একটি ভিডিও। ইন্টারনেটে, ইউটিউবে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। নরেন্দ্র মোদি, ২০১৪-এর লোকসভা ভোটের ঠিক আগে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, তিনি দেশ নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেন। কী স্বপ্ন? সেটা হল ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-র স্বপ্ন। যেখানে তথ্য জানার কোনও সীমা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদি সাত বছর থাকার পর আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? একদিকে তাঁর নেতৃত্বে ভারত বিশ্ববাসীর চোখে পৌঁছে গিয়েছে গণতান্ত্রিক দেশ থেকে আংশিক গণতান্ত্রিক দেশের দরজায়, গণতান্ত্রিক থেকে ‘ইলেক্টেড অটোক্র্যাসি’-র দুয়ারে, অন্যদিকে দেখতে পাচ্ছি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সেই স্বপ্নের ডিজিটাল ইন্ডিয়া তো দূরের কথা, পৃথিবীতে যে সব দেশের ব্রডব্যান্ডের স্পিড সব থেকে স্লথ, ভারত এখন সেই সব দেশের দলে। আমরা এগোতে পারিনি। শুধু তাই নয়, এখনও দেশের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষের হাতে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগই নেই। সেই ছবিটা আরও দগদগে হয়ে প্রকাশ পেল কোভিড লকডাউনের সময়।
আধুনিক দুনিয়ায় ধরে নেওয়া হয় ‘কানেকটেড পপুলেশন’ অর্থাৎ ইন্টারনেটের সুবিধাপ্রাপ্ত জনসংখ্যা যত বাড়বে ততই বৃদ্ধি পাবে আধুনিক জ্ঞান বা নলেজ, দক্ষতা, বৃদ্ধি পাবে বাণিজ্যের সম্ভাবনা। যা আসলে প্রত্যক্ষ ভাবে উন্নত করে জনগণের জীবনযাত্রার মানকে। সে কারণেই আধুনিক জগৎ ইন্টারনেট ছাড়া শুধু আচল নয়, বলা যায় তা হবে অন্ধকারের দিকে যাত্রা। কিন্তু আমরা কি করছি? মোদির ভারত কোন দিকে হাঁটছে? দিল্লির ‘সফটওয়্যার ফ্রিডম ল’সেন্টার’ (SFLC) নামের ‘ডিজিটাল রাইটস গ্রুপ’ যারা নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরব, তাদের প্রকাশিত তথ্য বলছে, মুখে যতই নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন হোক না কেন ডিজিটাল ইন্ডিয়া, বাস্তবে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ বা ইন্টারনেট নিষিদ্ধ করার ঘটনা বেড়েই চলেছে সারা দেশ জুড়ে। কী রকম? শুনুন তাহলে। ২০১২ সালে দেশে ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’-এর ঘটনা ঘটেছিল ৩টি, ২০১৩ তে ৫টি, ২০১৪ তে ৬টি, ২০১৫ তে ১৪টি, ২০১৬ তে ৩১টি, ২০১৭ তে ৭৯টি, ২০১৮ তে ১৩৪টি, ২০১৯-এ ১০৬টি এবং ২০২০ সালে ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’-এর ঘটনা ঘটেছে ১৩২টি। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা বলেই এই কাজগুলো করা হচ্ছে। এত বেশি সংখ্যায় ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ পৃথিবীতে আর কোনও দেশে হয় না। এই তথ্য আমাদের জানিয়েছেন ফ্রান্সের বিশিষ্ট ভারত বিষয়ক রাষ্ট্রনীতির গবেষক ক্রিস্তফ জাফেরলট।
২০১৯ সালে ‘সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল’ বিরোধী আন্দোলন যেখানে যেখানে বেশি হয়েছে, সেখানেই মোদি সরকার ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ করে দিয়েছিল যাতে আন্দোলনকারীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে খবর, ছবি পাঠাতে বা দেখাতে না পারে। বা ধরুন দিল্লির সীমান্তে কৃষক আন্দোলন এবং জমায়েতের কথা। ওই আন্দোলনকে আদালত বেআইনি বলেনি। সামান্য দু’একটি ঘটনা ছাড়া কৃষক আন্দোলন আগাগোড়া শান্তিপূর্ণ। তবু কিন্তু ওই আন্দোলনের জায়গায়, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসেব বলছে, মোট সাত দফা ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’এর ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে আন্দোলনকারীরা ওই সময়ে সমস্ত রকম যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তথ্য আদান প্রদান করতে পারেননি। ফলে মোদি সরকারের আমলে দেখা যাচ্ছে, আন্দোলন, প্রতিবাদ, ভিন্নমতের জমায়েতকে বাধা দিতে এতদিন যেমন লাঠি, জলকামান, টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করা হত, এখন তার সঙ্গে ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ কে-ও ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।
ক্রিস্তফ জ্যাফেরলট তাঁর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে লিখেছেন, পৃথিবীতে যে ক’টি গণতান্ত্রিক দেশ আছে, তাদের মধ্যে ভারতেই সব থেকে ঘন ঘন ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ নামের অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়। VPN (Virtual Private Network), যার মাধ্যমে ইন্টারনেটে আমাদের পাঠানো তথ্য গোপন এবং সুরক্ষিত রাখা হয়, এমন ১০ টি প্রধান ভিপিএন সংস্থা, যারা ‘গ্লোবাল ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ মনিটর করে, তাদের প্রকাশিত তথ্য বলছে ভারত তার দেশের নাগরিকদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের ক্ষত্রে ভীষণ রকমের কড়াকড়ি আরোপ করে থাকে। সেই সব নিষেধাজ্ঞা এতটাই বেশি যা বেলারুশ, মিয়ানমার আজারবাইজানের মতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। তারা হিসেব কষে দেখিয়েছে, এই ধরনের ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ এর ফলে ২০২০ সালে ভারতের ক্ষতি হয়েছে ঘণ্টায় দু’কোটি টাকা করে। ২০১৯-এর ৫ অগস্ট জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার এবং জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা বাতিল করার পর থেকে প্রায় বছর খানেক সেখানে ‘ফোর জি’ নেটওয়ার্ক নিষিদ্ধ ছিল। লেখা-পড়া, গবেষণা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ভয়ঙ্কর ভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছিল এর ফলে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার দীর্ঘদিন ওই সিদ্ধান্ত জারি রেখেছিল। কাজ চালাতে হত টু-জি নেট ওয়ার্ক দিয়ে। যা আসলে কোনও কাজেরই ছিল না। ফলে সেই পরিস্থিতি কার্যত ছিল ইন্টারনেট শাট ডাউনেরই সামিল।
সবে ২০২১-এর ৫ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রশাসিত জম্মু-কাশ্মীরে ফের ফোর-জি নেটওয়ার্ক চালু করেছে মোদি সরকার। এখানে একটা কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। এই যে ঘন ঘন মোদি সরকারের ‘ইন্টারনেট শাটডাউন’ ঘোষণা, এটা কতটা আইন সম্মত? ২০২০-র মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট তার এক রায়ে বলেছে, ইন্টারনেটের অধিকার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এর আগে রাষ্ট্রপুঞ্জ তার সব ক’টি সদস্য দেশকে অনুরোধ করেছিল ইন্টারনেটের অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে। সেই কথা মেনে ভারতে প্রথম কেরল সরকার ১৯১৭ সালে ঘোষণা করে তাদের রাজ্যে ‘অ্যাকসেস টু ইন্টারনেট বেসিক হিউম্যান রাইট’। যদিও এটা ঠিক, একটা রাজ্য কখনও এই ধরনের ঘোষণা করতে পারে না। এটা করতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। কেরলের এই ঘোষণাকে দেখতে হবে একটি রাজ্য সরকারের জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ হিসেবে।
যে নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে বলেছিলেন তিনি স্বপ্ন দেখেন এক ডিজিটাল ইন্ডিয়ার, তথ্যের অবাধ স্বাধীনতার, সেই অবাধ স্বাধীনতার কথা তিনি কিন্তু এখন আর বলেন না। ফ্রিডম হাউজ নামের সংস্থা যারা দেশে দেশে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করে রিপোর্ট তৈরি করে, তাদের তথ্য বলছে গত তিন বছর ধরে টানা ভারতে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বড় রকমের অবনমন হয়েছে। আর এটা হয়েছে যেমন ইন্টারনেট শাটডাউন-এর জন্য তেমনই হয়েছে মোদি সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ‘ডিজিটাল অ্যাটাক’ (যেমন ট্রোল) এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুয়ো তথ্যের কারবারি পলিটিশিয়ানদের কাজ-কর্মের জন্য।
ব্যাপারটা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি মোদি সরকার ঘোষণা করেছে তারা সোস্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেটের ব্যবহার, ওয়েবসাইটের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চলেছে। বলা হচ্ছে পর্নগ্রাফি ইত্যাদি ঠেকাতে এসব করা হচ্ছে। কিন্তু বিরোধীরা যেমন অভিযোগ তোলেন ইউএপিএকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে, যেমন সিবিআই, ইডি, আইটি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বিরোধীদের শায়েস্তা করার প্রতিষ্ঠান বলে, ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার শুরুতেই একই ধরনের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে বিরোধীদের পক্ষ থেকে। বেশ কিছুদিন আগে, ক্যারাভ্যান ম্যাগাজিন এই সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশ করেছিল। যে খবরে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি মন্ত্রীগোষ্ঠী একটি আলোচনায় ‘দ্য ওয়্যার’, ‘স্ক্রোল’-এর মত মোদি সরকারের সমালোচক ওয়াবসাইটগুলিকে কী ভাবে ‘নিউট্রালাইজ’ করা যায়, বাগে আনা যায়, তাই নিয়ে সরকারের নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন থাকা উচিত বলে মত দিয়েছে। তখনও বলা হয়েছিল মিথ্যা খবর ফেক নিউজ আটকাতেই নাকি এই সক্রিয়তা। ওই খবর প্রকাশ হওয়ার পর সেখানে যে মন্ত্রীদের নাম ছিল তাঁদের কেউ কেউ যদিও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এখন যখন এই বিষয়ে আইন করার কথা বলা হচ্ছে, তখন ফের ক্যারাভ্যানের সেই রিপোর্ট সামনে চলে এসেছে। আর এটাও সত্যি যে এখন আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সেই স্বপ্নের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কথা মোটেই বলছেন না।