বহু বাম ডান নেতাদের বলতে শুনেছি, ভোট হবে অথচ বোমা পড়বে না, গুলি চলবে না, রক্ত ঝড়বে না, দু-চারটে লাশ পড়বে না, তাহলে আর কিসের ভোট। কথাটা সাঙ্ঘাতিক হলেও খুবই সত্যি। কারণ স্বাধীনতার পর বাংলায় এমন একটা বিধানসভা, লোকসভা অথবা পঞ্চায়েত ভোটের উল্লেখ করা যাবে না যেটা নাকি বোমা-গুলি-রক্ত-প্রাণ ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আজকের পঞ্চায়েত ভোটেও রক্তাক্ত হল বাংলা। রক্ত ঝরেছিল মনোনয় পর্ব দাখিলের প্রথম দিন-ই। ভোটের আগেই বাংলায় বেলাগাম সন্ত্রাস, বোমা-গুলি-হিংসায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৮ জন। আর আজ ভোট শুরু হতেই বহু জায়গায় ফের সেই সন্ত্রাসে রক্তস্নাত হল বাংলা, প্রাণ হারালেন ১৭ জন। গণতন্ত্রের উৎসবে মুর্শিদাবাদের খড়গ্রাম, রেজিনগর, রানিনগর, ডোমকল থেকে শুরু করে কোচবিহারের দিনহাটা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়, বাসন্তী, উত্তর ২৪ পরগনার বারাসত-সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ প্রান্তে যা ঘটলো তা কি গণতন্ত্রের উৎসব নাকি রক্তের হোলি খেলা?
উল্লেখ্য, বাংলার পঞ্চায়েত ভোটে মোট ৬১ হাজার ৬৩৬ বুথের মধ্যে ৪ হাজার ৮৪৩টিকে স্পর্শকাতর বুথ ঘোষণা করেছিল রাজ্য নির্বাচন কমিশন। অর্থাৎ, মোট বুথের ৭.৮৪ শতাংশ হল স্পর্শকাতর বুথ। কমিশন কোন জেলায় কত স্পর্শকাতর বুথ তারও একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তা স্বত্বেও বহু জায়গায় অশান্তি হয়েছে ভোট ঘিরে, বোমাবাজি হয়েছে, গুলি চলেছে, সব মিলিয়ে সকাল থেকেই মৃত্যু মিছিল। ভোট-যুদ্ধে বলি হয়েছেন শাসক, বিরোধী দলের কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার। পাশাপাশি ভোটের ব্যালট পেপার নিয়েও বহু জায়গায় ঘটেছে নানা ধরণের কাণ্ডকারখানা। কোথাও ড্রেনে, কোথাও পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে ব্যালট। কোনো কোনো জায়গায় বুথের মধ্যেই অথবা বুথ থেকে ব্যালট বের করে দেদার ছাপ্পা মারার দৃশ্য দেখা গিয়েছে।
বাংলার পঞ্চায়েত ভোটে লাগাতার এই ধরণের ঘটনায় সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, কোথায় কেন্দ্রীয় বাহিনী? কোথায় পুলিশ? ভোটের সকাল থেকেই সর্বত্র সন্ত্রস্ত সাধারণ ভোটাররা এই প্রশ্নটি তুলেছেন বারবার। হাইকোর্ট রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ৪ হাজার ৮৪৩টি স্পর্শকাতর বুথে কি কেন্দ্রীয় বাহিনী মজুত ছিল? জানা গিয়েছে, ভোটের দিনও ৮২৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সবটা এসে পৌঁছয়নি। ভোটের সকাল থেকে সন্ত্রাসে আতঙ্কিত সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য পুলিশকে কার্যত দূরবীণ দিয়ে খুঁজে বেড়ালেও তাদের দেখা মেলেনি। যেখানে তাদের দেখা পাওয়া গিয়েছিল সেখানেও তারা ছিলেন দর্শক। কিন্তু বোমা-গুলি-মৃত্যুর পরও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট সাফাই, ‘কে কাকে গুলি করবে, কাকে মারবে, কেউ গ্যারান্টি দিতে পারে না’। পাশাপাশি বাংলার এই রক্তস্নাত পঞ্চায়েত ভোটেও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, বিকেল ৫টা পর্যন্ত পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬৬.২৮ শতাংশ।
পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে সবচেয়ে বেশি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদে। এই জেলায় ভোটের বলি ১০। দিনক্ষণ ঘোষণার পরের দিনই খুনের ঘটনা ঘটে খড়গ্রামে। তারপর থেকে মুর্শিদাবাদে মৃত্যু মিছিল লেগেই ছিল। ভোটের দিনেও জেলার মানুষ দেখলেন লাগমছাড়া সন্ত্রাস। ভোট শুরু হতেই বেলডাঙার কাপাসডাঙায়, খড়গ্রাম এবং রেজিনগরে তৃণমূল কর্মীকে খুনের অভিযোগ উঠেছে। লালাগোলায় ভোটের বলি হয়েছেন এক সিপিএম কর্মী। অন্যদিকে, নওদায় তৃণমূলের সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে এক কংগ্রসে কর্মীর। তাছাড়া ভোট ঘিরে দিনভর সংঘর্ষে জখম হয়েছেন কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএমের বহু কর্মী। নদিয়ার চাপড়ায় ভোটের লাইনে তুমুল সংঘর্ষে মৃত্যু হয় এক তৃণমূলকর্মীর। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামে তৃণমূল সিপিএম সংঘর্ষে মৃত্যু হয় এক সিপিএম কর্মীর। কাটোয়া-২ নং ব্লকে সিপিএম কর্মীদের সঙ্গে তৃণমূলের এজেন্টের তুমুল ধাক্কাধাক্কিতে আচমকা মাটিতে পড়ে গিয়ে প্রান হারান তৃণমূল এজেন্ট। মালদহের মানিকচকে ভোট চলাকালীন গুলি চললে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় এক তৃণমূলকর্মীর। উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর-২ নং ব্লকের চাকুলিয়ার ভেবরা ১০ নং বুথে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে মৃত্যু হয় এক তৃণমূল নেতার। গোলায়পোখরের হাটখোলা সাহাপুর গ্রামে তৃণমূলের সঙ্গে কগ্রেসের সংঘর্ষে মৃত্যু হয় এক কংগ্রেস কর্মীর। অন্যদিকে হেমতাবাদে এক তৃণমূলকর্মীর দেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গিয়েছে। কোচবিহারেও এদিন পঞ্চায়েত ভোট ঘিরে তুমুল অশান্তি ছাড়ায়। ভোট শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই কোচবিহারের ফলিমারিতে বিজেপির পোলিং এজেন্টকে গুলি করে খুন করার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে, দিনহাটায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে এক বিজেপি কর্মীর। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর ফুলমালঞ্চ গ্রামে ভোটের লাইনে দাঁড়ানো এক যুবক বোমাবাজিতে মারা গিয়েছেন।
বস্তুতপক্ষে এবারের পঞ্চায়েত ভোটের হিংসা ২০১৮-র ভোটকেও ছাপিয়ে গেল। বোমা, গুলি, সন্ত্রাস, সরকারি কর্মীদের মারধর, শাসক-বিরোধীদের সংঘর্ষপূর্ণ গণতন্ত্রের উৎসবে রক্তাক্ত হল বাংলা। সব পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করলেন, অভিযুক্ত করলেন আর মাঝখান থেকে মা হারালেন সন্তান, স্ত্রী হারালেন স্বামী। জানা নেই আজকের হিংসার রেষ মিলিয়ে যেতে বাংলাকে আরও কত রক্তাত্ত হতে হবে।