সেদিন দেখলাম একটা দলের তরফে আহ্বান জানানো হয়েছে — সবাই আসুন, নির্ভয়ে ভোট দিন। সবাই নিশ্চয় আসবেন এবং নির্ভয়ে ভোট দেবেন। নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার মধ্যে কোন ভয়ের ব্যাপারই নেই। তবে ওই ‘আসুন’ এর জায়গায় ‘হাসুন’ থাকলে আরও ভালো হত, আরও নিশ্চিন্ত হত মানুষ। এটা আমার নিজের মত, তাই সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। আমার মনে হয়, ভোট ব্যাপারটা আদতে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। কাজেই হাসতে হাসতে আসতে হবে, ভোট দিতে হবে হাসতে হাসতেই। হাসিই তো ভোটের আসল দেবতা জনগণেশের পরিতৃপ্তির চিহ্ন। পাঁচ বছরে মাত্র একবার এই দিনটিতেই তো তাদের পুজো করা হয়!
এটা ঠিক যে ভোট ব্যাপারটা মোটেই কোন লঘু কৌতুকের বিষয় নয়, তা একটা সিরিয়াস ব্যাপার। কিন্তু ভোট যতই সিরিয়াস হয়ে পড়ছে ততই কিন্তু লোকজন এটাকে ভয় পেতে শুরু করেছেন। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের দিকে আসার সময় থেকে ভোট দিয়ে বাড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত মানুষ ব্যাপক সিরিয়াস। কারণ তাকে কোনভাবেই প্রভাবিত হলে চলবে না, প্রয়োগ করতে হবে নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, খেয়াল রাখতে হবে নিজের নিরাপত্তার ওপর। নাহলে আগামী পাঁচ বছর ভালো থাকা তো দূরের কথা হয়ে যেতে পারে চিরজীবনের মত খারাপ থাকার ব্যবস্থা।
আগে কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এরকম ছিলনা। আদ্যিকালের কথা বলতে শুরু করেছি ভেবে নাক সিঁটকাবেন না। কিশোর বয়সে দেখতাম, ভোটের দিন পাড়ায় একটু বৃদ্ধ বা বয়স্ক মানুষদের বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াচ্ছে রিকশো। তাতে করে তাদের ভোট দিতে নিয়ে যাচ্ছেন কোন দলের স্বেচ্ছাসেবকরা। কোন মানুষই এতে আপত্তি করতেন না। ওই স্বেচ্ছাসেবকরাও ‘আমাদের ভোট দেবেন’ মার্কা কোন আবেদন করতো না তাদের কাছে। মার্কামারা কংগ্রেসী ভোটারকেও দেখেছি ভোটের দিন পাড়ায় সিপিএমের বুথ ক্যাম্পে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন কিংবা ভোটার তালিকায় তার নাম আছে কিনা তা মিলিয়ে নিচ্ছেন। এসব কিছুতে নির্বাচন বিধি ভঙ্গ হচ্ছে বলে প্রশ্ন তোলেননি কোন পক্ষই। ভোট যখন থেকে সত্যিই শারীরিক যুদ্ধ হয়ে উঠেছে, হয়ে উঠেছে একটা আতঙ্কের ব্যাপার, এসব বিধি এসেছে তারপর। আমাদের জীবনের স্বাভাবিক ও সহজ সুরটা কেটে গেছে বলেই খাইয়ে দাইয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে বলে নানা বিধি আরোপ করার প্রশ্ন এসেছে।
মেদিনীপুর, পুরুলিয়ার ভোটে আমি নিজে দেখেছি, মানুষ সব দলের বুথ ক্যাম্প থেকেই সহজভাবে মুড়ি-ছোলা বা গুড়-মুড়ি নিচ্ছেন স্বাভাবিকভাবেই। বিশ্বাস করুন, কোন ক্যাম্পের লোককেই বুদ্ধি খাটিয়ে আমাদেরকে ভোট দিন বলে কোন আবেদন করতে দেখিনি। আমারও মনে হয়নি মুড়ি-ছোলা-গুড়-চপ এসব খেয়ে তারা বিরাট কিছু প্রভাবিত হচ্ছেন। কথাবার্তার সময় কোন সমস্যা নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করলেও কাকে ভোট দিলেন, এটা বলেননি কেউ। এটাই তো সচেতনতা, এটাই তো গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আমাদের চলতি রাজনীতি ক্ষমতার দম্ভে যাকে অতীত করে দিয়েছে। ছোলা-মুড়ি খেতে খেতে বাড়ি ফেরার সময় আতঙ্ক নয়, হাসি মুখে বাড়ি ফিরেছেন তারা। এই হাসিটুকুই বেঁচে থাক, সবাই যাতে ভবিষ্যতে হাসতে হাসতে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করাই তো গণতন্ত্র।