কেন্দ্রের নয়া কৃষি আইনের বিরুদ্ধে গত ২৬ নভেম্বর রাজধানী সীমান্তে যে কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা চার মাস পূর্ণ হল। ওই দিনই আবার দেশ জুড়ে বন্ধের ডাক দিয়েছিল বিভিন্ন কৃষক সংগঠন। শনিবার ছিল এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট। সেই ভোটে কৃষক আন্দোলনের প্রভাব কি আদৌ পড়েছে?
নির্বাচনের ঠিক আগের জনমত সমীক্ষায় ৪৮.৬৫ শতাংশ মানুষের মতানুসারে, এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে কৃষক আন্দোলনের প্রভাব পড়বে। বাকি ৩৫.৮১ শতাংশ মনে করেন যে কৃষক আন্দোলনের চেয়ে অন্য ইস্যুগুলির প্রভাব বেশি পড়বে। যদিও দিল্লি সীমান্তের কৃষক আন্দোলনকে এ রাজ্যের ৬৩ শতাংশ কৃষক পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। ২০.৭৩ শতাংশ কৃষক জানিয়েছেন তাঁরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করছেন না। পাশাপাশি প্রজাতন্ত্র দিবসে রাজধানীর বুকে কৃষকদের আন্দোলন দমন করতে মোদী সরকার যে পদক্ষেপের করেছিল তাতে এ রাজ্যের ৩৯.৩৪ শতাংশ মানুষ তাকে সমর্থন করেন নি।
গত সেপ্টেম্বর মাসে যখন নতুন কৃষি বিল পাশ হয় তারপর পঞ্জাব এবং হরিয়ানার কৃষকরা যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আন্দাজ করতে পারেনি যে সেই প্রতিবাদ আজ এই চেহারা নেবে। কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে দেশের প্রত্যেকটা বিরোধী দল। সে কারণেই প্রশ্ন কৃষক আন্দোলন ইস্যুতে বিজেপি সরকার কি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনগুলিতে বেকায়দায় পড়বে? নজর রয়েছে শনিবার থেকে শুরু হওয়া বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। শাসক তৃণমূল ছাড়াও কংগ্রেস এবং বামদলগুলি শুরু থেকেই কেন্দ্রের এই নয়া কৃষি আইনের বিরোধিতা করেছে। অনেকেই মনে করছে কৃষক আন্দোলনের প্রভাবে বিজেপি যথেষ্ট চাপে রয়েছে।
এখনও এক বছর দেরি উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। কিন্তু গেরুয়া শিবিরে কপালে চিন্তার ভাজ। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ অধ্যুষিত এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়েছে ব্যাপক আকারে। যা বিজেপির চিন্তা বাড়িয়েছে। এই অঞ্চল থেকেই ২০১৭ বিধানসভা নির্বাচনে ৪১ শতাংশ ভোট আদায় করেছিল বিজেপি। তার আগে ২০১৪-র ভোটের বড় অংশই ছিল জাঠদের। গোটা রাজ্যের ভোট ৪২ শতাংশ হলেও জাঠদের এলাকায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। তাঁরাই যদি মুখ ঘুরিয়ে নেয় ভোটের কী ফল কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
হরিয়ানাতে মাত্র দেড় বছর আগে ক্ষমতায় আসা মনোহরলাল খট্টর-এর সরকারের দাপট ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক পুরসভা ভোটে বিজেপি এবং বিজেপি জোট প্রবল ধস নেমেছে। তার প্রধান কারণ কৃষক আন্দোলন। অকালি দল পঞ্জাবে বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছে। আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছে কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টি কৃষক। ফলে সে রাজ্যেও চাপে আছে পদ্ম শিবির।
এ রাজ্যে কৃষকরা প্রকাশ্যে বড় আন্দোলনে নামেনি ঠিকই, তবে কৃষক আন্দোলন নিয়ে রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দলগুলি প্রথম থেকেই সুর চড়িয়েছে। পাল্টা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা অভিযোগ করেন রাজ্যের ৭০ হাজার কৃষককে কৃষি নিধি প্রকল্পের সুবিধা না দিয়ে বঞ্চনা করেছেন তৃণমূল সরকার। মমতা জমানায় বাংলার কৃষকরা যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পান তা খুবই কম। অন্য রাজ্যের কৃষকরা তার থেকে বেশি সহায়ক মূল্য পান, এমনই দাবি নাড্ডার।
এরপর শুরু হয় ‘কৃষক সুরক্ষা অভিযান’। লক্ষ্য এই অভিযানে ৪০ হাজারেরও বেশি গ্রামে সভা করা, ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক সুরক্ষা কার্ড দেওয়া। গোটা জানুয়ারি মাস ধরে অভিযান চলে বাংলায়। বিজেপি কর্মীরা কৃষকের বাড়িতে গিয়ে চাল ভিক্ষা করেন, বাংলার কৃষকদের কৃষি আইনের সুফল সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেন। এরাজ্যের কৃষক তুষ্টিকেই নিজের নবান্ন জয়ের হাতিয়ার করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজ্যে কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্প চালু না করার জন্য বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন নরেন্দ্র মোদী। তবে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে পঞ্জাব-হরিয়ানা-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে কৃষক আন্দোলনের যে ঢেউ তারপর গেরুয়া শিবিরের ওপর এ রাজ্যের কৃষকদের ভরসা করবে কিনা সন্দেহ আছে।
কৃষকদের আন্সোলন চলাকালীন নেতারা এ রাজ্যের সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, আসানসোল, কলকাতা ঘুরে আবেদন জানিয়ে গিয়েছেন, বিজেপি-কে ভোট দেবেন না বলে। জনসভা করেছেন, বৈঠক করেছেন, মহাপঞ্চায়েত করেছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে রাকেশ টিকায়েত, যোগেন্দ্র যাদব, মেধা পাটকর, বলবীর সিং রাজেন্দ্রওয়ালরা একটাই আবেদন করেছেন— বিজেপিকে ভোট দেবেন না। কারণ, বিজেপি কৃষকদের দাবি অনুযায়ি তিন নয়া কৃষি আইন বাতিল করছে না। সিপিএমের কৃষক সংগঠন দিল্লির আন্দোলনের সঙ্গে আছে। কৃষক ফ্রন্টের নেতা হান্নান মোল্লা কৃষক আন্দোলনের সাত সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটিতেও আছেন। কিন্তু নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, কলকাতায় তাঁর দেখা মেলেনি, দেখা যায়নি সিপিএমের নেতা-কর্মীদেরও।
অবশ্য এর যঠেষ্ট কারণ আছে। ওই সফর আয়োজন করেছিল তৃণমূলের প্রভাবিত কয়েকটি গুরুদ্বারের সদস্য। কিন্তু কৃষক নেতারা যে এ রাজ্যের বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার কথা বললেন, তাতে কি আদৌ কারও লাভ হল? আরও স্পষ্ট প্রশ্ন দিল্লিতে আন্দোলনরত কৃষক নেতাদের আবেদনের কোনও প্রভাব কি এ রাজ্যে ছায়া ফেলবে? তারা দীর্ঘদিন ধরে আপোষহীন আন্দোলন চালাচ্ছেন এ কথা ঠিকই। কিন্তু রাজ্যের মানুষ কাকে ভোট দেবেন তার সঙ্গে রাজেশ টিকায়েত বা যোগেন্দ্র যাদবের আবেদনের কোনও সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। আদৌ কি নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের মানুষ বা কলকাতাবাসীর ওদের সম্পর্কে কোনও উৎসাহ বোধ করেন? কৃষক আন্দোলনের কারণেই তারা এই নামগুলি দু-একবার শুনেছেন মাত্র। ভোটে কৃষক আন্দোলনের তেমন কোনও প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।
খুবই ভাল লেখা, একটি রাজনৈতিক লেখায় যেমন বিশ্লেষণ থাকা দরকার লেখাটিতে তা বেশ ভালভাবেই করা হয়েছে।
The peasant movement has the full support of all except the BJP but its impact will not be felt in
the state assembly polls.
দিল্লি সীমান্তে কৃষকদের ধারাবাহিক আন্দোলন পঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অংশে যেমন প্রভাব ফেলেছে এই
বাংলায় কিন্তু তার তুলনায় অনেক কম, বিশেষ করে কৃষকরা প্রায় নিশ্চুপ। ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ বিক্ষোভে কিছু
ধান্দাবাজ বুড়ো ভামেরা ভিড়ে গেছে, যার পরিণতি অত্যন্ত শোচনীয়। কৃষকদের আন্দোলনকে যারা সমর্থন জানাচ্ছে তাদের
একটা অংশ আবার বিজেপিকেই ভোট মারবে।
ভালো লেখা।
খুব স্পষ্ট বক্তব্য এবং নিজস্ব যুক্তি তর্কে সমৃদ্ধ। লেখাটিকে ভাল বলতেই হবে।
কৃষক আন্দোলন নিয়ে এ রাজ্যে হইচই হল কোথায়? কিছু ছাত্র যুবক প্রতিবাদ মিছিল করলো ঠিকই, তাতে কি বড় কোনও
প্রভাব পড়ে? তাতেও কাজ হত যদি না ওই ছাত্র-যুবদের মধ্যে আপাদমস্তক ধান্দাবাজগুলো গিয়ে ভিড়তো। যাদের দুটো নাম
এবং সব কিছুই দুই তারা যেখানে ভিড়ে যায় তার প্রভাব কি হতে পারে?