তামিলনাড়ুতে ডিএমকের ম্যানিফেস্টোতে অনেক রকমের কল্যাণমূলক কর্মসূচির ঘোষণা সত্ত্বেও শেষে যে বলতে হল, ক্ষমতায় এলে সেতুসমুদ্রম প্রকল্প রূপায়ণ করা হবে, সেটা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরই প্রভাব। কেজরিওয়াল তাঁর বাজেটকে বলছেন দেশভক্তি বাজেট। বোঝা যাচ্ছে একটা মেজরিটারিয়ান স্টেট বা সংখ্যাগুরুবাদী রাষ্ট্রের আদর্শকে তিনি এড়াতে পারছেন না। একটা ‘এথনো-ন্যাশনালিস্ট আইডিওলজি’র প্রভাবের শিকার তিনিও। এখানেই থামেননি কেজরিওয়াল। তিনি বলেছেন, তিনি হনুমানের উপাসক। তিনি দিল্লিতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান। রামরাজ্যের ব্যখ্যা দিয়ে তিনি অবশ্য বলেছেন, রামরাজ্য মানে হল, খাদ্যের অধিকারের স্বীকৃতি, উন্নতমানের শিক্ষার অধিকারের স্বীকৃতি।
গত বছর ৫ অগস্ট, কাশ্মীর থেকে ৩৭০ প্রত্যাহারের বর্ষপূর্তিতে, অযোধ্যায় রামমন্দিরের ভূমি পূজা এবং শিলান্যাস করে প্রধানমন্ত্রী বললেন, তাঁর কাছে দিনটি স্বাধীনতা দিবসের সমান। তার আগেই দেখা গেল প্রিয়ঙ্কা গান্ধী স্বাগত জানাচ্ছেন ভূমি পূজনকে। ভোটের প্রচারে পশ্চিমবঙ্গে এসে বিজেপি নেতারা বলছেন, ক্ষমতায় এলে লাভ জিহাদ আইন করবেন।
ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে বিজেপি যে বলছে ক্ষমতায় এলে প্রথমেই তারা সিএএ লাগু করবেন, তারা কিন্তু অসমে একথা বলছে না। পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার দুর্গাপূজা এবং সম্ভবত কোটি খানেক সরস্বতী পূজা হয়। এর মধ্যে কোনও এক কালে, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে (প্রশাসনিক কারণে নেওয়া একটা বিরল সিদ্ধান্ত) ধরে বিজেপি যেসব কথা বলেছে ম্যানিফেস্টোতে, তাতে বোঝা যায়, হয় তারা খবর রাখে না, নয়তো উদ্দেশ্য প্রণোদিত এইসব মন্তব্য।
এই রকম একটা ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির আবহে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলের যে ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করলেন, তাতে তিনি প্রায় বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে, ১০০ ভাগ উন্নয়নের কথা বললেন, কোনও রকম ধর্মের ছোঁয়া লাগা একটি প্রতিশ্রুতিও তিনি দেননি তাঁর ম্যানিফেস্টোতে। (বামফ্রন্টের ম্যানিফেস্টোতেও ধর্মের ছোঁয়া লাগা কোনও প্রতিশ্রুতি নেই, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক, বাম রাজনীতিতে এ ব্যাপারটা কোনও দিনই ছিল না)। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে, দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি, আর্থিক, সাংগঠনিক ক্ষমতায় হাজার মাইল এগিয়ে থাকা, ‘নীতিহীন’ নির্বাচনী কৌশলে এবং বিভিন্ন সরকারি এজেন্সি-শক্তিতে প্রবল আগ্রাসী একটি দলের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ডেভলাপমেন্টের মডেল নিয়ে নির্বাচনে লড়তে নামা, এটা শুধু ব্যতিক্রম নয়, এটা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপরীতে এক বিরাট প্রতিবাদও। ভারতীয় রাজনীতির মূল ধারাকে রক্ষা করার এক উল্লেখযোগ্য প্রয়াস। মমতা সফল হলে দেশবাসী তাঁকে অভিনন্দন জানাবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত। যারা প্রয়োজনবোধ করেছেন, তারা নিশ্চয়ই পড়ে নিয়েছেন। এখানে তার একটি মাত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক। রাজ্যের সব মানুষের জন্য নেওয়া একটি প্রকল্প। ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’-এর ধাঁচে প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি ন্যূনতম আয়ের (বেসিক ইননকাম) ব্যবস্থা করা। সেটা জমা পড়বে বাড়ির গৃহকর্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। টাকাটা কম? আজ কম, তবে কাল বাড়তে পারে। কিন্তু একটা অঙ্গরাজ্যে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একটা বৈপ্লবিক প্রচেষ্টা। ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ প্রকল্পের ইতিহাস এবং তা নিয়ে বিশ্বের বর্তমান ভাবনাটা একটু দেখে নেওয়া যাক।
এই কলামে আমি আগেও এই কলামে লিখেছি, পৃথিবীতে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’, এই রাজনৈতিক আদর্শ যার চিন্তার ফসল, সেই মানুষটি, ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, উইলিয়াম হেনরি বেভরেজ-এর জন্ম স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের অবিভক্ত বাংলায়। ১৮৭৯ সালের ৫ মার্চ। এখানেই পৃথিবীর এই মানবিক অর্থনৈতিক ভাবনার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক।
পোপ ফ্র্যান্সিস, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকেরবার্গ, ইয়োরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট লুই গুইনডস, তিনজনই একমত, যে কোভিড-১৯-এর দুর্নিবার বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে এখনই উপযুক্ত সময়, বিশ্বজুড়ে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ নীতি রূপায়ণের। ইংরেজিতে কথাটা বেশ পরিচিত অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মীদের কাছে। বাংলা করলে বলা যায়, ‘সবার জন্য ন্যূনতম আয়’। সেটা কী? সেটা হল, যে নাগরিকরা কাজ করে আয় করতে পারেন না, তাঁরা যাতে রোজগারহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য না হন তার একটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। অর্থাৎ রোজগারহীন সব নাগরিকের জন্য একটা নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত করা। সরকারের থেকে পাওয়া ওই টাকা তারা বাজারে খরচ করবেন। তাতে চাহিদা বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে জোগানের উপর। বাড়বে উৎপাদন। উৎপাদন বাড়লে লোকেরা কাজ পাবে, মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরবে। উৎপাদনের এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরবে।
এই মুহূর্তে আমাদের দেশে প্রায় ৮১ কোটি মানুষ রেশন পান। এছাড়াও সরকারের বেশ কিছু কল্যাণপ্রকল্প রয়েছে। তা সে ১০০ দিনের কাজই হোক অথবা বিভিন্ন পরিষেবায় ভর্তুকি। সব যোগ করে যে টাকাটা দাঁড়াবে তার সঙ্গে আরও কত অর্থ যোগ করতে হবে সকলের জন্য ন্যূনতম রোজগার নিশ্চিত করতে, সে হিসেব অর্থনীতিবিদেরা করবেন। সরকারকে নিতে হবে নীতিগত সিদ্ধান্ত। করোনায় ধাক্কায় অচল অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে দেশে বেশ গুরুত্ব দিয়ে এই ভাবনা শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সরকারি স্তরে বা রাজনৈতিক স্তরেই হবে। কিন্তু আমাদের দেশে, যে সরকার এলআইসি, ব্যাঙ্ক, বিমানবন্দর, খনি, রেল সব কিছু বেসরকারিকরণের পথে হাঁটছে, সেই সরকার কি মানব কল্যাণে এই ধরনের প্রকল্প নিয়ে ভাববে? এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি অঙ্গরাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ন্যূনতম আয়ের গ্যারেন্টির মতো একটা প্রকল্প ঘোষণা করলেন নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে, তখন মানতে হবে কল্যাণকামী রাষ্ট্র ভাবনায় তিনি ভারতের অন্য রাজনীতিকদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে আছেন। ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের ধাঁচে নেওয়া একটি কর্মসূচি যখন পশ্চিমবঙ্গের মতো একটা ছোট রাজ্যের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে জায়গা করে নেয় তখন মানতে হয় মন্দিরের রাজনীতির বিপরীতে মানবতাবাদী রাজনীতির আরেকটি ধারাও সক্রিয় আছে। হারিয়ে যায়নি।
বামফ্রন্টের যে ম্যানিফেস্টো বিমান বসু প্রকাশ করেছেন সেখানে বিদ্যুতের বিলে ছাড়, দু’টাকা কিলো চালে প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্ট ছাপ কিছুটা কেজরিওয়ালের, কিছুটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচির। তবে শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ইত্যাদি যেসব কথা আছে বামফ্রন্টের ইস্তাহারে তা পড়ে কেউ প্রশ্ন করতেই পারে, যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন কেন করেননি?
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মাসে ২১ হাজার টাকা, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিলে সরকারি ভর্তুকি, বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের মাসে ২৫০০ টাকা ভাতা ও সস্তায় রেশন, দরিদ্র অংশের জন্য দু’টাকা কিলো দরে চাল বা আটা প্রতি মাসে ৩৫ কেজি করে প্রতি পরিবারে সরবরাহ করা-সহ বেশ কিছু ঘোষণা। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেটের অন্তত ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় বামফ্রন্টের ম্যানিফেস্টোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।
শেষ পর্বে বিজেপির নির্বাচনী ঘোষণাপত্র। এই ম্যানিফেস্টো পড়ে মানুষের মনে কী কী প্রশ্ন দেখা দিতে পারে তার দু’একটি নমুনা দেওয়া যাক।
বলা হয়েছে সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের কথা। বেজায় ভালো কথা, কিন্তু এ কাজ আপনারা আপনাদের হাতে দু’ডজনের কাছাকাছি যেসব রাজ্য সরকার আছে, সেখানে কেন করেননি?
প্রতি পরিবারে একজনের চাকরি। যখন নরেন্দ্র মোদীর আমলে দেশে বেকারি ঐতিহাসিক উচ্চতা ছুঁয়েছে, যখন ২০১৪-র ভোটে দেওয়া বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে এখনও লোকজন হাসাহাসি করছে, তখন ফের এসব কথা লোকে শুনবে কেন?
সরকারি কর্মচারীদের পে-কমিশন ইত্যাদি নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেসব ত্রিপুরাতেও বলা হয়েছিল, তার একটাও ত্রিপুরায় কেন করা হল না, তার জবাব নেই।
চা-বাগান শ্রমিকদের যে মজুরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেই মজুরি অসমের চা-বাগানে কেন দেওয়া হয়নি তার জবাব নেই।
এমনই অসংখ্য আকাশ ছোঁয়া সব প্রতিশ্রুতি যা বিজেপি তাদের নিজেদের হাতে থাকা কোনও রাজ্যেই কখনও করে দেখায়নি।
কংগ্রেসের ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছে। এটা ঠিক, ম্যানিফেস্টো পড়ে কেউ ভোট দিতে যান না। মানুষ ভোট দেন মূলত তার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া ধারণা থেকে। তবে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত চারটি ম্যানিফেস্টো যদি কেউ পাশাপাশি রেখে পড়েন, তুলনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ম্যানিফেস্টো অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য।