২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির ভোটের ঠিক আগে একটা জাতীয় চ্যানেল অমিত শাহের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। ইউটিউবে দেখে নিতে পারিস। সঞ্চালক বললেন, প্রধানমন্ত্রী ভোট প্রচারে এসে ব্ল্যাকমানির কথা বলছেন, কালাধন ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন, ১৫ লক্ষ টাকা সবার অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথা বলেছেন এই সব কথা বলার অর্থ কি—অমিত শাহ উত্তর দিলেন— ‘দেখিয়ে এ জুমলা হ্যায়। কিসিকো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টমে ১৫ লাখ কাভি নেহি যাতা ও উনকো ভি মালুম হ্যায় অউর আপকো ভি মালুম হ্যায়, দেশকি জনতা কো ভি মালুম হ্যায়। … এ ভাষণ দেনে কা এক তরিকা হ্যায়, এ জুমলা হ্যায়।… এ চুনাবি ভাষণ মে বজন ডালনে কি লিএ কহি গায়ি বাত হোতি হ্যায়। …ইসকো দিমাক কি গরিবি কি ইয়ে সমাঝ নেহি পাতা’। —টকাদা থামলো। কিছু বুঝলি?
সুমনরা মাথা দোলাল।
জুমলা কথার আক্ষরিক অর্থ কি?
সেইভাবে বলতে পারবো না। তবে সামান্য বুঝতে পারছি।
শোন, হিন্দি বলয়ে যথেষ্ট প্রচলিত শব্দ জুমলা। যার অর্থ মিথ্যে প্রতিশ্রুতি। আবার গুজরাটে জুমলা শব্দের অর্থ— বোকার মত কথা। তা রাজনীতিতে এই জুমলা-র ঠেলায় সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে। প্রতিশ্রুতি ভুরি ভুরি কিন্তু প্রাপ্তির ঘর শূণ্য। বাংলায় আমরা বলি, বাতেলা মারছে।
সুমনরা মুচকি মুচকি হাসছে।
এই তো দু-দিন আগে মোদির মিটিং হলো, কি বললো— সোনার বাংলা গড়বে, তাই তো?
সুমনরা মাথা দোলাল।
আমার এক বন্ধুর বাড়িতে—ও হাওড়ায় থাকে, কয়েকজন বিজেপির কর্মীরা গেছিলেন। ওই যে ওদের একটা প্রোগ্রাম চলছে না, আর নয় অন্যায়। ঘরে ঘরে যাচ্ছে। তার গল্প তোদের বলি। মন দিয়ে শুনে যাবি। যার বাড়িতে গেছিল সে কিন্তু হেঁজিপেজি লোক নয়। জ্ঞানগম্যি কিছু আছে। বিজেপির কর্মীরা যে গুলোকে বটগাছ ভাবছেন সেগুলি বিদ্যাবুদ্ধিতে ভেরান্ডার ঝোপ। ভোটটা কে দেবে জনসাধারণ—২০১১ সালে বামফ্রন্টের বিপক্ষে জনসাধারণের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটা ভোটের ছয় মাস আগে থেকে বোঝা গেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে মমতার বিপক্ষে জনসাধারণের এই মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারটা ততটা নেই কিছুটা অভিমান আছে তবে মমতাকে সরিয়ে দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় বসাবার ক্ষেত্রে সেই জণবিষ্ফোরণ নেই। অতএব এগুলো নিয়ে ভাববার কোনো অবকাশ আছে বলে আমার মনে হয় না।

সে যাক আমার সেই বন্ধুর বাড়িতে হাতে পতাকা আর জয়শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে হাজির অতিথিরা। বন্ধু প্রথমে ভড়কে গেছিল। তারপর যা হয় সাধারণ মানুষ, তাদের ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসায়। চা জল দেয়। জানতে চায় তাদের আগমনের কারণ কি? তারা বলেন বিজেপির ‘আর নয় অন্যায়’ ক্যাম্পেনের জন্য তারা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে বোঝাচ্ছে।
কি বলতে চান বলুন—
নেতৃত্বে একটি মেয়ে সেই মেয়েটি আবার ওই তল্লাটের এক নামকরা প্রমোটারের স্ত্রী এবং সম্ভবত সে ওই ওয়ার্ডে হাওড়া মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ভোটে দাঁড়াবেও। তা সেই ভদ্রমহিলা প্রথমেই আমার বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন—
আপনার ফোন নম্বরটা একটু দিন তো একটু লিখে নিই।
কেন কিসের দরকার আপনার!
না আমরা জানি আপনি একসময় আরএসএস করতেন।
হ্যাঁ আমি তো আরএসএস করেছি একসময় ঠিকই শুনেছেন আপনি। সুকুমার জ্যেঠুর তত্বাবধানে করেছি। তখন কিন্তু আমি বেশ ছোট।
আপনার তো আরএসএস-এর ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।

হ্যাঁ এখনও আমার সঙ্গে আরএসএস-এর যোগাযোগ আছে, তাতে কি হয়েছে? আরএসএস-এর একজন সর্বভারতীয় ট্রেডউইনিয়নের নেতা তো মোদীর চূড়ান্ত বিরোধী। তাতে কি আরএসএস আর বিজেপি এক হয়ে গেল।
না আপনি আপনার ফোন নম্বরটা দিন আমি আপনাকে মিস কল দিয়ে আমাদের সদস্য করে নেব।
আমার নম্বরটা এখানে আরএসএস-এর অনেকেই জানেন, তাই আমার নম্বরটা আপনাকে দিচ্ছি না। তবে হ্যাঁ যদি আপনি আমার নম্বরটা জোগাড় করে মিস কলের মাধ্যমে আমাকে সদস্য করেন এবং আমি যদি তা জানতে পারি তার পরেরদিন দেখবেন আমি টিএমসির পতাকা কাঁধে নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করবো। আমি কিন্তু এইসব পছন্দ করিনা। তবে আপনি এটা করলে আমিও ওটা করতে বাধ্য হবো। তখন কি আপনাদের মুখ থাকবে?
আপনি এমন কথা বলছেন কেন?
আমার ফোন নম্বর নিয়ে আমাকে সদস্য করার ব্যাপারে আপনার তো কোনও এক্তিয়ারই নেই আমাকে এই ধরণের কথা বলার। এই তো দেখুন না আপনাদের সঙ্গে কথা বলার পর দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে যাব, আমার বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠবে কেন এদের সঙ্গে কথা বলতে যাও। বাড়ির গ্যারেজে গাড়ি থাকতে গাড়ি বার করতে পারি না তেলের দাম আকাশ ছোঁয়া, রান্না ঘরে সিলিন্ডার ফাঁকা ইমার্সনে রান্না করছি গ্যাস কিনতে গেলে হাতে ছেঁকা লাগছে।

না ওটা তো ইন্টার ন্যাশন্যাল মার্কেটের…।
দেখুন এসব বোঝাবেন না। এখন একটা ছোট্ট বাচ্চা ছেলে গুগুলে সার্চ মারলে ইন্টার ন্যাশন্যাল মার্কেটে ক্রুড অয়েল এবং গ্যাসের দাম কতো তা বলে দেবে। সেটা ইন্ডিয়ান কারেন্সিতে কনভার্ট করলে কি দাম দাঁড়ায় তা গড় গড় করে বলে দেবে। শুধু করোনার দোহাই দেবেন না, করোনা হওয়ার ৬/৮ মাস আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি জিরো টলারেন্সে চলে গেছে।
না না ঠিক তা নয়… আপনি বেশ সুন্দর সুন্দর কথা বলেন…।
সুন্দর কথা বলার জন্য নয় আপনারা এসেছেন আর নয় অন্যায়-এর ক্যাম্পেনে। আমাকে তো বোঝাতে হবে আপনাকে কার অন্যায় আর কার ন্যায়।
আচ্ছা আপনি বলুন তো দেশের হালটা কি? বিজেপির এজেন্ডা কি? পাকিস্তান, মুসলমান, রাম, গরু আর গোমূত্র এই পাঁচটা এজেন্ডার বাইরে গিয়ে আপনি আমাকে বলুন আপনারা দেশের জন্য গত ৭ বছরে কি করেছেন?
আপনি জানেন ইরানের কাছে আমাদের দেশের একটা ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ছিল সেটা কংগ্রেসী আমলে নেওয়া, আমরা সেটা শোধ করেছি।
আমি বিশ্বাস করিনা এই কথা।
কেন কেন!
কথাটা আপনি বলছেন তাই। যদি সত্যি সত্যি ভারত সরকার ঋণটা শোধ করতো, তাহলে গদি মিডিয়া চুপ করে বসে থাকতো? তারা কেন্দ্রীয় সরকারের ভজনা করতে করতে কানের খোল বার করে দিত। আর একটা কথা ঋণটা যে কংগ্রেসী আমলের সেটাও আমার জানা নেই আপনি বললেন তাই জানতে পারলাম। আমি সরকারের কাগজটা দেখতে চাই, আপনার কাছে আছে?
মেয়েটি চুপ। একটা ব্রোসার বন্ধুটির হাতে দিল। বন্ধুটি কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখে বললো—
এতে তো অনেক কিছু লেখা আছে দেখছি। আমরা কাগজ একটু আধটু পড়ি। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং ফেসবুকের মাধ্যমে অনেক সংবাদ জানতে পারি। তাতে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের বেশ কিছু জনমুখী প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ এক নম্বরে। বলছেটা কে— না কেন্দ্রীয় সরকারের সেই সব দফতর। তাহলে খারপটা কি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে? হ্যাঁ একটা খারাপ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের নেক্সট জেনারেশনের চাকরি নেই। এটা আমি আপনাদের সঙ্গে একশ শতাংশ একমত। তবে হ্যাঁ ভবিষ্যতে কি করবে তা আমি জানি না। ১০/১৫ হাজার টাকার কন্ট্রাকচ্যুয়াল বেসিসে যে চাকরি, সেটা বেশ কিছু হয়েছে। আর পিএসসি, এসএসসি-র যে সব চাকরি সেগুলো মামলা-মকদ্দমায় আটকে আছে। এই তো প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের মেরিট লিস্ট বেরলো, আবার কোর্ট কেস, হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিল। কার ক্ষতি হলো— যে কয়েকজন চাকরি পেত তারা ঝুলে রইলো। এটা করার কি কোনও দরকার ছিল?

এই তো কয়েকবছর আগে আপনাদের উত্তরপ্রদেশের একজন নেতা এখন তিনি যদিও ওখানকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে ছিলেন আমি নিজে ধর্মতলায় একটা মিটিং-এ দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম তিনি মাইকে চেঁচাচ্ছেন— ভাগ মুকুল ভাগ। এখন মুকুল রায় আপনাদের সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। অনেক বেশি ক্রাইম তো আপনারা করছেন। যে টাকাটার জন্য সিবিআই এনকোয়ারি হলো। তারপরে সব ধামাচাপা পরে গেল। আচ্ছা যে টাকাটার জন্য ওনার নাম জড়াল সেই টাকাটা কি উনি ফেরত দিয়েছেন? আমরা সাধারণ মানুষ অর্থটা বুঝতে পারি না।
না না আপনি ঠিক কথা বলছেন না। ওটা কিন্তু বিচারাধীন ব্যাপার। ওনাকে ফাঁসানো হয়েছে। জোর করে ওনার নামটা কেসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
কেসটা তো এনকোয়ারি করছে সিবিআই। তাহলে সিবিআই ইচ্ছে করে মুকুল রায়কে জুড়ে দিল। শুনলাম তো সিবিআই ওনাকে রাজসাক্ষীও হতে বলছে উনি রাজী হচ্ছেন না। আচ্ছা বাকিদের ক্ষেত্রে আপনারা এই স্ট্যান্ড নিচ্ছেন না কেন? তাদের চোর বলছেন কেন? তাহলে তো আপনাদের বলতে হয় ওরাও চোর নয় বিচারাধীন ব্যাপার।
বাংলায় একটাও ইন্টাস্ট্রি হয় নি গত ১০ বছরে আমরা ক্ষমতায় এলে সোনার বাংলা গড়বো।
আপনারা বলছেন সোনার বাংলা গড়বেন। আপনাদের নেতৃত্ব স্থানীয়রাও যেখানেই যাচ্ছেন বলে বেড়াচ্ছেন তাঁরা ক্ষমতায় এসে সোনার বাংলা গড়ে দেবেন। আচ্ছা এই যে ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ হলো এতে জানেন কি বাংলার একটা নিজস্ব ব্যাঙ্ক ছিল যেটা চিরতরে হারিয়ে গেল। আপনারা নাম বলতে পারবেন?
না।
ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া। স্বাধীনতার সময় এর নাম ছিল কুমিল্লা ব্যাঙ্ক। পরে এটা ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক হয়। ইতিহাসে যাচ্ছি না। তাকে জুড়ে দেওয়া হলো পাঞ্জাব ন্যাশন্যাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে। জানেন এই ব্যাঙ্কের গোড়ার দিকে কোন বাঙালিরা ছিলেন? বি. কে. দত্তের মতো স্বনামধন্য মানুষেরা। জানেন সারা ভারতবর্ষে ব্যাঙ্কের উৎপত্তি কোথায় হয়— কর্নাটক আর বাংলায়। কর্নাটকের একটা সম্প্রদায়ই ছিল ব্যাঙ্কিং সম্প্রদায়। ঠিক তেমনি কুমিল্লার বি কে দত্তরা ব্যাঙ্কিং সম্প্রদায়ের মানুষ। কখনও ঢুকেছেন ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের হেড অফিসে? দেখে আসবেন সেখানকার ইন্টেরিয়র ডেকরেশন। বাঙালির মনন এবং সংস্কৃতি ধরা আছে সেই সব কাজের মধ্যে দিয়ে। আর তাকে আপনারা তুলে দিলেন পাঞ্জাব ন্যাশন্যাল ব্যাঙ্কের হাতে। ব্যাঙ্কের সমস্ত অ্যাসেট চলে গেল দিল্লি ওয়ালাদের হাতে। এটা কি সোনার বাংলা গড়ার নমুনা? আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের হাতে তৈরি বেঙ্গল কেমিক্যাল যেটা বাংলার সংস্কৃতির আর এক অধ্যায় সেটাও আজ বেচে দিতে চলেছে কেন্দ্র। এটাও কি সোনার বাংলা গড়ার নিদর্শন। একটা শিল্প আর একটা ব্যাঙ্ক। এটা তো বাংলার ঐতিহ্যের ওপর আঘাত।
তখন ওদের পালাই পালাই অবস্থা। সুমনরা টকাদার কথায় মুচকি মুচকি হাসছে।
না আমরা যদি মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে এসে আলোচনা করি কোনটা ভুল কোনটা ঠিক, নিজেরা একটু শুধরে নেওয়ার সুযোগ পেতাম।
আপনাদের অবাঙালি কালচার আমরা কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গে হতে দেব না। বাঙালি কালচারটা বিহার, ইউপি, এমপি-র সঙ্গে একেবারে গুলিয়ে ফেলবেন না। বাঙালি হতে গেলে, বাংলার সংস্কৃতিকে জানতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়।
না আপনার কথা আমরা ওপর তলায় জানাব আপনার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখলাম।
একেবারে জানাবেন না। তাহলে আমি খুব বিপদে পড়ে যাব। আপনাদের যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আছেন, তিনি কিন্তু যে সে লোক নন, আপনারা আমার কথা বলবেন আর উনি আমাকে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ জেলে ভরে দেবেন। তবে কি জানেন আমরা ছোটবেলা থেকে প্রিয়, সুব্রত, সোমেন, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো মানুষকে দেখে বড় হয়েছি, সেখানে অবাঙালিরা এসে বাংলা দখল করবে বক্তৃতায় ভুলভাল বাংলা বলবে সেটা মানা যায় না।
সুমনরা সকলে টকাদার মুখের দিকে তাকিয়ে।
ও কিন্তু আরএসএস ঘেঁষা। কিছু বুঝলি?