গত দু’দফা ভোটের পর ৩য় দফায় অশান্তি এড়াতে অনেক বেশি সতর্ক ছিল কমিশন। ৩ জেলার ৩১ আসনের ভোটের জন্য মোতায়েন ছিল ৬১৮ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩০৭, হুগলিতে ১৬৭ ও হাওড়ায় ১৪৪ কোম্পানি।
উলটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বিরুদ্ধে বহু এলাকায় পক্ষপাতিত্বমূলক সক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। যেখানে প্রার্থীরা আক্রান্ত হয়েছেন, সেখানে জওয়ানদের দেখা যায়নি। ভোটের দিন সাতজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনার নজিরও অতীতে বড় একটা দেখা যায়নি।
তৃতীয় দফায় যে ২০৫ জন প্রার্থী ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তার মধ্যে ১৩ জন মহিলা প্রার্থী, এদিন তিনজনের ওপর হামলা হয়েছে। বহু জায়গায় ইভিএম খারাপ, বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমনের অভিযোগ উঠেছে। সারা দিন ধরেই প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ছোট বড় সংঘর্ষ লেগেই ছিল। কমিশনে এদিনও ১৮০২টি নালিশ জমা পড়ে। দিনের শেষে ভোট পড়েছে ৭৯. ৬৮ শতাংশ।
তৃতীয় দফায় মতদানের তিন জেলাই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। তবে গত লোকসভা ভোটে বেশকিছু আসনে বিজেপি তাদের অনুকূলে ভোট টেনেছিল। একুশে সব পক্ষই কোমর বেঁধেছিল টক্কর দিতে। শেষ পর্যন্ত কে কিস্তিমাত করবে এখন তারই অপেক্ষা।
হাওড়া ১ম ভাগের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র উলুবেড়িয়া উত্তর। ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রটি তৃণমূলের কবজায়। ব্যবধান সামান্য কমলেও লোকসভাতে এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল লিড পেয়েছিল। এবার তৃণমূল প্রার্থী নির্মল মাজির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে গেরুয়া শিবির ভোট টানার চেষ্টা চালিয়েছে।
উলুবেড়িয়া দক্ষিণও ২০১১ থেকে ঘাসফুলের দখলে। এমনকি গত লোকসভাতেও এখানে তৃণমূল লিড বাড়িয়েছিল। ফলে এখানে তৃণমূলের পুলক রায়ের সঙ্গে বিজেপি প্রার্থী পাপিয়া অধিকারী এবং আইএসএফ প্রার্থী কুতুবউদ্দিন আহমেদের লড়াই বেশ কঠিন।
শ্যামপুর কেন্দ্রটিও তৃণমূলের গড়। এই কেন্দ্রে চারবারের বিধায়ক কালীপদ মণ্ডল এবারও তৃণমূল প্রার্থী। নারী দিবসে গেরুয়া মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে অভিনেত্রী তনুশ্রী চক্রবর্তী পদ্ম প্রতীকে লড়ছেন। তিনি কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার ভোটে লিড দেবেন বললেও ব্যাপারটা কঠিন।
লোকসভা নির্বাচনেও বাগনান কেন্দ্র থেকে তৃণমূল বিশাল ব্যবধানে জিতেছিল। এবার বিজেপি শক্তিশালী; তবে এখানে বিজেপির সংগঠন তেমন নেই।
আমতা আসনটি ২০১৬-য় ছিল কংগ্রেসের দখলে। ২০১৯-এর লোকসভায় জিতেছিল তৃণমূল। এবার সংযুক্ত মোর্চার শরিক হিসেবে কংগ্রেস আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া। অন্যদিকে তৃণমূল লোকসভার ফল ধরে রাখতে চাইবে।
উদয়নারায়ণপুর কেন্দ্রে গত বিধানসভা ও লোকসভায় তৃণমূল বিরাট লিড দিয়েছিল। এই আসনে ৯০ শতাংশ তফসিলি ভোট। এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থীর সমীর পাঁজার জনসংযোগ খুব ভাল। বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলেরই ক্ষোভ রয়েছে।
জগৎবল্লভপুর কেন্দ্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট। সেই ভোট টানতে সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে আইএসএফ। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকলেও তৃণমূলের প্রার্থী ভূমিপুত্র সীতানাথ ঘোষের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ। ভোট কাটাকাটির ফায়দা তুলতে মরিয়া বিজেপির পক্ষে কঠিন লড়াই।
গত লোকসভায় দক্ষিণবঙ্গের হুগলি জেলায় বিজেপি তৃণমূলকে কিছুটা হলেও টক্কর দিতে পেরেছিল। ২০১৬ সালে জাঙ্গিপাড়ায় তৃণমূল জিতলেও গত লোকসভায় ঘাসফুলের ভোটের ব্যবধান কমেছিল। এবার আইএসএফ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট কাটতে পারে; তবে লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপির।
তারকেশ্বর কেন্দ্রে বিজেপি স্বপন দাশগুপ্তকে রাজ্যসভা থেকে তুলে এনে প্রার্থী করেছে। তাঁর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী জনসভা করেছেন। তার আগে এখানে পরপর দু’বার বিধায়ক হয়েছেন তৃণমূলের রচপাল সিং। এবার তৃণমূলের প্রার্থী এলাকার পরিচিত মুখ রমেন্দু সিংহরায়। স্বপন দাশগুপ্তের স্বচ্ছ ইমেজকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি ফায়দা তুলতে পারবে কি?
ধনেখালির তৃণমূল প্রার্থী অসীমা পাত্রের নির্বাচনী রেকর্ড নজরকাড়ার মতো। পরপর দুবার বিধায়ক, ২০১৬-তে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে ৬০ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছিলেন। তবে বিধায়ককে সবসময় কাছে না পাওয়ার জন্য মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। কেন্দ্রের গ্রামীণ এলাকায় লকেট চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু বিজেপির তুষার মজুমদার কি এর অ্যাডভান্টেজ পাবেন?
করোনা পরিস্থিতিতে রক্তের সংকট কাটাতে মহিলাদের নিয়ে গোটা হরিপাল ঘুরে রক্তদান শিবির করেছেন, বাড়ি-বাড়ি খাবার পৌঁছে দিয়েছেন এবারের তৃণমূল প্রার্থী করবী মান্না। বিজেপি প্রার্থী সমীরণ মান্না সদ্য তৃণমূল ছেড়েছেন। এই কেন্দ্রেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
পুরশুড়াতে গত লোকসভায় তৃণমূলকে টক্কর দিয়েছিল বিজেপি। এবারও এই কেন্দ্রে লড়াই বেশ কঠিন।
আরামবাগ ২০১৬-র বিধানসভায় তৃণমূল জিতেছিল, গত লোকসভাতেও এই বিধানসভা কেন্দ্রে চার হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন তৃণমূল। সংখ্যালঘু এলাকায় বিজেপি কি তৃণমূলকে টক্কর দিতে পারবে?
গোঘাট ২০১৬-র বিধানসভায় তৃণমূল জিতলেও গত লোকসভায় এক হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল। অন্যদিকে বিজেপির এবারের প্রার্থী বিশ্বনাথ কারক আগে ছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লকে। এবারের লড়াইয়ে এখনও ঘাসফুল এগিয়ে।
গত বিধানসভা ও লোকসভা ভোটেও খানাকুল তৃণমূলের দখলে ছিল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় আইএসএফ প্রার্থীও আছেন। সংগঠনের নিরিখে পিছিয়ে বিজেপি। লড়াইটা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ঘাসফুল শিবির।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় বিজেপি খুবই দুর্বল। এখানে লড়াই সংযুক্ত মোর্চা বনাম তৃণমূল। সংখ্যালঘু প্রভাবিত কেন্দ্রগুলিতে আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট বেঁধে বামেরা পাল্টা লড়াইতে ফিরিতে চাইছে। আবার এই জেলাতেই লড়ছেন কান্তি গাঙ্গুলি ও সুজন চক্রবর্তীর মতো সিপিএম নেতা। সব মিলিয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাসন্তী এলাকায় তৃণমূল ও আইএসএফের মধ্যে ভোট কাটাকাটি হলে বিজেপির কিছুটা হলেও অ্যাডভান্টেজ পেতে পারে। তবে লড়াই হয়েছে জোড়।
কুলতলিতে এসইউসিআইয়ের সংগঠন আজও মজবুত। এই কেন্দ্রে লড়াই চতুর্মুখী হয়েছে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।
কুলপি তৃণমূলের গড়। পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা ভোটে এগিয়ে তৃণমূল। তবে সংখ্যালঘু ভোট কাটতে পারে আইএসএফ প্রার্থী। ভোট কাটলে লাভ হতে পারে গেরুয়া শিবিরের, কিন্তু কতটা?
রায়দিঘিতে দু’বার জিতলেও দেবশ্রী রায়কে প্রার্থী করেনি তৃণমূল। ভোট বৈতরণী পেরতে এবারও বামেরা দায়িত্ব দিয়েছিল কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়কে। বিজেপি প্রার্থী শান্তনু বাপুলি আগে তৃণমূলে ছিলেন। এখানে লড়াই হয়েছে ত্রিমুখী।
মন্দিরবাজারে বিজেপি প্রার্থীকে নিয়ে দলেই ক্ষোভ ছিল। আইএসএফ প্রার্থী বহিরাগত। কয়েকটি এলাকায় তৃণমূল প্রার্থীর বিরুদ্ধেও ক্ষোভ ছিল। এই কেন্দ্রে লড়াইটা আসলে তৃণমূল বনাম বিজেপির।
জয়নগর কেন্দ্রে এসইউসিআই-এর সংগঠন মজবুত। মানুষের আস্থা রয়েছে তাদের উপর। যেন তেন প্রকারেণ এই আসন ফেরত পেতে চাইছে তারা। ফলে এই কেন্দ্রে লড়াই চতুর্মুখী।
বারুইপুর পূর্ব কেন্দ্রে এবার তৃণমূলের গতবারের জয়ী নির্মল মণ্ডলের জায়গায় বিভাস সরদার। বিজেপির প্রার্থী চন্দন মণ্ডল একেবারে নতুন। সিপিএম প্রার্থী স্বপন নস্করের হয়ে আব্বাস সিদ্দিকি প্রচার করেছেন। সংখ্যালঘু ভোট কেটেই কি কিস্তিমাত হবে?
বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী দু’বারের বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবোপম চট্টোপাধ্যায় এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী। সিপিএমের তরুণ তুর্কি লায়েক আলি। এই আসনেও সংখ্যালঘু ভোট কাটাকাটির অঙ্ক আছে।
ক্যানিং পশ্চিমও ঘাসফুল শিবিরের গড়, এলাকায় বিজেপির সংগঠন নেই। ক্যানিং পূর্ব-তেও বিজেপির সংগঠন নেই। তৃণমূলের কিছু ভোট কাটতে পারে আইএসএফ প্রার্থী।
মগরাহাট পূর্ব কেন্দ্রে বিজেপির সামান্য প্রভাব রয়েছে। বিজেপি প্রার্থী তৃণমূলকে লড়াই দিতে পারেন। মগরাহাট পশ্চিমে তৃণমূলেরও সংখ্যালঘু প্রার্থী। আইএসএফ প্রার্থী আর তৃণমূল প্রার্থীর মধ্যে ভোট কাটাকাটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডায়মন্ড হারবারে পরপর দু’বারের তৃণমূলের বিধায়ক দীপক কুমার হালদার এবার বিজেপি প্রার্থী। তা নিয়ে বিজেপিতে ক্ষোভ রয়েছে। তৃণমূল প্রার্থী করেছে ডায়মন্ড হারবার পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান পান্নালাল হালদার। সিপিএমের তরুণ প্রার্থী প্রতীক উর রহমান। এই কেন্দ্রে লড়াই ত্রিমুখী।
ফলতার তিনবারের বিধায়ক তমোনাশ ঘোষের মৃত্যুর পর এবার তৃণমূল প্রার্থী শংকরকুমার নস্কর। শেষ মুহূর্তে বিজেপি প্রার্থী করেছে বিধান পাড়ুইকে। গত বিধানসভা ভোটে তিনি সিপিএম প্রার্থী ছিলেন। সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী কংগ্রেসের আবদুর রেজ্জাক মোল্লাকে। এগিয়ে তৃণমূল।
সাতগাছিয়ার চারবারের বিধায়ক সোনালীকে প্রার্থী না করায় তিনি বিজেপিতে। তবে তিনি বিজেপি প্রার্থীও নন। প্রার্থী হয়েছেন আমতলার চন্দন পাল। সংযুক্ত মোর্চার সিপিএম প্রার্থী থাকলেও, তৃণমূল প্রার্থী মোহনচন্দ্র নস্করের সঙ্গে বিজেপির জোর লড়াই।
বিষ্ণুপুরে পরপর দু’বারের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল এবারও প্রার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি-র অগ্নিশ্বর নস্করকে নিয়ে বিজেপি-র ঘরোয়া কোন্দল বেঁধেছিল। সংযুক্ত মোর্চার সিপিএম প্রার্থী ঝুমা কয়াল। তিন প্রার্থীর মধ্যে তৃণমূলের পাল্লা ভারী।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান ভিন্ন জাতীয়, ওভাবেই ওদের প্রতিপালন করা হয়। কিন্তু এতকাল ভোটে যারা ধম্মের ষাড় ছিল
তারা এবার বিভিন্ন ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে, বিষয়টা ভাবার কিন্তু…।
১৩ জন মহিলা প্রার্থীর মধ্য যদি তিনজনের ওপর হামলা হয় আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের ঘটনাস্থলেই খুজে না
পাওয়া যায় তাহলে তাদের কাজটা কি? বিজেপি-র পক্ষে ভোট সংগঠিত করা, না অশান্তির পরিবেশ তৈরি করা?
এবার ভোটে মেয়েদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-কথাটা অনেকদিন ধরেই শুনে আসছি, সেই ভূমিকাটা কি গত মঙ্গলবার
ভোটে সাতজন মহিলা প্রার্থীর মধ্যে তিনিজনের ওপর আক্রমণ? ঘেন্নায় বমি উঠে আসছে নির্বাচন কমিশন আর কেন্দ্রীয়
বাহিনীর তৎপরতা দেখে।
একদল নেমেছে ভোট কাটাকাটি করে যদি কিছু ফায়দা তোলা যায়, তার জন্য সব ধরণের আপোষ তারা করেছে। মুখে
বলছে সাম্প্রদায়িক দলকে ভোট নয়, কিন্তু তারা সেই দলকেই শক্তিশালী করে তুলছে দেশের যুবশক্তি থেকে শুরু করে
যে কোনও কিছুর বিনিময়ে। এরপরও যদি হিংসার ভোট না হয় তো কি ফুল চন্দন মাখা ভোট হবে?
সবাই এখন মানুষের সেবায় ব্যস্ত হতে চাইছে, তার মানে ভোটে নামতে হবে। হটাৎ মানুষের জন্য এত দরদ কেন? এত
লোক যদি একই কাজে ভোটে নাম লেখায় ভিড় বাড়বে আর ভিড়ে ঠেলাঠেলি গুঁতোগুঁতি তো হবেই। আর সেই ভোট
জেতাটা তো নানা অঙ্কেরই হিসাব।