গত লোকসভা ভোটের পর থেকে একটা কথাই শুনে এসেছি— বাংলার পাহাড় থেকে সাগর নাকি ছেয়ে ফেলছে বিজেপি। কেননা তারা ২০১১ তে শূন্য দিয়ে শুরু করে ২০১৯-এর লোকসভায় ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসন জিতে নিয়েছে। এরমধ্যে উত্তরবঙ্গের ৮টির মধ্যে ৭টি এবং দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহলে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়গ্রাম। বিধানসভার হিসাব অনুযায়ী উত্তরবঙ্গে ৫৬টি বিধানসভা আসনে ও দক্ষিণবঙ্গের জঙ্গলমহলে ১২টিতে এগিয়েছিল বিজেপি।
অস্বীকার করার উপায় নেই এই ফলাফল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভাবিয়ে তুলেছিল। তোলপাড় হয়ে উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহল। গত দু’বছরে পলিময় গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। শাসক দল, বিরোধী তর্জা বহু কথার কারণ ঘটিয়েছেন তৃণমূল নেতা মন্ত্রীরা। কতজন তৃণমূল মন্ত্রী, বিধায়ক, জেলাস্তরের নেতা দলবদলু হয়েছেন সেটাও রীতিমতো হিসাবের ব্যাপার। কিন্তু তারপরও এ রাজ্যের নাগরিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা এখনও তুঙ্গে।
দলবদলের কারণ হিসাবে ক্ষমতা হারানো, আর্থিক লোভ, দুর্নীতি বা আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে সিবিআই-ইডির কোপ থেকে বাঁচার চেষ্টা যেমন আছে, তেমনি আছে ‘এতদিন দলের হয়ে খেটে কি পেলাম’ জাতীয় অন্ত্রের কৃমি। অর্থাৎ কোথাও কোনও নীতি বা আদর্শের দ্বন্দ্ব নয়, স্রেফ ‘সাধ না মিটিল আশা না পুরিল’। আর সেকারণে কংগ্রেস, বিজেপি এবং বাম দল থেকেও তৃণমূলে আশ্রয় নেওয়ার সঠিক হিসেব করা কঠিন। এক কথায় ভয়ে না ভালোবাসায় এই দলবদল তা ভাববার বিষয়।
দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর জনপ্রিয়তা যথেষ্ট। যদিও আজ তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে আরও একবার কৃষক আন্দোলন, ব্যাঙ্ক ও বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলিকে বিকিয়ে দেওয়া বা বিলগ্নিকরণ, অর্থনৈতিক মন্দার জেরে দোকান-পাট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আর্থিক সঙ্কট, শ্রমিক ও চাকুরিজীবীদের বাধ্যতামূলক পে-কাট, দেশজোড়া সীমাহীন বেকারত্ব, গ্যাস-পেট্রল-ডিজেল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়ীজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, পেনসন ভোগীদের বছরের উপর ডিএ এক হাতে না পাওয়া-এরকম হাজার একটা সমস্যায় জর্জরিত দেশে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ থেকে সাধারণ মধ্যবিত্ত যে আজ জীবন যাপনের চরমসীমায় অবস্থান করছে সেই নিত্তিতে ফেলে মাপতে হবে।
অথচ মোদী আসমুদ্র হিমাচল প্রসারিত বিজেপির একমাত্র মুখ। অন্য যে কোনও রাজ্যের মতো বাংলাতেও বিজেপির মোদী ছাড়া অন্য মুখ নেই। এমনকি যে বাংলা তারা এই বিধানসভা নির্বাচনে দখল করতে চলেছেন সেখানেও বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর মুখ এখনও আঁকতে পারেনি। রাজনীতি বা নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও কি বলবেন এর কোনও প্রতিফলনই দুয়ারে দাড়ানো বিধানসভা ভোটে পড়তে বাধ্য নয়? তাঁরাও এখন বলছেন এই অবস্থা বিজেপির পক্ষে না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই পরিস্থিতি ছিল না, সেকারণে তখন সেগুলি বিষয় হয়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি, এনআরসি ইত্যাদি বিষয় ২০১৯-এর লোকসভায় সবক্ষেত্রে একইভাবে না হলেও কোথাও কোথাও সামান্য হলেও ৫৬ ইঞ্চির প্রতি একটা আস্থা জুগিয়েছিল কিন্তু এবার তা ভোটারদের একেবারেই প্রভাবিত করবে না। বরং বিজেপির ধর্মীয় জঙ্গিপনা, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই নির্বাচনে নেতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করেছে। নির্বাচন এগিয়ে আসায় আর তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে ওঠার কারণেই হয়ত গেরুয়া শিবিরে্র লেঠেল ও লুম্পেন বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এ রাজ্যের নাগরিক আন্দোলন থেকে প্রায় গণআন্দোলনের রূপ নিতে চলা ‘নো ভোট টু বিজেপি’ প্রতি দিন যেন মোদী-শাহদের স্বপ্নে ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
কারও মতে তথাকথিত বিজেপি বিরোধী দলগুলির কাছে এমনকি সিপিএম-এর কাছেও এই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিন্তু এর পাশাপাশি বাঙালিয়ানা বনাম বিজেপিয়ানার মতো একটি বিষয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যা বাংলার শিক্ষিত, সচেতন মানুষ কিছুতেই গ্রহণ করতে পারছেন না। কারণ বাংলার মানুষ ঐতিহ্যগত দিক থেকেই এ ধরণের হিঁদুয়ানি বা বিজেপিয়ানা বা কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদীকে কোনওদিন প্রশ্রয় দেয় নি। কারণ সেই রাজনীতি সব সময়েই আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে, সমাজ জীবন রক্তাত্ত করেছে।
বিজেপি রাজ্যের মানুষের মূল সমস্যাগুলিকে গুলিয়ে দিতে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের ধারণা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কৃষি থেকে শিল্পে ধারাবাহিকভাবে সৃষ্টি হওয়া সমস্যা রাজ্যের শ্রমিক-কৃষক-চাকুরিজীবীদের উপর যে একের পর এক আঘাত হানছে, সেসব কথা পাশ কাটিয়ে তাঁরা হিন্দুয়ানা বা বিজেপিয়ানার চর্চা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। তারা যদি মনে করেন রাজ্যেবাসী ঘাসে মুখ দিয়ে চলেন তাহলে তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করছেন। আর সেকারণেই দক্ষিণের পুদুচেরি, তামিলনাড়ু, কেরালা, পূর্বের পশ্চিমবঙ্গ কোথাও কোনও সমীক্ষাতে কি বিজেপি জিতছে, এমন কোনও আশ্বাস শোনা যাচ্ছে একমাত্র উত্তরপূর্বের আসাম ছাড়া?
বিজেপির ধর্মীয় জঙ্গিপনা, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণেই এই নির্বাচনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে উঠেছে আর সে
কারণেই গেরুয়া শিবিরের লেঠেল ও লুম্পেন বাহিনী সক্রিয় হয়ে উঠেছে- এটা তো ঘটনা, অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু বিকল্প?
প্রতিবেদনটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিয়েই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কোনও কথাই আবেগে গা
ভাসানো নয়।
বাংলার মানুষই বিজেপিকে চাইছে কারণ পরিবর্তন খুব দরকার, চারপাশে কান পাতুন, চোখ মেলে দেখুন, তাহলেই বুঝবেন
আপনার নিজের যুক্তি-তর্ক আপনার নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছে। তাও যদি আপনি নিজের পচা তত্ত্ব নিয়ে গ্যাঁট মেরে
বসে থাকেন তাহলে আর আপনাকে বাঁচাবে কে।
বাংলার মাটিতে বাংলার মানুষ চুপি চুপি বিজেপিকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিতে পারে, বিজেপির লড়াই মানে তো অন্তর্কলহ,
তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী বাম-কংগ্রেসের মমতা বিদ্বেষ, তারা পরোক্ষে বিজেপির জয় মানবে কিন্তু তৃণমূলকে মানতে
পারবে না, সে বিজেপি যতই ফ্যাসিস্ট কিংবা সাম্প্রদায়িক হোক।
খুব ভাল লিখেছেন। লেখার মধ্যে কোনও সহজ সরল মোটা দাগের কথা নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ যেমন হয় ঠিক তেমন।
পড়তেও ভাল লেগেছে।