জনতা জনার্দনের রায়দানেও কেশপুর, ডেবরা, চন্ডীতলার অশান্তির জেরে দিনভর টানটান উত্তেজনায় নজর কেড়ে রাখল হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রাম। অবশ্য দ্বিতীয় দফার ভোটকে কমিশন ‘মোটের উপর শান্তিপূর্ণ’ সার্টিফিকেট দিতে দ্বিধা করেন নি।
এক দশক আগে যে নন্দীগ্রাম ছিল রাজ্যপাট বদলের দিশারি, দশ বছর পর রাজ্য বিশানসভা নির্বাচনে সেই নন্দীগ্রামই রাজ্য রাজনীতির সমস্ত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো নিজেকে এই কেন্দ্রের প্রার্থী ঘোষণা ও বিজেপিতে নাম লেখানো শুভেন্দু অধিকারি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করতেই।
গত কয়েকদিন ধরেই হাইভোল্টেজ নন্দীগ্রামে চলেছে নানান প্রচার ও সভা। মমতা, শুভেন্দু ছাড়াও এই কেন্দ্রে লড়াই করছেন বামপ্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। নজর কেড়েছেন তিনিও।
নন্দীগ্রামের ভোট যাতে শান্তিপূর্ণ হয় তার জন্য নির্বাচন কমিশন চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেনি। ১৪৪ ধারা জারি ছিল নন্দীগ্রামে। ছিল ২২ কোম্পানী কেন্দ্রীয় বাহিনী। নাকা চেকিং ছাড়াও মাইক্রো অবজার্ভাররাও ছিলেন। মাঝেমধ্যে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের কনভয়ও ছুটেছে নন্দীগ্রামের রাস্তায় রাস্তায়।
সকাল সকাল ভোট দিয়েই আত্মবিশ্বাসের সুরে শুভেন্দু জানিয়ে দেন, ‘মমতা হারছেন’। হাওয়ায় খবর পেলেন, নাকি তাঁর একার ভোটেই সেই ঘটনা ঘটতে চলেছে তা তিনিই জানেন। কিন্তু তারপরই ইভিএম খারাপ থেকে নানা জায়গায় তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষের খবর। অবশ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মোটের উপর শান্তিপূর্ণ দ্বিতীয় দফা। ৮০.২৩ শতাংশ ভোট পড়েছে এদিন।
এতকিছুর মধ্যে থেকে শিরোনামে উঠে এসেছে বয়াল সাত নম্বর বুথ। দুপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হুইল চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়, পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকের বয়াল মক্তব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ নম্বর বুথে। তার আগে সেখানে দু’দলের কর্মী-সমর্থকরা একশো মিটারের তফাতে মুহূর্মুহু একে অপরের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল। পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা দু-পক্ষের মঝে দাঁড়িয়ে দু-দলকে আটকে রাখার চেষ্টা চালায়। ঘন্টা দুয়েক পর আসেন নন্দীগ্রাম থানার দায়িত্ব প্রাপ্ত আইপিএস নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠী, মাইক্রো অবজার্ভার ও বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী।
অভিযোগ ওই বুথে তৃণমূলের এজেন্টকে বসতে দেয় নি বিজেপি। তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা পুলিশকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। আতঙ্কে তৃণমূলের এজেন্ট মহাদেব সিনহাকে বাড়ি থেকে যেতে দিতে রাজি হননি তাঁর মা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর আশ্বাস পেয়েও কান্নায় ভেঙে পড়েন মা। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে যেতে দেব না।’
ছাপ্পা ভোট পরারও অভিযোগ আসে ওই বুথ থেকে। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছান মমতা। তাঁকে দেখেই বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। তৃণমূল সুপ্রিমো জানান, ৬৩টি অভিযোগ এসেছে। নির্বাচন কমিশনে জানানো হয়েছে। রাজ্যপালকেও ফোন করে সুষ্ঠু ভোটের দাবি জানান মমতা।
কেবল নন্দীগ্রাম তো নয়, আরও বেশি উত্তপ্ত ছিল কেশপুর। ভোটে কেশপুর যে আগুন হয়ে ওঠে তা আরও একবার বোঝা গেল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপ সত্বেও সেই অশান্তি এড়ানো গেল না। যুযুধান দু-দলের প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর থেকে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল দিনভর। আক্রান্ত দলীয় কর্মীদের দেখতে এসে কেঁদে ফেলেন তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহা।
শুরুতেই কেশপুরের গরগজপোতায় বিজেপি প্রার্থী প্রীতিশ কোঙারের এজেন্টের গাড়ি ভাঙচুর। সেই ঘটনার ঠিক দু-ঘন্টার মাথায় আক্রান্ত হন বিজেপি প্রার্থী, ভাঙচুর হয় তাঁর গাড়ি, আক্রান্ত হয় সংবাদমাধ্যমও। এরপর বিজেপির পাল্টা আক্রমন কেশপুর থানার মন্তা গ্রামে। বিজেপির বেধড়ক পিটুনিতে ৮ তৃণমূলকর্মী আহত হয়।
কেশপুর ছাড়াও হিংসার অভিযোগ উঠেছে জেলার পিংলা সবং-এও। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়না ২০৬ বিধানসভার বাকচা অঞ্চলের প্রায় ৯২টি পরিবারের ৫০০ জন তৃণমূল নেতা, কর্মী, সমর্থক ঘরছাড়া বলে অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনাকে এসব জানানোর পরও তাঁরা বলছেন আট দফার ২য় পর্ব মোটামুটি শান্তিপূর্ণ। যদিও ভোটপর্ব শেষে কেবলমাত্র তৃণমূল নয়, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ছাড়েনি বিজেপি। কোনও ক্ষেত্রেই কমিশনের ভূমিকা সন্তোষজনক নয় বলেও দাবি করে বিজেপি। কমিশনের হাবভাব হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে একটু আধটু অশান্তি তো হবেই।
Excellent reportaz.
খুব ভাল একটি প্রতিবেদন। নন্দীগ্রামের ভোট নিয়ে অনেকগুলি পড়েছি, এটাই সেরা মনে হল।
প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছে ঘটনাস্থলে ঠিক লেখকের পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় বিবরণ কিন্তু
প্রশ্নগুলি লেখাটির চাপা স্বরেও স্পষ্ট। ধন্যবাদ।
সেদিন অন্তত তিনটি মিডিয়ার গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছেন সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান, আহত হয়েছেন গাড়ি
চালক, যারা মিডিয়ার ওপর এ ধরণের আক্রমন চালাচ্ছেন, তারা কি চান সংবাদ হোক অফিসে বসেই? তাঁরাই তো আবার
মিডিয়া অফিসে এসে হাত-পা ধরেন একটা খবর করে দেবার জন্য…
নির্বাচন কমিশন গোড়া থেকেই একটি সং-এর প্রতিষ্ঠান, সারা বছর তাঁরা ভ্যারেণ্ডা ভাজেন আর ভোট এলে ‘তাঁদের’
তাবেদারি করতে করতে দু-এক ফোঁটা ঘাম ঝড়ে। কিছু ক্ষেত্রে অশান্তি-ঝামেলা-সংঘর্ষের কারণও ওই সঙেরা।