঁরা ভুগছেন। এতে নীচু তলার কর্মীদের প্রতি কি বার্তা যাচ্ছে।
সংযুক্ত মোর্চা বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ-এর কথা তথৈবচ। তারাও প্রার্থী বাছাইয়ে হিমসিম খাচ্ছে। কিছু আসনে প্রার্থীর নাম জানালেও এখনও সম্পূর্ণ নয়। নাম জানানোর পরেই কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের গোলমাল বেধে যায়। এমনকি বামফ্রন্টের শরিকরাও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নির্বাচনে ভোটারদের কাছে যাওয়া প্রার্থী পরিচিতি করানো দলের বক্তব্য তুলে ধরা — এসব ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস পরিকল্পিত, সংগঠিতভাবেই করছে। ভোট যুদ্ধে নির্বাচনের দিন ঘোষণা থেকে ফল ঘোষণা পর্যন্ত সময়কালকে কয়েকটি রাউন্ডে ভাগ করা যায়। দিন ঘোষণার পর দ্রুত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা এবং প্রচারে নেমে যাওয়া হলো প্রথম রাউন্ডের কাজ। অলিম্পিকে ৪০০ মিটারের যে রেস হয় তাতে কার্ল লুইসের মতো অ্যাথেলিটরা প্রথম ল্যাপ থেকেই এগিয়ে থাকতে চান এবং শেষ পর্যন্ত সব ল্যাপেই এগিয়ে থাকেন। ১,০১,৯১৬ বুথের সর্বত্র ব্যাপক সংখ্যায় সদস্য-কর্মী-সমর্থক পাওয়ার সুবাদে তৃণমূল কংগ্রেস এই রাউন্ডে অনেকটা এগিয়ে গেছে।
১৯৯৮ সালের অক্টোবরে কলকাতার নজরুল মঞ্চে বসেছিল সিপিআইএমের ষোড়শ পার্টি কংগ্রেস। সেই পার্টি কংগ্রেসের শেষ দিনে একটা ঘটনা ঘটেছিল। বৃন্দা কারাতকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেওয়ার পরেই বৃন্দা কমিটি থেকে নাম প্রত্যাহার করেন। তিনি বলেন, দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এত কম মহিলা কমরেড কেন? ১৯৯৬ সাল থেকে বামফ্রন্টের শরিক দলগুলি মাঝেমধ্যে লোকসভা ও বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ দাবি করে। এ নিয়ে সংসদে কম হইচই হয়নি। কিন্তু এতদিনেও আইন হয়নি। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার বিধানসভায় ৫০ জনকে প্রার্থী করেছেন। মুসলিম সম্প্রদায় থেকে ৩৫ জন, তফসিলি জাতি থেকে ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ১১ জন এমন আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, যেগুলি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসন নয়৷ এ ছাড়া তফশিলি উপজাতি থেকে প্রার্থী হবেন ১৭ জন, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি থেকে ১৯ জন৷ সদিচ্ছা থাকলে আইনি বাধ্যবাধকতা ছাড়াই যে মহিলা প্রার্থী দেওয়া যায় তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়ে দিলেন।
প্রচারের প্রথম রাউন্ডে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে যা খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে প্রতি কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে মহিলা কর্মীদের ঢল নেমেছে। বহু জায়গাতে ঝাঁকে ঝাঁকে মহিলারা দেওয়াল লিখন করছেন। শুধু তাই নয়, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ এমন সব সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলির বহু জায়গা থেকে খবর আসছে, ২০-২২ বছর বয়সি কলেজপড়ুয়া মেয়েরা হইহই করে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারে ঢল নামিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে এরা সব কণ্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথীর। গরিব মানুষেরা বলছেন, হাসপাতালে পরীক্ষা-সহ চিকিৎসা একদম বিনামূল্যে করে দেওয়ায় আমরা খুবই উপকৃত হয়েছি। এই সব পরিবারের মহিলারাও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারে হইহই করে নেমেছেন।