২০২৪-এর লোকসভা ভোট যদি হয় ফাইনাল তবে তো তার আগে পঞ্চায়েত ভোটকে সেমিফাইনাল বলাই যায়। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেরই মত, পঞ্চায়েত, বিধানসভা, লোকসভা ভোট একেবারেই আলাদা প্রেক্ষিত এবং প্রতিটি ভোটের ক্ষেত্রেই প্রেক্ষিতগুলি বদলে যায়। কোনো দল বিধানসভায় ভালো ফলাফল করলো মানেই যে সেই দল লোকসভাতেও ফোটা এলাকা দখল করে নেবে এমনটা বলা যায়না। তবে একথা ঠিক যে আগামী বছর লোকসভা ভোটের আগে গ্রাম বাংলার পঞ্চায়েত ভোট রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের কাছে অ্যাসিড টেস্ট। যে কারণে পঞ্চায়েত ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে থেকেই বিজেপি নেতৃত্ব পঞ্চায়েত ভোটে কতটা ভালো ফল করা যাবে তা নিয়ে হিসেব নিকেশ শুরু করে দিয়েছে।
২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে পঞ্চায়েত ভোট বিজেপির পক্ষে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। যে কারণে পঞ্চায়েত ভোটকে লক্ষ্য করেই রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি প্রচারে বেশ জোর দিয়েছে। আরও লক্ষ্য করার বিষয়, গত ৮ জুন পঞ্চায়েত নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পরদিন থেকেই বিরোধীরা মনোনয়ন দাখিলের সময়সীমা নিয়ে অভিযোগ করলেও দেখা যাচ্ছে, মনোনয়ন পর্বের প্রথম দিন মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি ও গ্রাম পঞ্চায়েতে যত মনোনয়নপত্র জমা পড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন বিজেপির। অন্যদিকে শাসক দল গ্রামাঞ্চলে কোনো উন্নয়ন করেনি একথা বলা যাবে না। যদিও তাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু বিরোধী দল কি শেষ পর্যন্ত শাসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি একত্রিত করে পঞ্চায়েত ভোটে প্রতিফলিত করতে পারবে?
বিজেপি নেতৃত্ব এবারের পঞ্চায়েতে ভাল ফলের আশা হিসাব করছে গত বিধানসভা নির্বাচনে গ্রামাঞ্চলের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ধস নেমেছিল, মাত্র ৭৭টি আসনে জয় পেয়েছিল তারা। তবে ওই ৭৭টি আসনের মধ্যে ৩৬টি কেন্দ্রের গোটা এলাকাই ছিল গ্রামাঞ্চল। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের আশা যদি সেই ফলের ছায়া পঞ্চায়েত ভোটেও পড়ে, তবে পাঁচটি জেলায় তারা ভাল ফল করতে পারে। ওই পাঁচটি জেলার গ্রামাঞ্চলে বিধানসভার ভোট ধরে রাখতে পারলে, জেলা পরিষদ দখলের কাছাকাছি চলে যেতে পারে বিজেপি। তবে বিধানসভা আর পঞ্চায়েত ভোটের প্রেক্ষিত যে এক নয়, দু-ধরণের ভোটের মধ্যে যে যথেষ্ট ফারাক আছে সে কথা বিজেপি নেতৃত্বের মাথায় রাখা দরকার।
গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জেতা আসনগুলির অধিকাংশই ছিল উত্তরবঙ্গের। এর মধ্যে কোচবিহার জেলার ৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি ৭টিতে জয় পেয়েছিল। আলিপুরদুয়ারের বিধানসভা আসন ৫টিই বিজেপি দখলে রেখেছিল এবং জলপাইগুড়ি জেলার ৭টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৪টি। এই তিনটি জেলার শহরাঞ্চল বাদ দিলে সর্বত্রই বিজেপি শাসক দলের থেকে বেশি ভোট পেয়েছিল। অন্য দিকে বিজেপি বেশি আসনে জয় পেয়েছিল দক্ষিণবঙ্গের পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়া জেলায়। গত বিধানসভা ভোটের এই পাঁচ জেলার শহরাঞ্চল বাদ দিয়ে প্রাপ্ত ভোটের অঙ্ক থেকেই বিজেপি পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভাল ফলের আশা করছে। এই পাঁচ জেলা বাদ দিয়েও বিজেপি নদিয়া এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভাল ফলের আশা করছে। সেই অঙ্কেও রয়েছে নদিয়ার ১৭টি আসনের মধ্যে ৯টিতে জয় আর পূর্ব মেদিনীপুরে ১৬টির মধ্যে ৭টিতে। উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলার মধ্যে বিজেপি আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি নিয়েই বেশি আশাবাদী। কারণ, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি সব আসনে প্রার্থী দিতে না পারলেও আলিপুরদুয়ার জেলায় প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৬.১৬ এবং জলপাইগুড়িতে ৩০.৮৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে গোটা রাজ্যে বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির গড় ছিল ২০ শতাংশের নীচে। অন্যদিকে বাঁকুড়ায় বিজেপির ভোটপ্রাপ্তির হার ছিল ২৫.৮৪ এবং পুরুলিয়ায় ৩২.৪৫ শতাংশ। পুরুলিয়ায় জেলা পরিষদের ৯টি আসনে জিতেছিলেন বিজেপি প্রার্থীরা।
এই অঙ্ক থেকেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এ বার পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যে ১০০ শতাংশ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, যে পাঁচটি জেলায় বিধানসভা নির্বাচনে গ্রামীণ ভোট প্রাপ্তিতে দল এগিয়ে সেখানে ১০০ শতাংশ আসনে প্রার্থী তো দিতেই হবে। আর সে কারণেই তিনি সাংগঠনিক বৈঠকে লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। কিন্তু অঙ্কের হিসাব কি পুরোটা সম্ভব করা যাবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, বিধানসভা ভোটে বিভিন্ন আসনে জয়ী হওয়ার পরেও বিজেপি বিধায়করা গ্রামাঞ্চলে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন এমন বহুক্ষেত্রেই হয়নি। এমনকী গ্রামে বিজেপি নেতাদের মধ্যে অনেককে দেখা যায়না। অন্যদিকে বুথস্তরেও বিজেপির সংগঠন নড়বড়ে। এই সব দুর্বলতা মাথায় রেখেই কি বিজেপি নেতৃত্ব পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল নিয়ে আশাবাদী?